একজন মাওলানা ও ভাবি সাহেবা

তিনি একজন বিখ্যাত মাওলানা ও ইসলামি চিন্তাবিদ। তাঁর নাম সাইয়েদ মোহাম্মদ আলী। আমাদের পিতৃপুরুষের সাথে তার রক্তের সম্পর্ক। তার৷ পিতা বিশিষ্ট আবেদ ও দরবেশ প্রকৃতির পরহেজগার মানুষ সাইয়েদ আবু সাইয়িদ। আমাদের গ্রামের বাড়ি পাশাপাশি। তিনি আমার প্রায় বিশ বছরের বড়ো ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে এম,এ আরবি সাহিত্যে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট অথবা সেকেন্ড হয়েছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকতা করতে পারেন নি। তিনি টাঙ্গাইলের করটিয়া সাদাত কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। বাড়িতে কালে ভদ্রে আসতেন।ঈদের সময়ে তিনি বাড়িতে বেড়াতে আসতেন এবং ঈদের জামাতে ইমামতি করতেন। আকর্ষণীয় খুতবা দিতেন। আন্তর্জাতিক বিষয়ে অনেক অনেক বক্তব্য দিতেন। সেগুলোর মর্মার্থ খুব কমই আমার মর্মমূলে মূলীভূত হতো, কারণ আমি তখন নিতান্তই বালক বয়সী ছিলাম। তার মুখেই সর্বপ্রথম শুনেছি ইসলাম একটি পূর্নাঙ্গ জীবন বিধান। ইসলাম সম্পর্কে এমন কথা না তার পিতা কখনও বলেছেন না আমার পিতা বলেছেন। আমার পিতাও ইংরেজি শিক্ষিত প্রচলিত শিক্ষাব্যাবস্হায় শিক্ষিত, তার ইসলাম সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা বিশেষত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যাবস্হা সম্পর্কে ধারণা না থাকাটা স্বাভাবিক। আমাদের এলাকার অন্যান্য আলেম ওলামারা এ বিষয়ে অজ্ঞ।তাদের সিলেবাসে হয়ত ও সব নেই।

যা হোক আমরা বালকেরা তার জ্ঞান, শিক্ষা, ও ব্যাবহারে মুগ্ধ ছিলাম। আমার শৈশব ও বাল্য সন্ধিক্ষণে তিনি রংপুরে বিয়ে করেছিলেন। তার বিয়ে সম্ভবত ঢাকায় হয়েছিল। তবে তিনি যখন অধ্যাপনা ছেড়ে অন্য অনেক কর্মে ব্যস্ত ছিলেন, তখন ভাবিকে বাড়িতে খালার নিকট রেখে জান।ভাবি ভীষণ আলাপি, পরহেজগার ও সুশিক্ষিতা ছিলেন। উম্মুল ওয়ারা শাহজাদী ছাদেকা তাঁর নাম। তাঁর বাবা রংপুরের বিশিষ্ট পীর পাকুড়িয়া শরীফের পীর আফজালুল হক। তাঁকে নিকট থেকে দেখেছি। তিনি আমাদের বাড়িতে অর্থাৎ খালার বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন মেয়ের ঘর সংসারের হাল হকিকত জানতে।

আমি তাদের বাড়িতে ভাবির বিশেষ অনুরোধে মেট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার পর।তাদের বাড়িটি বাজারের মত বড়ো। এমনিতেই বিরাট বাড়ি তার ওপর বাড়ির আঙিনায়, ছেলেদের স্কুল, মেয়েদের স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, পোস্ট অফিস, পীরের আস্তানা, মসজিদ, মালখানা, গুদাম ঘর এবং সংক্ষিপ্ত বাজারও। সে এক এলাহি কান্ড। আমাকে দারুণ আপ্যায়ন করা হতো। শীতের সময় সেখানে বেড়াতে গিয়েছিলাম। প্রচন্ড শীতে আমি প্রায় সময়ই দু,তিনটি লেপের নীচে কাটিয়ে ছিলাম।

শিবলী বেয়াই, ওজায়ের বেয়াই দারুণ মিশুক ও আলাপি ছিলো। ভাবির বড়ো ভাই শাহ রুহুল ইসলাম, ছোট সাহেবজাদা শাহ ওজায়ের পীর ছিলেন। পীরেরা এত মিশুক, সদালাপী হয় তা আমার জানা ছিলো না। তারা আমাকে নিবিড় ভাবে আপন করে নিয়েছিলেন। ভাবির ভাতিজি মুত্মাইন্না প্রায় আমার সমবয়সী ছিলো। ওরা একে একে আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন। ওরা ছিলো পরীর মতো সুন্দরী ও মাছুম বেগুনাহ্, প্রায় ফেরেশ্তার মতো নিশ্পাপ, ভদ্র। পীরের নাতি পীরের মেয়েরা যেমন হয়। আমার ভাবি ছাদেকা একজন পরহেজগার পীরের বেটি পীর। এই ভাবিকে আমি আমার মায়ের মতো ভক্তি ও শ্রদ্ধা করতাম। তিনি আমার মায়ের সাথে বান্ধবীর মতো মিশেছেন।আমার মাকে রিস্তা মতো নানীআম্মা বলতেন। সাদাকাতুল বারী অরফে ছাদি ও মোনাক্কা তার বড়ো ছেলে মেয়ে। অন্যরা হল হাদী, মোনাজ্জা, মোছাল্লেমা, মোনাও ওয়ারা।

ছাদি আমার ছোট বোন ফরিদার সাথে হাসামদিয়া স্কুলে পড়তো, মোনাক্কা ছোট বোন চন্দনা দু-এক ক্লাস ওপরে নিচে পড়তো, কিন্তু ওরা সকলে ফুপু ভাতিজী বান্ধবীর মতো একত্রে লেখা পড়া খেলাদুলা করতো। কলেজে পড়া কালিন ছুটিতে ফরিদ পুর শহরের বাড়ী থেকে এসে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে আসতাম। ওদের পড়াতাম। এমনকি ওদের স্কুলে ক্লাস নিতাম, ওদের আদর করে পড়াতাম। এইচ, এস, সি পরীক্ষার ছুটিতে বাড়িতে যে দু-তিন মাস ছিলাম, তখন আমি ওদের স্কুলের প্রায় নিয়মিত শিক্ষক বনে গিয়েছিলাম, কারণ আমিও ওই হাসাম দিয়া স্কুলের ছাত্র ছিলাম। ফার্স্ট বয় ছিলাম, ফলে স্কুলের শিক্ষকবৃন্দ আনন্দে আমার জন্য চেয়ার ছেড়ে দিয়েছিলেন। এ জন্য আমার প্রিয় শিক্ষক হেডমাস্টার সন্তোষ গুহ স্যারের কাছে আমাকে সম্মানের তাজ পরানোর জন্য ঋণী। মাজেদ স্যারের প্রিয় বাক্য আপ্যায়নের সংরাগে বিমুগ্ধ।

আমি রংপুর থেকে যথা সময়ে অর্থাৎ প্রায় এক সপ্তাহ পরে সহি সালামতে একাকি রেলপথে বোয়ালমারী আমাদের রেলস্টেশনে নেমেছিলাম এবং অজানা শংকায় কুঞ্চিত মায়ের বুকে স্বস্তির স্বাস ফিরিয়ে এনেছিলাম। কিন্তু প্রায় দূর্ঘটনা ঘটতে যাচ্ছিলো যখন মেজো মিয়া আসাদ উল্লাহ নির্দিষ্ট সময়ের প্রায় তিন দিন পর বিলম্ব করে ঐ দূরদেশ থেকে সফর শেষে আনন্দ চিত্তে বাড়িতে ঢুকতে যাচ্ছে। আমার মমতাময়ী মা তার পুত্রধনের অজানা আশংকায় তিন দিন তিন রাত নির্ঘুম, নাখেয়ে, না নেয়ে দোতলার টপ বারান্দায় মিয়ার বেটা গাদুম গুদুম মোটামিয়ার অপেক্ষায় নৈশব্দিক অশ্রু বিসর্জনে হৃদয় চৌচির করছিলেন।

উল্লেখ আসাদ ছোটবেলায় বেশ রিশ্ঠপুস্ট ছিলো কালীপদ কাকার মতো। তার গাদুম গুদুম মোটামিয়া নামকরণটি অবশ্য আমার পক্ষ থেকে হয়েছিল। তার আরও একটি উপনাম করেছিলাম কালীপদ নামে। কারণ বিশ্বাস বাড়ির কালীপদ কাকা বেশ মোটা ছিলেন এবং তিনি আয়েশ করে হেলে দুলে চলতেন। ছোট ভাই বোন দের নামা করণ এবং বিশেষত উপনাম আমার পক্ষ থেকেই প্রদান করা হতো। কেউ না মানলে তার চুল টানা অথবা টাউয়া টানা বা গাল টানা শাস্তি পেতে হতো। বড়ো ভাইয়ের পক্ষ থেকে এ সব ব্যাবস্হাপনা সবাইকে মানতে হতো। বড়ো মিয়া কেবল তার পিঠের বোন হামিদার সাথে বেশি মাতুব্বরি করতে যেতো না কারণ ওখানে ওসব করতে গেলে পিঠের চামড়ায় বিড়ালের এচর অর্থাৎ হাতের নলির বা নখের চামড়া কাটা খামচি খেতে হতো।

আগে সাধারণত আমাদের দেশে গরীব ও মেধাদূর্বল মুসলিম ছেলেরা মাদ্রাসায় লেখা পড়া করতো। খসরু ভাই জান অর্থাৎ মোহাম্মদ আলী কেন মাদরাসায় পড়তে গেছেন জানিনা। কারণ তাদের টাকা কড়ির তেমন একটা অভাব ছিলো না। তাছাড়া তিনিও শ্রীনগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ফার্স্ট বয় ছিলেন এবং তিনি প্রাথমিকে সরকারী বৃত্তি লাভ করেছিলেন। যাহোক শেষ মেশ তিনি আরবি সাহিত্যে এবং ইসলামের ইতিহাসে মাষ্টার দুইটা ডিগ্রি নিয়েছিলেন। প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন কিন্তু চাকরি জীবনে তেমন একটা ভালো করতে পারেন নি। টানাপোড়েনে কখনও কখনও তার জীবন অতিবাহিত হয়েছে। তবে শেষ জীবনে ইসলামী ব্যাংকের শরীয়া বোর্ডের প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন এবং দারুল ইফতা সহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি করেছেন। গ্রামের বাড়িতে সংসার রেখে ঢাকায় চাকরি করা এবং প্রায় ষাট বিঘার মতো ফসলি জমিনের দেখা শোনা করা তার জন্য কষ্টকর হয়ে পড়েছিল। তিনি জমা জমি বিক্রি করে ঢাকায় স্হায়ী ভাবে বসবাস করার পরিকল্পনা করেন। এ জন্য তার জমা জমি আব্বাকে ক্রয় করার প্রস্তাব দেন। কারণ নিকটাত্মীয় ও প্রতিবেশি হিসেবে আমাদেরই ক্রয় করার কথা। কিন্তু আব্বা তাঁর জমি কিনতে রাজি হননি কারণ আব্বা চাননি মাওলানা সহায় সম্পত্তি বিক্রি করে দূরে চলে যাক। সে চলে গেলে আমরা একজন আত্মীয় ও প্রতিবেশী হারাবো।

এরপর তিনি তার বসত বাড়ি বাদে সমস্ত জমিন ড. মান্নান সাহেবের কাছে বিক্রি করে দেন। মাওলানা তাঁর সমুদয় জমিন মামা বাড়ি থেকে পেয়েছিলেন। তাঁর বাবার বাড়ি ছিলো পাবনার মাছুম দিয়া গ্রামে। সেখানে আমাদের মাওলানা বসবাস করেননি। কারণ তাঁর বাবাই আমাদের গ্রামে স্হায়ী ভাবে চলে এসেছিলেন।

আমাদের গ্রামের বেশির ভাগ লোক ধুরন্ধর গ্রাম্য রাজনৈতিক। তারা অনেক সময় সম্মানি লোকদের প্রাপ্য সম্মান দিতে কৃপনতা করে। ক্ষেত্র বিশেষে অসহযোগীতা ও সত্রুতা করে থাকে আবার সময় মতো সালাম কালামও করে। আব্বা শেষ জীবনে কিছুটা নিঃসঙ্গ এবং অসহায়ত্ব বোধ করছিলেন, কারণ আব্বার পাশে থাকার জন্য তার কোন ছেলে মেয়ে ছিলো না। আমরা লেখা পড়া এবং চাকরির কারণে কেউ ঢাকা কেউ বা বিদেশ বিভূঁইয়ে অবস্থান করছিলাম। আমাদের সহায় সম্পত্তি দেখা শোনার জন্য পরের ওপর নির্ভর করতে হতো। এরপর মাওলানার সহায় সম্পত্তি ক্রয় বা দেখভালের অতিরিক্ত বোঝা আব্বার কাছে দুঃসহ কষ্টের ছিলো বলে আমার মনে হয়।

খসরুভাই গ্রাম ছেড়ে ঢাকার নদ্দাপাড়ায় বসতবাড়ি করে স্হায়ী বাসিন্দা হয়ে জানা। আমাদের ডান হাতটা ভেঙে গেলো, হৃদয়টা ফাঁকা ফাঁকা হয়ে গেলো। তাদের গ্রামের বাড়িটি, বাগান বাড়িসহ প্রায় তিন একর হবে। এটি আমাদের মালিকানায় দিয়ে গেছেন, প্রিয় মাওলানা ভাই। আমার বাবা অবশ্য টাকা দিয়েই বাড়ির জমিগুলো নিয়েছেন। অনেক দিন আমার বুকটা ব্যাথায় ভারি হয়েছিল। নদ্দার বাড়িতে আমি কয়েক বার বেড়াতে গিয়েছি।মোনাক্কার বিয়ে হয়েছিল কাকরাইলের একটি কমিউনিটি সেন্টারে। সেখানে গিয়েছিলাম।

ছাদি রংপুরে বিয়ে করেছে। ওকে ছোট বেলায় অনেক কোলে কাখে আদরে যত্নে রেখেছি। এখন দেখা হয় খুব কম। এ জন্য নাগরিক জীবনের ব্যস্ততা ও দূরত্বের বেড়াজাল অনেকটা দায়ী। তবে সেই যে বুক খালি হলো আপাত দূরত্বের কুয়াশায় তাতে আর মধ্যাহ্নদুপুরের ঝিলমিল রোদ ওঠে না। এইতো সেদিন আমার ভাবি-মাকে দেখলাম তার কনিষ্ঠ পুত্রের বিয়েতে।অনেক স্বজনেরা এসেছিলো আবার আপ্যায়ন শেষে যে যার পথে গোধূলির ধূসর রঙ মেখে অদৃশ্যে অগোচরে চলে গেছে। কিন্তু বিরহের কালো রঙ বড়ো কষ্টের, অমোচনীয় দাগের, জানিনা দাগ লাগা দাগের কতটা দাগ রবে অপরিবর্তিত।

সৈয়দ আহমদ আলী, সৈয়দ মোহাম্মদ আলী খসরু ভাই জানের বৈমাত্রেয় বড়ো ভাই। তিনি আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন কিন্তু আমার এখন সে স্মৃতি মনে নেই। তবে তার বড়ো ছেলেসহ অন্যান্য ছেলেরা বেড়াতে এসেছেন। এর মধ্যে শাফি ওরফে সৈয়দ আবদুল করিম বিশেষ ভাবে উল্লেখ যোগ্য। শাফি আমাদের চাচা বলে সম্বোধন করত কিন্তু আসাদ ঘনিষ্ঠ হতে হতে শাফিকে বন্ধুর মতো সহজ ও আপন করে ফেলে। শাফি দীর্ঘ বছর তা প্রায় ৫৬ বছর এক নাগাড়ে ভাই জানের কাছে অর্থাৎ তাঁর বাড়িতে থেকেছে। হাসাম দিয়া স্কুলের ছাত্রও সে হয়েছিল কিন্তু পড়তে পড়তে মাথা গরম হয়ে যেতো। পড়ালেখা করার চেয়ে সে ভাবির ফুট-ফরমায়েশ, সংসারের টুকিটাকি এবং মাঠের কাজের তদারকিতে বেশ স্বাচ্ছন্দ অনুভব করতো। সৈয়দের বেটা মাছুম দিয়ার মাদরাসা ডিঙিয়ে এসেছে বটে কিন্তু না সে দাখেলে দাখিল হয়েছে না স্কুলের এন্ট্রান্সে এন্ট্রি হয়েছে। সে প্রাকৃতিক ঞ্জান অর্জনের প্রতি বেশি আগ্রহী বলে আমার মনে হয়েছে।

দশম ক্লাস বয়সের ছেলেটি ষষ্ঠ শ্রেণির চৌকাঠ পেরুতে যতনা প্রানান্তকর প্রচেষ্টা করতো তারচেয়ে আকাশের চাঁদ, তারা, ফুল ফসলের বৈচিত্র্য নিয়ে আমাকে বিভিন্ন জটিল প্রশ্নবানে ঝালাপালা করতো। তাঁকে অংকের কোনো ফর্মূলা মুখস্থ করাতে পারিনি, ছোট ভাই আসাদকে যে ভাবে কড়া শাসন করার অধিকার রাখতাম অতিথি বেচারা শাফিকে মানুষ করতে বিশেষত অংকে তেত্রিশ পাওয়াতে আমার আপার চেম্বার টগবগে তেলের কড়াই বনে যেতো।

তাকে আমি কখনও রাগ করিনি কিন্তু তাঁর মাথায় অংক একটুও না ঢোকাতে পারায় আসাদ একটু আলাদা মজাই পেতো,আমার অসহায় অবস্থা দেখে সে হয়তো পুলক অনুভব করতো এইভেবে যাক এবার তার প্রতি আমার রক্তচক্ষুর আক্রমণ কিছুটা কমে যাবে।সে শাফিকে এক্কেবারে বন্ধু বানিয়ে ফেলে। শাফি রাত্র জেগে অর্থাৎ কোনো কোনো সময়ে সারারাত জেগে লেখা পড়ার করতো কিন্তু কি হবে সে একটু ঘুমুলেই তার মগজের কোষে সঞ্চিত লেখাপড়ার অক্ষর সমুহ ইরেজ হয়ে যেতো। এ জন্য সে লেখা পড়া শেষে না ঘুমিয়ে পরীক্ষার খাতায় হজমকৃত বস্তু উগরে দিয়ে স্বস্তি বোধ করতো কিন্তু তাতেও সবসময় সে সফল হতো না।

শাফিকে জ্বিনে আসর করতো বলে একটি বিষয় আগে থেকেই আমাদের কাছে আউট হয়েগিয়েছিলো। তাই তার প্রতি আমাদের একটু কৌতুহল এবং মমত্ববোধ বেশি ছিল। তাকে জ্বিনে ধরতো কি ভাবে তা আমরা পর্যবেক্ষণ করার অপেক্ষায় ছিলাম। একদিন সে মহেন্দ্র ক্ষণ চলে এলো। ভুত প্রেতের প্রতি আমার বিশ্বাস বা ভয় এর কোনটাই আমার ছিলোনা, সেই ছোট্ট বেলা থেকে।

জ্বিন না দেখলেও আল্লাহর বাণী অনুযায়ী তা বিশ্বাস করি। জ্বিন আগুনের ভাপ বা অগ্নি উত্তাপ দিয়ে তৈরী। মানুষ ও জ্বিন জাতিকে আল্লাহ কেবলমাত্র তার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু এক্ষেত্রে উভয়ের স্বাধীনতা রয়েছে ইবাদত বন্দেগি করা ও না করার ব্যাপারে।জোর করে স্রষ্টা তাঁকে ইবাদত করতে বলেন নি, তবে তাঁকে অশ্বিকার করলে ইবাদত নাকরলে আখেরে কঠিন শাস্তির বিধান রেখেছেন। কিন্তু কিছু মানুষ ও জ্বিন ভুল ত্রুটি করে এবং গোনাহ খাতাহ করে থাকে। এদের অনেকে নাফরমানি ও অন্যায় করে থাকে। জ্বিনদের মধ্যে কেউ কেউ মানুষের ক্ষতি করে থাকে। সে হিসেবে মানুষকে জ্বিনে আসর করতে পারে।

শাফিকে কেন জ্বিনে ধরতো তা আমার জানা নেই। তবে তাকে জ্বিনে ধরলে সে অদ্ভুত আওয়াজ ও আচরণ করতো। একদিন বিকেল বেলায় সে আমাদের পাশের ঘরের ভেতর থেকে প্রচন্ড শব্দ করে টিনের চালায় বাড়ি দিয়ে, দরজা খুলে বাহির বাড়ির দিকে সশব্দে দৌড়াতে দৌড়াতে মসজিদের পাশদিয়ে ছুটছিলো। আমি তার শব্দ সুনে তার পিছনে পিছনে দৌড়াতে লাগলাম। আমি বুঝে গেলাম তাকে জ্বিনে আসর করেছে,এ কারণে পাগলের মতো দৌড়াচ্ছে। দৌড়াতে দৌড়াতে মসজিদ পেরিয়ে স্কুলের রাস্তায় এসেই মুহূর্তে আমার মাত্র হাত খানিক সামনে থেকেই অদৃশ্য হাওয়া হয়ে গেলো।

তখন ভাদ্র মাসের বিকেল বেলা।আমাদের স্কুলের সামনে কুমার নদী বর্ষার পানিতে টইটুম্বুর। পারাপারের বাঁশের সাঁকোটিও ভেঙে গেছে, স্রোতের প্রবল তোড়ে। চারঘাটাতে পারাপারের নৌকাও নেই। মানুষ জন তাঁকে তন্নতন্ন খুঁজে ফিরছে। না কোথাও তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। নদীর ওপারে তো যাওয়ার যো নেই, সাঁকো নেই, নৌকা নেই, সে ও পারে যেতে পারবে না। তাই সকলে রাত কাটিয়ে সকালের অপেক্ষা করছে, তখন তাকে খুঁজে বের করা হবে।

চারঘাটাতে নদীর ওপারে রয়েছে একটি বিশাল বড়ো বড্গাছ। এটি বলতলার বডগাছ নামে খ্যাতো। কেউ কেউ মৃদু আশংকা করেছিলো শাফিকে বটগাছের মগডালে পাওয়া যাবে।জ্বিন তাকে ওখানে নিয়ে যাবে। আমি ভাবলাম জ্বিন তাকে আমার সম্মুখ থেকে অদৃশ্য করে কি ভাবে ওই গাছের মগডালে নিয়ে যাবে? সকালে সকলে দেখলো ঠিকই সৈয়দজাদা জ্বিনের তেলেসমাতিতে বটবৃক্ষের আগডালায় পা ঊর্ধ মুখ এবং মস্তক মোবারক নিন্মমুখি করে সাপের মতো পেচিয়ে আছে। কোন মানুষের পক্ষে বটগাছের শীর্ষের চিকন ডালায় নিচুমুখি হয়ে ঝুলে থাকা অসম্ভব কিন্তু তা এই সৈয়দজাদা অ্যাক্রোবেটিক কায়দায় সম্ভব করেছে। কিন্তু তাকেতো মৃত্তিকা লগ্ন করতে হবে সাহেবজাদাকে নিচে নামাতে হবে। দেখা গেলো সুরা জ্বিন পড়ে গাছের গোড়ায় ঝাড়ফুক করার সাথে সাথে তিনি সাপের মতো মাথা নিচেদিয়ে পা উপরে রেখেই উল্টো ভাবে সাপের মতো শীর্ষডাল বেয়ে গাছের গোড়ায় নেমে এসেছেন চক্ষু মুদে। তার কোন চেতনা নেই। পানি পড়া গায়ে ছিটাতেই যেনো বিয়ের নওশা আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলেন। যেনো তার কিছু হয়নি কেবল কি যেন ছেড়ে আসছেন এমন বিরহ বেদনায় তিনি বিমর্ষ বিহর্ষ।