মামু ভাগ্নে যেখানে

আমেনা বুজির বড়ো ছেলে জাহিদ আমার সরাসরি ভাগ্নে বা তারও অধিক কিছু। সে আমাদের খসরু ভাইজানের আপন বোনের ছেলে। ঢাকার নাখালপাড়ায় ওদের বাড়ি। প্রতি বছর আশ্বিন কার্তিক মাসের দিকে দুলাভাই বড়ো নৌকায় করে ঢাকা থেকে সরাসরি ফরিদপুরে আমাদের গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে আসতেন। বুজি, দুলাভাই ভাগ্নেদের পেয়ে আমি আকাশের চাঁদ পাওয়ার মতো ভীষণ আনন্দিত হতাম। ওদের নিয়ে আনন্দ জোছনায় সারা বাড়ি মাতিয়ে তুলতাম। বাড়ির ভেতরের পুকুরে, কুমার নদীতে সাতার কেটে, ডোঙা বেয়ে, কখনও বা বড়শিতে মাছ ধরে আমি আর জাহিদ অনেক সময় পার করতাম। পানিতে গোছল করে চোখ রাঙা করে ফেলতাম। পুকুরের লাল শাপলা, কুমার নদীর কোলচরীর পানিতে বেড়ে ওঠা শাপলা সালুক তুলে সে কি আনন্দই না পেতাম। মনে হতো আমরা কোন রাজকুমার কি এক অসাধ্যই না যেন আয়ত্ত করে ফেলেছি। সালুক শাপলা যতনা তুলতে পারতাম সে তুলনায় মাছ ধরা মামু ভাগ্নের পক্ষে সম্ভব হতো না কারণ মাছ ধরতে নিবিড় সাধনা ও কৌশল অবলম্বন করতে হয় যে পরিমান তার দ্বিগুণ পরিমান দুষ্টুমি ছিল আমাদের কর্মপ্রচেষ্টায়।

আনন্দ উচ্ছ্বাস হৈ-হুল্লোড় ছিলো আমাদের প্রধান লক্ষ্য ও সাকূল্য কর্মসূচি। এরপর বাগনে বাগানে ঘুরে বেড়ানো, নারকেল গাছের নিচে বসে ডাব নারকেল খাওয়া, কখনও কখনও জাম্বুরা খাওয়া, তালের আঁটি কেটে তার ভেতরের সাদা হলদে রঙের ফোপা খাওয়া ছিলো আরেক মহাকাব্যিক ব্যাপার। দুপুরে বিভিন্ন উপাদেয় খাবারের শেষে থাকতো দুধকলা মেশানো ভাত।কখনও বা আমসত্ত্বে দুধ মেশানো দারুণ স্বাদের খাবার।আমরা সে সব খাবার খেয়ে দোতলায় গড়াগড়ি দিয়ে, গল্প গুজব করে বিকেল পর্যন্ত সময় পার করতাম। এরপর মাঠে যেতাম ছি বুড়ী বা দাঁড়িয়ে বান্ধা খেলতে।তবে আমরা দু’জনে খেলার চেয়ে মাঠে, বাগানে, কখনও বা নদীর পাড়ে ঘুরে বেড়াতাম।

আমার ভাগ্নেরা পাঁচ ভাই ও একবোন। জাহীদ, শাহীদ, রফিক, আতিক, আবদুল্লাহ ও মাহবুবা রহমান সালমা। এদের মধ্যে পরীর মত সুন্দরী ছোট্ট সোনা মেয়ে আমার আদরের ভাগ্নি আর ওদের সাত রাজার ধন বোনটি আট দশ বছর বয়সে রিউমেটিক ফেভারে মারা যায়। ওর মৃত্যুটি ছিলো করুন। ওর বাবা ঢাকার বড়ো বড়ো ডাক্তার দেখিয়ে চিকিৎসা করেছে মেয়ের কিন্তু ভালো হওয়ার কোন লক্ষ্মণ ছিলো না। মেয়েটি জেনে গিয়েছিল তার পরিনতি। জাহীদ, শাহীদ-এর বুকভার হয়েগিয়েছিল প্রিয় বোনটির করুন দশায়। অবশেষে অনেকের বুক ভেঙে মেয়েটি পরম প্রভুর দরবারে চিরতরে চলে গেলো। শোকে শোকে আমেনা বুজিও চলে গেলেন। মেয়ের শোকের পাথর বুকে নিয়ে তিনিও চলে গেলেন। ওদের মৃত্যু ঢাকায় হয়েছে। নাখাল পাড়ার বাড়ির আঙিনায় ওঁরা চির নিদ্রিত হয়ে আছেন। আমি তখন ফরিদপুর শহরে লেখা পড়া করি। অনেক পরে জেনেছিলাম সেই করুন মৃতুগুলোর হৃদয় বিদারক খবর।

ঢাকায় বুজির বিয়ের পর আমার সাথে দূরত্ব বেড়ে যায় বাস্তব কারণে। ওঁরা যখন বাড়িতে বেড়াতে আসতো তখন এক মহা আনন্দের বন্যা বয়ে যেতো। ভাগ্নে ভাগ্নিকে মনের মাধুরি মিশিয়ে আদর করতাম কিন্তু সব আনন্দের প্রকাশ কি সব সময় শোভন? কিছু আনন্দ, কিছু ভালোবাসা তো নিতান্ত রক্তবন্ধনের, একান্ত হৃদয়ের তা প্রকাশ হলে যে গাঢবদ্ধতা সিগমাবন্ধনের দৃঢ়তা হাল্কা হয়ে যায়। তাই অনেক কথাই যায়নি বলা
কথার কথনে।

আমি তখন ফরিদপুর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজে আইএসসি পড়াশোনা করি। জাহীদ জানালো তারা আসছে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে। আমিও সেই তারিখে বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। আমি আমার কবিতা লেখার খাতা এবং ফরিদপুরের বিভিন্ন সাহিত্য ম্যাগাজিনে আমার প্রকাশিত লেখা নিয়ে গিয়েছিলাম। জাহীদ আমার কবিতা লেখার কথা জানে ও আমার লেখার একজন ভক্ত পাঠক এবং ভালো সমালোচক। মনে আছে আমি আমাদের পশ্চিম পোতার বড়ো ঘরে ওকে অনেক কবিতা পড়ে শুনিয়েছিলাম। ও আমাকে জীবনানন্দ দাশের কবিতা এক এক করে মুখস্ত করে শুনিয়েছিলো। জীবনানন্দ দাশ আমার অন্যতম প্রিয় কবি। আমি ওকে বলেছিলাম শুধু জীবনানন্দ দাশ নয়, আমি সুকান্ত, ইন্দুসাহা, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা নিবিড়ভাবে পড়েছি। জাহীদ আমাকে জীবনানন্দদাশের মতো কবিতা লিখতে বলেছিলো। আমি ওকে বলেছিলাম, আমি আমার মতো কবিতা লিখবো এবং তা অবশ্যই জীবনানন্দ দাশের চেয়ে কোন অংশে কম হবে না। আমি একদিন তাদের ছাড়িয়ে যাব,আমি নতুন কবিতা লিখবো। জাহীদ হেসে হেসে বলেছিলো,মামা হিসাব করে বইলেন।আমি কিন্তু কবিতার ভালো পাঠক।

এইচ.এস.সি পাশ করে উচ্চতর শিক্ষা লাভের আশায় ঢাকা রওয়ানা দিলাম সেই সাতাত্তর সালের সেপ্টেম্বর মাসের দিকে। এর আগে জাহীদ আমাকে বারবার তাড়া দিচ্ছিলো ঢাকায় এসে যেনো তাদের বাসায় উঠি। বুজি তখন বেঁচে নেই। দুলাভাই বিয়ে করেছেন কুমিল্লার মেয়ে। জাহীদ তার এই মায়ের সাথে তার অন্যান্য ভাই দের নিয়ে থাকে। তার এই মাকে যথেষ্ট সম্মান করে সংসারের টুকিটাকি থেকে ভারি কাজে সহযোগিতা করে। আমি ঢাকায় প্রথমে আমার এই ভাগ্নের ঘরেই ঠাঁই নিয়েছিলাম। আমি দুলাভাইয়ের স্ত্রীকে আপা বলে সম্বোধন করতাম। আপা আমাকে জাহীদের সাথে খাবার নাস্তা দিয়েছেন। আমি জাহীদের রুমে ওর সাথে অবস্থান করতাম। জাহীদ খুব ভোরে উঠে সংসারের কাজে লেগে যেতো। বুজি বেচে থাকলে জাহীদ নিশ্চয়ই এ কঠিন কাজ করতো না। কিন্তু জাহীদ খুব ত্যাগি ও ভাই বোন হৃদয় আবিষ্ট প্রাণ। তার সত মা যাতে অতিষ্ঠ না হয়, তার ছোট ছোট ভাই দের যাতে যন্ত্রণা না দেয় সে জন্য সে মুখ বুজে এ সব কাজ করতো। আমি তার এত দরদের মামা হয়েও তার দুখের কথা আমাকে বলেনি। আমি নিজ চোখেই এ সব দেখেছি কিন্তু আপাকে তার এই আচরণের জন্য কিছু বলতে পারিনি। দুলাভাইকেও কিছু বলতে পারিনি। আমি অনেকটা অসহ্য যন্ত্রণায় জাহীদ কে বলে নারায়ণ গন্জে সৈয়দ মুসা রেজা দের কাছে চলে যাই। আমার এ চলে যাওয়ায় জাহীদের নীরব সমর্থন ছিলো।