শহরে ইট পাথরের আবাহনে

আমাদের শহরের বাড়ি ফরিদ পুর শহরের হৃত্পিন্ডে অর্থাৎ ঝিলটুলী সোনালী ব্যাংক ও কোতোয়ালি থানার মাঝে। ফরিদ পুর জেলা শহরের ঝিলটুলী নীলটুলী হচ্ছে ঢাকার ধানমন্ডি গুলশান এলাকার মত এলিট শ্রেণীর বসবাস কেন্দ্র। আমাদের বাসাটি প্রায় দশ কাঠা জমিনের ওপর। প্রথমে সেমিপাকা দুটি বড়ো ঘর ছিলো এখন সেখানে চার তলা অট্টালিকা। বাসার সামনে খোলা আঙিনা, চারপাশে নানা রকমের ফুলগাছ আর পাতাবাহারের বেষ্টনী এক মোহনীয় পরিবেশ তৈরি করেছে। এখন এটি ওষুধ কোম্পানির অফিস হিসেবে ভাড়ায় চলছে। বাড়ির মালিকেরা এখন আমরা কেউ থাকি না। অথচ আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে এই বাড়িতে থেকেই সাত বছর লেখা পড়া করেছি।

আনুমানিক ১৯৬০ সালের দিকে আব্বা শহরের এই বাড়িটি প্রতিষ্ঠা করেন নিজের নামে। আমি ১৯৭০ সনে ফরিদ পুর শহরে আসি এবং সপ্তম শ্রেণীতে ফরিদ পুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হই। এই বাসায় থেকে আমার অন্যান্য ভাই বোনেরা স্কুল কলেজে লেখা পড়া করতো। সেলিম ভাই, হালিম ভাই ফরিদ পুর জেলা স্কুলে পড়তো। সপ্তম শ্রেণীতে জেলা স্কুলে ভর্তি করা হয়না। অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি করে এ জন্য আমাকে বাধ্য হয়ে ফরিদ পুর হাই স্কুলে ভর্তি হতে হয়েছিল। পরের বছর অষ্টম শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলাম। আমি লম্বায় বড়ো বলে খোড়া অজুহাতে হেডমাস্টার আলিম স্যার আমকে ভর্তি করেন নি। আমার ধারণা তিনি হয়তো ভেবেছিলেন তার নামের এক ছোকরা কেন তার তত্ত্বাবধানে লেখা পড়া করবে।এতে হয়তো তার রাশভারি হেডমাস্টারী মেজাজের অবনমন হবে। পরে অবশ্য এই হেডমাস্টার তার এক পুত্রকে আমার ভাতিজীর সাথে বিয়ে দিয়ে বেয়াই হয়ে সমতা বিধান করেছে। যাহোক ১৯৭৪ সনে এস.এস.সি পরীক্ষায় আমি জেলাস্কুলের ছেলেদের ডিঙিয়ে ভালো রেজাল্ট করেছিলাম। ফরিদপুর সহরের আটটি স্কুলের মধ্যে আমার ফলাফল সবচেয়ে ভালো ছিলো।

হাসামদিয়া স্কুলের ফার্স্ট বয় এই আমি শহরের বাড়ীতে এবং শহরে নতুন পরিবেশে জেলা স্কুলের রুঢ় আচরণের খোচায় রক্তাক্ত হলাম। মাকে ছেড়ে শহরের ইট-পাথরের নির্মমতার প্রথম আঘাত পেলাম। হায়রে মানুষ, তোমরা কত নির্দয়, একটি সম্ভাবনাময় বালকের গলাচিপে ধরতেও তোমার কুন্ঠা হয় না।

মাকে ছেড়ে আমি দীর্ঘ দিন কোথাও থাকিনি। বাড়িতে আমাদের শোবার ঘর আলাদা ছিলো। পশ্চিম পোতার বড়ো ঘরে বেশ কয়েকটি রুম ছিলো। একটি রুমে পাশাপাশি দুটি বড়ো চৌকি ছিলো। আমি মায়ের একপাশে পিঠ লাগিয়ে আবার কখনও মাকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে যেতাম। ময়ের গায়ে এক প্রকারের বেহেশতী সুগন্ধী থাকে ওই সুগন্ধ যে কেমন চিত্তহরা, কেমন পাগল করা তা সন্তান মাত্রই বুঝতে পারে কিন্তু বর্ণনা করতে পারে না। মা ঘুমুনোর সময় পান খেতেন। মায়ের পানমুখো মুখের ঘ্রাণ একটা আলাদা আকর্ষণীয় ছিলো। আমরা ভাই বোনেরা মার মুখের চিবানো পান খাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা শুরু করতাম। মার মুখের লালাযুক্ত চিবানো পান আমার প্রাণশক্তি বাড়িয়ে দিতো। মাও তার এই দোয়া মেশানো, প্রোটিন ও পলিফ্লেভানয়েড মিশৃত পান তার সন্তানদের মাঝে বিতরণ করে এক অপূর্ব আনন্দ উপভোগ করতেন। শহরের বাড়ীতে এসে সেই মাকে ছেড়ে একাকি থাকা যে কতটা কষ্ট দায়ক, কতটা বিচ্ছেদ যন্ত্রণার তা কেবল ভুক্তভোগিরাই অনুভব করতে পারে।

শহরের বাড়ীতে আমি যে ঘরে অবস্থান করতাম, সেখানে হালিম ভাই ও সেলিম ভাইও থাকতেন। আমি যে টেবিলে পড়তাম ওই টেবিলে আমার আরেক বোন হালিমা মাঝে মাঝে পড়তে বসতো। ও ভীষণ পড়িয়া ছিলো। ফরিদপুর সরকারী বালিকা বিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রী ছিলো। সে সর্বশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণিতে পাশ করেছে। সে এখন আমেরিকা প্রবাসী।

হালিম ভাই ও সেলিম ভাই ফরিদপুর জেলা স্কুলের মেধাবী ছাত্র ছিলো। হালিম ভাই কলা বিভাগের ফার্স্ট বয় ছিলেন। তিনি এখন আমেরিকা প্রবাসী। সেলিম ভাই ও বেশ মেধাবী ছাত্র। তিনিও বিজ্ঞান বিভাগে কয়েকটি লেটারসহ প্রথম বিভাগে এস.এস.সি পাশ করেছেন। তার সহপাঠী হাসান ভাই ঢাকা বোর্ড থেকে এস.এস.সিতে থার্ড স্ট্যান্ড করেছিলেন। সেলিম ভাই কম্পিউটার ইন্জিনিয়ারিং করে দীর্ঘ বছর ইটালিতে চাকরি করেছেন।

আমি সপ্তম শ্রেণীতে ফরিদ পুর হাই স্কুলে ভর্তি হয়ে লেখা পড়া করছি। ক্লাসে যেমন ফার্স্ট হওয়ার জন্য প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালাচ্ছিলাম তেমনি আমার রুমমেট ভাই-বোনদের সাথে পড়াশোনায় প্রতিযোগিতা শুরু করলাম। ওরা না জানলেও আমার এ প্রতিযোগিতা ছিলো অঘোষিত। ওরা কেউ আমার ক্লাস মেট ছিলো না কিন্তু দীর্ঘ রাত্র জেগে ওরা পড়াশোনা করতো। বিশেষত হালিমা রাত্রে না ঘুমিয়ে পরীক্ষার মৌসুমে একটানা রাত্রদিন পড়াশোনা করতো। আমি ওর এই নির্ঘুম পড়াশোনায় দারুণ কৌতুহল অনুভব করতাম। আমি স্কুলের সময় বাদে পাঁচ ঘন্টা পড়তাম আর স্কুল বন্ধের দিন টানা পনেরো ষোল ঘন্টা লেখা পড়া করতাম। আমি এখনও এই বয়সে টানা দশ বারো ঘন্টা সাহিত্য চর্চা,গবেষণা ও কবিতা লিখতে পারি।

আমার স্কুলের সহপাঠীদের সংখ্যা আনুমানিক তিন শত কের মতো হবে। এর মধ্যে এ মুহুর্তে ইমতিয়াজ, ইনতিশার, পান্নু, সামসুল হক, সামসুল হক মোল্লা, আবদুল মালেক, আবদুস ছালাম, মনিরুল হক মিঠু, মোদার্রেস আলী ঈসা, ইমরান, কাজী জাফর আহমদ সিদ্দিকী, আবদুর রহমান, নজরুল ইসলাম, রেজাউল করিম রেজা, ইসরাফিল, মোহাম্মদ আলী নিরন্জন সাহার নাম মনে পড়ছে। প্রিয় স্যারদের মধ্যে এ মুহূর্তে জয়নাল আবেদীন, রমেন্দ্র নাথ রমেন, রমনী মোহন, জগদীশ চন্দ্র ঘোষ ওরফে তারাপদ, অশ্বিনী স্যার, আবদুল বারী স্যার, নলিনী স্যারের নাম মনে পড়ছে।