প্রতিযোগিতার টাট্টু ঘোড়া

সকাল দশটায় আমাদের ক্লাস সুরু হতো। এর আগে সামনের খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে সবাইকে একসাথে কোরান তেলাওয়াত, শপথ ও সংক্ষিপ্ত পিটি করতে হতো।আমাদের পিটি করাতেন হেড মৌলভী স্যার ও ড্রিল শিক্ষক রমনি মোহন কুন্ডু স্যার। আমাদের শ্রেণিতে পাঁচ টি সেকশন ছিলো। আমি খুব সম্ভব এ সেকশনে ক্লাস করতাম। আমার সাথে ক্লাসের ফার্স্ট বয়, সেকেন্ড বয় একই বেঞ্চে বসতাম। আমি অন্য স্কুল থেকে এলেও অল্প দিনেই আমার যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছিলাম হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষায় তৃতীয় স্হান অধিকার করে। ফাইনাল পরীক্ষায় আমি দ্বিতীয় স্হান অধিকার করে অষ্টম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছিলাম। তখন ১৯৭১ সাল, আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের বছর। ২৫ মার্চের কালো রাতের পর ঢাকা শহরের উত্তাপ আমাদের শহরে এসে লাগে। উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেও এপ্রিল মে পর্যন্ত ক্লাস চলেছে। এরপর মুক্তিযুদ্ধের ক্ষিপ্রতায় স্কুল কলেজ অঘোষিত ভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

আমি শহরের বাড়ীতে ক্লাসের পাঠ্যপুস্তক পড়তে থাকি। আমাদের স্কুলের দশম শ্রেণির অনেক বড়ো ভাই মুক্তি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। এ মুহূর্তে হায়দার ভাই, দেলোয়ার ভাই ফজলে ভাইয়ের নাম মনে পড়ছে। হায়দার ভাই ছাত্র লীগের আমাদের স্কুল শাখা এবং শহর শাখার নেতা ছিলেন। দেলোয়ার ভাই আমার ক্লাস মেট এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু পান্নুর মেজো ভাই। তিনি পরবর্তীতে সেনাবাহিনীর মেজর হয়েছিলেন। দেলোয়ার ভাই, হায়দার ভাই, সোহরাব হাসান ভাই, ফরিদ উদ্দিন ভাই আমাকে খুব আদর করতেন। লেখা পড়া ছাড়াও আমি স্কুলের বিভিন্ন সাহিত্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ফার্স্ট হতাম।বিশেষ করে স্বরচিত কবিতা, প্রবন্ধ রচনা, ধারাবাহিক গল্প বলা এবং উপস্থিত বক্তৃতায় আমি ফার্স্ট হতাম।

আমি ফরিদ উদ্দিন ভাই ও সোহরাব হাসান ভাইয়ের ডাকে উনাদের সাথে একটি সাহিত্য সংগঠনের ব্যানারে নিয়মিত ভাবে সাহিত্য সভায় কবিতা ও প্রবন্ধ পাঠ করতাম।স্কুল ম্যাগাজিনে আমার কবিতা ছাপা হয়েছে সেই অষ্টম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালীন সময়ে। সেপ্টেম্বর অক্টোবর মাসে মুক্তিযুদ্ধ যখন তুঙ্গে তখন ফরিদপুর শহরে পাক সেনাবাহিনীর তত্পরতা বেড়ে যায়। অনেকে শহর ত্যাগ করে গ্রামমুখি হতে থাকে। পাকসেনাদের সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য সাধারণ মানুষ জনও শহর ছাড়তে থাকে। আমাদের বাড়ি শহরের মাঝে থাকায় এবং আমাদের তিন চার ভাই ও বোনদের এ ভাবে থাকা নিরাপদ নয় মনে করে আমরাও গ্রামের বাড়িতে চলে যাই।

স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭২ সনের জানুয়ারী মাসের দিকে গ্রামের বাড়ি থেকে আবার শহরের বাড়ীতে ফিরে আসি। ক্লাস শুরু হয়েছিল সম্ভবত জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে। আমরা সরকারি সিদ্ধান্ত মোতাবেক অটোপ্রমোশন পেয়ে যাই। অষ্টম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণিতে ওঠার জন্য আর পরীক্ষা দিতে হয়নি। ফলে আমার আর পরীক্ষা যুদ্ধ করতে হয়নি। এ জন্য মনটা বেশ খারাপ হয়ে যায়। অষ্টম শ্রেণির রোল নম্বর নিয়েই অর্থাৎ রোল নম্বর দুই নিয়েই মবম শ্রেনীতে ভর্তি হতে হয়।যাহোক নবম, থেকে দশম শ্রেনিতেও ওই দ্বিতীয় স্হান অধিকার করি। আবদুল মালেক, সামছুল হক ও আমার মধ্যে তুমুল প্রতিযোগিতা হয়েছিল। টেষ্ট পরীক্ষায় আমি ওদের সকলকে অতিক্রম করে ফার্স্ট হয়ে যাই অনেক নম্বরের ব্যাবধানে। ছয়টি বিষয়ে লেটার মার্ক পাই।

আমি টেষ্ট পরীক্ষার পর হেডস্যার নলিনী সাহার কাছে ইংরেজি প্রাইভেট পড়ি। অংকে প্রাইভেট পড়তাম তারাপদ স্যারের কাছে। তারাপদ স্যার সাধারণত শহরের ভালো ছাত্রদের প্রাইভেট পড়তেন। আমি বাংলা ও ইসলামিয়াতেও লেটার মার্ক পোতাম। অশ্বিনী স্যার আমাদের স্কুলের বাংলার নামকরা শিক্ষক ও পন্ডিত ছিলেন। তিনি আমাকে বাংলার পন্ডিত বলতেন। তিনি আমাকে বাংলার প্রশ্নপত্রের উত্তর সহজ বাংলায় লিখতে পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন, তোমার বাংলা অনেক শিক্ষক বুঝতে পারবে না, তুমি সহজ ভাবে লিখবে। আমি এস,এস,সিতে অল্পের জন্য বাংলায় লেটার মার্ক পাই নি।এটা আমার জীবনের বড়ো দুঃখ ছিলো। তখন অবশ্য বাংলায় দু একজন লেটার মার্ক পেতো।১৯৭৪ ও ১৯৭৬ সনে ঢাকা বোর্ডে এস.এস.সি ও এইচ.এস.সিতে ফার্স্ট স্ট্যান্ড করেছিল বিশিষ্ট রসায়ন বিজ্ঞানী ড. মোকাররম হোসেন খোন্দকার এর সুযোগ্য পুত্র লুত্ফর রহমান খোন্দকার জিটা। ও ঢা.বি.রসায়ন বিভাগে আমার সহপাঠী ছিল। ছয় মাস পরে ও অবশ্য অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি নিয়ে চলেগিয়েছিল। ও ঢাকা বোর্ডে রেকর্ড মার্ক পেয়েছিলো অর্থাৎ হাজারে ৯৯৪ নম্বর পেয়েছিলো। শুনেছি ও অক্সফোর্ডের রসায়ন বিভাগে পূর্বের সমস্ত রেকর্ড ব্রেক করে প্রচন্ড মেধার পরিচয় দিয়েছে।

আমি ১৯৭৪ সনে তিন বিষয়ে লেটার মার্ক সহ প্রথম বিভাগে পাশ করি এবং বৃত্তি লাভ করি।সে বছর ঢাকা বোর্ডে মাত্র ৩৫% পাশ করেছিলো।আমি ফরিদ পুর শহরের আটটি স্কুলের মধ্যে বেশি মার্ক পেয়েছিলাম। যে জেলাস্কুল জটিলতা করে আমাকে ভর্তি করেনি সেই স্কুলের সব ছাত্রকে আমি পিছনে ফেলেছিলাম এস,এস,সি পরীক্ষায়।