কবিতার আতরে,কবিতার আদরে

আমার কবিতা লেখার শুরু হয়েছিল তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র অবস্থায়, সবুজ শ্যামলে সোঁদা মাটির সৌগন্ধে। সাহিত্যের প্রতি এবং কবি সাহিত্যিকদের প্রতি আব্বার ভালোবাসা আমাকে কবিতা লিখতে উত্সাহী করেছিলো সেই শৈশবে। এবার ফরিদপুর শহরে এসে লেখাপড়ার প্রতি তীব্র মনোযোগ ও সাহিত্য বিশেষত কবিতার প্রতিও সমভাবে প্রচন্ড আগ্রহ ও চর্চার সুযোগ পেয়ে গেলাম। আমাদের স্কুলের বাংলার শিক্ষক জনাব আব্দুল বারী স্যার কবিতা লিখতেন। ক্লাসেই তার রচিত কবিতা পড়ে শোনাতেন। আমি কবিতা লিখি দেখে স্যার আমাকে ভীষণ আদর করতেন। আমার লেখা পড়ার তদারকির সাথে সাথে কবিতা লেখার খবর নিতেন। শহরের থানা রোডে আমাদের বাসার কয়েকটি বাসার পরেই ছিলো তার বই বিক্রির লাইব্রেরি, চেরাগ আলী বুক হাউস। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত তিনি দোকানে বসতেন, কাব্য রচনা করতেন আর তাস খেলতেন। ছাত্রদের মধ্যে মন্টু ভাই স্যারের সাথে তাস খেলতেন। যেদিন কবিতা লিখতেন সেদিন তাস খেলতেন না।আমাকে তারঁ লাইব্রেরিতে কবিতা শোনার দাওয়াত দিতেন। বারী স্যার পবিত্র কোরআন শরীফের তিরিশ পারা কবিতায় লিখেছিলেন। কাব্যে কোরান পাক,শিরোনামে তার এই কাব্যগ্রহ্ন প্রকাশ পেয়েছিলো সেই সত্তুর একাত্তর সনে।স্যার আমাকে দশ পারার প্রথম খন্ডটি উপহার দিয়েছিলেন। দশ পারা করে তিন খন্ডে তার এই কাব্যে কোরান পাক বের হয়েছিলো।

স্যারের এই কবিতা গুলোর আমি একজন নিবিড় স্রোতা ছিলাম। তদুপরি কি ভাবে কোরান কেন্দ্রিক কবিতা লেখা যায় তা আমার মগজে সেই বালক বয়সে ঢুকে যায়। আমি অবশ্য আধুনিক কবিতা লিখতাম সপ্তম অষ্টম শ্রেণির ছাত্র অবস্থায়। স্যারের সুন্দর চাঁদ পনা চেহারা এখনও আমার মনের মণিকোঠায় ভেসে ওঠে। স্যার যেন ক্লাসের টেবিলের ওপর বসে আমাদের পড়াচ্ছেন আর কবিতা শোনাচ্ছেন। বারী স্যার ক্লাসে চেয়ারে খুব কমই বসতেন। তিনি ছাত্রদের সামনে টেবিলের ওপর আয়েশ করে বসে পড়াতেন। ছাত্ররা স্যারের ক্লাসে বসার এই তরিকা নিয়ে মাথা ঘামাতো না। কারণ তিনি কবি মানুষ তাই তার এ আচরণে বরং মুগ্ধ হতো সকলে। স্যার ক্লাসে মাঝে মাঝে সুর করে পুথি পাঠ করতেন। স্যারের হোম ডিস্ট্রিক্ট ছিলো যশোর জেলায়। কবি ফররুখ আহমদ তার প্রিয় কবি ছিলো কিন্তু তার কথা খুব কমই বলতেন। স্কুলের বড়ো ভাই সোহরাব হোসেন, ফরিদ উদ্দিন ভাইদের সাথে কবিতার আড্ডায় যেতাম। ডাস্টবিন, নামে আমার একটি কবিতা ছাপা হয়েছিল প্রথম। আমি তখন সপ্তম বা অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। কবিতার কিছু পঙক্তি উল্লেখ করছি।

ডাস্টবিন
মানুষ খাবার খোজে বাসা বাড়ি, হোটেল, দোকানে
একমুঠো সাদা ভাত, একটুকরো রুটি
যদি পাওয়া যায় কোথাও
পেটের ভেতর জ্বলছে হাবিয়া দোজখ,
নাড়িভুড়ি সব পুড়ে বের হয়ে যাবে যেন।

অথচ অনেকে বেশ আরামে দিন কাটায়
তাদের খাদ্যের চিন্তা নেই,
তাদের ঘরে প্রচুর খাবার,
গুদামে রয়েছে অনেক ফসল,চাল,ডাল
কোন কিছুর অভাব নেই।

আর আমরা খাবারের জন্য হাত বাড়ালেই ওরা তেড়ে আসে, তখন ওরা কৃপন হয়ে যায়
দারুণ অভাবি হয়ে যায়।

শহরের নিরন্ন মানুষ একটু খাবারের জন্য
অলি গলি বাসা বাড়ি খুঁজে খুঁজে
শেষ পর্যন্ত ডাস্টবিনে পেয়ে যায় সাধের খাবার
কিন্তু সেখানেও লড়াই ক্ষুধার্ত কুকুরের সাথে।
হায়রে মানুষ আজ তুই কুকুরের মতো
ধনী ধনকুবেরের উচ্ছিষ্ট নিয়ে কাড়াকাড়ি করছিস!

আমার ক্লাসমেটদের মধ্যে কাজী আবু জাফর সিদ্দিকী কবিতা লিখতো। ও কোন সাহিত্য সভায় কবিতা পড়তোনা। কোথাও কারো সাথে কবিতা নিয়ে আড্ডা দিতোনা। ও কেবল আমাকে ওর কবিতা পাঠ করে শোনাতো। ওর বাসা ছিলো সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের পিছনের গলিতে। ওদের বাসার সামনে বেশ ভালো পাকা রাস্তা রয়েছে, যেটি দিয়ে উত্তর দিক দিয়ে মোড় নিয়ে রাজেন্দ্র কলেজে যাওয়া যায়। আমি ওর আমন্ত্রণে ওদের বাসায় যেতাম। ওর বাবা সরকারি চাকরি করতেন। মা মারা গিয়েছিলেন ওদের তিন চার ভাই বোনকে এতিম মাতৃশূন্য করে দিয়ে। আবু জাফর অত্যন্ত ধৈর্য ধরে ছোট ভাই বোন দের দেখা শোনা করতো, লেখাপড়া করতো আবার কবিতাও লিখতো। ওর কবিতা লেখার বেশ কয়েকটি খাতা ছিলো। কবিতার খাতা স্টিলের ট্রাংক থেকে তালা খুলে বের করে আমাকে শোনাতো। ওই ট্রাংকে ওর আরও গুরুত্বপূর্ণ নাটক নভেলের বই থাকতো। ও প্রচুর নাটক নভেল ও কবিতার বই পড়তো। ওর লেখা আমাকে আকর্ষণ করতো। আমিও ওকে আমার লেখা কবিতা পড়ে শুনাতাম।

আমি শহরের শেরে বাংলা পাবলিক লাইব্রেরির সদস্য ছিলাম। আমি, জাফর, ইমতিয়াজ, কখনও কখনও মনিরুল লাইব্রেরিতে বসে পড়াশোনা করতাম। বাসায় বইও নিয়ে আসতাম লাইব্রেরির খাতায় নাম ইস্যু করে।
আমি বিঞ্জানের বই ও কবিতার বই বেশি পড়তাম উপন্যাস নাটকের বইয়ের তুলনায়। জাফরকে আমি শহরের বিভিন্ন সাহিত্য আড্ডায় নিয়ে যেতে পারিনি। আমি সাধারণত ক্লাসমেটদের মধ্যে ইমতিয়াজ, পান্নু, জাফর, নজরুল ও আবদুর রহমানদের সাথে বেশি ঘোরাঘুরি করতাম। কিন্তু সাহিত্যের আসরে ওরা কেউ যেতোনা। লোকায়ত সাহিত্য সংস্কৃতি সংস্থার আমি একজন শক্তিশালী এবং পদাধিকারী সদস্য ছিলাম। আমাদের এই প্রতিষ্ঠান টি চালাতেন কবি আবদুস সাত্তার গুমানি। তনি আদর্শ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তিনি অত্যন্ত অমায়িক, মিষ্টি ভাষি ভদ্রলোক ছিলেন। ভালো কবিতা লিখতেন। সেই সত্তুর একাত্তরে তার কবিতার বই প্রকাশ পেয়েছিলো। আমাদের সাহিত্য আড্ডা অধিকাংশ সময় আদর্শ বালিকা বিদ্যালয়ের বিভিন্ন রুমে অনুষ্ঠিত হতো। এই সাহিত্য সভাগুলো আাবদুস সাত্তার গুমানি পরিচালনা করতেন। আমাদের সাহিত্য আসরে প্রায় নিয়মিত ভাবে আসতেন কবি জসিম উদ্দিন এর ছোট ভাই ছয়জুদ্দিন, ফরিদ আহমেদ, সোহরাব হোসেন, নূর আহমদ রইসি, কৃষ্না দিদি, শিপ্রা দিদি সহ আরও অনেকে।

সাহিত্য চর্চা ও লেখা পড়া পাশাপাশি চলতো।শহরের বাসায় মোটামুটি স্বাধিন ভাবে চলাফেরা করতাম। সাহিত্য আড্ডা ও বন্ধুবান্ধবদের সাথে ঘোরাঘুরি কখনও সন্ধ্যা অতিক্রম করতো না। সন্ধার পরপরই আমি অন্যান্য ভাই বোন দের সাথে লেখা পড়ায় লেগে যেতাম।ফলে আমার সাহিত্য চর্চা ও আড্ডায় কোনো বাধা পড়েনি। ভালো রেজাল্ট ছিলো বলে আমার এই সাহিত্য আড্ডাকে বাসার কেউ খারাপ চোখে দেখেনি। উপরন্তু শাহিদা আপাও কবিতা লিখতেন। তার কবিতা ও প্রবন্ধ বিভিন্ন সাহিত্য ম্যাগাজিনে ছাপা হতো। আপা রাজেন্দ্র কলেজে পড়তেন। তিনিকোনো সাহিত্য আড্ডায় যেতেন না। তবে তার সমসাময়িক নাসিরুদ্দিন ভাই, মিহির কুমার কর্মকার এবং কলেজের পিয়ন এনায়েত ভাই সাহিত্য চর্চা করতেন। এনায়েত ভাই চমৎকার ছড়া লিখতেন। ফরিদ পুর শহরে এদের নাম সেই সত্তুর দশকে সবাই জানতো। বিকেলে আমাদের শহরের বাসায় অনেক কবি সাহিত্যিক জড়ো হতেন। এদের মধ্য মণি ছিলেন আমার আপা শাহীদা খান মজলিশ। শাহীদা আপা এখন শাহীদা মজলিশ নামে লেখেন। তিনি স্কুল কলেজের শিক্ষাকতা শেষে এখন ঢাকার শাহবাগে তার নিজের ফ্লাটে অবসর জীবন অতিবাহিত করছেন। আমাদের বাসার অঘোষিত সাহিত্য আড্ডায় আপার ডাকে কবি জসিমউদদীন অনেক বার এসেছেন। তিনি খুব দিলখোলা সহজ সরল মনের অধিকারী ছিলেন। আমি তখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র ছিলাম। তারপরেও বাসায় ওদের আড্ডার আলাপ চারিতা আমি নিকট থেকে উপভোগ করেছি। কবি যেদিন আমাদের বাসায় আসতেন সেদিন নাস্তার মেনুতে দুধকদু যোগ হতো। এটি কবি জসিমউদদীন এর একটি প্রিয় খাবার। দুধকদু হচ্ছে ঘনদুধে গরম মশল্লা সহযোগে কদু বা লাউঝুরির শুকনেপ্রায় উপাদেয় মিষ্টি জাতীয় খাবার।

১৯৭২ সনের ডিসেম্বর মাসের একটি সাহিত্য ম্যাগাজিনে বাংলার পতাকা শিরোনামে আমার একটি কবিতা ছাপা হয় জনাব আক্তারুজ্জামান সম্পাদিত একটি সাহিত্য পত্রিকায়। আক্তারুজ্জামান খুব সম্ভব ছাত্রলীগ অথবা ছাত্র ইউনিয়নের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। আমার কবিতাটি মোটামুটি নিন্মরুপ :

বাংলার পতাকা

অনেক রক্তের বিনিময়ে আমরা পেলাম লাল সবুজের পতাকা, রক্তের লাল সূর্য
গ্রামে গন্জে শহরে নগরে খাল বিল নালা ডোবায় লাশের স্তুপ,
কল কারখানা দোকান পাট বাজার বিপনি বিতান আগুনে পুড়ে ছাই ভস্ম।
মানুষের ঘরে খাবার নেই, লঙ্গরখানায় দীর্ঘ লাইন
জীবনের বেহাল দশা,কোথায় ত্রানের খোশবু,

আমাদের পতাকার বুকে জ্বলছে লাল টকটকে রক্ত সূর্য
ওটা শুধু সূর্য নয় ওটা লক্ষ কোটি মানুষের হৃদয় বিদীর্ণ করা জমাট বাধা শোনিত।
মানুষের চিত্কার, হাহাকার, ক্ষুধার আগুন
মা বোনের শরমের লাল খুন!
আমাদের পতাকা চির উন্নত শির,
কাজি নজরুল ইসলাম, বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবীর জেগে আছেন
ওই পতাকার লাল সবুজের মীড়ে,
আমরা তুলে ধরছি এই পতাকা বিশ্ব সভায়,
নতুন এক পতাকা, নতুন এক মানচিত্র
সগৌরবে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকবে অনন্ত প্রহর।

হে পতাকা বাংলার পতাকা লাল সবুজের মধুমতী
তুমি আমাদের ভালোবাসা,তুমি আমাদের বিশ্বাস,ঈমান
তোমাকে চির উন্নত রাখবো শেষ মুহূর্ত…
তুমি অম্লান, তুমি উন্নত, বিস্ময়

আমাদের শহরের ঝিলটুলীর বাসায় প্রায়ই এক ভদ্রলোক প্রায় ছয়/সাড়ে ছয় ফুট লম্বা উজ্জ্বল গৌরবর্ণ সাদা পয়জামা পানজাবী পরিহিত ছিপছিপে গড়নের আকর্ষণীয় চেহারার রবীন্দ্রনাথের ফটোকপি ঢুকে যেতো। বিকেলে চা নাস্তা করে আপাদের সাথে কথাবার্তা বলে আবার চলে যেতো। আমি ভদ্রলোকটিকে কখনও উচ্চস্বরে কথা বলতে শুনিনি। তিনি মাঝ বয়সী বেশ সৌম্য শান্ত প্রকৃতির। কখনও কখনও ছাতা হাতে করে আসতেন। শহরে আমি খুব লোকজনকে ছাতা হাতে চলতে ফিরতে দেখেছি। তিনি হয়ডো আমার সম্পর্কে জেনেছেন। একদিন তিনিই প্রথম আমাকে বল্লেন, তুমি নাকি কবিতা লেখ? আমি একটু ইতস্তত হয়ে বলেছিলাম, জ্বি লিখি।তিনি স্মিতহাস্যে বললেন, ফররুখ আহমদ এর কবিতা পড়েছো? আমি বলেছিলাম খুব কম পড়েছি। পাঠ্য পুস্তকে যে টুকু আছে। তিনি আমার কথার উত্তরে বলেছিলেন, তাহলে কবিতা লিখবে কি ভাবে? আমি তার কথা শুনে একটু অবাক হয়েছিলাম, এমন কথাতো আর কেউ আমাকে শোনায় নি। পরে আপাদের নিকট জানলাম তিনি ফররুখ আহমদ এর বড়ো ভাই সিদ্দিক আহমদ।তিনি সম্পর্কে আমাদের খালু হতেন। তার দুই পুত্র সাদী ও সূফী। এরা ফরিদ পুর শহরে অনেক পরিচিত। সিদ্দিক খালু আম্মার কোন এক খালাতো বোনের স্বামী। সিদ্দিক খালুর বাড়ি যশোরের মাগুরায় মাঝআইল গ্রামে।তিনি কোলকাতায় চাকরি করতেন।পরে ফরিদপুর শহরে জজকোর্টে চাকরিতে যোগদান করেছিলেন। সিদ্দিক খালু বলেছিলেন পাঞ্জেরী কবিতা পড়ে দেখ বলেই কয়েক পঙক্তি উচ্চারণ করলেন :

রাত পোহাবার কত দেরী পান্জেরী?
এখনো তেমার আসমান ভরা মেঘে
সেতারা হেলাল এখনো ওঠেনি জেগে?
তুমি মাস্তুলে আমি দাড়ঁ টানি ভুলে
অসীম কুয়াশা জাগে শূন্যতা ঘেরি।

আমি পরে ভেবেছি খালুর এক কন্যার নাম সেতারা এবং পড়শী এক ছেলের নাম হেলাল।বাহ্, চমৎকার তো এদের জীবন সার্থক। কবি এদের নিয়ে কবিতা লিখেছেন। অনেক পরে কবির এই পান্জেরী কবিতার মর্মার্থ বুঝেছি। ফররুখ আহমদ এর প্রায় সব কবিতা পড়েছি।তাঁর ওপর, ফররুখ আহমদ এর কাব্যপ্রকৃতি ও শিল্প সম্ভার, শিরোনাম নামে একটি গবেষণা গ্রন্থ রচনা করেছি।

সেতারা আপা সেজ আপার ক্লাসমেট ছিলেন। তিনি সারোদা সুন্দরী মহিলা কলেজে পড়তেন। আমাদের বাসায় এলে তাঁকে অনেক সময় তাদের নীলটুলীর বাসায় পৌঁছে দিতাম।তিনি বোরকা পরতেন। ছাগলদী গ্রামের এক ভদ্রলোকের সাথে তাঁর বিয়ে হয়ে যায়। একদিন শীতের রাতে চাদর গায়ে জড়িয়ে আমার শোয়ার ঘরে ঢুকে একজন অপরিচিত লোক আমার পায়ে আলতো করে চিমটি কাটে।আমি ঘুমিয়েছিলাম, সে ভেবেছিল হালিম ঘুমিয়ে আছে। রহস্যময় লোকটি ছিলেন সূফী ভাই। তিনি হালিম ভাই, সেলিম ভাই এর খুব ক্লোজ ছিলেন। সূফী ভাই পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে চলে এসেছিলেন। বাঙালির প্রতি পাকিস্তানীদের একটু তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের ভাব ছিলো, তাই সূফী ভাইয়ের সহ্য হয়নি। তিনি চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে অথবা না জানিয়ে চলে এসেছিলেন। সূফী ভাই বডিবিল্ডার এবং বক্সিং, কুস্তিগীর হিসেবে ফরিদ পুর জেলা শহরে নামকরা ছিলেন। তিনি শহরের মুসলিম ছাত্রলীগের গুন্ডামীর বাধা দিতেন। মুসলিম লীগ নেতাদের অন্যায় আচরণের বিরোধিতা করতেন। তিনি কোন দল করতেন না। তিনি অত্যন্ত সত ও সহসী বীর চিত্তের অধিকারী ছিলেন। তার জন্য শহরে কোন অন্যায় অবিচার হতে পারতো না। তিনি সহজেই মুসলিম লিগের কতিপয় নেতার শত্রু বনে যান। শহরের লক্ষীপুরের মুসলিম লিগের নেতা তার নাম সম্ভবত ফজর আলী, তিনি তার আস্হা ভাজনগুন্ডা বাহিনী দিয়ে সূফী ভাইকে তারঁ ফজরের নামাজ শেষে রাস্তায় হাটাহাটি করার সময় চৌরঙ্গী বিল্ডিংয়ের মোড়ে কুপিয়ে হত্যা করে। সকালে সূফী প্রেমিক সাধারণ জনগন একত্রিত হয়ে ওই খুনি নেতার বাড়িতে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয়। সূফী ভাইয়ের স্মরণে শহীদ সূফী স্মৃতি ক্লাব গঠন হয়।

আমি তার এই করুন মৃত্যুতে মানষিক ভাবে দারুণ আঘাত পেয়েছিলাম। সূফী ভাই আমাদের গ্রামের বাড়িতেও বেড়াতে গিয়েছিলেন।মনে পড়ে শরত কালে তাকে নিয়ে নৌকায় ভ্রমণ করেছিলাম আমাদের কুমার নদীতে। নৌকায় বসলে তার ওজনে নৌকা ডুবে যাওয়ার উপক্রম হতো। আমার ধারণা তার শরীরের ওজন ছিলো প্রায় সাত মণের মতো। মৃত্যুর পর তার পোস্ট মর্টেম হয়েছিল। তার কলিজার ওজন ছিলো সাড়ে সাত সের বা সাড়ে সাত কেজির মতো। কিন্তু এই মানুষ টি ছিলো শিশুর মতো সরল ও পাঁচ ওয়াক্ত জামাতে নামাজ আদায় কারী। তার শরীর ছিলো বলিষ্ঠ, তিনি ছিলেন ব্যায়াম বীর, তার ব্যাক্তিত্ত্ব ছিলো লেহার মতো কঠিন। তিনি ছিলেন আত্মমর্যাদাশীল মানুষ। তার বড়ো সাদী ভাই ছিলেন অমিতাভ বচ্চনের মতো লম্বা, সালমান খানের মতে বলিষ্ঠ ও আমির খানের মতো সুন্দর চেহারার অধিকারী। তিনি ও অত্যন্ত ভদ্রলোক, রুচিসম্মত গাম্ভীর্যের অধিকারী। আমি এ জীবনে তার মতো এতো সুপুরুষ খুব কমই দেখেছি।