রাজেন্দ্র কলেজের রাজা

আমি ১৯৭৪ এর শেষে সরকারি রাজেন্দ্র কলেজে একাদশ শ্রেণীর বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হই। ফরিদপুর হাই স্কুলের আমার অনেক সহপাঠীও আমার সাথে বিজ্ঞান, মানবিক ও বানিজ্য বিভাগে ভর্তি হয়েছিল। আমার সাথে আমার হাসাম দিয়া স্কুলের ক্লাসমেট সিরাজ এবং বোয়াল মারী জর্জ একাডেমির কিছু মেধাবী ছাত্র, ফরিদ পুর জেলা স্কুলের, তাপস সাহা, বিজন কুমার সাহা, মিজান, ময়েজউদ্দিন হাইস্কুলের হোসেন মোল্লা, সামছুল হক মোল্লা, হিতৈষী স্কুলের ফরহাদ, রাজবাড়ী জেলা থেকে আশরাফুল আলম, রাজীবসহ কিছু মেধাবী ছাত্র, আবদুর রাজ্জাক রাজা যে আসলেই রাজার মতো সকলের মনে জেগে থাকে তেমন একজন,এবং মাগুরার কিছু মেধাবী ছাত্র। আমাদের ক্লাসের আমরা দশজনের একটি মেধাবী ছাত্রের ব্যাচ ছিলো। আমাদেরকে কেউ কেউ নিউটনের নিউক্লিয়াস বলতো।

রাজেন্দ্র কলেজ বৃহত্তর ফরিদপুর জেলা এবং দক্ষিণ পূর্ব অঞ্চলের নামকরা শেরা কলেজ ছিলো। এটি ১৯১৮ সনের ১৩ মে প্রতিষ্ঠিত হয়। তত্কালীন কংগ্রেস নেতা অম্বিকাচরণ মজুমদারের উদ্যোগে আশি হাজার টাকার তহবিল নিয়ে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।তবে এই টাকার মাত্র চল্লিশ হাজার টাকা বিভিন্ন সমাজসেবক ও বিত্তশালী হৃদয়বান লোকদের নিকট থেকে আদায় হলেও বাকি টাকার জন্য বাইশরসির জমিদার শ্রী রমেশ চন্দ্র চৌধুরীর সাহায্য নেয়া হয়। রমেশ বাবুর ইচ্ছা পুরনের শর্তে অর্থাৎ তার মৃত বাবা রাজেন্দ্র চন্দ্র রায় চৌধুরীর নামে কলেজের নাম করণ করা হয়।

এই বছরের এপ্রিল মাসে জেলা কালেক্টর সি.ডনলপ কলেজের ভিত্তি প্রস্তর স্হাপন করেন। জুন মাসে প্রথম অধ্যক্ষ হিসেবে কাজে নিয়জিত হন, কামাখ্যা নাথ মিত্র। জুলাই মাসে মাত্র ২৯ জন ছাত্র ও আরও ৫জন অধ্যাপক নিয়ে রাজেন্দ্র কলেজ তার যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে ১৭৯ জন শিক্ষক ও ৩০,০০০ হাজার ছাত্র এই বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজ পরিচালিত হচ্ছে।

কলেজে বিজ্ঞান বিভাগের ক্লাস সংগত কারণেই আলাদা হতো। তবে বাংলা ও ইংরেজি ক্লাস বিজ্ঞান, বানিজ্য ও মানবিক বিভাগের সব ছাত্রদের নিয়ে একত্রে হতো। সেই সময়ে তিন বিভাগ মিলে প্রায় তিনশতের মতো ছাত্র ছিলাম, একাদশ শ্রেণীতে। বাংলা ও ইংরেজি ক্লাসগুলো আমাদেরজন্য একটা আনন্দ ময় মিলন মেলা হতো।কারণ স্কুলের পুরাতন বন্ধুদের সাথে একত্রিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হতো এই ক্লাস গুলোতে।তাছাড়া সপ্তাহে মাত্র তিন দিন এমন কমন ক্লাস হতো।

আমাদের বাংলার নাম করা প্রফেসর ছিলেন জি.এম. হালিম মুজিবুর রহমান পাঠক যিনি রেডিওতে আবৃত্তি ও খবর পাঠ করতেন, ও মজিবর রহমান তালুকদার। ইংরেজি পড়াতেন অধ্যাপক ফরহাদ হোসেন যাকে মেয়েরা নায়িকা স্যার বলতো। কারণ তিনি অভিনয় করে কপোলে আঙুল ঠেকিয়ে মেয়েদের মতো আদুরী আদুরী স্বরে ইংরেজি পড়াতেন রসগোল্লার রস মাখিয়ে। স্যারের কারণে ওই কঠিন ইংরেজির ক্লাস ছাত্র ছাত্রীতে ভরপুর থাকতো। জি.এম. হালিম শুধু বাংলার জন্য নয় বরং তিনি কলেজে সকলের প্রিয় স্যার ছিলেন।তিনি ক্লাসের ৫০ মিনিট বাংলা পড়াতেন শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণ করে প্রমিত বাংলা ভাষায়। অভিনয়ের মতো আকর্ষণীয় করে বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন বিষয় যেমন প্রবন্ধ, গল্প, কবিতা, নাটক ও উপন্যাস প্রভৃতি পড়াতেন। তার ক্লাসে অন্য সেকশন এবং উপরের ক্লাসের বড়ো ভাইয়েরা জড়ো হতো লেকচার শোনার জন্য। তিনি কলেজ ম্যাগাজিনও সম্পাদনা করতেন। আমার কবিতাও তার সম্পাদনায় কলেজ ম্যাগাজিনে প্রকাশ পেতো।

মুজিবুর রহমান পাঠক ভরাট গলায় দরাজ কন্ঠে ক্লাসের পাঠ্যভুক্ত কবিতা আবৃত্তি করে পড়াতেন এবং ব্যাখ্যা করতেন। স্যার একটু রাশভারি লোক হলেও কেমন যেনো পাগলাটে ভাব ছিলো। তবে তিনি সব সময় পাগলের ভাব নিতেন না। মেয়েরা তাদের কমনরুম থেকে স্যারদের অনুসরণ করে বিড়ালের মতো চুপচাপ শ্রেনীকক্ষে তাদের জন্য নির্ধারিত বেঞ্চে বসে যেতো। পাঠোক স্যারের ক্লাসে মেয়েদের দেখে ছাত্ররা একটু উল্লসিত উচ্ছ্বসিত হতো। একদিন এই স্যারের ক্লাসে মেয়েদের উদ্দেশ্য করে কে যেনো ভেতর থেকে কি একটা আচরণ করেছিলো, আর অমনি মজিবুর রহমান স্যার ক্ষেপে গিয়ে মেয়েদের একটি স্পর্শ কাতর অঙ্গের নাম দরাজ কন্ঠে উচ্চারণ করলেন, সেটি হলো ভ উ-কার দ আ-কার মেলালে যা হয়। স্যারের এই অদ্ভুত, রোমাঞ্চকর ও আপত্তিকর শব্দ প্রয়োগে আমারা যুবক যুবতিবৃন্দ যতোটা না লজ্জায় লাল হয়েছিলাম তার চেয়ে বরং ভয়ে থর থর করছিলাম। যেনবা আমরা কবি নজরুলের সেই অমর কবিতা বিদ্রোহীর সেই পঙক্তির অবোধ বালকবৃন্দ:

চিত-চুম্বন-চোর-কম্পন আমি থর-থর-থর প্রথম পরশ কুমারীর।

আমাদের পদার্থ বিজ্ঞান পড়াতেন, রাণা স্যার, হাসান স্যার, এহিয়া স্যার, কলেজের অধ্যক্ষ ড. মুসলেহউদ্দীন প্রমুখ। তবে এদের মধ্যে রাণা স্যারের পড়ানোর কৌশল ছিলো আলাদা। অধিকাংশ ছাত্র ছাত্রী তার ক্লাসের পড়া ক্লাসেই আয়ত্ত করে ফেলতো। স্যার ছিলেন কালো বর্ণের অথচ আকর্ষণীয় চেহারার লিকলিকে তীব্র গতিশীল এবং প্রচণ্ড মেধাবী এক জনপ্রিয় শিক্ষক। তার চুল ছিলো লম্বা, পড়ানোর সময় মাঝে বা হাতের পরশ দিয়ে চুলের আগা থেকে মেধার মাখন ছেকে এনে যেনো ছাত্রদের বিলিয়ে দিতেন। আমার মাঝে মাঝে মনে হতো স্যারের মগজের নিউরোনে নিউটন বসবাস করে।স্যার আমাকে খুব আদর করতেন। আমি ক্লাসের দু একজনের মধ্যে ফিজিক্সে রাণা স্যারের হাতে লেটার পেয়েছিলাম। দ্বাদশ শ্রেণির ফাইনালে আমি প্রথম বিভাগে তৃতীয় স্হান অধিকার করেছিলাম। পদার্থ বিজ্ঞান, প্রাণী বিজ্ঞান, ও উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিষয়ে আমি অবশ্য লেটার মার্ক পেয়েছিলাম। তখন আমাদের মধ্যে প্রথম হয়েছিল রাজবাড়ীর মাছকান্দীর এক মেধাবী ছাত্র ও দ্বিতীয় হয়েছিল মাগুরা থেকে আাসা এক হিন্দুছাত্র। ওদের নাম এই চল্লিশ বছর পর আর মনে পড়ছে না।

উদ্ভিদ বিদ্যা পড়াতেন আমার প্রিয় শফিউজ্জামান রুনু স্যার, কামরুন্নাহার আপা এবং পি.সি. দাশ স্যার। রুনু স্যার ও নাহার আপা পরস্পর ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। তারা খুবই সজ্জন এবং তার আমাকে ছোট ভাইয়ের মতো আদর করে পড়াতেন। আমকে স্যার ও আপা প্রায়ই তাদের বাসায় দাওয়াত করে খাওয়াতেন। স্যার ফরিদ পুরের বাইরে গেলে আমাকে বাসায় রেখে যেতেন। আপাকে তার কাজেরও সহযোগিতা করতাম। আমি হয়তো মেধাবী বলে তারা আমাকে এমন আপন মনে করতেন। আমি অবশ্য প্রাণী বিজ্ঞান ও উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিষয়ে লেটার মার্কসহ হায়েষ্ট মার্ক পেতাম।উল্লেখ্য শফিউজ্জামান সুস্বাস্থ্য ও সুন্দর চেহারার এবং রাশভারি চারিত্রের মানুষ ছিলেন। তার কাছে কোন ছাত্রই সহজে ভিড়তো না। শহরের গুন্ডা পান্ডা মানুষও তাকেঁ ভয় করতো।

দ্বাদশ শ্রেণির ফাইনালে এবং নির্বাচনী পরীক্ষায় আমরা দশ জন প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছিলাম। আমার পজিশন ছিল তৃতীয়। বোর্ডের পরীক্ষা হয়েছিল ১৯৭৬ সনে। পরীক্ষার একমাস আগে আমার পেটে জটিল পীড়া হয়েছিল। বাঁচার ভরষা ছিলো না। আমার পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব হবেনা বলে শহর থেকে বাড়িতে আমার আব্বাকে জানানো হয়েছিল। তারপর আল্লাহর রহমতে পরীক্ষার একসপ্তাহ আগে আমি কিছু টা সুস্থ হয়ে উঠি এবং পরীক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। পরীক্ষায় আমি দ্বিতীয় শ্রেণিতে পাশ করি।তবে বোর্ডের বৃত্তি লাভ করি। সে বছর ঢাকা বোর্ডে মাত্র ১৭% পাশ করেছিলো। আর প্রথম বিভাগে পাশ করেছিলো মাত্র কয়েক শত। আমাদের কলেজ থেকে সেবার দশ জন প্রথম বিভাগ পেয়েছিল অথচ তিন জন প্রথম বিভাগ পেলেও আমার পাওয়ার কথাছিল।পরে জেনেছি আমাকে কেউ হয়তো জামালগোটা জাতীয় বিষাক্ত পদার্থ আমার অগোচরে খাইয়েছে। বিধিলিপি। জানি না রাজেন্দ্র কলেজের কে রাজা।

কলেজে আমাদের শ্রেনীতে বিজ্ঞান বিভাগে প্রায় শতজন ছাত্র ছাত্রী ছিলো। এর মধ্যে মাত্র কয়েক জন আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলো। হাইস্কুলের বন্ধুদের মধ্যে প্রায় চল্লিশ পঞ্চাশ জন বিভিন্ন বিভাগে ভর্তি হয়েছিলো। আমরা পনেরো জনের মতো বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছিলাম।মোহাম্মদ আলী, ইমরান, ইনতিশার হোসেন মাসুদসহ আরও কয়েকজন। ইমতিয়াজ এস.এস.সি.তে মানবিক বিভাগে আমাদের স্কুল থেকে ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছিল, পান্নু সেকেন্ড ডিভিশন পেয়েছিলো, ওরা মানবিক বিভাগে ভর্তি হয়েছিলো। জেলা স্কুল থেকে তাপস সাহা, বিজন সাহা, প্রনব বালা সনু, মিজান, সৈয়দ মুকিতুল হক রনি, আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুতে পরিনত হয়। ফরিদ পুর, রাজবাড়ী, পাংশা বোয়ালমারী ও মাগুরা থেকে আরও কিছু মেধাবী ছাত্র আমাদের সাথে ভর্তি হয়েছিলো। বেশ কিছু ছাত্রীও আমাদের সহপাঠী ছিল, তাদের মধ্যে দু-একজন সুন্দরী ও মেধাবীও ছিলো, কিন্তু তাদের সাথে আমার বা আমার বন্ধুদের তেমন ঘনিষ্ঠতা ছিলোনা। আমরা পড়াশোনা নিয়েই বেশি ব্যাস্ত থাকতাম তবে তাদের অর্থাৎ ওই ললনা কুলের মধ্য থেকে কেউ কেউ প্রাকটিকাল ক্লাসে আমার ঘনিষ্ঠতা পাওয়ার চেষ্টা করেছে। ওদের মধ্যের কারো নাম এ মুহূর্তে মনে পড়ছে না। তবে ফেরদৌসী নামের একটি মেয়ে মেধাবী ছিলো।

সে পরবর্তীকালে ডাক্তার হয়েছে। জীবন চলার কোন এক বাকে কোথায় যেন তার সাথে দেখা হয়েছিল, আবার এখন কোন কুয়াশায় রয়েছে তা জানিনা। স্কুল কলেজ জীবনের অনেক বন্ধুর সাথে আমি আর যোগাযোগ রাখতে পারিনি। এ ক্ষেত্রে আমার ছোট ভাই আসাদ তুলনাহীন। সে বন্ধুপ্রাণ পাগল। তার স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অনেক বন্ধু বান্ধবের সাথে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। কর্মজীবনের সহকর্মীদের সাথেও হরিহরাত্মা। আমি কবিতা চর্চা করি এবং ধ্যানমগ্ন নিরব সুনসান পরিবেশে পরিতৃপ্ত থাকি। তা ছাড়া আমি বালক বয়স থেকেই অনেকটা নীরব অনুচ্ছল প্রকৃতির। ফলে আমি আমার অনেক বন্ধু বান্ধবদের কলকাকলী থেকে বিচ্ছিন্ন।

আমাদের শ্রেণি কক্ষের পিছনের সারিতে বসতো ছোট খাটো চটপটে স্বভাবের আবদুর রাজ্জাক রাজা। সে রাজবাড়ি পাংশা এলাকার ছেলে। হঠাৎ সে আমার সাথে খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে গেলো। আমার বন্ধুদের অনেকেই নামাজ পড়ায় অনিয়মিত ছিলো কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমি ছিলাম ব্যাতিক্রম। আমি নামাজের সময় কলেজের নিকটবর্তী কোট মসজিদ ও স্টেডিয়াম সংলগ্ন মসজিদে নামাজ পড়তাম। নামাজে নিয়মিত হাওয়ার শিক্ষাটা আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য ও আব্বার কড়াকড়ির ফসল। আমাদের সময়ে কলেজে কোন মসজিদ ছিলো না। নামাজের সময় কলেজর আরও কিছু ক্লাসমেট ও সিনিয়র ভাইয়ের সাক্ষাৎ পেতাম। আবদুর রাজ্জাক রাজা নামাজের সময় মসজিদে হাজির থাকতেন। তিনি মসজিদ থেকে আস্তে আস্তে আমার ঘনিষ্ট বন্ধুতে রুপান্তরিত হলেন। তিনি খুব মিশুক ও আলাপি মানুষ ছিলেন। সে ক্লাস মেট হওয়া সত্ত্বেও তাকে আমি ও আমার অন্যান্য বন্ধুরা আপনি বলে সম্বোধন করত। তিনি এখনো আপনিতেই রয়ে গেছেন।

একদিন কলেজের মাঠে বাদাম চিবানো ও আড্ডার কথা বলে ক্লাসের ফাঁকে কয়েকজন জন সিনিয়র ভাইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। এরা হলেন দ্বাদশ শ্রেণির রফিক ও শফিক ভাতৃদ্বয়, রসায়ন অনার্সের ছাত্র শেখ মহিউদ্দিন, শাহ আলমসহ আরেক জন। এরা কলেজে ভালো ছাত্র ও ভদ্র ছেলে হিসেবে স্যারদের কাছে পরিচিত। ওরা আমার কবিতা লেখার যোগ্যতা ও মেধাবী ছাত্রত্ত্বের প্রসংশা করলো এবং কিছু সাহিত্য ম্যাগাজিন উপহার দিলো। রাজাভাইয়ের একটি সাইকেল ছিলো তিনি সেটা চালিয়ে নিয়মিত ভাবে কলেজ করতেন আর পিছনে বসে স্যারদের লেকচার শুনতে শুনতেঝিমিয়ে যেতেন। ছাত্র হিসেবে তিনি তেমন মেধার পরিচয় দিতে পারেন নি। এস এস সির রেজাল্ট তার ভালো ছিলো কিন্তু কি কারণে যেন খুব ব্যাতিব্যাস্ত থাকতেন, ছটফট করতেন, লেখা পড়ায় মাথা লাগাতে পারতেন না। তার মগজ হয়তো অন্য কোথাও অন্য কারো কাছে বন্ধকি রেখেছিলেন। তার এ আচরণের জন্য প্রশ্ন করলে মৃদু হেসে জবাব দিতেন, আমার মাথায় বিজ্ঞান ঢোকেনা।তোমারা পড়ো, ভালো রেজাল্ট করো।

রাজাভাই মেধাবী ছাত্র না হলেও তার মিষ্টি ব্যাবহার চাঁদের মতো হাসি আমাকে দারুণ আকর্ষণ করতো। রাজাভাই একদিন আমাকে বল্ল, আপনিতো মেধাবী ছাত্র আবার কবিতাও লেখেন। আপনাকে একটা আজব ছেলের কাছে নিয়ে যাবো, সে ইংরেজিতে কবিতা লেখে। মাত্র ক্লাস এইটে পড়ে। দারুণ মেধাবী। মহিম স্কুলের ছাত্র। বাসা পশ্চিম খাবাসপুর। ওর বাবা নদী কমিশনের ইন্জিনিয়ার। ছেলেটি জটিল জটিল প্রশ্ন করে। আপনার কথা তাকে বলেছি। চলেন একদিন ওদের বাসায় যাবো। ওর মা, খালাম্মা খুব ভালো মহিলা, মায়ের মতো। আপনাকেসহ তাদের বাসায় একদিন চা খেতে বলেছেন।

ছেলেটির নাম আজফার হোসেন। আমি সত্যি একদিন রাজা ভাইয়ের সাথে আজফারদের খাবাসপুরের বাসায় গিয়েছিলাম। খালাম্মা সেদিন আমাদের খুব আপ্যায়ন করেছিলেন। আজফারের ইংরেজি কবিতা বেশ ভালো লেগেছিল। ওকে সেদিন বাংলায় কবিতা লিখতে বলেছিলাম। ও আমতা স্বরে রাজি হয়েছিল, তবে সে ইংরেজি ছাড়বে না, ইংরেজিতে সাহিত্য চর্চা করবে এবং সে দেশের একজন নামকরা কবি ও সাহিত্যিক হবে বলে আমার নিকট দৃঢ় আশা প্রকাশ করেছিল। সে বোর্ডে হয়তো এস.এস.সি.তে স্ট্যান্ড করবে আর ইংরেজিতে অবশ্যই লেটার মার্ক পাবে বলে আমি তাকে আশ্বস্ত করেছিলাম। বোর্ডে সে সত্যি ইংরেজিতে লেটার মার্ক পেয়েছিলো কিন্তু স্ট্যান্ড করেছিলো কিনা তা এ মুহূর্তে আমার স্মরণে নেই। আজফার পরবর্তী জীবনে জাহাঙ্গীর নগর ইউনিভার্সিটির ইংরেজির অধ্যাপক হয়েছিল। সে সাহিত্য চর্চাও করেছে, তবে সময় বলে দেবে।