সাহিত্য সংগঠনের সৌগন্ধিক

সাহিত্য করতে হলে সংঘবদ্ধ সৌগন্ধিকতার প্রয়োজন তা ওই সাহিত্য রসিক রাজাই আমাকে বাতলে দিয়েছিলো। রাজা কোন লেখাই লেখেন নি কিন্ত লিখতেন ক্যামেরা দিয়ে। কর্মজীবনে এই বিজ্ঞানের ছেলেটি ফটোজার্নালিস্ট হলো আর আমার প্রথম কাব্যগ্রহ্নের হলো প্রকাশকসহযোগী। রাজেন্দ্র কলেজে লেখা পড়ার সাথে আমার সাহিত্য চর্চা ও সমান তালে চলছিলো। আমি লোকায়ত সাহিত্য সংস্কৃতি সংস্হার একজন বিশিষ্ট সদস্য ও কবি ছিলাম। আমরা কবি আবদুস সাত্তার গুমানির পরিচালনায় আদর্শ বালিকা বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে, মোছলেম প্রিন্টিং প্রেসের রুমে, অম্বিকাহলে, কখনও বা কৃষ্ণা দির বাসায় সাহিত্য আসর করতাম।

রাজা ভাই একদিন আমাকে বল্ল, ফরহাদের বাসায় আপনি কবিতা পড়বেন।আরো কবি আসবেন। তরুন কবি তারিক হাসান আসবেন। আমি নির্ধারিত দিনে সেখানে গেলাম। পরিচয় হলো, তুখোড় কবিতা লিখিয়ে তারিক হাসান, সৈয়দ মুকিতুল হক রনি, জেবুল আমিন দুলাল, শেখ মহিউদ্দিনসহ আরও কয়েক তরুনের সাথে। তারিক হাসান সুকান্ত, ইন্দু সাহার সাথে কবি ফররুখ আহমদ এর কবিতা বিশেষ ভাবে পড়ার পরামর্শ দিলেন। সেদিনের পঠিত লেখার ওপর তিনি খুটিয়ে খুটিয়ে আলোচনা করলেন। তারপর ক্রান্তিকাল সাহিত্য সংস্কৃতি সংস্হা নামে একটি সাহিত্য সংগঠন গঠনের প্রস্তাব দিলে উপস্থিত সকলে তা মেনে নেয়। কিন্তু অবাক কান্ড হলো আমার সাথে কোন আলোচনা ছাড়াই এ সংগঠনের সভাপতি করা হলো আমাকে। ঘটনায় আকস্মিকতায় আমি কিছুটা অপ্রস্তুত হলে তারা বল্লেন, দায়িত্ব দিলে পালন করতে হয়। এটাই নিয়ম, দায়িত্ব চাইলে আমরা কাউকে দায়িত্ব দেই না। আমি বুঝতে পারলাম না কার দায়িত্ব কাকে দিয়ে পালন করানো হচ্ছে। এ ভাবেই তাদের সহযোগিতায় আমরা সাহিত্য চর্চা শুরু করলাম।

আমরা হিতৈষী স্কুলের রুমে কখনোবা দুধবাজারের পাশে, মসজিদের একটি রুমে আবার কখনও বা কলেজ চত্বরে সাহিত্য আড্ডায় বসতাম। আমি আবদার রহমান, শোয়ায়েব, ওজায়ের, মন্টু ভাই, মহিউদ্দিন ভাই, রনিসহ আরও অনেকে এসব সাহিত্য আড্ডায় সরব হাজির হতাম। রাজা ভাই আমাদের, জড়ো করে মাঝে মাঝে কি কাজে যেন ভীষণ ব্যাস্ততা দেখিয়ে চলে যেতেন কবিতা, গল্প পাঠ শেষে আলোচনা হতো ঝাঝালো। তারপর চলতো ঝাল মুড়ি, চানাচুর, পিয়াজু ও পুরি ভক্ষনের আনন্দ মেলা। চা ও চলতো কখনও কখনও। আমি অবাক হতাম আমাদের এই আড্ডায় লোকায়ত সাহিত্য সংস্কৃতির মতো কোন মেয়ে সদস্য ছিলো না বলে।পরে অবশ্য বিষয়টি অনেকটা পরিস্কার করেছিলো ওই আবদুর রাজ্জাক রাজা।

ফরিদপুর শহরে ১৯৭০ থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত স্কুল কলেজে অধ্যায়ন কালিন সময়ে বেশ ভালোভাবেই সাহিত্য চর্চা করেছি। সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময়ে ফরিদপুর হাইস্কুলের সিনিয়র ভাই সোহরাব হোসেন ও ফরিদ উদ্দিন এর সাথে শহরের বিভিন্ন স্হানে আড্ডা করে সাহিত্য চর্চা করেছি কিন্তু আমাদের সেই আড্ডার কোন নামছিলোনা। পরে অবশ্য লোকায়ত সাহিত্য সংস্কৃতি ও ক্রান্তিকাল সাহিত্য সংস্কৃতি সংস্থা নামে দুটি সাহিত্য সংগঠনের মাধ্যমে যুথবদ্ধ কর্মকাণ্ডে সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চা করেছি। আমার এই সময়ে ফরিদপুর সাহিত্য সংস্কৃতি উন্নয়ন সংস্থা নামেও একটি সাহিত্য সংগঠন ছিলো কিন্তু সেখানে বার্ষিক অনুষ্ঠান ছাড়া নিয়মিত ভাবে তেমন কোন সাহিত্য চর্চা হয়নি। আমাদের বাসায় ও অধ্যাপক মুক্তিযোদ্ধা নাসিরুদ্দন ভাইয়ের বাসায় মাঝে মাঝে সাহিত্য আড্ডা হতো।এ গুলোতে শাহীদা আপা, নাসির ভাইসহ কেউ কেউ অংশ গ্রহন করতো। আমি ক্ষুদে কবি হিসেবে বড়ো ভাই বোন দের সাহিত্য আড্ডায় বসার এবং কবিতা পড়ার সুযোগ পেতাম। এ জন্য অবশ্য শাহীদা আপার বদান্যতা আমার সাহিত্য করার অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। তখন শেখ মুজিব রোডে মিহির কুমার কর্মকার একটি ট্যাবলয়েট সাহিত্য পত্রিকা বের করতেন এবং ওই পত্রিকা কেন্দ্রীক সাহিত্য আড্ডা হতো। সেখানেও কেউ কেউ অংশ গ্রহণ করতো। আমি হয়তো কালে ভদ্রে সেখানে অংশ গ্রহণ করতাম। শহরে কয়েকটি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের হতো। সে সব পত্রিকায় কবিতা প্রকাশ পেতো।আমি বেশ কিছু সাপ্তাহিক পত্রিকায় লিখেছি সেই বালক বয়সেই।

শহরে “গনমন” নামে একটি উন্নত মানের সাহিত্য ম্যাগাজিন পত্রিকা বের হতো। অধ্যাপক জি.এম. হালিম এর দায়িত্ব পালন করেছেন কখনও কখনও। এটি একটি উন্নত মানের সাহিত্য পত্রিকা ছিলো। এখানে কবি জসিমউদদীন, জি.এম. হালিম, অধ্যাপক আ.ন.ম. আবদুস সোবহান, অধ্যাপক বলাই স্যার, নাসিরুদ্দিন, শাহীদা খান মজলিশ, এনায়েত হোসেন, আবদুস সাত্তার গুমানি, সোহরাব হোসেন, নুর আহমদ রইসি, মিহির কুমার কর্মকার এবং আমি-সহ দেশের নামকরা কবি সাহিত্যিকবৃন্দ লিখতেন। “গনমন” পত্রিকা কেন্দ্রিক সাহিত্য আড্ডাও মাঝে মধ্যে হতো। এভাবে ফরিদপুর শহরে আমার সময়ে সাহিত্য চর্চা হয়েছে। কিন্তু শক্তিশালী সাহিত্য সংগঠন বলতে তখন ওই তিনটি সাহিত্য সংগঠন যথা, লোকায়ত সাহিত্য সংস্কৃতি সংস্থা, ক্রাতিকাল সাহিত্য সংস্কৃতি সংস্থা ও ফরিদ পুর সাহিত্য সংস্কৃতি উন্নয়ন সংস্থার নাম উল্লেখ যোগ্য ছিলো। অনেকেই তখন লিখতেন কিন্তু মাত্র কয়েক জন এখন কবি হিসেবে পরিচিত। কবি ও প্রকৌশলী হাবীবুল্লা শিরাজী আমার সিনিয়র। তার সাথে হয়তো কোন সাহিত্য আড্ডায় উপস্থিত থেকেছি কিন্তু এ মুহূর্তে আমার স্মরণ হচ্ছে না।