মায়বী জোছনার রেশমী রুমাল

বায়ান্নর অমর ভাষা শহীদ বরকত, রফিক, শফিক, জব্বার, সালাম প্রমুখের স্মরণে ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে ফরিদপুর হাইস্কুলে এবং সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের শহীদ মিনারে নগ্নপদে ফুল দিয়ে প্রভাত ফেরী করেছি ফজর নামাজের আগে পরে। সে কি এক আবেগ আমাদের কচি মনে কাজ করতো তা বলে প্রকাশ করা কঠিন। প্রভাতফেরীতে আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি সুর করে কোরাস গেয়েছি। স্কুলে আমাদের সিনিয়র হায়দার ভাই এই প্রভাত ফেরীতে ও পুষ্প স্তাবক অর্পনের নেতৃত্ব দিতেন আর কলেজে নেতৃত্ব দিতেন নাসিরুদ্দিন ভাই, জহুরুল ইসলাম ভাইসহ আরও অনেকে।

ফরিদপুর শহরে একটি নতুন মাত্রা যোগ হয়েছিল নবী দিবস পালনে অর্থাৎ ঈদ-এ-মিলাদু্ন্নবী উজ্জাপনে। এই দিবসে অধ্যাপক আবদুস সামাদের উদ্যোগে ফজরের নামাজের কয়েক ঘন্টা আগে থেকে ট্রাকে করে আমরা সারা শহর চক্কর দিতাম নাতে রসূল গেয়ে গেয়ে। আমাদের সাথে হামদ নাত পরিবেশন করার ভালো শিল্পীরা অংশ গ্রহণ করতো। তাদের নাম আজ মনে নেই। কিন্তু তারা আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাড়া জাগানো নাত পরিবেশন করতো। আমাদের এই প্রভাত ফেরীতে এক নতুন প্রাণ পেয়ে জেগে উঠতো গোটা শহর। মনে হতো আকাশ থেকে ফেরেস্তারা আমাদের ফুল আর গোলাপ পানির মুগ্ধ শিশিরে ভিজিয়ে দিচ্ছে। আমরা এক বেহেশতী খশবুর মৌ মাতাল সুগন্ধী কস্তুরি কিন্নরে অবগাহন করছি। আমরা একে একে হৃদয় উজাড় করে গাইছি :

তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে
মধু পূর্ণিমারি সেথা চাঁদ দোলে
যেন ঊষার কোলে রাঙা-রবি দোলে।।
কূল মখলুকে আজি ধ্বনি ওঠে,কে এলো ঐ
কালেমা শাহাদাতের বাণী ঠোঁটে, কে এলো ঐ
খোদার জ্যোতি পেশানিতে ফোটে, কে এলো ঐ
আকাশ-গ্রহ-তারা পড়ে লুটে, কে এলো ঐ
পড়ে দরুদ ফেরেশতা,বেহেশতে সব দুয়ার খোলে।।

কিম্বা
সাহারাতে ফুটল্ রে রঙিন গুলে লালা
সেই ফুলেরি খোশবুতে আজ দুনিয়া মাতোয়ালা।।
সে ফুল নিয়ে কাড়াকাড়ি চাঁদ -সুরুজ গ্রহ-তারায়
ঝুঁকে পড়ে চুমে সে ফুল নীল গগন নিরালা।।
সেই ফুলেরি রওশনিতে আরশ কুর্ সি রওশন
সেই ফুলেরি রঙ লেগে আজ ত্রিভুবন উজালা।।

কিম্বা

মোহাম্মদের নাম জপেছিলি বুলবুলি তুই আগে
তাই কিরে তোর কন্ঠেরি গান,
(ওরে) এমন মধুর লাগে।। ওরে গোলাপ নিরিবিলি

নবীর কদম ছুঁয়েছিলি-
তার কদমের খোশবু আজো তোর আতরে জাগে।।

কিম্বা

তৌহিদেরি মুর্শিদ আমার মোহাম্মদের নাম
ঐ নাম জপলেই বুঝতে পারি খোদায়ী কালাম-
মুর্শিদ মোহাম্মদের নাম।।
ঐ নামেরি রশি ধরে যাই আল্লার পথে
ঐ নামেরি ভেলা ধরে ভাসি নূরের স্রোতে
ঐনামের বাতি জ্বেলে দেখি আরশের মোকাম
মুর্শিদ মোহাম্মদের নাম।।

মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা. এর জন্ম তারিখ ১২ ই রবিউল আউয়ালকে ঠিক রেখে প্রতি বছর ইংরেজি যে মাসেই এই তারিখ পড়ে নবী প্রেমিকেরা সেই তারিখে ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী পালন করে থাকে। অনেকে শুধু এই তারিখে নয় বরং সারা বছরে নবী জীবনাচরণ নিয়ে আলোচনা করে।তারা ওই নির্দিষ্ট তারিখ থেকে সারা বছর অনুষ্ঠান চলায়, তাই এর নাম দিয়ছে সীরাতুন্নবী স.। তারা এ দিনে প্রচলিত নিয়মে মিলাদ না পড়ে নবীর শানে নাত পরিবেশন করেন ,সেমিনার, সিম্পোজিয়াম অনুষ্ঠিত করেন।

সীরাতুন্নবী বা মিলাদুন্নবী যে নামেই মহা নবীর জন্মক্ষনকে নির্দিষ্ট করা হোকনা কেন, এ নিয়ে বিতর্ক না করে প্রতি বছর বারোই রবিউল আউয়াল তারিখ থেকে যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী নবীর জীবনী আলোচনা, নাত পরিবেশন করা উচিত। নবীর আদর্শকে একমাত্র জীবনাদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। কেউ যদি নবী সা,কে ভালোবেসে সুর করে নাত পরিবেশন করে, প্রচলিত মিলাদে আরবি, উর্দু, বাংলা যে ভাষাতেই মিলাদ মাহফিল করে তাকে স্বাগত জানানো দরকার। নবীকে ভালোবেসে কেউ যদি ছড়া, কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ রচনা করেন, তাকে নবীজীর মতো দরকার হলে মসজিদেও তা পরিবেশনের সুযোগ করে দিতে হবে। নবীজী হাসসান বিন সাবিতের জন্য মসজিদে নববীতে রিয়াজুল জান্নায় কবিতা পড়ার সোনার মঞ্চ তৈরি করেছিলেন যা আজও বিদ্যমান আছে। আমাদের সকলকে যে যার তৌফিক মতো নবীজীকে স্মরণ করতে হবে, হৃদয় দিয়ে, জান প্রাণ দিয়ে ভালো বাসতে হবে। নবীজিকে ভালোবাসা, তাঁকে অনুসরণ করার নির্দেশ রয়েছে কোরান ও হাদিসে।

সুরা আল ইমরানের ৩১ নং আয়াতে বলা হয়েছে : কুল ইনকুনতুম, তুহিব্বুনাল্লাহা ফাত্তাবিয়ুনি ইউহিব্বিকুমুল্লাহু, ওয়াইয়াগফিরলাকুম জুনুবাকুম,ওয়াল্লাহু গাফুরুর রাহিম। অর্থ : বলো, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো তবে আমাকে(রসূল)অনুসরণ কর, তা হলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ সমূহ ক্ষমা করবেন,আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। সুরা মুহাম্মদ-এর ৩৩নং আয়াতে বলা হয়েছে : ইয়া আইয়ু হাল্লাজিনা আমানু,আতিয়ুল্লাহা,ওয়া আতিয়ুর রাসূলা ওলা তুমবিতু আমালাকুম। অর্থ : হে যারা ঈমান এনেছ, তারা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর, তোমাদের আমলগুলো বিনষ্ট করো না’
আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদতের পূর্ব শর্ত হচ্ছে রাসূল সা.কে ভালোবাসা, তার আনুগত্য করা। রাসূলকে শর্ত হীন ভাবে বিশ্বাস করতে হবে ভালো বাসতে হবে। এই ভালোবাসা ও আনুগত্য অবশ্য রাসূল সা.এর তরিকা অনুযায়ী হতে হবে। উপরন্তু কেউ যদি রাসূলকে ভালোবেসে কবিতা লেখে, সাহিত্য চর্চা করে, নাত পরিবেশন করে সুরকরে রাসূলকে হৃদয় মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসে, ভালোবাসে বাহলুল পাগলেরমতো বা আবুজর গিফারীর মতো, কিম্বা বদর ওহুদের শহীদদের মতো,তাতে অন্যের সমালোচনা করা ঠিক নয়।

আমি ফরিদপুর শহরে প্রতিটি মিলাদুন্নবী অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ রচনা করে ফার্স্ট হতাম, মিলাদুন্নবীর প্রভাতফেরি অনুষ্ঠানে শিল্পীদের সাথে ট্রাকে সারা শহর ঘুরে নজরুলের নাত পরিবেশনে সঙ্গ দিতাম। মিলাদ মাহফিলেও অংশ গ্রহণ করতাম। শহরে ইসলামি ফাউন্ডেশনের ইসলামি সংস্কৃতি কেন্দ্র এই মিলাদুন্নবীর প্রভাতফেরি অনুষ্ঠানের আয়োজন করতো। এর প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন অধ্যাপক আবদুস সামাদ। শহরের দুধবাজারের জামে মসজিদে মিলাদুন্নবীর আলোচনা অনুষ্ঠান হতো। এতে আলোচনা করতেন, অধ্যাপক মনিরুজ্জামান ফরিদী, অধ্যাপক আবদুল গফুর, মাওলানা আবদুল আলী সহ আরও অনেকে।

আমি পরবর্তীতে রাসুলের ভালোবাসায় তাঁকে উদ্দেশ্য করে দুটি কাব্যগ্রহ্ন যথা : ১. সবুজ গম্বুজের ঘ্রাণ ও ২. যে নামে জগত আলো এবং গল্পগ্রন্থ সত্যের গল্প রচনা করেছি। “যে নামে জগত আলো” সম্ভবত বাংলা ভাষায় রসূল কেন্দ্রিক একক সনেট কাব্য এবং সত্যের গল্পও রসূল জীবন কেন্দ্রিক প্রথম গল্পের বই। মধ্য যুগের বিখ্যাত কবি সৈয়দ সুলতান রসূল জীবন কেন্দ্র করে বিশাল কাব্য গ্রহ্ন রসুল চরিত, আধুনিক সাহিত্যে কবি ফররুখ আহমদের সিরাজাম মনিরা (রসূল ও সাহাবাসহ মিশ্র) আবদুল মান্নান সৈয়দ এর সকল প্রশংসা তাঁর (রসূল, সাহাবায়ে কেরাম এবং অন্য আধ্যাত্মিক কবিতা মিশ্র) রসূল জীবন কেন্দ্র করে সৃষ্টি করেছেন অমর কাব্যগ্রন্থ। বাংলাভাষী প্রায় কবি রসূল সা.কে নিবেদন করে কবিতা লিখেছেন। কবি ইশারফ হোসেনের সম্পাদনায় বের হয়েছে রসুল সা.কে নিবেদিত কবিতা, কবি আসাদ বিন হাফিজ এর সম্পাদনায় বের হয়েছে রসূলের শানে কবিতা সংকলন। কবি নাসির হেলালও রসূল সা.কে নিবেদন করে একটি কাব্য গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। কবি সাজজাদ হোসাইন খান শিশুদের উপযোগী রসূল কেন্দ্রিক গল্পের বই লিখেছেন, সোনালী শাহজাদা নামে।

নবী করিম হযরত মোহাম্মদ সা. এর জন্মবার ছিল সপ্তাহের সোমবার। এ জন্য আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া রোজা রাখতেন প্রতি সোমবার। এটাই ছিল তাঁর জন্ম বার স্মরণ করার পদ্ধতি। রসূল প্রেমিক, রসূল সা. এর অনুসারীরাও অবশ্যই তাঁর জীবন আলোচনা করে তার জীবন যাপন পদ্ধতি ও তার আদেশ নিষেধ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা উচিত। কারণ এ বিষয়ে কোরানে আল্লাহর নির্দেশ রয়েছে। কতিপয় উদ্ধৃতি :
১. বলো’, আল্লাহ’ও রসূলের অনুগত হও। কিন্তু তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে যেনে রাখ আল্লাহ অবিশ্বাসীদের ভালো বাসেন না।(সুরা আলইমরান-৩২)
২. আমি তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে, যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের
ওপর বিশ্বাস রাখ, রসূলকে সাহায্য কর ও সম্মান কর এবং সকাল সন্ধায় আল্লাহর প্রশংসা ও মহিমা ঘোষণা কর (সুরা ফাতাহ, ৮-৯)

মূলত : রসূল সা.কে ভালোবসতে হবে মা, বাবা, পুত্র সন্তান থেকেও অধিক নইলে সে ঈমানদার নয়। আমরা মানুষ আমাদের দূর্বলতা থাকতে পারে বিভিন্ন ইবাদাত বন্দেগিতে কিন্তু রসূলের ভালোবাসায় কমতি থাকা যাবেনা। রসূল যেমন তাঁর জন্মবার সোমবার পালন করেছেন নফল রোজা রেখে তদ্রূপ আমরাও সোমবার রোজা রাখতে পারি। রসূল সা. যা যা করেছেন আমরা তাকে ভালোবেসে তাই করতে পারি। রসূলের অনুসরণ হল পূর্ণ ইসলাম মানা। উপরন্তু রসূল সা.কে ভালোবেসে কেউ যদি মিলাদ মাহফিল করে, দরুদ পাঠ করে নাত গায়, নাত, রসূলের শানে কবিতা, গল্প, উপন্যাস, মহাকাব্য রচনা করে তবে তাতে বাধা দেওয়া বা সমালোচনা করা মোনাফেকি এবং কুফুরী।

রসূলের শানে বিখ্যাত সাহাবীবৃন্দ, চার খলিফা নাত ও কবিতা রচনা করেছেন। মসজিদে নববীতে রিয়াজুল জান্নায় কবিতার আসর হয়েছে। হাসসান বিন সাবিতকে কবিতা পড়ে শোনানোর জন্য সোনার মঞ্চ তৈরি করে দিয়েছেন স্বয়ং নবীজি। পৃথিবীর বিখ্যাত কবি বৃন্দ রসূলের শানে যে পরিমাণ কবিতা লিখেছেন তা আর কোন ধর্ম নেতা বা জাতীয় নেতার ভাগ্যে ঘটেনি।কতিপয় সাহাবির কবিতার কিয়দংশ উদ্ধৃতি :

১. আশ্বাস/হযরত আবু বকর

গুহার আধারে আমরা তখন
শংকিত হইনি আমি
নবীজি আমাকে আশ্বাস দিলেন-
ভয় নেই কোন কিছুর
আল্লাহ তৃতীয় জন।

২. এই তরবারি/হযরত আলী

ও ফাতিমা, লও এই তরবারি-
যা কখনও কলংকিত হয়নি,
আমিও নই ভীরু, কাপুরষ, নীচ।

প্রাণের শপথ, চিহ্ন আছে এই অস্ত্রে
বহু ব্যবহারের,
নবী আহমদের পরশ রয়েছে এতে
প্রভুর সন্তোষে উত্তোলিত হত এটি,
তিনি মানুষের সব কিছু অবগত।

৩. সত্য নবী/হযরত ওমর ফারুক

আমি সাক্ষ দিচ্ছি আল্লাহ আমার মালিক ও স্রষ্টা
আর আহমদ এক ভাস্বর নবী।
সত্যের নবী তিনি, সত্য নিয়ে এসেছেন পৃথিবীতে
পূর্ণ বিশ্বাসে পূর্ণ ভরসায়
নিজ আমানত করেছেন বিশ্বস্ততায় সমুজ্জ্বল।
তিনি শোষণহীন সমাজের অনন্য রুপকার
যেখানে নেই জুলুম শোষণ।

৪. জ্যোতির গোলক/হযরত আব্বাস

হে নবী যখন ভূমিষ্ট হলে তুমি
পৃথিবী আলোকরশ্মিতে ভেসে গেল
চারদিক জ্যোতির্ময় হল তেমার আলোয়
আর আমরা আলোকিত সেই জ্যোতির গোলকে
আর সত্য পথের পথিক আমরা কেবল হাঁটছি
হাঁটছি, হাঁটছি…

৫. হিদায়াতের আলো/আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা

আমাদের রয়েছেন আল্লাহর রসূল
রাতের আঁধার চিরে যখন উদিত হয় আলোর প্রভাত
তখনও তিনি আল্লাহর কিতাব করেন তেলাওয়াত।

৬.বানাত সুয়াদ/কাব ইবনে যুহায়ের

বার্তা পেলাম আমার পরে রুষ্ট নাকি শ্রেষ্ঠ রসূল
ভয় কি তাতে এই জগতে সত্যি তিনি ক্ষমায় অতুল।
চিত্তে আশা ভিক্ষে পাব সেই সাগরের বিন্দু বারি
হাজার পাপী অশেষ ভুলে পায় যে ক্ষমা নিত্য তারি।

মাপ করে দিন সে পাক নামে সহজ সুপথ করল যে দান
জ্ঞানের সোপান ন্যায়ের বিধান কোরান যাঁহার পুত অবদান
নিন্দুকেরা পণ করেছে প্রাণটা আমার হানবে নাকি
সত্য তো নয় বিন্দু তারা সকল তাদের মিথ্যে ফাঁকি।

৭.মর্সিয়া/হযরত (মা) ফাতিমা তুজ্জোহরা

তেমার বিহনে আমি বৃষ্টি হীন বিশুষ্ক মৃত্তিকা
তোমার বিদায়ে বন্ধ আজ সব ঐশীবাণী।

তেমার মৃত্যুর আগে মৃত্যু হত যদি এ আমার
তুমিই করতে শোক,।আমার তোমার মাঝে
তখন মাটির স্তুপ ছাড়া কিছুই থাকতো না আর।

আমার হৃদয় আজ অন্ধকার, কণামাত্র তার
পড়তো এ বিশ্বে যদি, আলো বলে কিছু থাকতোনা আর

৮. কাসিদা/নাবিখাজাদী

সত্যের দিশারী রসূলের নিকটে এসেছি
এমন কিতাব তিনি উচ্ছ্বাসে পড়েন
সমুজ্জ্বল ছায়াপথ যেনো।

সু-উচ্চ আকাশ ছোঁয়া সকল গৌরব আমাদের,
আজ তার চেয়েও উর্ধ্বে যাবে এ গৌরব
যখন তাঁর আলোক ছায়ায়…

৯. তোমার তারিফ/হযরত হাসসান বিন সাবিত

তোমার চোখের মতন সুন্দর চোখ পৃথিবীতে নেই আর
কোন মাতাও এমন সুন্দর পুত্র করেনি প্রসব

তোমার সৃজন সে তো একেবারে দোষ মুক্ত
তুমিও চেয়েছিলে তাই আপন কৃপায়
তোমার তারিফ এই পৃথিবীতে চলেছে বেড়েই
যেমন কস্তুরী ঘ্রাণ বাতাসে কেবলি ছুটে চলে

১০.আলোক বর্তিকা/হযরত হামযা

এমন বাণী নিয়ে এলেন আহমদ
প্রতিটি আয়াতে আছে পথের নিশানা
প্রতিটি অক্ষর যার আলোকবর্তিকা।

১১. নাতে রাসূল/আবদুল কাদের জিলানী

হে নবীকুল সম্রাট
হে নবীদের মাথার মুকুট
আপনার ঘাম থেকে পুষ্প পেয়েছে সৌরভ
আপনার পরশ নিয়ে তুচ্ছ মানব
মৌমাছির মত মধু আহরোণে
ধন্য করে জীবন তাদের।

১২. নিন্দার ভয়ে/আবু তালিব

হে পুত্র, আমাকে তুমি
ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় নিতে ডাক দিয়েছ
আমি জানি, তুমি আমার হিতাকাঙ্খী,
আর তুমি যে দ্বীনের পথে ডাকছো
সেটাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম দ্বীন।
হায়! যদি গালমন্দ আর অপবাদের ভয় না থাকতো
তবে আমি এ দ্বীন অবশ্যই কবুল করতাম।
আমিও হতাম উত্সর্গিত প্রাণ সফেদ বলাকা।

১৩. তোমার মাহফিলে/আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি

তোমার প্রতীক্ষা করি কেবল পায়ের ধুলি নিতে
বিভোর রয়েছি আমি নিশ্চিন্তে নিজের প্রাণ দিতে
তোমার হাতের স্পর্শে ও শরাবে যেন প্রাণ পাই
ইহকাল পরকাল ভুলের মাথায় ভুলে যাই।

১৪. প্রিয় তুমি/ওমর খৈয়াম

ওহে ওই ব্যক্তি যে অদ্বিতীয় বিশ্বের
আমার মন,চোখ ও জীবনের চেয়েও প্রিয়
জীবনের চাইতে প্রিয় কোন জিনিস নেই
অথচ আমার জীবনের চেয়েও শতগুণ প্রিয় তুমি।

১৫. হযরত মুহম্মদ সা.-এর গীতি/গ্যাটে

ক. দেখ ওই গিরি প্রস্রবণ আনন্দে উজ্জ্বল
তারার চমক যেন এক,মেঘের উপরে
পালে তারে তরুন বয়সে সদয় আত্মিকগন
চূড়াগন মধ্যবর্তী ঝোপের ভেতরে।
খ.তবে এস তোমরা সকলে
এখন ফুলিছে সে
প্রভুরুপে, একটি গোটা জাতিকে
তার রাজকীয় স্রোতে উঠায় উর্ধে
এবং সঞ্চরমান জয়যাত্রায়
দেয় সে নাম দেশকে,
নগর জন্মে তার পদতলে।

১৬.নাত/সম্রাট জহির উদ্দিন মুহম্মদ বাবর
বৃথাই খুঁজেছি আমি কিমিয়া নামের সেই চীজ
কোথায় সন্ধান তার? অজ্ঞরা পায়না তার বীজ।
রাসূলের জ্ঞান পারে দিতে সেই কিমিয়ার খোঁজ
নিজে তুমি জ্ঞানী হও,কিমিয়া দেখবে রোজ।

১৭. নাত/জালালউদ্দিন রুমী
আহমদ নাম যদি বন্ধুত্বের এত সহায়ক
তাহলে কি উপকারী পবিত্র সে নাম মুবারক।
আহমদ নাম সে তো শীলাদৃঢ় দূর্গের মতন
তাঁর সে কঠিন সত্তা -রক্ষাকারী, বিপদ যখন।

১৮. নবী গনের গর্ব/জিগর মুরাদাবাদী

নবীগনের গর্ব হে রাসূল
আপনার আবির্ভাবে ধন্য হয়েছে বিশ্ব জাহান।
আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছেন আপনি
পবিত্র কুরআন -ই-কামিল-
অনুসারী হয়ে যার নিজেকে ধন্য ভাবে
জ্বীন,ইনসান এবং ফেরেশতা সকল
হে রাসূল।

১৯. নাত/দাগ দেহলভী
হে আল্লাহ, আমার হৃদয়ে যেন নিশিদিন, অনুক্ষণ
জড়িয়ে থাকে তোমার প্রিয় হাবীবের কালেমার ধন।
দো-জাহানে এ পবিত্র নামের ওছিলায় বিপদ ও অকল্যান
দূর হয়,সবখানে সকল সময় বেঁচে রয় মান ও সম্মান।

২০. নাত/ফরিদুদ্দিন আত্তার
কি বলব আমি, তাঁর প্রশংসায় আল্লাহই মশগুল
যে নামের সাথে মিশে আছে সুপ্রিয় রসূল।
মুহম্মদ, সে তো সত্যবাদী আল -আমিন
সমস্ত জগতের জন্য শ্বাশত রহমত।
দো-জাহানের শ্রেষ্ঠ মানব
দ্বীন দুনিয়ার শ্রেষ্ঠতম সংগঠক।
মুহম্মদ, এ বিশ্বের গৌরব তিনি
মানবতার অনন্য শিক্ষক।

২১. নাত/বাহাদুর শাহ জাফর
হে দো-জাহানের নেতা মেহেরবান,শাহেনশাহ
প্রেরিতদের নেতা,উম্মতের শাফায়াতকারী।
তোমার আবির্ভাবের রঙে পৃথিবী পুষ্পময়
তোমার অস্তিত্বের জ্যোতিতে আমার হৃদয় উজ্জ্বল
তুমি ছিলে রেসালতের উচ্চাসনে সমাসীন
আদম তখন অদৃশ্যে পর্দার আড়ালে লীন।

২২. নাত/মীর্জা আসাদুল্লাহ গালিব
কী আনন্দ কী আনন্দ! যখন তোমার কথা ভাবি
আমার আত্মার ঘর যেন বেহেশতী বাগান
আল্লাহ আমাকে দাও চিরন্তন অপার করুণা
নবীর আদর্শে হোক আমার জীবন উজ্জীবিত।

২৩. জওয়াব/ড.স্যার মুহম্মদ ইকবাল
কুঁড়ির বক্ষে, ঘ্রাণের মত লুকিয়ে থেকোনা আর
করো ক্ষুদ্রকে মহান তোমার প্রেমের শক্তিবলে
শরাব যদি নাথাকে সুরাহিতে
সুরাহি থাকেনা আর
মুহাম্মদের নামের মহিমা ছড়াও জগত সভায়।

২৪. নবীজির রুপ/হাফিজ
কত অতুলন ছবি চিত্রপটে
দেখিলাম শোভা-সার
আমার হৃদয় সখার মনোরম রুপ
তুলনা হয়না যার।
আদিকাল থেকে কত রুপবান
উদিলেন ধরা মাঝে
সমতুল্য কেহ হলনা তো
সেই অপরুপ তাজে।

২৫. নাত/দুদ্দু শাহ
নবী ছেড়ে খোদাকে চায়
মোয়াহেদ কাফের তারে কয়।
দুদ্দু কয় নবী দয়াময়
যে কদমে খোদার কদম পায়।

২৬. নাত/শা’বারিদ খান

নূর মোহাম্মদ হৈলা যার হোন্তে পয়দা হৈলা
সৃষ্টি কৈলা এ তিন ভূবন
যার হেতু নিরন্জন দুনিয়া করিল সৃজন৷
আকাশ পাতাল মর্ত্তস্হান।

২৭. নাত/শাহ গরীবুল্লাহ
একা সেই করতার
কেহ নাহি ছিল আর
নূরে নবী কৈল পয়গম্বর।

আপনার নূর দিয়া
পহেলায় পয়দা কিয়া
মেহের বড়ো হৈল তারপর।

এলাহি বুঝিয়া কাম
রাখিল তাহার নাম
নূরনবী, নূর মোহাম্মদ।

সেইত নবীর নূরে
পয়দা কৈল সবাকারে
চৌদা ভূবন হদাহদ।

২৮. নাত/শাহ মোহাম্মদ সগীর
জীবাত্মার পরমাত্মা মহাম্মদ নাম
প্রথম প্রকাশ তথি হৈল অনুপাম।
যত ইতি জীব আদি কৈলা ত্রিভূবন।
মহাম্মদ হন্তে কৈলা তা সব রতন।
নিরন্জন একারক প্রেমে সে মজিলা
এহি লক্ষ্যে যত জীব সৃজন করিলা।

২৯. নাত/সৈয়দ আলাওল
পূর্বতে আছিলা প্রভু নৈরুপ আকার
ইচ্ছিলেক নিজ সখা করিতে প্রচার।

নিজ সখা মুহম্মদ প্রথমে সৃজিলা
সেই জ্যোতি-মূলে ত্রিভূবন নিরমিলা।।

তাহান পিরীতে প্রভু সৃজিলা সংসার
আপনে কহিছে প্রভু কোরান মাঝার।

৩০. নাত/সৈয়দ সুলতান

যেরুপে আদম ছাফি হৈলা উত্পণ
কহিবাম সে সব কিঞ্চিৎ বিবরণ।
দ্বিতীয় প্রণাম করি প্রভু নিরঞ্জন
নূর মুহাম্মদের কহিমু বিবরণ।

৩১. নাত/দৌলত কাজী
মহাম্মদ আল্লার রসূল সখাবর
যার নূরে ত্রিভুবন করিছে প্রসব।।
শ্যাম তনু জ্যোতির্ময় সর্বাঙ্গ দাপণি।
নবুয়ত পৃষ্ঠে যেন জ্বলে দিনমনি।

৩২. নাত/লালন শাহ
মদীনায় রসূল নামে কে এলো ভাই
কায়াধারী হয়ে কেন তার ছায়া নাই।
কি দিবো তুলনা তারে
খুজে পাইনা এ সংসারে
মেঘে যার ছায়া ধরে ধুপের সময়।।
৩৩. নাত/শীতালং
মক্কা শ’রে জন্ম লইয়া-
কুদরতে অয় দিন জারী ঐ নূরী
কাবাতে সৃজিলা আল্লায়
উম্মত নিস্তারী।।

৩৩. মোহাম্মদ, এখন তুমি/অমিতাভ পাল
আত্মোপলব্ধির আলো জ্বলে ওঠার পরে
একটি মোমবাতি
গুহার একাকিত্ব থেকে নেমে এসে
অনেক শব্দের মধ্যে ছড়িয়ে দিল প্রাপ্ত প্রত্যাদেশ
তারপর থেকে প্রত্যেকটি মোমবাতি
প্রত্যাদেশের আলো নিয়ে
একটি নির্জন অন্ধকারের ভেতর
হানা দেয়া শুরু করে গুহার অন্ধকারে
এইভাবে একদিন সবকটি পাথর মোমবাতি হয়।

৩৪. মদীনাতুন্নবী দঃ/আফজাল চৌধুরী
এখানেই মসজিদে নববী
ওখানেই সমাহিত সর্বশেষ পয়গম্বর সাঃ
এইমাত্র শেষ করে এসেছি আংশিক যেয়ারত
ওহোদ পর্বতের পাদদেশ হতে
ক্ষমাহীন রণক্ষেত্রের মহান শহীদানের কবরের পাশে দাড়িয়ে
বার বার মুছতে হয়েছে উপচানো অশ্রু
আল্লাহর সিংহের পবিত্র দেহের ছিন্নভিন্ন অংশ
ছবির মত ভাসছে চোখে এখনো

৩৫. তোমার দেখানো পথে/আবদুর রশীদ খান
তোমার দেখানো পথে
সব ছেড়ে বারবার শুধু ফিরে আসা
অন্ধকারে ফিরে এসে আলোর প্রত্যাশা।

নাস্তির রঙিন নেশা কেটে গেলে অলক্ষ্যে কখন
অলৌকিক আলো এসে ধরা দেয় হেসে
অস্তির অপার তেজে হেরার আভাস।
৩৬.রাসুলুল্লাহ /আবদুল আজিজ আল আমান
তাবত আঙুর বুঝি মদ হল হেজাজের বুকে
গুহায় জমাট হলে নিরক্ষর পাথুরে আঁধার
মরুর ধুলিতে বাড়ে সচকিত মেদের সোহাগ
সমিরির স্বর্ণগাভী দিকে দিকে মূঢ়তা ছড়ায়।

খুর্মা জৈতুন ডালে ঝুলেছিল কুকাফ আঁধার
মানুষেরা খুটে খায় উল্লাসে দোজখী আহার
গৃহাবাসী হলে তুমি বুকে পেতে বেহেশতী ডালিম
উড়ে যাবে নির্ভয়ে ঈমানের সফেদ কপোত।
৩৭.হযরত মুহম্মদ সা.আবির্ভাব /আবদুল মান্নান সৈয়দ
ইয়াসরিবের দূর্গ থেকে জন্মের তারকা আহমদের
ওই দ্যাখো হতবাক হয়ে দেখছে ইহুদি সমাজ।
পৃথিবীর যুগ-যুগান্তের আশা পূর্ণ হলে আজ।
সালাম! সালাম!ধ্বনি ছেয়ে গেলো সমস্ত জগতে।

শতাব্দীর প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকুণ্ড হলো নির্বাপিত।
আলোকিত হয়ে উঠলো সিরিয়ার প্রাসাদ মণ্ডলী।
জমিন -আসমান সব নত হয়ে লিখলো গীতাঞ্জলি।
পারস্যের প্রাসাদের চৌদ্দ চূড়া ভূতল-লুন্ঠিত।

৩৮. জ্যোতিস্ক মেঘের বাতিঘর/আবদুল হাই শিকদার
মুহম্মদ আপনি এমন কেন
আমার উপকূল জুড়ে আপনার বেলাভুমি
তায়েফের বনে একজন রক্তাক্ত মানুষের
দূর্লভ উচ্চারণ থেকে
আমার দূরত্বকে আমি বাড়াতে পারিনি কোনদিন
আমার পরমায়ুর সমূহ সীমাবদ্ধতায় মুহম্মদ
কেবলমাত্র আপনার নামের বাতিঘর
প্রলুব্ধ মক্ষিকার মতো আমার গহন রক্ত ও ঘুমে
উন্মাতাল আলোর নাচনে আমাকে অস্হির করে শুধু

৩৯. হযরত মোহাম্মদ/আল মাহমুদ
গভীর আঁধার কেটে ভেসে ওঠে আলোর গোলক
সমস্ত পৃথিবী যেন গায়ে মাখে জ্যোতির পরাগ
তাঁর পদপ্রান্তে লেগে নড়ে ওঠে কালের দোলক
বিশ্বাসে নরম হয় আমাদের বিশাল ভুভাগ।
হেরার বিনীত মুখে বেহেশতের বিচ্ছুরিত স্বেদ
শান্তির সোহাগ যেন তাঁর সেই ললিত আহ্বান
তারই করাঘাতে ভাঙে জীবিকার কুটিল প্রভেদ
দুঃখীর সমাজ যেন হয়ে যাবে ফুলের বাগান।

৪০.মুহাম্মদ সাঃ, প্রথম মানব মনবীর উত্তরাধিকার/আল মুজাহিদী
আমিতো প্রতিদিনই তোমার ওপর শান্তির মহান
দরুদ পাঠ করি
তুমিই আলোর উদ্ভাসন এবং অন্ধকার তিমিরের পার্থক্য
দেখিয়ে দিয়েছো আমাকে,মুহম্মদ।
আমি আমার চেতনা ও বোধির শিখর স্পর্শ করি
আমি তো প্রতিদিনই তোমার ওপর শান্তির মহান দরুদ
পাঠ করি।

বি.দ্র. লেখা টি গ্রহ্ন আকারে প্রকাশ করার কালে এ অংশে আরও কবিদের কবিতা উদ্ধৃত করা হবে।