আমার কদর, আমার বরাত

ছোট বেলা থেকেই মা বাবার শিক্ষা ও পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী আমি ধর্ম কর্ম পালনে নিষ্ঠাবান ছিলাম। আমাকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার প্রচেষ্টা থাকলেও যাতে ধর্ম বিরোধী বা নাস্তিক না হয়ে যাই সে জন্য বাড়িতে বিভিন্ন হুজুরের নিকট আব্বা আমাকে কোরান ও ধর্মীয় তালিম দিয়েছেন। নামাজ রোজা করার প্রাকটিস সেই নাবালক বয়সেই রপ্ত করতে হয়েছিল। শুধু তাই নয় বিভিন্ন নফল এবাদত, যেমন শবে বরাত, শবে কদর রাতে রাত জেগে মসজিদে নামাজ, কোরান তেলাওয়াতের মোহনীয় ইবাদতে মশগুল থাকতে হয়েছে। আমরা ছোট ভাই বোনেরা এই ইবাদতে মা বাবার সাথে উতসব মুখর পরিবেশে পালন করেছি। শবে বরাত ও শবে কদর রাতে ইবাদতের জন্য সূর্য ডোবার সাথে সাথেই বাড়ি সংলগ্ন কুমার নদীতে আমরা গোছল করে নফল নামাজের জন্য প্রস্তুতি নিতাম।ঈদের দিনে ভোর বেলা যেমন অযু গোছল অবধারিত ছিলো, তেমনি শবে বরাতের রাতের শুরুতে সন্ধ্যা বেলায় দ্রুত গোছল করে মসজিদে ঢুকে যেতাম। আমাদের বিশ্বাস ছিলো এই রাতের নামাজের জন্য গোছলের সাথে সাথেই সগিরা গুনাহ অর্থাৎ ছোটো পাপ ধুয়েমুছে শেষ হ’য়ে যায়।আর বড়ো গুনাহ মাফের জন্য নামাজ পড়ে তওবা করলে আল্লাহর দরবারে কেঁদে বুক ভাসালে তিনি পিছনের গুনাহ মওকুফ করে দেন।

শাবান মাসের পনের তারিখ নিছফুস শাবান প্রসঙ্গে এই তারিখের রাতে ইবাদত বন্দেগি, কবর জেয়ারতের ব্যাপারে নবী করিম সা. এর হাদিসের কথা অনেকে বলে থাকেন।কেউ কেউ এ রাতকে ভাগ্য রজনী বলে আখ্যায়িত করেন। কিন্তু কোরানে বরাত রাত বা ভাগ্য রজনী প্রসঙ্গে কোন সুস্পষ্ট আয়াত নেই বরং শবে কদর বা লাইলাতুলকদর সম্পর্কে একটি সূরা রয়েছে। আমার অভিমত যাই থাক, আমি ধর্মীয় বিষয়ে অভিজ্ঞ নই। নফল ইবাদতে ক্ষতি কি, যেখানে যুব সমাজ মাদকাসক্ত, নামাজ বিমুখ সেখানে মসজিদ মুখি হওয়া খারাপ কিসের। তবে এ বিযয়ে অধ্যায়ন করতে এবং মতামত দিতে অসুবিধা নেই, যদি তা শেরকি, কুফরি না হয়। আমি এখনও কদর রাতে এবং শাবান মাসের পনের তারিখ রাতের আংশিক ইবাদতে সময় কাটাই।

উল্লেখ্য, স্কুল কলেজ জীবনে যে ভাবে নফল ইবাদাত বন্দেগি করতাম এখন তা কমে গেছে, তবে যতটা সম্ভব সার্বক্ষণিক জিকির ও সত্য সুন্দর সাহিত্য চর্চায় সময় ব্যায় করছি। রমজান মাসে এবং এ মাসের বেজোড় রাতে লাইলাতুলকদর রয়েছে। কদর রাতের মর্যাদা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। এ রাতে আল্লাহ মানুষের গুনাহ মাফ করে দেন এবং সৌভাগ্য বন্টন করেন। তাই এ রাত জেগে নফল ইবাদাত করতে হবে, আল্লাহর দরবারে ক্ষমা চাইতে হবে, সৌভাগ্যের জন্য প্রার্থনা করতে হবে। কদর রাত সম্পর্কিত কোরানের আয়াতের উদ্ধৃতি:

১. ইন্না আনজালনাহু, ফি লাইলাতুলকদর। ওমা আদরাকা মা লাইলাতুলকদর। লাইলাতুল কাদরি খাইরুম মিন আলফ ফি শাহর।(সুরা কদর) অর্থাৎ- নিশ্চয়ই আমি তাঁকে (কোরআন) লাইলাতুলকদর রাতে নাজিল করেছি।আপনি কি জানেন কদরের রাত টি কি? কদরের রাত হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। (১-৩)

২. হা মিম।ওয়াল কিতাবুল মুবিন। ইন্না আনজালনাহু ফি লাইলাতিম মুবারাকা। ইন্না কুন্না মুনজিরিন। (সুরা দুখান,১-৩) অর্থাৎ- আমি (এটি বা কোরআন) একটি মোবারক রাতে বা মর্যাদাময় রাতে নাজিল করেছি। অবশ্যই আমি হচ্ছি সতর্ককারী।

৩. শাহরু রমাজান, আল লাজি উনজিলা ফি হিল কুরআন, হুদাল লিন, নাছি,ওয়া বাইয়্যিনাতি, মিনাল হুদা ওয়াল ফুরকান। (সুরা বাকারা-১৮৫) অর্থাৎ- রমজান মাস, যে মাসে কোরআন নাজিল করেছি, মানুষের হেদায়েতের জন্য, সুস্পষ্ট ভাবে, (হক বাতিলের) পার্থক্য রুপে।

সুরা কদর এবং সুরা দুখানে আল্লাহ তায়ালা কোরআন নাজিলের রাতকে একবার বলেছেন কদর বা মর্যাদা ময় রাত হিসেবে আবার মোবারক বা বরকত ময় রাত হিসেবে। এটা সমার্থক শব্দ, যা কদরের বা মর্যাদার তাই মোবারক বা বরকতময়। এখানে কোরআন নাজিলের রাতের গুরুত্ব নিয়ে মুসলিমদের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি নেই। কিন্তু নাজিলের মাস কোনটি তার প্রশ্ন উঠলে দেখা যায় এর উত্তর সুরা বাকারায় ১৮৫নম্বর আয়াতে আল্লাহ পাক, কোরআন নাজিলের মাসকে বলেছেন রমজান মাস। এজন্যই অর্থাৎ কোরআন নাজিলের রাতের গুরুত্ব হাজার মাসের চেয়ে উত্তম বলা হয়েছে।

কেউ কেউ বলেন, সুরা দুখানে কোরআন নাজিলের মাসকে যে বরকতময় রাত বলেছেন তা শবে বরাত বা বরকতময় সৌভাগ্য রজনী তা নিছফুস শাবান, কিন্তু আমার বিশ্লেষণ হল, কোরআন নাজিলের মাস রমজান মাস এবং এটাই কদরের রাত, এটাই মোবারক ময় রাত। এটা কিছুতেই শাবান মাসের পনের তারিখ নয়। কারন শাবান মাসের পনের তারিখ নিয়ে কোন আয়াত কোরআনে নেই। আর শাবান মাসের পনের তারিখ যে ভাগ্য রজনী তা ও সঠিক নয়। তবে শাবান মাসের পনের তারিখ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ন রাত। কয়েক টি হাদিসে রয়েছে হযরত মোহাম্মদ সা. এ রাতে নফল নামাজ পড়েছেন, বিশেষতঃ জান্নাতুল বাকীতে গিয়ে কবর জেয়ারত করেছেন এবং কবরবাসীর জন্য দোয়া করেছেন। নবী পাক, কদর রাতে যে ভাবে নিকটজনকে নফল নামাজ ও ইবাদত বন্দেগির তাকিদ দিয়েছেন সে ভাবে শাবান মাসের পনের তারিখের রাতে নফল ইবাদাত বন্দেগির কথা বলেন নি। তবে তিনি নিজে এ রাতে ইবাদত বন্দেগি করেছেন তার প্রমাণ কিছু হাদিসে রয়েছে। তাই এ রাতে কেউ যদি রসূল সা. এর মতো ইবাদত করে তা সমালোচনা করা ঠিক নয়। তবে এ রাতকে ভাগ্যরজনী আখ্যা দেওয়া ঠিক নয়।আতস বাজী করা, মাজারে মাজারে মোমবাতি জ্বালানো, মসজিদে মসজিদে ঘোরাঘুরি করা বেদাত। কেউ যদি এ রাতে জিকির আজকার, কোরআন তেলাওয়াত, নফল নামাজ পড়ে এবং কবরস্থানে গিয়ে স্বজনদের জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া চায় দোষের নয়।