তারার মেলার চন্দ্রজ্যোতি

আমার মায়ের নাম রাহিলা বেগম। তিনি অত্যান্ত গুনবতী ধৈর্যশীলা আবেদা পরহেজগার মহিলা। গায়ের রঙ উজ্জ্বল শ্যাম বর্নের, না কি কালো ককিলার কমল কোরক! কি এক মায়াকাননের চন্দ্র জোছনা তার প্রশস্ত কপোল-পেশানি থেকে ঝরে ঝরে পড়ে! আমি বিস্ময় বিমুগ্ধ চিত্তে তাকিয়ে থাকি মায়ের স্বর্ণাননে, আমি এই বেহেশ্তি রমণীর কোমল উদরে জন্ম নিয়েছি। তাঁর দিকে মাখন নয়নে তাকালে কা’বার দিকে তাকানো হয়, কবুল হজ্জের সওয়াব পাওয়া যায়! এই বাণী তো পৃথিবীর সব সন্তানের জন্য। মায়ের পায়ের নিচে বেহেশত। এটাতো সব মায়ের প্রতি ইসলামের পক্ষথেকে দেয়া সম্মান। কিন্তু আমার মাকে পৃথিবীতে অনেকই বেহেশ্তি নারী বলেছেন। এদের মধ্যে পাশের বাড়ির রাজেক মামা। চাচি আম্মা সূর্য খাতুন সহ আরও অনেক। আমি তাদের কথা শুনে আবেগে আনন্দে পুলকিত হতাম। এই তাহলে আমার মা, জননী জন্মদায়িনী মহাত্মা বিদূষি রমণী। একবার ভাবি আমার আব্বাতো গৌরবর্ণ স্বর্নকান্ত সুশোভন বলিষ্ঠ শক্তিমন্ত পুরুষ, তিনি কেন কালোগোলাপের সৌগন্ধে এমন বিভোর হয়ে তাঁর পাণিগ্রহণ করলেন! পরে জেনেছি আমার আব্বা কোন গৌরবর্ণের মহিলা নয় বরং গুন বতী, ভদ্রবংশের পরহেজগার নারীর পাণিগ্রহণ করবেন, ট্রেতে সাজানো সুগন্ধি মিঠে জোছনার শরবত-পানি গ্রহণ করবেন।

গ্রামের প্রভাবশালী মদন মিয়া সাহেব আমার নানা আবু সায়ীদ আরবি সাহেব, মুনশি সাহেবের আবেদা পরহেজগার, অণূঢ়া মেয়ের বিবাহের প্রস্তাব দিলেন বাবাকে। আমার বাবা মেয়ের আদ্যপাম্ত জেনে বংশ পরিচয় জেনে বিবাহের প্রস্তুতি নিলেন।কণ্যার এজেন পেয়ে বিবাহ সম্পন্ন হল। আমি আমার মায়ের প্রথম সন্তান, নাড়িছেঁড়া ধন, আন্ধার মানিক চন্দ্র কথন।

আমার শৈশব কেটেছে গ্রামের বাড়ির চৌকাঠে, বাবার প্রতিষ্ঠিত স্কুলে, খারদিয়া পশ্চিম মিয়া পাড়া প্রথমিক বিদ্যালয়ের দু’ক্লাসে শ্রীনগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম ক্লাসে, হাসামদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ ক্লাসে, ফরিদপুর উচ্চবিদ্যালয়ে দশম শ্রেণি পর্যন্ত। উল্লেখ্য আমি স্কুলের সব ক্লাসেই পরীক্ষায় প্রথম বা দ্বিতীয় স্হান অধিকার করতাম। এস.এস.সি’তে তিনটি লেটার সহ প্রথম বিভাগে পাশ করি। এরপর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নে পড়াশোনা করি। উল্লেখ্য আমি এস.এস.সি, এইচ.এস.সি’তে সরকারি বৃত্তি লাভ করি। এম.এস.সি’তে দ্বিতীয় শ্রেণিতে দশম স্হান অধিকার করি।

আমার জন্ম সন ১৯৫৭ ঈ. ঠিক আছে, তবে জন্ম তারিখ ১৩ মার্চ স্কুল সার্টিফিকেট অনুযায়ী সঠিক নয়। কারণ আমি ওই বছরে কার্তিক মাসের কোন এক শুক্রবার ভোরে জন্ম নিয়েছি। আমাদের সব ভাই বোন দের জন্ম তারিখ লেখা খাতাটি হারিয়ে যাওয়ায় এ হিসেবের কিছুটা সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। আমার পরেই জন্ম নেয় আদরের ছোট বোন, আমার খেলার সাথী হামিদা বেগম। এরপর মার কোল জুড়ে পৃথিবীতে আগমন করে আমার দ্বিতীয় ভাই শাহ মোহাম্মদ আসাদ উল্লাহ। ওর জন্ম মাস ছিলো আাষাড়ের ঘন বাদল ধারার, নিপবন ময়ূর নৃত্যের আবাহনে বিমোহিত।

আসাদ হাসামদিয়া হাই স্কুল, ফরিদপুর জেলা স্কুল, সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখা পড়া করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে বিএঅনার্স ও এম.এ পাশ করে কৃতিত্বের সাথে। পরবর্তী এক বোন জন্মের দু’মাস পরে মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে পরলোকে চলে যায়। ওই আদরের বোনটির নাম ছিলো রাশিদা বেগম। তারপর জন্ম নেয় তৃতীয় ভাই শাহ হাবিবুল্লাহ। সে খুব নরম প্রকৃতির। তাকে আব্বা দ্বীনি শিক্ষার জন্য মাদরাসায় ভর্তি করলেন। সে কোরানে হাফেজ এবং এম.এম পাশ। এরপর এক ভাই জন্ম গ্রহন করে এবং মাত্র সাত দিন জীবন কাল পেয়েছিল। তার নাম রাখা হয়েছিল শাহ শহীদুল্লাহ। এরপর জন্ম গ্রহণ করে ফরিদা ইয়াসমিন ও ফাহমিদা ইয়াসমিন চন্দনা। এরা দুজনে ডিগ্রি পাশ করেছে। এরপর দুই ভাই শাহ মোহাম্মদ সাইফ উল্লাহ ও শাহ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ জন্ম গ্রহণ করে। শাহ মোহাম্মদ সাইফ উল্লাহ ১৯৭১ এ স্বাধীনতার দুই দিন আগে ১৪ ডিসেম্বরের উত্তাল দিনে জন্ম গ্রহণ করে। শাহ মোহাম্মদ সাইফ উল্লাহ ও শাহ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ উভয়ই মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করে। এরা সকলেই চাকরি করছে। আসাদ ইতোমধ্যে জনতা ব্যাংক থেকে জি.এম পদে চাকরি রত অবস্থায় অবসর গ্রহণ করে। হাবিব গ্রামের সুলতানিয়া মাদরাসায় সুপার হিসেবে চাকরি করছে। সাইফ এন.টিভি’তে প্রোগ্রাম পরিচালক পদে চাকরি করছে। আব্দুল্লাহ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জি.এম পদে চাকরি করছে। ছোট বোন চন্দনা আমেরিকা প্রবাসী। ফরিদা ক’বছর হল মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে পরলোকে চলে গেছে।

আমি এম.এস.সি পাশ করার পর রাজবাড়ি জেলা শহরে আদর্শ গার্লস কলেজে রসায়নের লেকচারার হিসাবে চাকরি গ্রহণ করি। তখন কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন জনাব আমিন উদ্দিন সাহেব। আমি ফরিদপুর শহর থেকে কলেজে যেতাম। আমিন উদ্দিন নামে আমাদের বাড়ির একজন গরুর রাখাল ছিলেন। সে খুব উদার কর্মঠ ও একটু বোকা বলদা প্রকৃতির মানুষ ছিল। মানুষ হিসেবে সে অন্যদের থেকে অনেক মহত ও দয়াবান ছিল। সে মজনু ভাইজানকে আব্বাজী বলে সম্বোধন করত। আব্বাকে সে হিসেবে দাদাজান বলত। অনেক সময় দ্রুততা করে দাজান বলত আর মাকে বলত দাইজান। আমাদের সে কাকাজান না বলে কাহাজান বলে বড়ো আয়েশ করত। সেই তার কথা মনে পড়ে অধ্যক্ষ আমিনউদ্দীন সাহেবের নিকট থেকে ছুটি নিয়ে বলদা রাখাল আমিনুদ্দির কাছে ফিরে যেতে কোশেশ করলাম। উদ্দেশ্য শুধু আমিনুদ্দিন নয় বরং অনেকটাই আমার বাবা মা। আমি সে বার বাড়িতে গিয়ে আমার শিশু কালের কবিতা লেখার খাতা বের করে পড়তে লাগলাম। তৃতীয় ক্লাসের ছাত্র বয়সেই আমার কবিতা লেখা শুরু। এক দিস্তার সাদা কাগজের খাতা বানিয়ে তাতে অনেক অনেক কবিতা লিখেছিলাম। শৈশবের সেই কবিতার খাতা কি ভাবে যে হারিয়ে ফেলেছি তা আজ আর মনে পড়ছে না। তবে কিছু কবিতার কিছু লাইন এখনো মনের মণিকোঠায় ঝিলিক দিয়ে ওঠে। এই যেমন:
১. বাংলার আমি বাঙালি
আম খেয়ে মুখ রাঙালি।

২. কুমার নদী ছলাৎ ছল
জল টলমল জল টলমল।
ঢেউয়ে নাচে কেরাই নাও
গলই বইসে উড়ুম খাও।

৩.আমরা শক্তি
আমরা বল
সামনে চল
ছাত্র দল।
সামনে চল
শাস্ত্রী দল
আমরা শক্তি
ছাত্র দল।

আমি ইচ্ছে করেই জোর গলায় কবিতাগুলো পাঠ করতাম যাতে পাশের রুম থেকে আব্বা কবিতাগুলো শুনতে পায়। একদিন আব্বা ঠিকই আমার কবিতা পড়া শুনে কড়া স্বরে আমাকে ডাক দিলেন। আব্বা খুব রাশভারি, মেজাজী ও রাগি প্রকৃতির ছিলেন। আবার কখনো শিশুর মত সরল আচরণ করতেন। আমাদের আদর সোহাগ করতেন। স্কুলের তুখোড় ছাত্র ছিলাম বিধায় আমার একটু বাড়তি ভরসা ছিল। আব্বার আদর সোহাগ পাবার একটা সুবর্ণ সুযোগ ছিল। আমি বিড়ালের মত তুলতুলে পায়ে নিঃশব্দে আব্বার পড়ার টেবিলের কাছে তাঁর চেয়ারের সামনে দাড়ালাম। আব্বা আমাকে বল্লেন, এ গুলো কার কবিতা পড়ছিস? এমন লেখা তো আগে শুনিনি, পড়িনি। তুই কার লেখা পড়ছিস? আমি বলেছিলাম, আমি লিখেছি। তিনি রেগে ভেংচি করে বল্লেন, মিথ্যা কথা বলার জায়গা পাসনে বুঝি। তুই এত ভালো লিখতে পারলি কি ভাবে? যাও লেখা পড়া কর ভালোকরে। তিনি সেদিন বুঝেছিলেন এ কবিতা আমারই লেখা কিন্তু কাব্য করতে গিয়ে যাতে লেখা পড়ার ক্ষতি না হয় এ তারই আগাম সতর্কবার্তা। অথচ অন্য সময়ে তিনি বারবার শাহিদা আপার প্রশংসা করতেন। আপা কবিতা লিখতেন। বিভিন্ন সাহিত্য ম্যাগাজিনে তাঁর যে সব লেখা প্রকাশ পেত তা তিনি আব্বাকে পড়ার জন্য গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতেন। আব্বা সে গুলো বারবার পড়তেন আর আমারই সামনে গৌরব করে সেগুলো অন্যদের পাঠ করে শোনাতেন। আব্বার মেয়ের কবিতা পাঠ করে শোনানোর নিয়মিত শ্রোতা ছিলেন চাচিআম্মা, চরপাড়ার আবুল কালাম, মানিক বিশ্বাস, আলোমিয়া, কাজীপাড়ার কাজীদের কেউ কেউ। শ্রীনগরের ডাক্তার মোকন্দলাল সাহাসহ আরও অনেকে। আমার আব্বা সাহিত্যের সমজদার পাঠক ছিলেন। প্রখর স্মৃতি শক্তি ছিলো তাঁর। বাংলা ইংরেজি সাহিত্যের অনেক নাম করা কবির প্রচুর কবিতা তাঁর মুখস্ত ছিলো। তিনি বিভিন্ন ঘরোয়া আড্ডায়, মিটিং এ কখনো বা খাবার টেবিলে বসেই আলোচনা প্রসঙ্গে ইংরেজি কবিতা গড়গড় করে বলে যেতেন। যেমন:
১. Like as the waves make towards rhe pebbled shore, / So do our minutes hasten to their end,
Each changing place with what which goes before, /,In sequent toil all forwards do contend. (William Shakespeare)

  1. When I consider how my light is spent,
    Ere half my days,in this dark World and wide,
    And that one Talent Which is death to hide
    Lodg,d with me useless, through soul more bent.(John Milton)
  2. The poetry of earth is never dead :
    When all the birds are faint with the hot sun,
    And hide in cooling trees,a voice will run
    From hedge to hedge about the new-mown mead,(john keats)
  3. Music when soft voices die,
    Vibrates in the memory-
    Odour,when sweet violets sicken,
    Live within the sense they quicken.
    (P.b.Shelley)

আজ অনেক কথাই মনে পড়ছে। কিন্তু সব হয়ত বলার স্পেস হবে না। আব্বার মত কবিতা মুখস্থ করার জেহেন আমার নেই তবে প্রয়োজনে কবিতা সৃষ্টি করে পরিস্হিতি সামাল দিতে পারি। আল্লাহর অশেষ কৃপায় যেকোনো পরিবেশে আমি কবিতা লিখতে পারি। এস.এস.সি পরীক্ষার সময় অনেক বই মুখস্থ করেছি। আবার অনেক বিষয় মনের মাধুরি মিশিয়ে লিখেছি। আমার বাবা ইংরেজি শিক্ষিত লোক হলেও দারুণ পরহেজগার ছিলেন। আমি তাঁকে কোন নামাজ কাজা করতে দেখিনি। তিনি তাহাজ্জুদগোজার ছিলেন। তাহাজ্জুদ নামাজের অযু দিয়ে টানা চল্লিশ বছর ফজরের নামাজ পড়তে দেখেছি। তিনি শেষ রাতে নফল নামাজ শেষে জিকির আজকার করতেন। ঘরের মেঝেতে জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজে দাড়িয়ে যেতেন। অনেক আরবি-ফারসি বয়েত সুর করে পড়তেন। আমি ঘুম থেকে জেগে আব্বার জিকির ও সুর করা হামদ শুনে মুগ্ধ হয়ে যেতাম। এক অনির্বচনীয় আনন্দলোকে উড়ে বেড়াতাম। এখনো আমার কানে বাজে একটি মধুর হামদ। জানি না কে এর রচয়িতা। আব্বাকে এ বিষয়ে কখনো জিজ্ঞেস করিনি। হামদটির কয়েক চরন:
হাইয়াল বারী কুদরতি নূর
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু
আন্তাল বারী,
আন্তাল হাদী
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু।

আমি পিতার ঋন কখনো শোধ করতে পারবো না তবে পিতার ওফাতের পর তাকে নিয়ে একটি কবিতা লিখেছি। কবিতাটি আমার ছড়াগ্রন্থ ছোট্ট পাখি চন্দনা তে রয়েছে। কবিতাটি এখানে তুলে ধরছি:
আমার বাবা
আমার বাবা শ্রেষ্ঠতম বাবার তুল্য বাবা
বাবা আমার দিল মোহরে, আমার মনের কাবা।
চলন বলন কথা বার্তায় কর্ম এবং সাধনে
জনপ্রিয় ছিলেন তিনি ভালোবাসার বাধনে।
রাজরক্ত ছিল তাহার দিল দিগরি অন্তরে
দেখলে যে কেউ সালাম ঠোকে অন্তহীন এক অন্তরে।
গরীব দুখি দীন মুজুরের ছিলেন সবার বাতিঘর
সবার জন্য সমান ছিলেন কি বা আপন কি বা পর।
অমিত তেজ বীর সাহসী ছিলেন উচ্চশির
জুলুমকারীর প্রতি ছিলেন বক্ষভেদা তীর।
খোদার রাহে রাত্রভরে ঝরত তাহার অশ্রু নীর
তাহাজ্জদের ডাহুক ছিলেন দরবেশ অলি আল্লাহ পীর।