লাল জামা ও একটি করুণ মৃত্যু

আমার ভাই বোনদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট্ট ও বড়ো আদরের বোন ছিলো মিষ্টি। ওর ডাক নাম মিষ্টি। খুব সুন্দর চেহারা মায়বীও মধুর ছিলো তার মুখাবয়ব। যে কেউ দেখলে তাকে আদর সোহাগ না করে যেতে পারতোনা। ওর পুরো নাম মাহবুবা জেসমিন মিষ্টি। আমি চিটাগাং যাচ্ছি পনেরো দিনের জন্য। তাই ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে মা বাবা ও ছোট ভাই বোনদের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম।তখন আমি বি.এস.সি অনার্স ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং করা আমাদের জন্য বাধ্যতা মূলক ছিলো। ঢা.বি. রসায়নের ছাত্ররা এ বিষয়ে বেশ সুযোগ পেতো। এই ট্রেনিংএ ভালো হোটেলে থাকা খাওয়া ছিলো আমাদের জন্য ফ্রী। তার ওপর ট্রেনিং শেষে ছিলো টাকা কড়ির সম্মাননা প্যকেজ।

আমি বাড়িতে এসে সবাইকে বল্লাম। ছোট ভাই বোনেরা খুব খুশি। কার জন্য কি কি আনতে হবে আমি বল্লাম প্রিয় ভাই বোনদের। কেউ তেমন বায়না না ধরলেও আমার ছোট্ট প্রাণপাখিটা, আমার অতি আদরের ছোট্ট বোন মিষ্টি আমাকে অত্যন্ত আদুরে গলায় বল্ল, বড়ো ভাইয়া আমার জন্য লাল জামা আনবে। বোনটিকে আদর করে কপালে চুমু দিয়ে বলেছিলাম, আপুমণি তোমার জন্য অবশ্যই সুন্দর লালজামা কিনে আনবো। মিষ্টির বয়স তখন তিন চার বছর হবে। বোনটি আমার অত্যন্ত শুদ্ধ ভাষায় আদুরে কন্ঠে সোহাগ মাখিয়ে কথা বলতো। অতটুকু মেয়ে খুব তাজিমের সাথে চলাফেরা করতো। আর দশটা ছেলেমেয়ের মতো সে দুষ্টমি করতো না। কখনো অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতোনা। তিন/চার বছরের বাচ্চাদের মতো সে কখনো খালি গায়ে থাকতোনা। সে মেয়ে শিশু। ছেলেশিশু নয়। তার এ বুঝটি ছিলো। সে টয়লেটে যেতে আমার মা বা বড়ো বোনদের বেশি পছন্দ করতো। কখনো ভাইয়াদের বা মুরব্বি পুরুষদের এড়িয়ে চলতো। মিষ্টি ছোট্ট বেলা থেকেই পরদা পুষিদা বিষয়ে সচেতন ছিলো। অথচ মা, আব্বা বা আমরা তাকে এ বিষয়ে অতটা সতর্ক করিনি। সে নিজে থেকেই খুব লাজুক এবং বড়ো মেয়েরা যেমন ছেলেদের থেকে আলাদা থাকতে পছন্দ করে ও তেমন ছিলো। আমার আব্বা এবং বড়ো মামা ওর মধ্যে আলাদা সচেতনতা দেখে বড়ো উতসাহ বোধ করতেন। মা বলেছেন, তোর বড়ো মামার আশংকা ছিলো এই মেয়ে দরবেশ প্রকৃতির এ মেয়ে আমাদের
পরিবারে খাপখাওয়াতে পারবে না। ও তোমাদের সংসারে বেশি দিন টিকবেনা বলে মাকে জানিছিলো।

বাড়ি থেকে বিদায় নেওয়ার প্রায় বিশ/বাইশ দিন পর আমি চিটাগাং থেকে ফিরে আসি। ছোট ভাই বোন দের জন্য কার কার কি কি এনেছিলাম তা আজ সাইত্রিশ বছর পর মনে নেই। কিন্তু আমার আদরের সোনা বু, মিষ্টির জন্য বেশ দামিলাল জামা, পুতিরমালা, ঝিনুক, রঙ বেরঙের সমুদ্র সামুক, এনেছিলাম। বাড়িতে প্রথমে দোতলা ঘরের পশ্চিম দরজা দিয়ে ঢুকেছিলাম। ঘরে পা রাখতেই আমার বুকটা ধক করে বেদনার আগুনে জ্বলে উঠলো।

আমি ঘরে ঢুকলে সোনাবোনটি বড়ো ভাইয়া বড়ো ভাইয়া বলে দৌড়ে আসে কিন্তু আজ বাড়িটা এত শুনশান কেন।আমি হন্যে হয়ে ঘরের এ রুম ও রুম করে চিত্কার করে বল্লাম, আমার দাদু, সোনা বোন মিষ্টি কোথায়? ও আল্লাহ আমরা মিষ্টি গেল কোথায়? ও মা তোমার মুখ আাচলে লুকানো কেন? তোমার কি হয়েছে? আমার মিষ্টি কোথায়? ও আল্লাহ আমার বুকটা পাষাণ পাথরে চেপে ধরছে? আমার দম বন্ধ হয়ে যায়। বুক চাপড়াতে চাপড়াতে ওর জন্য কিনে আনা লাল জামা দিয়ে বুক চেপে ধরলাম। না কেযেনো আমার বুকে কাতরা বসিয়ে দিয়েছে। বুঝলাম মিষ্টি নেই কোন এক দূর্ঘটনায় ও এ নিঠুর পৃথিবী ত্যাগ করেছে। মা আর নিজেকে সামলাতে পারছেনা। আমার বুক ফাটা চিত্কারে মা কোকিয়ে কোকিয়ে কেঁদে উঠলো। আর বলতে লাগলো,আমার বুকের মানিকরে আল্লাহ কেড়ে নিছে। ও আল্লাহ আল্লারে আমি এখন কি করবো। আমার বড়ো ছেলেটা বুঝি কানতে কানতে মইরা যাবে। ও আল্লাহ ও আল্লাহ।

মেনিনজাইটিস রোগে আমার আদরের সোনা বোন মিষ্টি পৃথিবী থেকে অত্যন্ত করুণ ভাবে চলে গিয়েছিল। তার মৃত্যুর দশ বারো দিন পর আমি বাড়িতে এসে জানতে পারলাম। আমিতো হঠাৎ বৈশাখী ঝড়ের বজ্জ্রাঘাতের মতো ওর মৃত্যুর শোকে দগ্ধীভুত হচ্ছিলাম। কিন্তু বাড়ির সবাই ওর মৃত্যুশোকে বিহ্বল, বিমূঢ়, বিদগ্ধ হচ্ছিল ওর মৃত্যুর পর থেকে প্রায় দশ বারো দিন পর্যন্ত অমবরত। এমনকি আমার আব্বা যিনি এ বিষয়ে যথেষ্ট ধৈর্যশীল তিনিও অনবরত কেঁদে চলেছেন। ওর কবরের কাছে আব্বা প্রতি দিন যেয়ে কেঁদে কেঁদে পরম প্রভুর দরবারে মোনাজাত করেছেন। মা ওর পরিহিত সব জামা কাপড় আলাদা ট্রাংকে পরম যত্নের সাথে রেখে দিয়ে বার বার খুলে দেখেন প্রিয় কণ্যার স্মৃতি স্মারক।

এই চল্লিশ বছরেও মা তার প্রিয় কন্যার জামা কাপড় ট্রাংকের ভেতরে পরম মমতায় রেখে দিয়েছেন। এখনও
মনে হলে ওর জামা খুলে নাক দিয়ে শুকে ঘ্রাণ গ্রহণ করেন। মিষ্টিকে কবর দেওয়া হয়েছিল আমাদের পুরনো বাড়ির ভিটেয় খালেক চাচার কবরের পাশে। আমি যে কদিন বাড়িতে ছিলাম তার প্রতি দিনই মিষ্টি ছোট্ট বোনটির কবরের পাশে গিয়ে কেঁদে কেঁদে আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করেছি। বুকে বোন হারা বেদনার পাষাণ পাথরের চাপ জেঁকে বসেছিল। সোনা মণিটাকে মৃত্যুর সময় দেখতে পাইনি। ওকে আদর করে চোখের বেদনার অশ্রু দিয়ে মেখে দিতে পারিনি। কবরের মাটিতে শুইয়ে দেওয়ার আগে সেই মাটির বিছানায় আমার হাত বুলিয়ে দিতে পারিনি। কবরের ওপর মাটির পাপড়ি ছড়িয়ে দিতে পারিনি। কবরের চারপাশে ফুলের চারা লাগাতে পারিনি। ওতো মাছুম বাচ্চা বেগুনাহ। আমি কেবল আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করেছি, ও প্রেমের প্রভু, ও দরদী স্রষ্টা আমার, আমার দাদুমণি, আমার কলিজার টুকরো ছোট্ট বোনটি যার জন্য আমার বুকে দরদের সমুদ্র সৃষ্টি হয়েছে তা তো তুমিই সৃষ্টি করেছো। ও প্রভু আমার, ছোট্টসোনা বোন মাহবুবা জেসমিন মিষ্টিকে তো তুমি জান্নাতুল ফেরদৌস দান করবে- যেভাবে শিশুদের তুমি জান্নাত দান করবে।এ টা তোমার প্রতিশ্রুতি। আমার ছোট্ট বোনটির আবদার মতো ওর জন্য একটি লাল জামা কিনে এনেছিলাম, তা আমি ওকে পৃথিবীতে উপহার দিতে পারিনি। আমাকে একটু সুযোগ দিও দয়াল প্রভু, আমি যেন বেহেশতে গিয়ে ওকে লাল জামাটা পরিয়ে দিতে পারি। ওকে বুকে জড়িয়ে একটু আদর করবো, আল্লাহ। আমাকে সুযোগ দিও। আমি নবী প্রেমিক, আল্লাহ প্রেমিক, আমি তোমার ও তোমার বন্ধু হযরত মোহাম্মদ সা.এর ভালোবাসা চাই। আমার আর কিছুর দরকার নেই। আমি আমার বোনটিকে বেহেশতের মধ্যে যত কাল ইচ্ছে আদর সোহাগ করতে চাই। আমার বুকের ভেতর ওর জন্য একটা হাহাকার নিরবে নিঃশব্দে চিতকার করছে। আমার বুকে ভাতৃস্নেহের অঙ্গার জ্বলছে। তুমি আমার আকুতি কবুল কর। মিষ্টিকে নিয়ে বেদনার কাছিদা লিখতে চেয়েছি কিন্তু আজও আমার বুকের ব্যথার নদী পাথর হয়ে আছে।

মাহবুবা, মাহবুবা মিষ্টি বোন আমার দরোজা খোল
আমি আসছি জান্নাতের পশ্চিম দরজায়,
তুই কি ঘুমিয়ে আসিছ সোনা বোন,
এই তো চন্দ্র বোনের কপাট খুলে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ছি
তোকে যে অনেক অনেক বছর দেখিনা,
তুই কি বড়ো ভাইয়া ডাকে আমার বুকের সমুদ্রে তরঙ্গপাত করবিনা,
তুই কি খিল খিলিয়ে হেসে আমাকে উদাস বাউল
করবিনা?
বোন তোর জন্য সেই লাল জামা নিয়ে এসেছি
তুই পরে দেখ কি সুন্দর মানাবে তোকে,
বোন, আমিকি তোকে কখনো ভুলতে পারি?
দেখ, আমি কক্সবাজারের সেরা দোকান থেকে পছন্দ মতো সুন্দর লাল মোরগের ঝুটির মতন,
কিম্বা মোরগবেলে ফুলের মতো টকটকে লাল কামিজ কিনে এনেছি,
বোন, বাড়িতে এসে এ ঘরে ও ঘরে বড়ো দোতলা ঘরের
প্রতিটি রুমে প্রতিটি পঙক্তিতে তোকে খুঁজেছি,
মাত্রাবৃত্ত, স্বরবৃত্ত, অক্ষর বৃত্তের প্রতি বর্ণে বর্ণে তোকে
পাগলের মতো খুঁজেছি,
বুক চাপড়ে চাপড়ে অক্ষরের সুগন্ধি চিপড়ে নিঙড়ে
আমি সন্ধ্যক্ষর সৃষ্টি করতে চেয়েছি,
নতুন মাত্রার কাছিদা লিখতে চেয়েছি,
অবশেষে চল্লিশ বছর পর গদ্যের অমিল এলোমেলো পথে
তোকে খুঁজতে খুঁজতে এই জান্নাতের দরজায় কড়া নাড়ছি,
তা প্রায় কয়েক যুগতো হবে!

আমি জানি পরম প্রভু তোর ইচ্ছে পুরনে বাবা মাকে
তোর কাছেই বসবাসের সুযোগ করে দেবেন।
তোর কোন অপূর্ণ ইচ্ছে অপূর্ণ রাখবেন না।
তুই তোর বড়ো ভাইয়ার কাছে যে লাল জামাটি বায়না
ধরেছিলি তা আমি আমৃত্যু ধারণ করেছি তোকে
পরিয়ে দেবো, সাজিয়ে দেবো মনের মাধুরি মিশিয়ে!
তুই পরম প্রভুকে বলবি তোর ভাইয়ার কিনে আনা
সেই লাল জামাটি তার হাতেই পরিয়ে দিতে,
আমি অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে বিশীর্ণ বিদীর্ণ হয়ে
গেছি, আমার বুকের ভেতর বেদনার রাজহাস
আমার বুকের মধ্যে ভিসুভিয়াসের অগ্নি পাথর,
আমি চিতকার করে কাঁদতে কাঁদতে এখন নৈঃশব্দের
ভাঙা বাঁশী, একটু দরজা খোল বোন
দরজা খোল, দরজা খোল, আমি জান্নাতের সিংহ দরজায় দাড়িয়ে আছি
প্রভুর রুমাল খুল্লে চাবিকাঠি পেয়ে যাবি।