উচ্চ শিক্ষার সিড়ি : ভর্তিযুদ্ধ

আমি ১৯৭৬ সনে ফরিদপুর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে আই.এস.সি’তে ঢাকা বোর্ডে বোর্ডবৃত্তি পেয়ে পাশ করেছি। এর পর উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি পরীক্ষার অপেক্ষা করেছি প্রায় দু’বছর। তখনকার শিক্ষা মন্ত্রী সম্ভবত আবুল ফজল সাহেবের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের জন্য আমার শিক্ষা জীবন থেকে একটি বছর ঝরে গেছে। ১৯৭৬ এবং ১৯৭৭ সনের পাশ করা এইচ.এস.সি. দু’ব্যাচকে একত্রিত করে উচ্চতর শিক্ষা বর্ষ শুরু করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। আমাদের এই দু ব্যাচকে একই সংখ্যক আসনে ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রতিদ্বন্দিতা করতে হয়েছে। এর জন্য ভর্তি পরীক্ষার কঠিন লড়াই করতে হয়েছে আমাকে।

আমি মেডিকেলে এবং ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলাম। ঢাকা মেডিকেলে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা, দর্শন, বোটানি, জুয়োলজী এবং রসায়ন বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। আমি বাংলা বিভাগে প্রথম, দর্শন বিভাগে দ্বিতীয়, জুয়োলজী বিভাগে প্রথম, বোটানিতে প্রথম এবং রসায়ন বিভাগে সতেরোতম স্হান অধিকার করেছিলাম। আমার পিঠাপিঠি বোন হামিদার বিয়েতে বাড়িতে গিয়েছিলাম। ফলে এর মধ্যে আমি, বাংলা বা জুয়োলজী বা বোটানিতে ভর্তি হতে পারিনি। বাংলা বিভাগের স্যারেরা আমাকে জানালেন, তোমার রেজাল্ট ভালো তুমি যদিও বাংলায় ফার্স্ট হয়েছো, তুমি বিঞ্জান বিভাগে ভর্তি হও। তোমাকে বাংলায় ভর্তি করা হবে না। ওয়েটিং লিস্টের প্রার্থীরা সিরিয়ালে চলে এসেছে। ফলে বাংলায় ভর্তি হতে আর পীড়াপীড়ি করিনি। বোটানি ও জুয়োলজীতে ওয়েটিং লিস্টের প্রার্থীরা চলে আসায় আমার ও সব বিভাগের কোনটিতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ হয়নি। প্রাণীবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান আনোয়ারা বেগম আমাকে রাগত স্বরে বল্লেন, তুমি ফার্স্ট হয়েছো কিন্তু একমাস পরে ভর্তি হতে এসেছো কেন? ভর্তি ফর্ম সব বিতরণ করা হয়ে গেছে।

প্রাণহীন প্রাণীর ছোবলে তাই প্রাণী বিজ্ঞান বিভাগে এই প্রাণময় প্রাণীর প্রানপাত হলে না। ফিরে গেলাম দর্শনের দরজায়। এ বিভাগে দ্বিতীয় স্হান অধিকার করেছি। ফর্ম তুলতে গেলে চেয়ারম্যান স্যারের মুখোমুখি হতে হলো। তিনি বল্লেন, তুমিকি দর্শনে ভর্তি হবে নাকি বিঞ্জান বিভাগে ভর্তি হবে ? ভেবে চিন্তে এসো, আজ তোমাকে ফর্ম দেওয়া হবে না। ক’দিন পরে এসো। আমি দুদিন পরে গিয়ে দর্শন বিভাগে ভর্তি ফর্ম তুলে আনলাম কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভর্তি হলাম না।

ও দিকে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পেলাম না। শেষ পর্যন্ত রসায়ন বিভাগে সতেরো তম স্হান নিয়ে বি.এস.সি অনার্সে ভর্তি হতে হলো। আমার সিলেকশনে রসায়ন ছিলো, বোটানি ও জুয়োলজীর পরে। রসায়ন বিভাগে বি.এস.সি. অনার্সের প্রথম বর্ষে ভর্তির সিট ছিলো মাত্র ৫০টি। আমাদের সাথে ভর্তি হয়েছিল ঢাকা বোর্ডে এস.এস.সি ও এইচ.এস.সি.তে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্হান অধিকারী লুতফর রহমান খোন্দকার। সে উপমহাদেশের বিশিষ্ট রসায়ন বিঞ্জানী প্রফেসর ড. মোকাররম হোসেন খোন্দকার এর দ্বিতীয় পুত্র। আরো ভর্তি হয়েছিল ঢাকা বোর্ডে চতুর্থ স্হান অধিকারী তৌকির হোসেন।

এখনকার মতো ক, খ, গ, ঘ ইউনিটে ভাগ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা হতো না। বিজ্ঞান, কলা ও বানিজ্য অনুষদে ভিন্ন ভিন্ন পরীক্ষা হতো। এখন ক ইউনিট যদি বিজ্ঞান বিভাগের জন্য নির্ধারিত হয় তবে বিজ্ঞান অনুষদের বিভিন্ন বিভাগে ভর্তির জন্য চয়েস অনুপাতে সিট ভাগ করা হয়। আমাদের সময় রসায়ন, পদার্থ, ফলিত পদার্থ, ভেষজ রসায়ন, প্রান রসায়ন, প্রাণীবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগে ভর্তি হতে আলাদা আলাদা পরীক্ষা দিতে হতো। রসায়ন বিভাগে ৫০টি সিটে ভর্তি হওয়ার জন্য আমরা তখন ৪০০০ ছাত্র ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিলাম। প্রথম হয়েছিল ঢাকা বোর্ডের এস.এস.সি. ও এইচ.এস.সি. পরীক্ষায় যে প্রথম হয়েছিল সেই লুতফর রহমান খোন্দকার। আমি সতেরোতম স্হান অধিকার করে ভর্তি হয়েছিলাম।

আমাদের প্রথম ক্লাস হয়েছিল CL-এ, অর্থাৎ রসায়ন বিভাগের মূল ভবনের দোতলায় লেকচার থিয়েটারে। রুমের সিট সজ্জা ছিলো অর্ধাবৃত্তাকার গ্যালারীতে সুজ্জিত বেঞ্চে, ফুটবল খেলার মাঠের গ্যালারীর মতো। অর্ধাবৃত্তাকার গ্যালারীর সামনে মেঝে থেকে প্রায় একফুট উচু বড়ো চৌকি বা মঞ্চে একটি বড়ো টেবিল এবং চেয়ার ছিলো স্যারদের জন্য। আর তার পিছনে রুমের দেয়ালে ফিক্সড ব্লাকবোর্ড ছিলো। আর সেটির দৈর্ঘ্য ছিলো প্রায় বিশ/পচিশ ফিট। প্রত্যেক প্রিয়ডে স্যারেরা রোল কল করতো ঝড়ের গতিতে। দ্রুত অর্থাৎ পাচ মিনিটের মধ্যে সবার রোল কল করতেন স্যারেরা।কিন্তু কি ভাবে? পরে বুঝেছি এই রোল কলের মোজেজা।স্যারেরা সবার নাম দ্রুত বেগে বলে যেতেন, যার নাম ডাকলে সাড়া পাওয়া যেতো না, অর্থাৎ এবসেন্ট থাকতো কেবল তার নামের ঘরে শূন্য বা A লিখতেন এবং ক্লাস শেষে নিজ রুমে গিয়ে উপস্থিত সবার নামের ঘরে p বা প্রেজেন্ট চিহ্ন বসিয়ে দিতেন। এ কাজটি কেবল লেকচারের সময় দীর্ঘায়িত করার জন্য বা রোল কলে সময় অপচয় না করার জন্য করতেন। রসায়ন বিভাগের অধিকাংশ স্যারেরা ক্লাসে ঢুকে বেশী কথা না বলে গট৷ গট করে ইংরেজিতে বক্তৃতা দিয়ে যেতেন। লেকচারের সময় ব্লাকবোর্ড ব্যবহার করতেন কিন্তু প্রায় শিক্ষকই কোন রিপিটেশন ছাড়া ইংলিশম্যানের মতো বক্তৃতা করতেন। ছাত্ররা তার বক্তব্য বুঝতে পারছে কিনা তার তোয়াক্কা করতেন না অনেকেই। তারা ধরেই নিয়েছিলেন রসায়নের ছাত্ররা প্রচন্ড মেধাবী এবং ইংরেজি তাদের মাছ ভাত।

আমাদের ৫০ জনের রসায়ন পরিবার শেষ পর্যন্ত ২৭ জনে ঠেকেছিলো। এদের মধ্যে দু’জন লুতফর রহমান খোন্দকার ও তৌকির হোসেন ছয় মাস পর আমেরিকার বড়ো দুটো ইউনিভার্সিটিতে বৃত্তি নিয়ে চলে গিয়েছিল। প্রায় দশ জন বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে এবং বুয়েটে চলে গিয়েছিল ওয়েটিং লিস্টের সিরিয়ালে। কেউ কেউ রসায়নের জটিল প্যাঁচে পড়ে ডিপার্টমেন্ট ছেড়ে চলেগিয়েছিলো। রসায়নের তেজসক্রিয়ায় তারা তেষ্টাতে পারেনি।

আমাদের কৌতুহল ছিলো লুতফর রহমান খোন্দকার ওরফে জিটাকে নিয়ে।জিটা ওর ডাক নাম। এ নামটি রসায়নের জিটা-পটেনশিয়ালকে বিখ্যাত করার জন্য বোধহয় তার বাবা বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত রসায়ন বিঞ্জানী প্রফেসর ড. মোকাররম হোসেন খোন্দকার তার মেধাবী পুত্রের জন্য নির্ধারণ করেছিলেন। জিটা ঢাকা বোর্ডে এস.এস.সি. এবং এইচ.এস.সি.তে শতকরা ৯৬% নম্বর পেয়ে উভয় পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে প্রথম হয়েছিল। আমরা ওকে প্রশ্ন করেছিলাম তুই ডাক্তারী, ইন্জিনিয়ারিং না পড়ে কেনো রসায়ন বিভাগে ভর্তি হয়েছিস। ও বলেছিল, আমার বাবা রসায়নের বোরন কেমিস্ট্রির ওপর নতুন কাজ করেছেন কিন্তু তা সমাপন করার আগেই তিনি মৃত্যু বরন করেন। আমি আমার বাবার অসমাপ্ত কাজগুলো শেষ করার জন্য রসায়নে ভর্তি হয়েছি।

আগেই উল্লেখ করেছি আমরা ১৯৭৬ এবং ১৯৭৭ এর ব্যাচ একত্রে একই শিক্ষা বর্ষ মেনে নিয়ে ভর্তি হতে বাধ্য হয়েছি। ১৯৭৭ ব্যাচের ঢাকা বোর্ডের ফার্স্ট বয় টিটকারি করে বলেছিলো, লুতফর রহমান খোন্দকার আমার সাথে কমপিটিশনে হেরে যাবে বলে ও মেডিকেলে বা বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষা দিতে চাচ্ছে না। লুতফর রহমান খোন্দকার এ কথা শুনে এস্পেশাল পারমিশন নিয়ে ভর্তি ফর্ম নির্ধারিত তারিখে জমা না দিয়েও উভয় পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে এবং দুটোতেই সে সবাইকে টপকে শীর্ষে চলে যায়। ফার্স্ট হয়ে যায় কিন্তু ওসবে ভর্তি না হয়ে ৭৭ ব্যাচের ফার্স্ট বয়কে উপযুক্ত জবাব দিয়ে চলে আসে বীরের মতো রসায়ন বিভাগে ভর্তি হতে। আমাদের কোনো কোনো শিক্ষক ক্লাসে এসে লুতফর রহমান খোন্দকারকে উদ্দেশ্য করে আমাদেরকে পরম তৃপ্তির সাথে বলতেন, দেখ ছেলে মেয়েরা তোমাদের সাথে এমন এক ছাত্র ভর্তি হয়েছে যার নিকট থেকে আমাদের অনেক কিছু শিখতে হয়। তোমরা বড়ো ভাগ্যবান। মন দিয়ে রসায়ন পড়বে, ওর কাছ থেকে শিখবে। জিটা ক্লাসের ব্যাক বেঞ্চে বসতো। আর নিজস্ব কি সব পড়তো এবং বড়ো একটা ক্যালকুলেটরে কি সব হিসেব নিকেশ করতো।

একদিন আমি ওকে বলেছিলাম দোস্ত, তুই পিছনে বসিস ক্যান? তুই তো দেশের সেরা ছাত্র। সামনে বসবি।ও বলেছিলো আমি এখন থার্ড ইয়ারের রসায়ন পড়ছি। তোরা স্যারের লেকচার মন দিয়ে শোন। আমার ও সব অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। আমার চক্ষু চড়ক গাছ, বলে কি ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়ে আমার প্রানান্তকর কসরত করে যাচ্ছি রসায়নের রান্না বাড়ায় আর ওর ও সব খতম। তৃতীয় বর্ষের কেতাব পড়ছে জিটা-আইনস্টাইন!

ভুল বলিনি সত্যেন বোস ও আইনস্টাইন বোস পার্টিক্যাল বোসন আবিস্কার করেছে। বোস-আইন্সটাইন থিয়োরি রয়েছে। আমরা রসায়নে পড়েছি। বাঙালি সত্যেন বোস পারলে জিটা কেন পারবে না। বাঙালি বিঞ্জানী জি.এন ইসলাম বা জামাল নজরুল ইসলাম বিগ ব্যাং এর উন্নত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি Big Rap থিয়োরি আবিষ্কার করেছেন। আমেরিকা, বৃটেনসহ প্রথম বিশ্বের নাম করা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার গবেষণা গ্রন্থ ও প্রবন্ধ পাঠ দান করানো হয়।