ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা : পক্ষ ও প্রতিপক্ষ

খুব সহজ ছিলো না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার কাজ। এ জন্য দেশীয় কিছু হিন্দু মুসলিম নেতৃবৃন্দ বিরোধিতা করেছেন। বিরোধিতাকারীদের অন্যতম সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, মওলানা আকরম খাঁ, আবদুর রসূল প্রমূখ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার জন্য নবাব সলীমুল্লাহ, নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, আবুল কাশেম ফজলুল হক প্রমূখ মুসলিম নেতৃবৃন্দ প্রানান্তকর প্রচেষ্টা করেছেন। উপমহাদেশের মুসলিম নেতৃবৃন্দের সাথে পরামর্শ করে ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ দিল্লীর দরবারে ১৯১১ সনের ২০ ডিসেম্বর লর্ড হার্ডিঞ্জের কাছে বাংলার মুসলমানদের পক্ষ থেকে ৮ দফা দাবি পেশ করেন– যার অন্যতম ছিলো মুসলমানদের উচ্চশিক্ষা খাতে বিশেষ অনুদানের কথা। ১৯১১ সনের পহেলা নভেম্বর দিল্লীর দরবারে আকস্মিক ঘোষণায় ১২ ডিসেম্বর বঙ্গভঙ্গ রদের তারিখ ঠিকের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত কোনো কোনো রাজনৈতিক ইংরেজদের “রাজকীয় ক্ষতিপূরণ” হিসেবে বিবেচনা করেন। এর কয়েক মাস আগে অবশ্য ১৯১১ সনের ১৯ আগষ্ট আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি ওঠে। লর্ড হেয়ারের বিদায় ও লর্ড চার্লস বেইলির দায়িত্ব গ্রহণ কালের এক অনুষ্ঠানে পৃথক দুটি মানপত্রে নবাব সলীমুল্লাহ ও নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার দাবি জানান।

বড় লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ ১৯১২ সনের ৩১ জানুয়ারি ঢাকা সফর করেন। তখন নবাব সলীমুল্লাহের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দলের প্রস্তাব ছিলো আগেকার দাবি দাওয়াসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়। ৩১ জানুয়ারি দাবি পেশের দুই দিন পর ২ ফেব্রুয়ারী সরকার এক ইশতেহারের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করেন। এরপর ৪ এপ্রিল বৃটিশ সরকার চূড়ান্ত ভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব অনুমোদন করেন। ২৭ মে ব্যারিস্টার রবার্ট নাথানের সভাপতিত্বে ১৪ সদস্য বিশিষ্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি গঠন হয়। এ কমিটিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই কমিটির প্রধান ছিলেন নাথান। এই কমিটির ৬ জন ছিলো বৃটিশ, ৪ জন হিন্দু ও ৪ জন মুসলিম। এটি নাথান কমিটি হিসেবে চিহ্নিত হয়। নাথান কমিটির আরও ২৫টি সাব-কমিটি গঠন হয়। এ সব কমিটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন কাজ করতে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব প্রকাশ করার সাথে সাথে কোলকাতা ও ঢাকার বর্নহিন্দু নেতৃবৃন্দ এর বিরোধিতা শুরু করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তের বিপক্ষে তারা ৫ ফেব্রুয়ারী ঢাকায়, ১০ ফেব্রুয়ারী নারায়নগঞ্জ ও ফরিদপুর এবং ১১ ফেব্রুয়ারী মোমেনশাহীতে সভা করে। ৫ ও ১০ ফেব্রুয়ারী ঢাকা উকিল লাইব্রেরি হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার বিপক্ষে দুটি সভা করা হয়। ত্রৈলোক্যনাথ বসু এই সভাগুলোর সভাপতিত্ব করেন। সভার গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয়- “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে শিক্ষার অবনতি হবে। তাই প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন দরকার নাই।”

২৬ মার্চ কলকাতা টাউন হলে ব্যারিস্টার বোমকেশ চক্রবর্তীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সভায় গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয়- “কোনো স্কুল-কলেজের ওপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অধিকার থাকতে পারবে না এবং পূর্ব বঙ্গে কোনো শিক্ষা কর্মসূচিও থাকতে পারবে না।” বিপিনচন্দ্র পাল বলেন: “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অশিক্ষিত ও কৃষকবহুল পূর্ব-বঙ্গের শিক্ষা দানের কাজে নিয়োজিত থাকতে হবে। পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম বঙ্গের জনসাধারণের শিক্ষানীতি ও মেধার মধ্যে কোন সামঞ্জস্য থাকবে না।”

লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা সফর শেষে কলকাতা শহরে গেলে ১৯১২ সনের ১৬ ফেব্রুয়ারী ড. রাস বিহারী ঘোষের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল তার সাথে দেখা করে একটি স্মারক লিপি পেশ করে, যাতে বলা হয়- “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হবে অভ্যন্তরীণভাবে বঙ্গভঙ্গের সমতূল্য, তাছাড়া পূর্ব বঙ্গের মুসলমানেরা প্রধানত কৃষক, তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তারা কোনমতেই উপকৃত হবে না”

১৯১২ সনের ২৮ মার্চ কলকাতা গড়ের মাঠে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিপক্ষে প্রতিবাদ সভা করে। কেউ কেউ বলেন এ সভায় সভাপতিত্ব করেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কিন্তু তিনি এ সময়ে অসুস্থ হয়ে দার্জিলিং ছিলেন বলে জোর প্রচার রয়েছে। যাহোক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা করেছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ কাজের অগ্রণী ভুমিকা পালন করেছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভি.সি. স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়।।

১৯১৭ সনের ১৫ নভেম্বর স্যাডলার কমিশনের কাছে এক প্রতিবেদনে তিনি বলেন- “যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যায় করা হয়, তা হলে কি কলকাতা মারাত্মক ভাবে বঞ্চিত হবে না? যদি না হয়, তাহলে কে অগ্রাধিকার পাবে? …ঢাকার জন্য আমরা যাই করি না কেন, বাংলায় কলকাতার স্হান সর্বাগ্রে এবং ভবিষ্যতেও তা থাকবে। কাজেই এ ধরনের একটি উন্নত শ্রেণির বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতির পথ রুদ্ধ করে দেয়া একটি মারাত্মক ভুল পদক্ষেপ হবে।”

আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের বিরোধিতা প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ভাইস চ্যানচেলর ঐতিহাসিক রমেশ চন্দ্র মজুমদার তাঁর কৃত “ঢাকার স্মৃতি” প্রবন্ধে লেখেন: “তিনি (সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী) ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্হাপনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তিনি আশুতোষ বাবুর কাছে জানতে চেয়েছিলেন কি মূল্যে অর্থাৎ কিসের বিনিময়ে তিনি ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্হাপনের বিরোধিতা থেকে বিরত থাকবেন। শেষ পর্যন্ত স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য চারটি নতুন প্রফেসর পদ সৃষ্টির বিনিময়ে তার বিরোধিতার অবসান ঘটিয়েছিলেন।”

সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির সদস্য হিসেবে বেঙ্গল প্রেসিডেনসী আইন সভায় অল ইন্ডিয়া মুসলিম লিগের অধিবেশনে “বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি মুসলমান শিক্ষা সমিতি” ও “ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল” সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বঙ্গীয় সরকার ও ভারত সরকারকে চাপ প্রদান করেন। ১৯১৬ সনের ৩০-৩১ ডিসেম্বরে লাখনৌতে মুসলিম লিগের অধিবেশনে বলেন: “পাচটি বছর কেটে গেল, যুদ্ধ ও আর্থিক সংকটের অজুহাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়টি আজও প্রতিষ্ঠিত হলনা। অথচ এই সংকটের মধ্যেও পাটনায় হাইকোর্ট ও বিশ্ববিদ্যালয় স্হাপন করা হল।”

১৯১৬ সনের ৩ এপ্রিল এ.কে. ফজলুল হক বঙ্গীয় আইন পরিষদে বলেন, with a view to prevent a setback in the progress of education in Eastern Bengal, we are promised a University at Dhaka. Ever since 1912 provisions were being made in every budget for this proposed University, and each year we were toled to live on the hope that the University would soon be an accomplished fact.we are now to believe that a costly project like a university at Dhaka is out of the bounds of possibilities in the future.l can understand that a big scheme like this can not be developed in a day: but does it really take years and years for the scheme to matter and developed it only the will to carry the work through be not wanting?”

পূর্ব বাংলার মুসলিম নেতৃবৃন্দের দাবির মুখে ১৯১৭ সনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যানচেলর লর্ড চেমসফোর্ড কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা সমূহ তদন্ত এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্হাপন সম্পর্কে রিপোর্ট করার জন্যও এই কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য নাথান কমিটির রিপোর্ট এই কমিটি অনুমোদন দান করে। অবাক কান্ড হলো ভাইস রয় কাউন্সিলের হিন্দু সদস্য গন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রচন্ড বিরোধিতা করে।

অবশেষে সব বাধা উপেক্ষা করে নবাব সলীমুল্লাহর দান করা ৬০০একর জমির ওপর ১৯২১ সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা লাভ করে। নবাবের মৃত্যুর ছয় বছর পর তার স্বপ্নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভুমিকা পালন করে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহচর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ও তাঁর মানসপুত্র আবুল কাশেম ফজলুল হক।