শতবর্ষের সেরা রসায়ন বিঞ্জানী প্রফেসর ড. মোকাররম হোসেন খোন্দকার

আল জাবির ওরফে জাবির ইবনে হাইয়ান রসায়নের জনক।তিনি ওমাইয়া খেলাফতের সময় খোরাসানের তুস নগরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাগদাদের কুফায় একটি রসায়নাগার তৈরি করেন। এটিই পৃথিবীর প্রথম রসায়নাগার বলে অনেকে মনে করেন। এটির অস্তিত্ব এখন আর নেই। তিনি প্রায় দুই হাজার গ্রহ্ন রচনা করেন। এর মধ্যে চিকিৎসার ৫০০ গ্রহ্ন এবং অন্যান্য গুলো রসায়ন, দর্শন, সাহিত্য বিষয়ক। আল-জাবির রসায়নের ওপর মৌলিক কাজ করেছেন। তিনি ১. রাসায়নিক বস্তুসমূহের পদ্ধতিগত শ্রেণী বিন্যাস। ২. জৈব পদার্থ এবং উদ্ভিদ থেকে অজৈব পদার্থ অ্যামোনিয়া ও অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইড আবিস্কার তার উল্লেখ যোগ্য কাজ। এছাড়াও তিনি রাসায়নিক বিশ্লেষণ পদ্ধতি আবিষ্কার করেন যেমন, পাতন (Distillation) ঊর্ধ্বপাতন (Sublimation), পরিশ্রাবণ, দ্রবন(Solution), কেলাশন (Crystalization), ভস্মীভবন, বাস্পীভবন, গলানো পদ্ধতিসমূহ আবিষ্কার করেন। তিনি চর্ম রনজন,ওয়াটার প্রুফ কাপড়,লোহার ওপর মরীচারোধী বার্নিশ, চুলের নানা রকম কলপ তৈরির ওপর বই লেখেন। তিনি ম্যাংগানীজ ডাই অক্সাইড থেকে কাচ, সালফার ও এলকালী থেকে সিলভার ওফ সালফার এবং মিল্ক ওফ সালফার তৈরি করেন।

বাঙালি রসায়ন বিঞ্জানীর মধ্যে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, ড. কুদরত-ই-খুদা এবং প্রফেসর ড. মোকাররম হোসেন খোন্দকার উল্লেখযোগ্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার শত বর্ষে (১৯২১-২০২১) কেবলমাত্র মোকাররম হোসেন খোন্দকারই অনেক অবদান রেখেছেন। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মের কয়েক মাস পরেই জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৬১ সনের দোসরা আগষ্ট বাংলাদেশের খুলনাজেলায় জন্ম নেন। আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ১৯৬১ সনের সাতই মে বা ২৫ বৈশাখ। প্রফেসর ড. প্রফুল্ল চন্দ্র রায় রসায়নের ওপর ১৪৫টি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। তিনি মারকিউরাস নাইট্রেট(HgNO2), আবিষ্কার করে রসায়ন জগতে সাড়া ফেলেন। তিনি মোট ১২টি যৌগিক লবন (Complex Salt) এবং ৫টি থায়ো এস্টার আবিষ্কার করেন। প্রফেসর ড. কুদর-ই-খুদা (১৯০০, ১০ মে জন্ম) আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় এর প্রিয় ছাত্র ছিলেন। তিনি ২৯২৫ সনে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের হাতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্হান অধিকার করেন। কিন্তু বর্নহিন্দু শিক্ষকদের সাম্প্রদায়িক কূটচালে প্রফুল্ল চন্দ্র রায় এর প্রিয় ছাত্র কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সুযোগ পাননি। পরে তিনি বৃটেন থেকে ১৯২৯ সনে ডি.এস.সি. ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯২৪ থেকে ২৯৪৭ সন পর্যন্ত তিনি বিশুদ্ধ রসায়নের ২১টি গবেষণা পত্র প্রকাশ করেন। “কিটোল্যাকটাল টটোমারিজম” নিয়ে তিনি যে ৬টি গবেষণা প্রকাশ করেছিলেন তাতে বিঞ্জান মহলে বিশাল সাড়া পড়ে।তিনি পাটের ৯টি পেটেন্ট বের করেন। তার মধ্যে পাট থেকে সুতা পাটবীজ থেকে তেল, পাটখড়ি থেকে বোর্ড ও কাগজের মন্ড প্রধান। পাট অপজাত থেকে রেয়ন উল্লেখ যোগ্য। এছাড়াও তিনি গুড় থেকে সুক্রোজ, ল্যাকটিক এসিড, ভিনেগার প্রভৃতির চারটি পেটেন্ট বের করেন। তামাক পাতার পরিবর্তে কুন্ডিপাতা ব্যাবহারের পেটেন্ট দিয়েছেন তিনি।

প্রফেসর ড. মোকাররম হোসেন খোন্দকারের প্রতি আমার মুগ্ধতা তিনটি কারণে ১. তিনি বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার কৃতিসন্তান ২. তিনি প্রখ্যাত রসায়ন বিঞ্জানী, যে বিষয়ের গর্বিত ছাত্র আমি ৩. তার সুযোগ্য পুত্র লুতফর রহমান খোন্দকার এস.এস.সি ও এইচ.এস.সিতে ঢাকা বোর্ডে প্রথম বিভাগে প্রথম স্হান অধিকারী এবং বি.এস.সি. অনার্স রসায়নের আমার ক্লাস মেট। তিনি ১৯২২ সনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বরিশাল জেলা স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন এবং জগন্নাথ কলেজ থেকে আই.এস.সি পাশ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ থেকে বি.এস.সি. অনার্স এবং এম.এস.সি. পাশ করেন। ডরহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে পি.এইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৪৪ সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে লেকচারার হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৪৯ সনে তিনি রিডার হন এবং ১৯৬০ সনে প্রফেসর হিসেবে নন্দিত হন। তিনি ১৯৫৪ থেকে ১৯৭২ সনের মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত দীর্ঘ ১৮ বছর বিভাগীয় প্রধান এবং সায়েন্স ফ্যাকাল্টির ডিন হিসেবে উজ্জ্বল ভুমিকা পালন করেন। উল্লেখ্য তিনি রসায়ন বিভাগের চতুর্থ হেড অব দি ডিপার্টমেন্ট। প্রতিষ্ঠা কালীন বিভাগীয় প্রধান ছিলেন জ্ঞান চন্দ্র ঘোষ (১৯২১-১৯৩৯) তিনি ছিলেন ভারতীয় বাঙালি। তিনিও আঠারো বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। মোকাররম হোসেন খোন্দকার একমাত্র বাংলাদেশী বাঙালি মুসলিম যিনি একটানা আঠারো বছর বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। তার পরে আরও ষোলো জন শিক্ষক বিভাগীয় প্রধান হয়েছেন কিন্তু তাঁরা কেউই একটার্মের বেশি দায়িত্ব পালন করতে সুযোগ পাননি। তাঁর প্রায় শতাধিক গবেষণাপত্র দেশ বিদেশের জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি Royal Institute of Chemistry (FRIC) of Great Britain and Royal Society of Arts(FRSA) এর সম্মানিত ফেলো। তিনি বাংলা একাডেমির বিঞ্জান ও প্রযুক্তি বিভাগের সাব কমিটির সদস্য এবং কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের রসায়ন পরিভাষা কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজা কালী নারায়ণ স্কলারে ভূষিত হন এবং স্বাধীনতা পদক ১৯৭৩ লাভ করেন।

আধুনিক রসায়ন বিঞ্জানে তাঁর অনেক অবদান রয়েছে। তিনি পাট ও তন্তুর বিবর্তন ব্যাবহারে, ইলেক্ট্রোকেমিস্ট্রি, মেটাল সালফাইড, নন-মেটাল সালফার যৌগ, অজৈব বোরেট, অর্গানো-বোরন যৌগ, মিনারেল প্রসেসিং এবং বিশ্লেষণ প্রভৃতিতে বিরাট ভুমিকা পালন করেছেন। তিনি অজৈব এবং বিশ্লেষণ রসায়নে বিশেষজ্ঞ। খনিজ পদার্থের বিক্রিয়া এবং সেলুলোজ, পাট রসায়নে তিনি নতুন বিষয় উদ্ভাবন করেছেন। তিনি সলিড কেমিস্ট্রিতে বিশেষ বুত্পত্তি লাভ করেন। তিনি মেটাল বোরেট কৃষ্টাল, তৈরি পদ্ধতি এবং তার ডিকম্পজিশন, উদ্ভাবন করেন। ট্রানজিশন মেটাল অক্সালেট সালফিডেশন এবং গ্রাফাইট-সালফার আন্তক্যাটালায়ন যৌগের উদ্ভাবন করেন। তিনি যৌগ পদার্থ থেকে মেটাল আয়ন বিশ্লেষণ পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। তিনি দেশিয় ধাতব পদার্থ থেকে নতুন আয়ন-এক্সচেঞ্জার তৈরি করেন। তিনি বিভিন্ন খনিজ পদার্থের নতুন ব্যাবহার পদ্ধতি বের করেন। তিনি সালফাইড মিনারেলের ওপর গবেষণা করেন, যেমনঃ আয়রন পাইরাইটিস, স্টিবনাইট, ক্রোমাইট, বক্সাইট, ইলিমিনটারী সালফার এক্সট্রাকশন,বিশেষ করে কপার বা তামা এবং এন্টিমনি এক্স ট্রাকশন। তিনি পাটের নতুন ব্যাবহার উদ্ভাবন করেন, বিশেষ করে কটনের ফসফোরাইলেশন, নাইট্রেশন এবং পাটের সেলুলোজ। পাট থেকে কার্বোক্সিমিথাইল সেলুলোজ (সি.এম.সি) তৈরির নতুন পদ্ধতি।

ফিজিক্যাল সায়েন্সে গবেষণার জন্য তখন কার পাকিস্তান সরকার তাঁকে পাকিস্তান বিঞ্জান একাডেমি গোল্ডমেডাল পুরষ্কারে সম্মানিত করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার(১৯২১-২০২১) শতবর্ষের রসায়ন বিঞ্জানী হিসেবেই তিনি কেবল নন্দিত নন বরং তিনি রসায়ন বিঞ্জান প্রাতিষ্ঠানিক রুপে পরিচিত পাওয়ার পর বিশ্বের অন্যান্য নামকরা রসায়ন বিঞ্জানীর মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ রসায়ন বিঞ্জানী এবং বাঙালী রসায়ন বিঞ্জানীর মধ্যে শ্রেষ্ঠতম। এটি আমার আবেগের কথা নয় বরং জ্ঞান চন্দ্র ঘোষ, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, ড.কুদরত-ই-খুদা এবং জোগেশ চন্দ্র ঘোষ এই সব বাঙালি রসায়ন বিঞ্জানীর রসায়ন গবেষণা ও যৌগিক লবনতৈরি, নতুন বিশ্লেষণ পদ্ধতি, প্রাকৃতিক ও খনিজ পদার্থ ব্যবহার বিধি আবিষ্কার, বিবেচনায় প্রফেসর ড. মোকাররম হোসেন খোন্দকার এখনও অগ্রগামী। এই মেধাবী বিজ্ঞানীকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য এবং তার অবদানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ “খোন্দকার মেমোরিয়াল চেয়ার” সৃষ্টি করেছে। প্রফেসর এস.জেড. হায়দারকে এই চেয়ারে প্রথম বারের মতো ১৯৮৬ সনে খোন্দকার প্রফেসর হিসেবে সম্মানিত করেছে।

প্রফেসর ড. মোকাররম হোসেন খোন্দকারের কর্মকে সামনে তুলে ধরার জন্য এবং তার মৃত্যু দিবসকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য রসায়ন বিভাগের প্রস্তাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট মিটিংয়ে ১৯৭৮ সনের ৪ অক্টোবর “খোন্দকার মেমোরিয়াল লেকচার”কে প্রাতিষ্ঠানিক রুপদান করতে অনুমোদন প্রদান করে। এরপর প্রায় প্রতি বছর খোন্দকার মেমোরিয়াল লেকচার অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই মেমোরিয়াল লেকচার অনুষ্ঠানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রখ্যাত রসায়ন বিঞ্জানীবৃন্দ তাদের মূল্যবান বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এবং বক্তব্য প্রদান করেন। এশিয়া, ইউরোপ, ইউ.এস.এ, কানাডা, অষ্ট্রেলিয়া, ইউ.কে, জার্মানী, সুইডেন, জাপান, কোরিয়া, পাকিস্তান এবং ভারতের রসায়ন বিঞ্জানীদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে খোন্দকার মেমোরিয়াল লেকচার দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

কিছু বিখ্যাত রসায়ন বিঞ্জানী, যারা এসে তাদের মূল্যবান বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন তার কিঞ্চিৎ তথ্য :

  1. Professor H.j. Emeleus CBE FRS, Emeritus Professor of University Chemical laboratories, UK. deliver speech on Fluorine Containing Free Radicals.(12 March 1981)
  2. Dr. A.K. Mukherjee, Head of Applied Chemistry Division, Indian jute Industries Research Association, Calcutta, India deliver his paper on Structure of plant polysaccharides with Special Reference to Bael(Angle Marmelos)
  3. Professor Muhammad Iqbal Bhanger Director, National Centre of Excellence in Analytical Chemistry, Sind University, Pakistan
    talked about “Solid phase Extraction of Metal ion”

রসায়ন বিভাগের উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন কার্জন হল এলাকার রসায়ন বিভাগ এবং ফার্মেসীসহ অন্যান্য রসায়ন সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে
আরও বিস্তৃত ভবনে পাঠদান এবং গবেষণার জন্য একটি বহুতল ভবনের স্হাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠের বিপরীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী সংলগ্ন এলাকায় “প্রফেসর ড. মোকাররম হোসেন খোন্দকার বিজ্ঞান ভবন” নামে প্রতিষ্ঠিত হয়।