রসায়নের রান্নাবাড়া

মাসটার্সে এসে ১৯৮৩-১৯৮৪সনে প্রফেসর ড. হুমায়ুন আহমেদ স্যারকে পেলাম।তিনি আমাদের পলিমার কেমিস্ট্রির ক্লাস নিতেন।তিনি এর আগে দেশের বাইরে ছিলেন। অরগানিক কেমিস্ট্রিতে পলিমার রসায়ন পড়াতেন ড.মাহতাব স্যার।পলি ইথেন,মিথেন ইথেন,ইথেন-সালফার কম্বিনেশন, এসবের পলিমারাইজেশন, এইসব হাইড্রোকার্বনের সরল চেইন ফরমেশন,ব্রান্চড চেইন ফরমেশন, পলিএস্টার বিষয়ে জৈব রসায়নে সংশ্লেষণ,রাসায়নিক বিক্রিয়ার মেকানিজম নিয়ে বিস্তারিত ক্লাস নিতেন এই স্যারেরা। তবে ড.হুমায়ুন আহমেদ পড়াতেন পলিমারাইজেশনে কোন কোন ফিজিক্যাল প্রপার্টি বিশেষ ভুমিকা রাখে তার ভৌত -রসায়ন। তিনি অত্যন্ত দক্ষতা নিয়ে গাণিতিক এবং জ্যামিতিক উপায়ে পলিমারের ওপর বিশ্লেষণ মূলক ক্লাস নিতেন।

একদিন তিনি রসায়নের লেকচার গ্যালারীতে ক্লাস নিচ্ছিলেন। এ সময়ে আমার সহপাঠীএমদাদ হুট করে বলে দিলো, স্যার আলীম কবিতা লেখে। ওর কবিতার বই বের হয়েছে। স্যার ওর কথা শুনে দারুণ উল্লাসিত হলেন। আমাকে দাঁড় করিয়ে কবিতা বইয়ের নাম জিজ্ঞাসা করলেন। আমাকে ক্লাস শেষে তাঁর সাথে দেখা করতে বললেন। ক্লাসের সবাইকে উদ্দেশ্য করে আমার কবিতার বই কিনতে বললেন।
ক্লাস শেষে আমি স্যারের অনুগামী হলাম। তিনি আমাকে সায়েন্স ক্যাফেটেরিয়াতে নিয়ে বেশ যত্ন করে মিষ্টি খাওয়ালেন। শহীদুল্লাহ্ হলে তাঁর আবাসস্থলে নিয়ে তাঁর দুটি বই “শংখনীল কারাগার” এবং “নিশিকাব্য”উপহার দিলেন। তিনি তখন মোটামুটি পরিচিত উপন্যাসিক। তার ছাত্র এই আমি একজন উদীয়মান কবি, ছাত্রাবস্থায় কবিতার বই বের হয়েছে এতে তিনি দারুণ খুশি। তিনি আমাকে মিষ্টিমুখ করিয়ে সেলিব্রেট করলেন। ছাত্র শিক্ষকের এমন রসায়নে আমার ভেতরে এক মনো জৈব রসায়ন সৃষ্টি হল।আমি আনন্দে চাঁদ জোছনার জোয়ারে অভিষিক্ত হলাম।

আমার প্রথম কাব্যগ্রহ্ন “শ্বাপদ অরণ্যে অগ্নিশিশু” বের হয়েছিল ১৯৮৩ সনের জানুয়ারী মাসে।প্রকাশক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের নামকরা ছাত্র কবি আসাদ বিন হাফিজ। প্রচ্ছদ করেছিলেন নূরুল ইসলাম। এটি আমার শিক্ষা জীবন এবং সাহিত্য জীবনের দাগ রেখে যাওয়া এক বিরল ঘটনা। রসায়নের ছাত্ররা সাধারণত রসায়ন বিঞ্জানী হবে,রসায়নের গবেষক হবে কিন্তু আমার জীবনে কবিতার রস কাব্য রসায়ন সৃষ্টি করেছে, যেমন করেছে আমার ওস্তাদ আমার শিক্ষক ড. হুমায়ুন আহমেদকে কথাশিল্পের রসে রস শিক্ত রসিক কথাশিল্পী,আধুনিক বাংলা সাহিত্যের নন্দিত ঔপন্যাসিক।

অনার্স কোর্স আমাদের সময় ছিলো তিন বছরের জন্য। এই তিনি বছর প্রত্যেক ছাত্র ছাত্রীকে বাধ্যতামূলক ভাবে রসায়নের প্রাকটিকাল ক্লাস করতে হতো সপ্তাহের ছয় কর্মদিবসে দুপুর একটা থেকে বিকেল পাঁচ টা পর্যন্ত। এম.এস.সিতে থিসিস গ্রুপের জন্য আলাদা ল্যাব এবং অন্যান্য ছাত্র ছাত্রীদের জন্য ভিন্ন ল্যাবে প্রাকটিকাল ক্লাস চলতো। আমি এম.এস.সি.তে থিসিস নেই নি। থিসিস গ্রুপের ছাত্র ছাত্রীরা ল্যাব থেকে কোনদিন ই রাত্র ৯টা ১০ টার আগে বের হতে পারতোনা। আমি সন্ধ্যা বেলায় সাধারণত কোন না কোন সাহিত্য সংস্কৃতি কেন্দ্রের আড্ডায় সাহিত্য চর্চায় সময় অতিবাহিত করতাম। এ জন্য রসায়নের “এ” গ্রুপের সাথে ল্যাবে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত প্রাকটিকাল ক্লাস করতাম।

অনার্সের তিন বছরই আমি, জৈব, অজৈব এবং ভৌত রসায়ন ল্যাবরেটরীতে প্রাকটিকাল ক্লাস করেছি। অজৈব রসায়নের ল্যাবে নরমাল সলিউশন, মোলার সলিউশন, মোলাল সলিউশন, নন-এক্যুয়াস টাইট্রেশনের জন্য গ্ল্যাসিয়াল এসিটিক এসিড, এসিডিক এনহাইড্রাইড এবং পারক্লোরিক এসিড সহযোগে পারক্লোরিক এসিড তৈরি এবং এর শক্তি নির্ণয়। এসিড-বেস টাইট্রেশন, করা শিখেছি। সিনথিসিস বা সংশ্লেষণের জন্য বিভিন্ন মেটাল সল্ট তৈরি করা শিখেছি। এ সব লবনের মধ্যে, মোর সল্ট, (Mohr,s Salt) যথাঃ (NH4) 2, Fe(SO4)2(H2O)6 or H20FeN2O14S2, ফেরাস সালফেট (FeSO4 xH2O,) কিউপ্রিক সালফেট (CuSO4,5H2O) পটাসিয়াম পারম্যাঙ্গানেট(KMnO4) ম্যাঙ্গানিজ সালফেট (MnSO4,H2O) প্রভৃতি প্রধান। এসব লবন তৈরি করে তাদের উতপাদনের হার নির্ণয় করতে হতো। এম.এস.সি.তে এ জাতীয় লবনের উতপাদন এবং পরিমানগত বিশ্লেষণ (Quantitative Analysis,) গুনগত বিশ্লেশন (Qualitative Analysis) করতে শিখেছি। এ ছাড়াও লবন বা অন্য কোন রাসায়নিক দ্রব্যের বিশ্লেষণের জন্য এম.এস.সি.তে পেপার ক্রোম্যাটোগ্রাফিক (p,c,)সিলিকাজেল ক্রোম্যাটোগ্রাফিক ( Silica G.C.), ইউ.ভি./ভিজিবল স্পেক্ট্রোসকপি (UV.Visible Spectroscopy), হাইপারফরমেন্স লিকুইড ক্রোম্যাটোগ্রাফি(HPLC) প্রভৃতি পদ্ধতিতে ল্যাবে নিবিড় ভাবে কাজ করেছি।

আমাদের অজৈব রসায়নের এম.এস.সি. ল্যাব পরিচালক ছিলেন প্রফেসর ড. আবুল খায়ের স্যার। তিনি ল্যাব প্রাকটিকাল ক্লাসে আমাদের কাজ এবং খাতা দেখতেন। তিনি প্রাকটিকাল ফাইনাল পরীক্ষার সময়ে আমাকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন শুধু হাতের কাজ জানলে হবেনা আগামী কাল তোমাদের মধ্যে যে প্রিয়ডিক টেবিলের ১০৫ টি মৌলের নাম,পরমাণু সংখ্যা, পারমানুবিক ওজন, মৌল সমূহের শক্তি স্তরের পারমাণবিক বিন্যাস মুখস্ত বলতে পারবে তাকে আমি সর্বোচ্চ নাম্বার দেবো। আমি স্যারের এ প্রস্তাবে খুব খুশি হয়েছিলাম। কারণ আমি প্রিয়ডিক টেবিলের মৌল সমুহের বিস্তারিত বিষয় আগে থেকেই মুখস্থ করেছিলাম। সত্যি পরদিন প্রাকটিকাল ভাইবা পরীক্ষায় আমি প্রিয়ডিক টেবিলের সব প্রশ্নের উত্তর যথাযথ ভাবে দিয়ে সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়েছিলাম। হাতের কাজ সহ সব মিলিয়ে আমি পেয়েছিলাম ৬৮% আর গৌরাঙ্গ পেয়েছিলো ৭০% নম্বর।

ছাত্র জীবন শেষে অনেকের রসায়ন মেলে নি। বিভিন্ন জন বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে জীবন পরিচালনা করছে। গৌরাঙ্গ সোনালী ব্যাংকের হেড অফিসে সরাসরি অফিসার পদে চাকরি নিয়েছিলো। প্রাকটিকালে ৭০% নম্বর পেয়ে সে জীবন যাপনে প্রাকটিকাল হয়েছে। আর আমি কলেজের শিক্ষাকতা এবং সবশেষে ফার্মাসিউটিক্যালে ঔষধ বিশ্লেষণ আর কবিতা বিশ্লেষণ করতে করতে নিজের সংসারটাকে আজও বিশ্লেষণ করতে পারিনি। গৃহিনীর অপ্রিয়ংবদ বাক্যবানে জর্জরিত হয়ে ঝাঝালো গ্লাসিয়াল এসিটিক এসিডে নিদারুণ বিশ্লিষ্ট হচ্ছি। অথচ এই এসিডে পানি ঢেলে ১০% করলে আমিও বাচতাম আর সিরকাও তৈরি হয়ে যেতো।

জৈব রসায়ন ল্যাবে আমরা আননোন জৈব সল্ট বিশ্লেষণ করতাম। যৌগের ফাংশনাল গ্রুপের টেস্ট এবং মেটাল অংশ নির্ধারণের জন্য ধাতবের কলাম টেস্ট করে ক্রমান্বয়ে মেটালটি ডিটেকশন করতাম।এরপর যৌগটির দ্রাব্যতা, গলনাঙ্ক প্রভৃতি টেস্ট করতাম। সবশেষে যৌগটিকে শনাক্তকরণ করা হতো। এই ল্যাবে ইউ.ভি. স্পেক্ট্রোসকপি ব্যাবহার করে অনেক কাঁচামাল বা Raw materials test করেছি।

প্রফেসর ড. তৌফিক হোসেন স্যার অনেক জৈব পদার্থের এবজর্পশন পিক (Absorption peak) বের করার টেকনিক শিখিয়েছিলেন HPLC মেশিন ব্যাবহার করে। তিনি আমাদের Mass Spectroscopy
এর মাধ্যমে জৈব যৌগের ফর্মুলা বের করার টেকনিক শিখিয়েছিলেন। এটি আমাকে দারুণ ভাবে আলোড়িত করতো।

ভৌত রসায়ন ল্যাবে তেলের এসিড ভেল্যু, পার অক্সাইড ভেল্যু, চা এবং কফির ক্যাফিন, ট্যানিন সহ আরও অন্যান্য এলকালয়েড বিশ্লেষণ করার পদ্ধতি শিখেছিলাম। আমাদের ভৌত রসায়ন ল্যাব পরিচালনা করতেন ড. আলতাফ হোসেন স্যার এবং প্রফেসর ড.মহিবুর রহমান স্যার। ভৌত রসায়ন ল্যাবেও আমি ভালো কাজ করতাম। বিশ্লেষণ, খাতা লেখা সহ আমি অগ্রগামী ছিলাম। কিন্ত আমার ইসলাম প্রিয়তার কারণে কোন এক স্যারের রোষানলে পড়লাম। তিনি আমাকে ল্যাব টেস্টের মৌখিক পরীক্ষায় ধিক্কার দিয়ে বল্লেন, “তুমি কেন রসায়ন পড়তে এসেছো? তোমাদের মোহাম্মদ সা. (তিনি দরুদ পড়েননি) লেখাপড়া জানে না।” আমি তার কথায় বিস্ময় প্রকাশ করে বল্লাম, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল তো মেট্রিক পাশ করেনি। অথচ তাদের লেখার ওপর পি.এইচ.ডি. হয় কেন? তারাও তো অশিক্ষিত। আমার কথায় তিনি আর প্রতি উত্তর দেননি, তবে যারা আমার সহযোগিতা নিয়েছেন তারা অনেকে প্রাকটিকালে ৬০% এর উপরে পেয়েছেন। আর আমাকে দয়া করে ফেল করান নি বরং ৫৬% নম্বর দিয়েছেন।

আমি এম.এস.সি.তে যৌথভাবে রেবেকা সুলতানা দীপুর সাথে “এ” গ্রুপে দ্বিতীয় শ্রেণিতে দশম স্হান অধিকার করেছি। উল্লেখ্য থিসিস গ্রুপে মাত্র ৪ জন প্রথম শ্রেণি পেয়েছিল। এরা হল কামরুল এহসান, প্রদীপ বকসী, গোলাম রসুল এবং মিজানুর রহমান। অনার্সে কেবল মাত্র আসিরুর রহমান প্রথম শ্রেণি পেয়েছিল এবং বৃত্তি নিয়ে দেশের বাইরে এম.এস.সি. ও পি.এইচ.ডি. করেছে।