রসায়নের ক্রিয়া বিক্রিয়া (Chemical Action and Reaction)

এই জগৎ ক্রিয়া বিক্রিয়ার ফসল। মহান প্রভু ইচ্ছে করলেন, উত্তেজিত করলেন, বল্লেন, হও। প্রচন্ড হুকুম। বিগব্যাঙ্গ (Big Bang) সুক্ষ্ম বস্তুর ওপর প্রচন্ড ফু বা ফুতকার। মাত্র সু্ক্ষতম সময়ে। বাস সৃষ্টি হল সময়ের কয়েক পর্যায়ে এই জগৎ মহাজগৎ। বস্তু, প্রাণী, কৃয়া কর্ম সব কিছুই ওই একই নিয়মে সৃষ্টি হচ্ছে কিন্তু তার প্রকাশ এক একটি একেক রকমের।

রসায়ন ল্যাবে নতুন যৌগ বা আবিষ্কৃত যৌগ যা-ই, সৃষ্টি বা তৈরি করতে হবে। তাকে উত্তেজিত করতে হবে তাপ, চাপ ও মিশ্রণ প্রকৃয়ার মাধ্যমে। মানব সমাজেও যা কিছু সৃষ্টি হয় তার জন্য কার্য কারণ বা উপযুক্ত অবস্থা থাকতে হয়। রসায়ন পড়ে ক’জন ভারসিটি কলেজে অধ্যাপনা করবে? কেমিস্ট বা রসায়নবিদরা তো, শুধু শিক্ষাকতা বা অন্য কোন বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে সাধারণ অফিসার হিসেবে চাকরি করবে না। তাদের তো উচিৎ উতপাদন শীল শিল্প প্রতিষ্ঠানে সম্মানের সাথে চাকরি করা। অথবা কোন সৃষ্টি শীল গবেষণা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা।

রসায়নবিদরা নিশ্চয়ই সায়েন্স ল্যাবরেটরীতে, আনুবিকশক্তি কমিশন, ঔষধ শিল্প কারখানা বা অন্য যেকোনো কেমিক্যাল ল্যাবরেটরীতে চাকরি গ্রহণ করবে। এক্ষেত্রে কোন বৈরীতা সৃষ্টি করা ঠিক নয়। ১৯২১- ১৯৭৮ পর্যন্ত এদেশের ঔষধ কোম্পানিগুলোতে কেমিস্টরা অবাধে অফিসার পদে চাকরি করেছে। এরপর ১৯৭৮ থেকে ১৯৯৫ সনের আগ পর্যন্ত একমাত্র ফার্মাসিস্টরা সম্মানের সাথে তাদের রেজিষ্ট্রেশন নম্বর ব্যাবহার করে ঔষধ কোম্পানিতে চাকরি করেছে। কেমিস্টরা সমমর্যাদায় ঔষধ কোম্পানিতে চাকরি করতে পারেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিস্টরা চাকরির ক্ষেত্রে ফার্মাসিস্টদের সাথে সমমর্যাদায় চাকরি করার সুযোগ পায়নি।

চাকরি ক্ষেত্রে সরকার কর্তৃক এ হেন অবমূল্যায়নের জন্য আমরা ঢাবি’র রসায়ন, ফলিত রসায়ন, প্রাণ রসায়ন, অণুজীব বিঞ্জানের ছাত্ররা রসায়ন ফলিত রসায়ন ছাত্র সংগ্রাম কমিটি গঠন করি। এই আন্দোলনের মূল নেতৃত্বে ছিলেন আমাদের সহপাঠী এম.এস.সি’র ছাত্র মনির উদ্দিন আহমেদ। তার নেতৃত্বে আমরা সারা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের নেতৃ পর্যায়ের ছাত্ররা এফ.এইচ. হলের ৩২৪ নম্বর রুমে একত্রিত হই। এসময় রসায়ন ফলিত রসায়ন ছাত্র সংগ্রাম কমিটির কেন্দ্রীয় আহবায়ক করা হয় মনির উদ্দিন আহমেদকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন ফলিত রসায়ন বিভাগের
ছাত্র সংগ্রাম কমিটির আহবায়ক করা হয় আমাকে। আমরা কয়েক দফা দাবির ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা শহরে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলি। দাবীগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিলো:
১. ঔষধ শিল্প প্রতিষ্ঠানে চাকরির ক্ষেত্রে কেমিস্ট, ফার্মাসিস্টদের মধ্যে বৈষম্য তুলে দিতে হবে।
২. ঔষধ শিল্প প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য কেবলমাত্র রেজিস্ট্রার ফার্মাসিস্টদের অগ্রাধিকার দেওয়া যাবে না।
৩. ঔষধ শিল্প প্রতিষ্ঠানে কোয়ালিফাইড পারছন হিসেবে রসায়ন, ফলিত রসায়ন, প্রানরসায়ন, অনুজীববিঞ্জানী ছাত্রদের ওষুধ তৈরি ও বিশ্লেষণে ফার্মাসিস্টদের মত নিয়োগ দিতে হবে এবং সমমূল্যায়ন করতে হবে।
৪. ঔষধ শিল্প প্রতিষ্ঠান একটি মাল্টি ডিসিপ্লিন প্লান্ট। এখানে সব বিষয়ের বৈঞ্জানিক কর্মকর্তাদের প্রবেশাধিকার এবং নিয়োগের সুযোগ দিয়ে এই ক্ষেত্রকে আরও সম্মৃদ্ধ করতে হবে।
প্রভৃতি দাবি দাওয়া আদায়ের লক্ষ্যে আমরা ক্যাম্পাসে মিছিল, মিটিং করেছি। জাতীয় প্রেসক্লাবে একাধিক সেমিনার সিম্পোজিয়াম করেছি। সরকারের দায়িত্বশীল কর্তাব্যাক্তিদের স্বারকলিপি দিয়েছি।

প্রথম প্রথম আমাদের রসায়ন বিভাগের স্যারেরা আমাদের এ আন্দোলনে সাড়া দেননি। পরবর্তীতে আমাদের শিক্ষক প্রফেসর ড. মোস্তফা স্যার, প্রফেসর ড. ইশতিয়াক এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছেন। জাবেদ ইয়াহিয়া ও পাটোয়ারী ভাই আমাদের মুরব্বি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে ছিলেন। ১৯৯৫ সনে চার দলীয় সরকার আমাদের যৌক্তিক দাবি মেনে সংসদে গেজেট প্রকাশ করেন। আমরা এখন কোয়ালিফাইড পারসন হিসেবে ডিজিডিএ-এর মাধ্যমে সম্মানের সাথে চাকরি করছি।

বাংলাদেশের ঔষধ শিল্প প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিতে ফার্মাসিস্ট, কেমিস্ট, বায়োকেমিস্ট, মাইক্রোবায়োলজিস্টদের সহ অন্যান্য বিশেষজ্ঞ বৃন্দের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে কাজ করে যেতে হবে। রাসায়নিক বিক্রিয়াটি হয়েছিল বন্ধুবর মনিরউদ্দিনের ইনিসিয়েশন এবং আমাদের সম্মিলিত উত্তেজনার ফলে। জানি না মনিরউদ্দিন কি ইনিসিয়েটর না ক্যটালিস্ট। সময় আমাদের কতটুকু মূল্যায়ন করবে!