রসায়নের ক্যাটালিস্ট

ক্যাটালিস্ট হচ্ছে প্রভাবক। রাসায়নিক বিকৃয়া ঘটানোর জন্য কখনও কখনও প্রভাবক হিসেবে কোন কোন উপাদান রাসায়নিক কৃয়ায় অংশ গ্রহণ করে কিন্তু বিকৃয়া শেষে নিজের অস্তিত্ব বা চরিত্র ঠিক রাখে। আবার কিছু পারিপার্শ্বিক অবস্থা বা সহযোগি পরিবেশ অবশ্যই দরকার হয়, রাসায়নিক বিকৃয়া সংঘটনের জন্য। রসায়নকে ভালোভাবে রপ্ত করার জন্য কিছু সাবসিডিয়ারী বিষয় অধ্যায়ন করতে হয়। এ জন্য আমাদেরকে দু বছর পদার্থবিজ্ঞান ও গনিত বিষয়ে পড়তে হয়েছে। এ দু বিষয়ে ৪৫%মার্ক পেয়ে পাশ করতে হতো।আমরা কার্জনহলের মূল ভবনে পদার্থবিদ্যা এবং সায়েন্স এনেক্স বিল্ডিংয়ে গনিত বষয়ে ক্লাস করেছি এবং পরীক্ষা দিয়েছি। প্রথম গনিত ক্লাসে কয়েকজন হুজুরিয়া ড্রেসের গনিত অধ্যাপক পেলাম। এদের একজনের নাম, খলিফা আবদুর রহমান। তিনি আমাদের জ্যামিতি পড়াতেন।এনারাও ইংরেজিতে গনিত পড়াতেন।রসায়নের ছাত্রদের কাছে ইংরেজি সহজ মিডিয়া।তাছাড়া গনিতে ইংরেজির চেয়ে অংকই বেশি। আমার মুগ্ধতা ছিলো অন্য স্হানে।আর তা হল, অধ্যাপকের নামের টাইটেলে। দেশীয় অর্থে খলিফা মানে যারা সেলাই মেশিন দিয়ে জামা কাপড় সেলাই করে জীবিকা নির্বাহ করে। আবার আরবি অর্থে খলিফা মানে শাসক বা আল্লাহর প্রতিনিধি। কিন্তু এই অধ্যাপক কাপড় সেলাই করা খলিফা নয়, আবার শাসক খলিফা হারুনর রশীদও নয়, আবার আল্লাহর প্রতিনিধি কোন ধর্মীয় নেতাও নয়। এই হুজুরিয়া পোশাকের অধ্যাপক একটি জ্যামিতিক উপপাদ্য আবিস্কার করেছেন, তার নাম হল “খলিফাস থিওরেম”,। এই উপপাদ্য তিনিই আমাদের ক্লাসে পড়াতেন। ক্লাসে একবারও তিনি বলেননি এটি তার আবিষ্কার। ক্লাস শেষে জেনে অবাক আনন্দ লাভ করেছি, একজন বাঙালী পরহেজগার মুসলিম অধ্যাপক এই উপপাদ্যের আবিষ্কারক এবং তিনিই আমাদের শিক্ষক। অথচ তাকে দেখতে নেহাত গোবেচারা হুজুরিয়া পোশাকের নিরহংকার মানুষ।

পদার্থবিজ্ঞান অনেক অধ্যাপক পড়িয়েছেন। তাদের নাম এখন আর মনে নেই। তবে একজন অনিন্দ সুন্দরী ম্যাডাম যার চেহারা রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী মিতা হকের মতো।তিনি আমাদের অত্যন্ত মিষ্টি গলায় পড়াতেন এবং প্রাকটিক্যাল ক্লাস করাতেন।তিনি তখনকার দিনে ঢাকা বেতারে এবং বিটিভিতে রবীন্দ্র সংগীতও পরিবেশন করতেন। তিনি আমাকে পদার্থের প্রাকটিক্যালে ৬০% উপরে নাম্বার দিয়েছেন।

রসায়নের সাবসিডিয়ারী ক্লাস আমার জন্য কেবল মাত্র বিজ্ঞান বিভাগে সীমাবদ্ধ ছিলো না। আমি মাঝে মাঝে সেখ মহিউদ্দিন ভাইয়ের এপ্লাইড কেমিস্ট্রি বিভাগেই যেতাম না।আমি বাংলা বিভাগে কয়েকটি ক্লাস করেছি আমার কাব্যসতীর্থ প্রেমিক কবি বন্ধু আসাদ বিন হাফিজের সাথে। সে যখন ঢাকা কলেজে বাংলা অনার্সের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র তখন একদিন সকালে তাদের কেন্টিনে সকালের নাস্তা খাওয়ার দাওয়াত দিলো।আমি তখন ঢা.বি.র রসায়ন অনার্স ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। কবিতা লেখার সূত্রে ওর সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। ফলে ওর অনুরোধ ফেলতে পারিনি। সেদিন কেন্টিনে তন্দুরি রুটি আর ভাজি ডাল, চা আপ্যায়ন করেছিলো আমাকে। আমি আর কি খেলাম। দাওয়াতি অতিথি আমি, আর মেজবান বেচারা একে একে ৫২টি রুটি খেলো ভাজি সহ।আমি এই প্রথম ওর খাওয়া দেখে বিস্মিত হয়ে গেলাম। এটা কি করে সম্ভব? আমি বল্লাম দোস্ত, তোর পায়ে পড়ি, তুই আর খাসনে।তোর ক্ষতি হবে। ও বল্লো, আরে ধুত, এ তো পানিচুনি খাইলাম। আমি বল্লাম বলিস কি? ও হেসে বল্লো আমি এক সিটিংএ সাত জনের গোস্ত পোলাও খেয়ে ফেলবো। তবে আজ দুপুরে আর খামুনা। তুই ডরাইছোস নি? আমি হেসে বল্লাম, পান খাবিনা? হ, খামু চল। এর পর পাশের পানবিড়ির দোকান থেকে ৫/৬টি পান, জর্দা, মিষ্টি মসল্লা সহ মুখের মধ্যে চালান করে আরামে চোখ কোচকায়ে চিবাতে লাগলো। আমাকে একটু এগিয়ে দিয়ে বল্ল, কাল দেখা হবে বিপরীতে।

বছর খানেক পরে ও আমাকে ঢাবির কলা ভবনে বাংলা বিভাগের ক্লাস করতে বল্লো। ও বল্লো দোস্ত আমিতো তগো ভারসিটিতে বাংলায় ভর্তি অইছি।একদিন আহিস। রসায়নের ক্লাস করতে করতে রস আয়ন হয়ে গেছে। তগো রস কস নাই। বাংলায় আছে আসল রস, রসগোল্লা। তোমরা সালারা আঙুল চোষ।বল্লাম দোস্ত ঠিকই কইছস।তয় বাংলায় আবার আইলো কহান থেকে? সব সময় দুষ্টুমি। বল্লাম, আমাদেরও, মেয়ে ক্লাস মেট আছে। তবে মাত্র সাত জন, সাতাশ জনে।

আসাদ বল্লো, আমাগো শত শত মেয়ে ক্লাস মেট। এত মেয়ে আর কোন ডিপার্টমেন্টে নাই। তবে আমি ওদের রসের কথা কইনি। বাংলা গ্রামারে রস আছে। তুই সালা নেগেটিভ ভাবোস ক্যান?আমি বল্লাম আরে না আমি কবিতার রস উপাদানের কথা জনি।আমি একটু শব্দালংকার শ্লেষ করলাম। এই রস ওই রস সবই বোঝালাম। আসাদ বলল,বুঝছি সালা,আমারে কি শিখাবি। এরপর সত্যি একদিন আসাদের বাংলা ক্লাসে গিয়ে আমা চক্ষু চড়ক।ও মা৷ আমি যাই কোথায় এত মেয়ের মধ্যে আমরা মাত্র কয়েক জন। শতকরা ৯০ ভাগ মেয়ে সহপাঠী দেখেছিলাম। কিন্তু ওদের সাথে আসাদের কোন জম্পেশ আড্ডা দেখলাম না।ওরা কেন যেনো ওকে সমিহ করে চলে। দু’একজনের সাথে ও অবশ্য আমাকে ওর বন্ধু ও কবি হিসেবে পরিচিত করে দিয়েছিলো। আমি অবশ্য আগে থেকে কিছু জানতাম ঢাবির বাংলা, বোটানি ও জুয়োলজী বিভাগে সংখ্যাগরিষ্ঠ মেয়ে আর সংখ্যা লঘু সম্প্রদায় পুরুষ ছেলে।

আমরা ক্লাস শেষে বিশেষত শীতের দিনে ডিপার্টমেন্টের সবুজ লনে শিরিষ তলায় আড্ডা দিতাম।ক্লাসের বন্ধুদের মধ্যে আমাদের একটি গ্রুপ ছিলো। গ্রুপের সদস্যরা হল রেজওয়ানুল হক রিজু, বর্তমানে জনতা ব্যাংক থেকে ডিজিএম পদথেকে অবসরে, প্রফেসর ড. কামরুল এহসান, বর্তমানে ঢা.বি.র রসায়নের শিক্ষক, প্রফেসর ড. প্রদীপ বকসী ঢা.বি.র রসায়নের শিক্ষক, এমদাদুল হক, জনতা ব্যাংক থেকে বর্তমানে অবসরে কবির হোসেন ইসলামি ব্যাংকের সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, আমি এপোলো ফার্মাসিউটিক্যাল ল্যাবোরেটরীর কোয়ালিটি এস্যুরেন্স ম্যানেজার, সাজাহান সাবেক অধ্যক্ষ দেবেন্দ্র নাথ কলেজ মানিক গঞ্জ, কামাল উদ্দিন অধ্যাপক ফেনী কলেজ, ড. তোফাজ্জল হোসেন বাচ্চু, আমেরিকা প্রবাসী, ড. গোলাম রসুল রাসেল আমেরিকা প্রবাসী (মৃত), ড. ইউসুফ মালিক কানাডা প্রবাসী।

আমাদের সাথে মেয়ে সহপাঠীরাও বসতো। ওরা হল ড. সাবরিনা মোরশেদ বারডেমে চাকরি রত, অধ্যাপিকা তাইয়েবা তাওসিক মিলু, রেবেকা সুলতানা দীপু, আনোয়ারা বেগম আনু সচিব প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়, আফরোজা বেগম এমিলি, অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী, রহিমা বেগম আমেরিকা প্রবাসী। আমরা ওদের সাথে তুমুল আড্ডা দিতাম। আমাদের মধ্যে চৌকস আড্ডাবাজ ছিলো কামরুল, এমদাদ, রিজু, প্রদীপ। ওরা মেয়েদের নাকি গলায় আবার কখনো মেয়েলি কন্ঠে মৃদু উপহাস ও রঙ, তামাসা করতো। কিন্তু কখনও শালীনতার পর্দা ছিঁড়ে যেতো না। আর একটি ব্যাপার হলো আমাদের ছেলে বন্ধুদের কেউ ওদের সাথে প্রেম করতো না। এমনকি অন্য মেয়েদের পিছনে ঘুরঘুর করতো না। আমাদের হাসি ঠাট্টা-তামাশা কখনও বাজে পরিবেশ সৃষ্টি করতো না। লন ছাড়া আমরা কেউ কোথাও কোন মেয়ে বন্ধু বা ছেলে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতাম না। তবে আমি প্রায়ই বিভিন্ন সাহিত্য আড্ডায় সরব উপস্থিত থাকতাম। আমার বন্ধুরা আমার লেখালেখির খবর জানতো, তবে ওরা সাহিত্যের ব্যাপারে একেবারে উদাসীন ছিলো। শুধু লেখা পড়ার মধ্যে ওরা ডুবে থাকতে ভালো বাসতো।

আমার কবিতা লেখা এবং আমার কবিতার আগ্রহী পাঠক ছিলো কবির হোসেন, কামাল উদ্দিন, গোলাম রসুল, তোফাজ্জল হোসেন বাচ্চু, ইউসুফ মালিক, সাজাহান। আমার সহপাঠীদের অনেককে আমার কাব্যসমগ্র দিয়েছি পরবর্তীতে। গোলাম রসুল মৃত্যুর কয়েক মাস আগে আমার কবিতা পড়ে, তার ভালো লাগার কথা মোবাইল করে জানিয়েছে। তোফাজ্জল হোসেন বাচ্চু আমেরিকা থেকে ফোন করে বলেছে, প্রায় রাতে বিছানায় শুয়ে আমার কবিতা পড়ে ও।

আমার বন্ধুদের মধ্যে কবির হোসেন, কামাল উদ্দিন, বাচ্চু, ইউসুফ মালিক, সাজাহান সহ কেউ কেউ ভক্তি ভরে আপনি বলে সম্বোধন করতো। কেন যেন একটু আলাদা রকম সম্মান করতো। হলের অনেকে অবশ্য আমাকে একটু অন্য রকম সমীহ করতো। আমার মেয়ে ক্লাস মেট দের মধ্যে যারা ফরিদপুর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে অনার্স পাশ করে এম.এস.সি.তে আমাদের সতীর্থ হয়েছিল তাদের মধ্যে খনা ও খুরশিদা অন্যতম ছিলো। খনা আমার কলেজ জীবনের ক্লাস মেট পান্নার প্রিয়তম স্ত্রী ছিলো। আমি প্রাকটিক্যালে একটু ভালো ছিলাম। ওরা আমার সহযোগিতা নিতে আমার হলে এসেছে আমার রুমের করিডরে দাঁড়িয়ে কথা বলেছে কিন্তু আমি আমার ক্লাড মেট বন্ধু পত্নীকে রুমে বসতে দিতে সংকোচ বোধ করেছি। ওরা এ জন্য কিছু মনে করেনি। ওরা আমাকে বেশ সম্মান করতো।

আমার বন্ধুদের কেউ কেউ আমার কোন কোন মেয়ে ক্লাস মেট এর সাথে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে কিন্তু আমি কোন ক্লাস মেট বিয়ে করতে রাজি হইনি। আমার মেয়ে ক্লাস মেট দের মধ্যে যে কাউকেই স্ত্রী হিসেবে পাওয়ার মৃদু স্বপ্ন ছিল না তা দিব্যি দিয়ে বলছি না। হয়তো কোন একজনকে ভালো লেগেছে কিন্তু সংস্কার ও লজ্জার কারণে মুখ খুলে বলিনি। তাছাড়া বিয়ে বা প্রেম করার উদগ্র বাসনা আমাকে উচ্চন্ড করেনি। যে সংস্কার, যে সম্মানের তাজ আমার মস্তকে যারা বা যে পক্ষ থেকে পরিয়ে দিয়েছিলো, সেই ঘরণার মেয়ে প্রজাতি আমার প্রতি সুগন্ধি রুমাল ছুঁড়ে দেয়নি। উপেক্ষার বৃন্দাবন পেরিয়ে সেই যে দেউলিয়া হয়েছি তা আর পুরন হয়নি। সবাই দূর থেকে ক্যটালিষ্ট হয়ে যে যার মতো আপন ভুবনে ডুবে গেছে।