রসায়নের মিঞা ভাই একজন সেখ মহিউদ্দিন

সেখ মহিউদ্দিন রাজবাড়ীর মেধাবী ছাত্র। এস.এস.সি. ও এইচ.এস.সি.তে প্রথম বিভাগে পাশ করেও তার মুরব্বিদের পরামর্শে সরকারি রাজেন্দ্র কলেজে ভর্তি হয়। বিজ্ঞানের ভালো ছাত্র। সে সহজেই ঢা.বি. বা বুয়েটে ভর্তি হতে পারতো। কিন্তু সুবিধাবাদী মুরব্বিদের পরামর্শে সে তার ক্যারিয়ার স্যাকরিফাইস করে। নিজেকে তাদের সিদ্ধান্তের কাছে কোরবানি করে ফরিদপুর সহরে থেকে যায় এবং রসায়ন অনার্সে ভর্তি হয়। বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া সত্তুর দশকে মফস্বল শহরের কলেজ থেকে রসায়নে দ্বিতীয় শ্রেণি পাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিলো। তারপরেও সে হয়তো না জেনে রসায়নের ঝাঁঝালো কূট গন্ধময় রসে ভুলেভালে ডুবে পড়েছিল। এমনিতেই রসায়নের সব বিষয়ে সব স্যার ভালো করে পড়াতে পারে না। বিশেষ করে, কোয়ান্টাম মেকানিক্স, স্টাটিস্টিক্যাল কোয়ান্টাম মেকানিক্স, নিউক্লিয়ার কেমিস্ট্রি, কৃস্টালগ্রাফি, ইলেক্ট্রোকেমিস্ট্রি, থার্মোকেমিস্ট্রি,রিয়্যাকশন মেকানিজম, এই সব কঠিন সাবজেক্টের কোন কোন পার্ট এত জটিল যে তা সহজে অনেক স্যারই স্বচ্ছন্দ বোধ করেন না। শ্রেণি কক্ষের ব্লাকবোর্ডের এক মাথা থেকে অন্য মাথা পর্যন্ত রাসায়নিক সমীকরন ও গানিতিক ডেরিভেশন করছেন, নোট থেকে টুকে টুকে লিখেছন কিন্তু সুস্পষ্ট ভাবে ব্যাখ্যা করতে পারছেন না। এ সব বিষয় মফস্বল শহরের স্যারেরা কতটুকু পড়াতে পারেন সে বিষয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তার ওপর এ সব বিষয়ের প্রশ্নপত্র তৈরি যদি ঢা.বি.র রসায়নের স্যারেরা করেন তবে তার সঠিক উত্তর হাতে গোনা কয়েকজনই পারবে। এই সব জটিলতার মধ্যেও মহিউদ্দিন ভাইকে অন্য রকম কাজে নিয়জিত হতে হতো। ফলে রসায়নের রস তাকে বেরসিক বিষরসে জর্জরিত করেছে। তিনি চার পাঁচ বছরের পাঠ চুকিয়ে ঢাকা এলেন। আমার সাথে হলে দেখা করলেন। আমার পরামর্শ মতো বোরহান উদ্দিন কলেজ থেকে বি.এস.সি. পরীক্ষা দিলেন। ভালো রেজাল্ট করে পাশ করলেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলিত রসায়নে এম.এস.সি.তে ভর্তি হলেন। তিনি রাজেন্দ্র কলেজে থাকা কালীন সময়ে রসায়ন বিভাগের “মিঞাভাই” উপাধি পেয়েছিলেন।

মহিউদ্দিন ভাই গনিতে খুব মেধাবী ছিলেন। অথচ তিনি কেন গনিতে অনার্স, মাস্টার্স করেন নি, তার হিসেব মিলাতে পারিনি। মহিউদ্দিন ভাই আমার সাথেই ফজলুল হক হলে এটাস্টড্ হয়েছিলেন। তিনি ফলিত রসায়নের ভালো ছাত্র হিসেবে সহজেই স্যার এবং ছাত্রদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। তার কাছে আমি সহ আরও কেউ কেউ কোয়ান্টাম মেকানিক্সের এবং স্টাটিস্টিক্যাল কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জটিল অংক গুলোর সহজ সমাধান শিখে নিতাম। অথচ আমার ম্যাডাম এ সব জটিল অংকের জট খুলেন নি ক্লাসে।

সেখ মহিউদ্দিন ভাই শেষ পর্যন্ত ফলিত রসায়ন বিভাগে এম.এস.সি.তে দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন। তার সাথে সম্ভবত দু’এক জন প্রথম শ্রেণিতে এম.এস.সি পাশ করেছে। মহি ভাই শুরু থেকে ঢা.বি.তে রসায়নে অনার্স, মাসটার্স করলে হয়তো তিনি দুটোতেই প্রথম শ্রেণি পেতেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নের শিক্ষক হতে পারতেন। জানি না তার মুরব্বীরা রসায়নের কোন ক্যাটালিস্ট ছিলো, তবে মহিভাই শেষ মেষ যথার্থই মিঞা ভাই ছিলেন, আমাদের হলে ও ক্যাম্পাসে পরম সম্মানিত ছিলেন। তার সহপাঠীদের মধ্যে শাহ আলম এবং ওয়াহিদ ভাই রসায়নের কোঅরডিনেশন বন্ড করে মফস্বলি মেঘমেঘালীতে বিশোষিত হয়েছেন।