আমার হল জীবন, আমার রসায়ন

ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হয় কোন না কোন হলের এটাস্টড হয়ে। ঢাকার বাইরে থেকে যারা আসেন, তাদেরকে হয় আত্মীয়ের বাসায় থেকে নতুবা হলে থেকে ক্লাস করতে হয়।আমি ফজলুল হক মুসলিম হলে এটাস্টড হলাম।এর দুটি কারণ ছিলো। প্রথম কারণ হল, বিজ্ঞানের মেধাবী ছাত্ররা এ হলে বেশি এটাস্টড হয়, এ হলে কোন নোংরা রাজনীতি হয়না। দ্বিতীয়টি হল ঐতিহ্যগত। বাংলার হাজার বছরের সেরা রাজনৈতিক সেরা দেশপ্রেমিক, মুসলিম জাতীয়তাবাদী, হত দরিদ্রের নেতা শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের নামে এ হলটি ১৯৪০ সনে প্রতিষ্ঠিত। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার জন্য বড়ো ভুমিকা পালন করেছেন। শেরে বাংলা আমাদের গৌরব। তিনি ১৯৩৫ সনে কলকাতার মেয়র, ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৩ পর্যন্ত তিনি অবিভক্ত বাংলার মূখ্যমন্ত্রী, ১৯৫৪ সনে পূর্ব বাংলার মূখ্য মন্ত্রী, ১৯৫৫ সনে পাকিস্তানের স্বরাস্ট্র মন্ত্রী ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৮ সন পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার মতো কারিশমাটিক নেতা আর পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ আছে।

অবশ্য এর মধ্যে তার অনুজ প্রতিম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হাজার বছরের সেরা বাঙালি ও আমাদের বাংলাদেশের জাতির জনক। আমি রসায়ন বিভাগে ভর্তি হয়ে প্রথম থেকেই এ হলের আবাসিক ছাত্র হিসেবে ক্লাস করার সুযোগ পাই। ফজলুল হক হলকে আমরা প্রায় সকলেই এফ. এইচ. হল বলে পরিচিত করি, কিন্তু এ অনিচ্ছাকৃত প্রবণতাটা ভালো নয়। একজন মহান জাতীয় নেতার নামের হলকে সংক্ষিপ্ত ভাবে বলা একটা সংগুপ্ত পাপ প্রবনতা, আমাদের ইতিহাসবিমুখ প্রবণতা। আমি এই হলের এক্সটেনশন পুরাণ বিল্ডিংয়ের ৩৩ নম্বরে থাকার পাশ মার্ক তেত্রিশ পেয়ে যাই। এই রুমে আমার ডিপার্টমেন্টর বড়ো ভাই মুস্তাফিজুর রহমান থাকতেন। হয়তো তার আনুকুল্যে এখানে সহজেই সিট পেয়ে যাই।

রুমটি বেশ বড়ো ছিলো। চার জনের চারটি সিঙ্গেল সিট থাকার নিয়ম থাকলেও সেখানে পাঁচ টি সিট ছিলো। আর প্রতি সিটেই ডবলিং করে ছাত্ররা বসবাস করতো। ছাত্র রাজনীতি, দেশীয়, আত্মীয় বা ডিপার্টমেন্টর ছাত্রের ট্যাগ লাগিয়ে দেদারসে চার জনের পরিবর্তে আট জন কখনও কখনও বা তার অধিক জনসমাগম হলে ফ্লোরে মাদুর বিছিয়ে নাক ডেকে দেদারসে রাত্রি যাপন করা যেতো। ফজলুল হক হলের প্রথম প্রোভোস্ট ছিলেন বিশিষ্ট ভাষা বিজ্ঞানী, বহুভাষাবিদ প্রফেসর ড. শহীদুল্লাহ্। আর আমি যখন এই হলে এটাস্টড হলাম তখন প্রোভোস্ট ছিলেন আমার শিক্ষক প্রফেসর ড. মহব্বত আলী। তিনি রসায়ন বিভাগের জনপ্রিয় শিক্ষক ছিলেন, দলমত নির্বিশেষে তিনি ছাত্রদের কাছে বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। আমার রুমের কয়েকটি রুমের পর চল্লিশ নম্বর রুম। এই রুমে থাকতেন, এপ্লাইড ফিজিক্স এন্ড ইলেকট্রনিকস বিভাগের নামকরা ছাত্র শাহ আলম বকসি।তিনি খুব সজ্জন এবং নামাজি পরহেজগার ছিলেন। মসজিদে নামজের মাধ্যমে তার সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। তিনি আমাকে প্রাণী বিজ্ঞান বিভাগের ফার্স্ট বয় ইসমাইল হোসেনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তিনি মেইন বিল্ডিংএর ১০২ নম্বর রুমে থাকতেন। তিনিও নামাজি ও পরহেজগার মানুষ। এইসব মেধাবী ছাত্ররা নামাজি দেখে আমার খুব ভালো লাগলো। ভাবলাম নিশ্চয়ই এদের বাবা-মার কড়া শাসনে এরও আমার মতো নামাজি হয়েছে। নামাজ না পড়লে খানা বন্ধ নিশ্চয়ই এমন শিক্ষা পেয়েছেন তারাও আমার বাবার মতো তাদের বাবা মার নিকট থেকে। আল্লাহ আমাদের রিজিকের মালিক। একজন পরহেজগার নামাজি মানুষকে তিনি কখনও না খাইয়ে রাখেন না। আর নামাজের প্রশ্নই বড়ো প্রশ্ন স্রস্টার পক্ষ থেকে। তাই সবকিছু, দলমত রাজনীতির উর্ধ্বে হচ্ছে নামাজ বা সালাত কায়েম করা। ইউনিভার্সিটিতে ধর্মীয় নৈতিকতা সব ছাত্রকে শেখানো হয় না। ফলে একজন মেধাবী ছাত্র কর্মজীবনে যেয়ে নৈতিক শিক্ষার অভাবে মেধা খটিয়ে সুচারু ভাবে দূর্নীতি করতে পারে।

এরা পাঠ্যপুস্তক পড়ার সাথে সাথে অতিরিক্ত কোরআন হাদিস ও নীতি কথা মূলক বইপত্র পড়ে। অন্যকে পড়তে উদ্বুদ্ধ করে। সপ্তাহে নামাজ শেষে মসজিদের ইমামের কাছে শুদ্ধ তেলাওয়াত ও বাংলা অর্থ সহ কোরান হাদিস পাঠ করে। বিষয়টি আমাকে কৌতুহলী করে তুলে। আমার বাবা আধুনিক শিক্ষিত, তবে তিনি পরহেজগার। তিনি কোন রাজনীতি করতেন না। তিনি বাড়ির মসজিদে প্রতিদিন কোরান তেলাওয়াত ও অর্থসহ অধ্যায়ন করতেন। ইসলামি ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত কোরানের বাংলা তর্জমা পড়তেন। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে আমাদের বাড়ির মসজিদে বাবার কোরান ক্লাস দেখতে পেয়ে কিছুটা আশ্বস্ত হলাম। ভাবলাম এরাও আমার বাবার মতো বাবার আশ্রয়ে বেড়ে উঠছেন। এটা কোন নতুন বিষয় নয়-এটা বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত বাঙালী মুসলিম পরিবারের পরিচিত চিত্র।

আমার মতে উচ্চ শিক্ষার সিলেবাসে সব বিষয়ের ছাত্র ছাত্রীদের জন্য সর্ব ধর্ম নির্বিশেষে ধর্মীয় মূল্যবোধের ভিত্তিতে নৈতিক শিক্ষার কোর্স বাধ্যতামূলক থাকা উচিত। তাহলে উচ্চ শিক্ষিত লোকের মধ্যে অনৈতিকতা ও দূর্নীতি কমে যাবে। আমাদের হলে বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্ররাই বেশি এটাস্টড হোতো।এখনও তাই হয়। আমার সময়ে সিনিয়র ভাইদের মধ্যে নামকরা ব্যাক্তিত্বদের মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হলেন, কবি ও সচিব কামাল চৌধুরী, এহসানুল হক মিলন,(সাবেক শিক্ষা মন্ত্রী)মাসুদ মজুমদার,(সাংবাদিক) আবুল কাশেম হায়দার,(এফবিআইসির সাবেক প্রধান) প্রফেসর ড.ইসমাইল হোসেন (ঢা.বি. প্রাণী বিজ্ঞান), শাহ আলম বকসি (সাবেক ডি.সি.) এ.কে.আজাদ (সাবেক প্রধান, এফবিআইসি) প্রমুখ। এদের অনেকের সাথে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিলো। এহসানুল হক মিলন রসায়ন বিভাগের আমার সিনিয়র ভাই। তিনি ফজলুল হক হলে আমাদের সময়ে পর পর দুবার ভি.পি পদে রেকর্ড সংখ্যক ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। কামাল চৌধুরী ভাইকে অল্প সময় পেয়েছিলাম। তিনি ভালো কবিতা লিখতেন। সম্ভবত হলের ওয়াল ম্যাগাজিনে তাঁর কবিতা প্রকাশ পেতো। আমি তাঁর কবিতা আগ্রহ ভরে পড়তাম। বিচিত্রাসহ বিভিন্ন ম্যাগাজিন ও দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতায় তার লেখা প্রকাশ পেতো।আমার কবিতাও বিচিত্রা সহ দেশের বিভিন্ন পত্রিকার সাহিত্য পাতায় ছাপা হতো। আবুল কাশেম হায়দার ভাই হলের সুদর্শন ও ভদ্র ছাত্র ছিলেন। তিনি মৃত্তিকা বিজ্ঞানের নাম করা ছাত্র ছিলেন। হলের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তিনি বক্তা হিসেবে অংশ গ্রহণ করতেন।

ইসমাইল ভাই আমাকে ছায়ার মতো সংগ দিতেন। আমি পারিবারিক ঐতিহ্য মোতাবেক নামাজ রোজা করলেও ইসলাম সম্পর্কে আমার তেমন সুস্পষ্ট ধারণা ছিলো না। ইসলাম বিষয়ক অনেক জটিল প্রশ্নের জবাব তিনি সহজ সরল করে বুঝিয়ে দিতেন। এর পূর্বে আমাকে অবশ্য সেখ মহিউদ্দিন ভাই ইসলাম বিষয়ে সবক দিয়েছেন। আমি কবিতা লিখতাম, অনেক পড়াশোনা করতাম। আমার বিভিন্ন রকম প্রশ্নের জবাব দিতেন মাসুদ মজুমদার। তিনি ছিলেন ইতিহাসের ছাত্র। কার্ল মার্ক্স আমার ভালো পড়া ছিলো। মার্ক্সবাদ, লেলিনবাদের শ্রেণি সংগ্রাম আমাকে আকৃষ্ট করেছিলো। আমি মাসুদ মজুমদার ভাই এর পরামর্শ মতো ইসলামি অর্থনীতি এবং শ্রেণি বিভাজন তত্ত্ব ভালো করে অধ্যায়ন করতে থাকি। এক সময় বুঝে যাই
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কেন ইসলামকে সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলেছেন।

আমি তেত্রিশ নম্বর রুমে প্রায় তিন বছর ছিলাম। এর মধ্যে অনার্স তৃতীয় বর্ষে পদার্পন করছি প্রায়। ছোট ভাই আসাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার রুমে ওঠে।এখানে থেকেই সে দর্শন বিভাগে ভর্তি হয়ে ক্লাস করেছে। তার আগে বিভিন্ন স্হানে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছে। আমি তাকে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হতে নিরুৎসাহিত করি।কারণ কলা ও বানিজ্য বিভাগে হেসেখেলে দ্বিতীয় বিভাগ পাওয়া যায়।অন্য দিকে বিজ্ঞান বিভাগে দ্বিতীয় শ্রেণি পেতে লাল সুতা বের হয়ে যায়। সাধারণভাবে পাশ করে বিজ্ঞানে কোন চাকরি নেই। অপর দিকে বিজ্ঞান ছাড়া অন্য বিষয়ে পাশ করে বি.সি.এস. বা ব্যাংক বা বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি পরীক্ষা দিয়ে সহজে চাকরি পাওয়া যায়। সেখানে কেন বিজ্ঞানে ভর্তি হয়ে কষ্ট করে পাশ করে সাধারণ চাকরির জন্য ওই একই রকম কসরত করতে হবে। তারচেয়ে কলা বানিজ্য করে চাকরির বাজারে ভালোই ব্যাবসাপাতি করা যায়।

ছোট ভাই আসাদকে তাই বিজ্ঞান ছাড়া অন্য বিষয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে বল্লাম। সে শেষ পর্যন্ত দর্শন অনার্স কোর্সে ভর্তি হল। ওর সাথে ওর কয়েক বন্ধুও জুটে গেলো। একদিন সত্যি ও জহুরুল হক হলে এটাস্টড হয়ে চলে গেলো। কারণ ইতোমধ্যে আমার রুমের আবাসিক জনসংখ্যা প্রায় বাজারের মতো হয়ে গেলো। আমি সিট ছেড়ে দিয়ে রাতে মসজিদে ঘুমাতে শুরু করলাম। আমি একটু কেন যেন ছাত্র জনপ্রিয় লোক হয়ে গেলাম। ডিপার্টমেন্টের ছোট ভাই, ছোট ভাইদের বন্ধু বান্ধবদের আবাসন সমস্যার সমাধান অনেক সময় আমাকে করতে হতো। এতে রুমে লেখা পড়ার পরিবেশ খানিকটা ক্ষুন্ন হতো। কিন্তু কি আর করবো, মানুষকে যতদূর সম্ভব সহযোগিতা করা আমার জন্মকালিন স্বভাব। ছোট সময় গায়ের জামা খুলে একজনকে দিয়েছিলাম। তারপর খালি গায়ে বাড়িতে এলে মা বিষয়টি জেনে খুব খুশি হয়ে হেসে কুটিকুটি হয়েছিলেন। আমার মায়ের সেই হাসি মাখা মুখ এখনো আমার মনের আকাশে জ্বলজ্বল করে জ্বলে, চাঁদ তারা হয়ে আমার আধারে আলো ছড়ায়।

ছোট ভাই আসাদকে হয়তো বলেছিলাম, তুই আমার মায়ের পেটের ভাই। তুই ভুল বুঝবি না, তুই তোর হলে চলে যা। আমাকে আমার হলের আরও কিছু সুবিধা বঞ্চিত ভাইদের আমার রুমে আশ্রয় দিতে হবে। আসাদ আমাকে ভুল না বুঝে জহুরুল হক হলে চলে গেল। পরে আমার খুব খারাপ লেগেছিল। আবার আনন্দও পেয়েছিলাম, এই ভেবে যে আমি স্বজনপ্রীতি করিনি। নিজের ভাইকে বেশি সুবিধা দেইনি। যে নীতির কারণে এটা করেছিলাম, সেই নীতিবাগীশদের হাতে চাকরির শেষ জীবনে ধোলাই খেয়ে বিষন্ন বদনে, বিফল মনোরথে ফিরে এসেছি। আমার স্কুল জীবনের বন্ধু এবং রাজেন্দ্র কলেজ জীবনের বন্ধু সিরাজুল হক আমার সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গনিতে ভর্তি হল।কিন্তু ও গনিতে পড়বে না। ওর টার্গেট বুয়েটে ভর্তি হয়ে ইন্জিনিয়ারিং পাশ করে ইন্জিনিয়ার হওয়া। ও ঠিক মতো ক্লাস করতো না। ও আবারও বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে লাগলো। তাই সে হলে থেকে বুয়েটে ভর্তির যাবতীয় চেষ্টা কসরত করতে লাগলো। আমার ভর্তি হওয়ার বছর খানিক পর ও আমার সাথে হলে দেখা করলো। আমি ওকে আমার তেত্রিশ নম্বর রুমে থেকে যাবতীয় প্রস্তুতির কথা বল্লাম। ও তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তাই আমার সাথে থাকার কোন অসুবিধা নেই। সিরাজ অল্প কয়েক মাস থেকেই বুয়েটে ভর্তির সুযোগ পেয়ে গেলো।ওর আনন্দ কে দেখে। আমারও কম আনন্দ হল না। যদিও আমি কখনও বুয়েটে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করিনি, কারণ আমার ইন্জিনিয়ারিং পড়ার স্বপ্ন ছিল না। তবে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন ছিল। স্কুল কলেজ জীবনে এমন স্বপ্ন অনেকের থাকে। স্কুল সহপাঠীদের মধ্যে ইমরান রংপুর মেডিকেল থেকে পাশ করে ডাক্তার হয়েছে। কলেজ জীবনের বন্ধু তাপস সাহা সিলেট মেডিকেল থেকে পাশ করে ডাক্তার হয়েছে। প্রনব কান্তি বালা অবশ্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করে ডাক্তার হয়েছে। আমি শুধু মাত্র ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিলাম কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন পাশ করে কেমিস্ট হয়েছি। বিয়ে করার সময় আমার বউয়ের ফুপাতো ভাই” ইন্জিনিয়ার” শালা তালা সারানোর মিস্তিরি আমাকে বলেছিলো, আমি কোন দোকানের কেমিস্ট?

আমার চাঁদ বদনী চেহারা আর শরীরের সাইজ দেখে শালা ভেবেছিলো আমি ঔষধের দোকানের কেমিস্ট। আমি কলেজের রসায়নের অধ্যাপনা ছেড়ে তখন ১৯৯ শান্তিবাগে অবস্থিত “ম্যাকস ড্রাগ লিঃ” এর মান নিয়ন্ত্রণ অফিসারের চাকরি করতাম। তা শালার মানে আমার সমন্ধির পছন্দ হয়নি। তিনি বুয়েটের ইন্জিনিয়ার। গর্বে মাটিতে পা পড়েনা যেন। আমার দুই শ্যালক এবং দুই ভায়রা বুয়েটের ইন্জিনিয়ার। আমার পুত্র ধন আর্কিটেক্ট ইনজিনিয়ার, আমার ছোট ভাইয়ের মেয়ে সিভিল ইনজিনিয়ার, আমার ছোট দুই বোনের মেয়ে ও ছেলে ইন্জিনিয়ার। উনি এখন পরপারে। ওনার বড়ো মেয়ে স্হপতি। অন্যান্য ছেলেমেয়েদের কেউ কেউ ডাক্তারী ইন্জিনিয়ারিং পড়েছে। আমার স্কুল জীবনের বন্ধু মোহাম্মদ আলী বুয়েট থেকে ইন্জিনিয়ারিং পাশ করে পরবর্তী কালে সেনাবাহিনীর কর্নেল হয়েছে। কলেজ জীবনের বন্ধু আশরাফুল আলম বুয়েটে থেকে ম্যাকানিক্যাল ইন্জিনিয়ারিং পাশ করে বিভিন্ন কোম্পানিতে চাকরি করে শেষে আমপাঙ মিনারেল ওয়াটার এন্ড ফুড কোম্পানিসহ আরও কয়েকটি ইন্জিনিয়ারিং কোম্পানির মালিক হয়েছিল। সে এখন পরম প্রভুর সন্নিধানে। আমি বুয়েটে আশরাফুল আলমের রুমে কয়েকবার গিয়েছি।

আমাদের হলের নতুন পাচতলা এক্সটেনশন বিল্ডিং হচ্ছিল আমার রুমের দক্ষিণ পূর্ব দিকে। সেখানে কয়েক শত ছাত্রের আবাসন ব্যাবস্হা হবে। কিন্তু হলের ছাত্রদলগুলোর নীতি হল সিট দখল দেওয়া এবং রুম দখল দেওয়া। এরপর প্রভোস্ট স্যার এবং হাউস টিউটর স্যারেরা ছাত্রদের দখলী সত্ত্ব অনুযায়ী অনেক সময় সিট এলোট করে। আমার রুমটি ছিলো পুরাতন বিল্ডিংয়ে, তাই আমাকেও নতুন ভবনে একটি সিট বরাদ্দ দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবতা হল যদি সব সিট অন্যান্য ছাত্র দ্বারা দখল হয়ে যায় তবে প্রশাসন আমাকে কি ভাবে সিট বরাদ্দ দেবে? আর যেহেতু আমি হলের কোন প্রভাব শালী ছাত্র সংগঠন করিনা তাই আমাকে আরও সতর্ক হতে হলো। আমার কিছু অনুগত ও ভালোলাগার ছাত্র বন্ধুরা আমার জন্য তাদের রুমে একটি সিট আমার জন্য নির্ধারিত করে রাখলো। সহজে বল্লে বলতে হয় প্রশাসনের অনুমতি সাপেক্ষ সিট বরাদ্দের পূর্বেই আমার সিট হয়ে গেলো ১০০৯ নম্বর রুমে। আর এ রুমের পাশেই ছিলো নামাজঘর।

আমার রুমের কয়েক রুম পরেই ছিলো নতুনবাংলা ছাত্র সমাজের এক নেতার রুম। পবিত্র রমজান মাসেও সে রুমে বাইরের মেয়েদের নিয়ে তারা মনোরন্জন করতো। এ ভাবে বেশি দিন পারেনি। আমাদের প্রচেষ্টায় ওইসব কুকর্ম বন্ধ হয়ে গেলো। তাদের রাজনীতিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশি দিন জায়গা পায়নি। বেশি দিন থাকতে হয়নি এক্সটেনশন নতুন ভবনে। অনার্স তৃতীয় বর্ষে মেইন বিল্ডিং-এ ১১৫ নম্বর কক্ষে সিট পেয়ে য়াই। এই রুমে ভু-তত্ত্ব বিভাগের ফকরুল ইসলাম ভাই একসিটে থাকতেন। আমি অন্য সিটে উঠলাম। ১০২ নম্বর কক্ষে ইসমাইল হোসেন ভাই থাকতেন। তিনি এখন আমার আরও নিকটের হয়ে গেলেন। মেধাবী ছাত্রের বাতাস পেলে অন্য সাধারণ ছাত্ররাও ভালো হয়ে যায়। আমরা ভালোই ছিলাম, তবে ইসমাইল ভাই ছিলেন সুপার। তিনি প্রাণী বিজ্ঞান বিভাগের ফার্স্ট বয়। অনার্সেও ফার্স্ট হয়েছিলেন। এ.এস.সি.তেও ফার্স্ট হবেন। সহজেই প্রাণী বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক হয়ে যাবেন। এটাই আমরা কামনা করছি। তিনি এখন প্রায়ই আমার খোঁজ খবর নিতেন। কেন্টিনে একসাথে নাস্তা করা।ডাইনিং হলে দুপুরে রাতে খাবারের জন্য লাইনে দাঁড়ানো, নামাজের ওয়াক্তে একসাথে নামাজ পড়া প্রায় নিয়মিত হয়েগিয়েছিল। ইসমাইল ভাইসহ আরও কেউ কেউ, যেমন আমার ক্লাসমেট গোলাম রসুল, সলিমুল্লা ভাই সকালে হাজির বিরিয়ানি খেতে নিমতলীতে যেতাম। এটি আমাদের হলের দক্ষিণ দিকে বঙ্গবাজারের কাছে ছিলো।

আমি একবার নিয়মিত ভাবে সকালে একমাস হাজির বিরিয়ানি খেয়েছিলাম। তখন প্রতি প্লেট বিরিয়ানির দাম ছিলো দশ টাকা। এই সময়ে হলে প্রতি মিল খাবারের খরচ পড়তো দু টাকা। কেন্টিনে পাঁচ টাকায় মুরগী, শবজি ও ডাল দিয়ে পেট পূর্তি হয়ে যেতো। আমাকে তখনকার দিনে প্রতি মাসে আব্বা খরচের জন্য ছয় হাজার টাকা হাত খরচ দিতেন। আমাদের হল সিট ভাড়া ছিলো প্রতি মাসে দুই টাকা।আমি অনার্সের পুরো সময় বৃত্তির টাকা পেতাম এবং আমার বেতন ছিলো এ কারণে মৌকুফ। আমি ভার্সিটির জীবন বেশ আয়েশ কাটিয়েছি। আমাকে টাকার জন্য চিন্তা করতে হয়নি। আমার দরদী পিতা আমাকে কোন কষ্ট করতে দেননি। এ জন্য আমি আমৃত্যু আমার পিতার জন্য পরম প্রভুর দরবারে তার কল্যানের জন্য প্রার্থনা করে যাচ্ছি। আমার পিতাকে মহান পিতাকে আল্লাহ রহম করুন, জান্নাতুলফেরদৌসের উচ্চ মাকাম দান করুন।

১১৫ থেকে ৩৪৮ নম্বর রুমে আমি সুনির্দিষ্ট সিট এলোট পেলাম। তখন আমাদের হলের প্রোভোস্ট ছিলেন প্রফেসর ড. মহব্বত আলী স্যার। তিনি রসায়নের অধ্যাপক ছিলেন। আমাকে খুব ভালো যানতেন। হাউস টিউটর ছিলেন প্রফেসর এ.টি.এম. ফজলুল হক। তিনি ভূতত্ত্ব বিভাগের নামকরা প্রফেসর ছিলেন। তিনি অত্যন্ত পরহেজগার মানুষ ছিলেন। আমাকে কেন।যেন একটু বেশি ভালো যানতেন। আবদুল কাদের স্যারও হাউস টিউটর ছিলেন। তিনি আমাদের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। হলের স্যার দের কাছে আমি খুব প্রিয় ও পরিচিত ছিলাম।এর কারণ ও ছিলো।

আমি হলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে চ্যাম্পিয়ন হতাম।বিশেষ করে, রচনা প্রতিযোগিতা, স্বরচিত কবিতা, উপস্হিত বক্তৃতা ও বিতর্ক প্রতিযোগিতায় ফার্স্ট হতাম বরাবর। ঈদ-এ-মিলাদুন্নবী স. দিবসে রচনা প্রতিযোগিতা এবং নির্ধারিত বক্তৃতায় ফার্স্ট হতাম। হলের ম্যাগাজিন ও দেয়াল পত্রিকায় আমার লেখা কবিতা, প্রবন্ধ ছাপা হতো। দেশের জাতীয় পত্রিকার সাহিত্য পাতায় প্রায় সপ্তাহে আমার কবিতা ছাপা হতো। হলের ছাত্ররা এবং স্যারেরা আমার এসব কর্মকান্ড সম্পর্কে কমবেশি অবগত হতো। ফলে সকলে আমাকে একটু আলাদা করে মূল্যায়ন করতো। বিশেষ দিবস সমূহে, জাতীয় দিবস সমূহে আমার সম্পাদনায় “স্বরান্তর” নামে একটি দেয়াল পত্রিকা বের হতো। এটির হস্ত লিখনে ও অলঙ্করণের দায়িত্ব পালন করতেন সেখ মহিউদ্দিন ভাই এবং আমার ক্লাস মেট কামালুদ্দিন আহমেদ। এই দেয়ালিকায় কবিতা লিখতো ফারুক হোসেন, গাজী এনামুল হক, সাজ্জাদ তৈমুর, কামাল উদ্দিন আহমেদ, কামাল আহমদসহ আরও অনেকে।

আমার পাশের রুমে অর্থাৎ ৩৪৬ নম্বর রুমে থাকতো আমার প্রিয় বন্ধু গোলাম রসুল রাসেল ও সলিম উল্লাহ। আমি প্রায় সময় এই রুমে আড্ডা দিতাম। লেখা পড়া ও সংস্কৃতি বিষয়ক আলাপ আলোচনা চলতো। আমি সহ ওরা দু জন মিলে রুমে ম্যাছ করে দুপুর ও রাতের খাবার খেতাম।রুমেই হিটার লাগিয়ে রান্না বাড়ার আয়োজন হতো। আমিন নামের একটি ছেলে আমাদের বাজার ও পাক করে দিতো। ওখুব সুন্দর করে পাকাতো। বেশ কিছু রুমে এই বিকল্প পদ্ধতিতে রান্নাবাড়ার আয়োজন হতো। কারণ হলের খাবারের মান তখন খুব খারাপ হতো মাঝে মাঝে। দু,তিন কেজি ডাল দিয়ে তিন/চারশত লোকের যে ডাল পাক হতো, তা হলুদ রঙের গরম পানি ছাড়া কিছু হতো বলে আমার মনে হতোনা। তদুপরি পেয়াজ পোড়া সদৃশ্য তেলে পোকাও মাঝে মাঝে তাতে পাওয়া যেতো। আবার ডাইনিং টেবিলের হাতধোয়া পানির ডিস দ্বিতীয়, তৃতীয় ব্যাচের ভোজনকারীরা ডাল ভ্রমে পাতে তুলে নিতো চামচ দিয়ে। ভাতের ওম ওঠা খশবু পাটপচা গন্ধের সৌরভে ডাইনিং হলের বাইরে এসে পর্যন্ত টাংকি মারতো, ফলে তাদের আদরে শরমিন্দা হয়ে আমরা কতিপয় মেয়েলীস্বভাবা পুরুষ বৃন্দ রুমের ভোজনে পৌরুষ দেখাতাম। কারণ এটি হলকর্তৃপক্ষের বারণ ছিলো।

আমার ক্লাস মেট গোলাম রসুল এবং সম ব্যচ মেট সয়েল সায়েন্সের সলিমুল্লা ভাই আমার খুব প্রিয় ছিলো। দুপুরে এবং রাতে ওদের রুম ৩৪৬ নম্বরে আমরা তিন জন মিলে খাবার খেতাম।আমিন নামের একটি ছেলে আমাদের বাজার ও পাক করে দিতো।ওর রান্না বেশ মজাদার ছিল। আমরা আয়েশ করে খেতাম।

এছাড়াও এই রুমে আমাদের অঘোষিত আড্ডা হতো। এ আড্ডায় কামরুল এহসান, এমদাদ ও রিজু প্রায় অংশ গ্রহণ করতো। আমরা আড্ডা দিয়ে আবার পড়তে বসতাম। আমি রাসেলের সাথে রসায়নের কমন সাবজেক্ট গুলো ডিসকাস করে পড়তাম। গোলাম রসূল রাসেল মাসটার্সে অরগানিক কেমিস্ট্রি নিয়েছিলো। আমি নিয়েছিলাম ইনঅরগানিক ও ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রি। রিজু, কামরুল, আমি, এমদাদ ইনঅরগানিক কেমিস্ট্রি নিয়ে এম.এস.সি পাশ করেছি। মাসটার্সে স্পেক্ট্রোসকপি বা বর্ণালী রসায়ন সবার কমন সাবজেক্ট ছিলো। এই সাবজেক্টে আমি আর রাসেল মাসটার্সে ডিসকার্স করে পড়তাম। আমরা এই সাবজেক্ট যদিও কঠিন ছিলো কিন্তু ভালো নম্বর পেয়েছিলাম। কামরুল এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নের প্রফেসর। এমদাদ, রিজু ব্যাংকের উচ্চপদের চাকরি থেকে অবসর নিয়েছে। সলীমুল্লাহ সোনালি ব্যাংকের উচ্চপদের চাকরি থেকে অবসর নিয়ে, কয়েক বছরের মধ্যে ইন্তেকাল করেছে।

এ সময়ে তার বয়স ষাটের মতো ছিলো। তার বিয়েতেও আমি আর রাসেল গিয়েছিলাম। সে আজ লোকান্তরিত! রাসেলও বছর আগে আমেরিকাতে চাকরিরত অবস্থায় জটিল কেনসারে ইন্তেকাল করেছে। আমার এই দুই বন্ধু। ঘনিষ্ঠ বন্ধু আজ আমাকে তার প্রিয় সন্তান মা বাবাকে ছেড়ে মহান প্রভুর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেছে। আমি ওদের মাগফিরাত কামনা করছি পরম দয়াবান মহান আল্লাহর দরবারে।

রাসেল এম.এস.সি.তে আমাদের মধ্যে যে চারজন প্রথম শ্রেণি পেয়েছিলো, তাদের মধ্যে অন্যতম। সে বৃত্তি লাভ করে আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পি.এইচ.ডি করেছে এবং সেখানে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতো। বিয়ে করেছিলো জাহাঙ্গীর নগর ইউনিভার্সিটির আমেরিকা প্রবাসী এক বিদুষী নারীকে। ওর মেয়ে সন্তান ছিলো। ওদের খুব আদর করতো। আমেরিকা থেকে ঢাকায় একবার বেড়াতে এসে আমার সাথে দেখা করেছিলো। মৃত্যুর কয়েক মাস আগে ও আমার সাথে মোবাইলে অনেক কথা বলেছে। আমার কবিতা ভালো লাগার কথা আমাকে আবেগের সাথে জানিয়েছে। মৃত্যুর আগে ও বেশ কিছু স্টাটাস দিয়েছে সাহিত্য সংস্কৃতি বিষয়ে। আমি কিছুটা অবাকও হয়েছিলাম ওর এই পরিবর্তনে কারণ ছাত্র-জীবনেও কখনও ওর সাহিত্য প্রীতির কথা আমাকে জানায়নি। তবে আমার কবিতা ও খুব পছন্দ করতো। আজ সবই ধুষর স্মৃতি হয়ে মনের আকাশে মেঘমেদুরতা সৃষ্টি করছে। বন্ধু তোমরা ভালো থেকো নিরন্তর। স্রস্টা তোমাদের ভালোবাসা দিন। আমাকে ক্ষমা করে দিন।

বন্ধু রাসেল, সলীমুল্লাহ তোমাদের সাথে জীবনে কখনও খারাপ ঘটনা ঘটেনি আমার। যদি কোন আচরণে তোমরা কষ্ট পেয়ে থাকো তাহলে আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমার রুমে ৩৪৬ নম্বর কক্ষে প্রায় তিন বছর ছিলাম। আমার রুম মেটদের মধ্যে ম্যানেজমেন্ট বিভাগের এক সিনিয়র ভাই ছিলেন। বেশ সুন্দর চেহারার, হাশি খুশি ও সদালাপী। তার নামটি এ মুহূর্তে মনে পড়ছে না। তবে খুব সম্ভব কবিরুল ইসলাম বা কবিরুল হক হবে তার নাম। তার হোম ডিস্ট্রিক্ট ছিলো বৃহত্তর কুমিল্লা জেলা।

এরপর তার সিটে আসেন জিওলজি বিভাগের এক ভাই। তার নামটা এ মুহূর্তে মনে পড়ছে না। সে আমার জুনিয়র ছিলো। আমাকে খুব ভক্তি শ্রদ্ধা করতো। চাকরি জীবনে সে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডাইরেক্টর পদে ঢুকেছে। সে বৃহত্তর নোয়াখালী জেলার অধিবাসী। আমাকে সে অনেক বিষয়ে অনুস্মরণ করতো। আমার খাওয়া দাওয়া, গোছাল, পাক পবিত্র হওয়ার পদ্ধতি, নামাজ রোজা ইত্যাদি। সেই প্রিয় অনুজের নাম মনে করতে স্মৃতি আমাকে এ মুহুর্তে সহায়তা করছে না। সে জীবনে বেশ কিছুটা সফল। শুনেছি সে খিলগাও বাসাবো এলাকায় বাড়ি করেছে। এ রুমের অনেক স্মৃতি আমার মনের মণিকোঠায় জমে আছে। এ মুহূর্তে হয়তো সবকিছু প্রকাশ করতে পারবো না।আর জীবন বড়ো রহস্য ময়। জীবনের সবকিছু প্রকাশ করে দিলে তাঁর আর চমক থাকে না। কারো প্রয়োজন হলে শেকড় সৌগন্ধ কৌটার মুখ খুলতে পারে। সেই সময়টি সম্ভবত ১৯৮৩ এর প্রথম দিকের হবে। কবি ও গীতিকার মতিউর রহমান মল্লিক আমার রুমে এসে হাজির। তার প্রতি আমার মুগ্ধতা ছিলো সেই কলেজ জীবন থেকে। কিন্তু তার সাথে আমার সাক্ষাৎ এই প্রথম। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের নামকরা ছাত্র। প্রখ্যাত কবি ও সাহিত্য সমালোচক আবদুল মান্নান সৈয়দ তার সরাসরি শিক্ষক। এমন একজন গুনি মানুষ আমার রুমে স্বপ্রোনোদিত হয়ে এসেছেন আমি এতে খানিকটা অবাক খানিকটা আনন্দিত। তার গানের সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়েছিল ফরিদপুরে এক ঈদ-এ-মিলাদুন্নবী দ.এর প্রভাত ফেরীতে, নাতে রসূল দ.এর হৃদয় ছোঁয়া নাত সমুদ্রের অবগাহনে। তিনি চমৎকার কবিতা লেখেন। তার কাব্যভাষা গানের কথা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তার কবিতা লেখা এবং শব্দ চয়নের কৌশল অনেকটা সৈয়দ আলী আহসানের মতো। তবে তা নিশ্চয়ই সৈয়দের শব্দ সম্ভার থেকে আলাদা। অনেক কথা হয়েছিল তাঁর সঙ্গে, কিন্তু তাঁকে ক্যাফেটেরিয়ায় নিতে পারিনি। আপ্যায়ন করতে পারিনি। তিনি খুব আত্মমর্যাদা সম্পন্ন মানুষ। নিজে এসেছেন। তারপরে আমার গাট থেকে কেন খরচ করাবেন। তাছাড়া তার সাথে এই প্রথম দেখা সাক্ষাৎ। ঘনিষ্ঠতা এখনো জমে উঠেনি। কিছু দিন পর হিমেল হাওয়া বইবে।তাই এই ঈষদুষ্ণ পরিবেশে ভালোলাগা ও ভালোবাসার উষ্ণ বাষ্প জমাট বাধতে পারেনি। তিনি চলে যাওয়ার পর দরোজার চিপায় হাতের আঙুলে চাপ লেগে ব্যাথা পেয়েছিলাম। মল্লিক ভাইকে নিয়ে এ বিষয়ে একটি কবিতা লিখেছিলাম। কবিতাটি আমার প্রথম কাব্য গ্রহ্ন “শ্বাপদ অরণ্যে অগ্নি শিশু”।

শহীদুল্লাহ্ হল ও ফজলুল হক হলের মাঝখানে, প্রাণী বিজ্ঞান বিভাগের উত্তর থেকে দক্ষিণ দিক পর্যন্ত একটি বিরাট পুকুর রয়েছে। পুকুরের পূর্ব দিকে মাঝ বরাবর শানবাঁধানো ঘাটলা রয়েছে। এই ঘাটলা টি ফজলুল হক হলের ছাত্র বৃন্দ ব্যাবহার করে। আর ঠিক এর বিপরীতে পশ্চিম দিকে রয়েছে আরও একটি দৃষ্টি নন্দন শানবাঁধানো ঘাটলা। এটি শহীদুল্লাহ্ হলের ছাত্র শিক্ষকবৃন্দ ব্যাবহার করে। পুকুরের চারপাশে সার বেধে নারকেল গাছসহ আরও অনেক সবুজ বৃক্ষদারুকুন্জে সুশোভিত রয়েছে। এর ফাঁকে ফাঁকে রয়েছে কালভার্টের বেঞ্চ। এ সব কালভার্টে কেবল হলের ছেলেরাই উদাস দুপুর, স্নিগ্ধ বিকেলের মোহনীয়তার মায়াজালে পরিশিক্ত হয় না বরং বিকেলের বিরহ কাতর,কিম্বা রোমান্টিক ছেলে মেয়ের জুটিও মৌন মুগ্ধ আকুলতায় ঝালাপালা হয়। দু দন্ড জিড়িয়ে নেয় বিকেলের ব্যাবহারিক ক্লাসের জড়তা ক্লিষ্ট ছেলেমেয়ের দঙ্গল। এদের ভারী উপস্থিতি পুকুরের শান্ত জলের শরীরে রোমাঞ্চকর ঢেউ সৃষ্টি করেনা সব সময়। জলের শান্ত স্নিগ্ধ হাতছানিতে কেউ কেউ সিড়ি বেয়ে একেবারে জলের উঞ্চ শীতল পরশ পেতে উদগ্র হয়ে ওঠে। পা ডুবিয়ে দেয় নীল যমুনার জলে, কেঁপে ওঠে এক অজানা আনন্দ জোছনা শিশিরে। মার্চ এপ্রিল মাসে পুকুরের পানি কমে যায়। পানির শরীর প্রচন্ড মার্তণ্ড তাপে রাগে গরগর সর্প সখা। নামলেই পশুপতি, নামলেই বৃষ-বরাহ,। জলৌকা জলজ জলপাই নয়, রুপালি জোছনার মত্সবৃন্দ লাজ লজ্জার বসন ফেলে উদাস মত্সকন্যা, শরীরের গরমে জলের নৌকায় নিজেকে ভাসিয়ে দেয়, চেতিয়ে তোলে টংকারে। কিন্তু তাদের এ যন্ত্রণা, মানুষেরা কম বোঝে। মানুষ উচ্চণ্ড ধর্ষকের মতো ঝাপিয়ে পড়ে জল জোছনার সমুদ্রে, মত্স্যকন্যাকে দোপাজা করে, কোলে করে পরম আবেগে সোল্লাসে টেনে তোলে ডাঙায়। এমনই এক চৈত্র মাসের গরমে পুকুরের মাছ গভীর থেকে ভেসে ওঠে ওপরে। হলের ছেলেরা নেমে পড়ে পুকুরের গরম জলে। আমিও নেমে পড়ি। আমি পাঁজাকোল করে সাপটে ধরে ফেলি বিশাল এক রুই মাছ। প্রায় বিশ কেজি ওজনের এই মাছ ধরে রুমে নিয়ে যাই। সেদিন রাতে এ বিশাল মাছটি রুমের সকলে মিলে রান্না করে পরম আনন্দে খেয়েছিলাম।

আজও এই বিরাট ঘটনাটি আমার মনের কোনে উঁকি দেয় বারবার। ছোট বেলায় বড়শি ফেলে মাছ ধরেছি। আমার বড়শিতে, শোল, টাকি, বাইম, বোয়াল পড়েছে কখনো কখনো। কিন্তু হাত দিয়ে বা পলো দিয়ে মাছ ধরার অভিজ্ঞতা নেই আমার। আমাদের বাড়ির পুকুরে, বিলের পুকুরে অন্যের সহায়তায় সব ধরনের মাছ মারার আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা আছে কিন্তু আমার হল জীবনের এই মত্স্য রসায়ন খুবই রোমাঞ্চকর।