আমার সোনার হরিণ চাই

রাজবাড়ী আদর্শ গার্লস কলেজ আমাকে বেশি দিন ধরে রাখতে পারেনি। কুমারী কোমলমতি মেয়েদের শিউলি বকুল চন্দন ঘ্রাণ আমাকে যতটা না আকর্ষণ করেছে তারচেয়ে ঢাকার সাহিত্যপাড়ার প্রবল প্রগাঢ় ভালোবাসার মৌ-বন্ধন আমাকে উন্মুখ উন্মুল দেওয়ানা করেছে। তবে শুধু সাহিত্য সংস্কৃতির সৌগন্ধ্য নয় বরং ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্যও আমাকে ঢাকার কোন কলেজ, ঔষধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে চাকরি নিতে হয়েছে। নিপাট সাহিত্য চর্চার জন্য সাংবাদিকতা বা কলেজ ভার্সিটির চাকরি খারাপ নয়। এবার ঢাকায় এসে সাহিত্য চর্চাকে ফার্স্ট প্রায়োরিটি দিয়ে একটি ইংলিশ মিডিয়াম কলেজে আবার অধ্যাপনার চাকরি নিলাম।কিছু দিন সেটা করে সাংবাদিকতার চাকরিতে নাম লিখিয়ে আবার হুট করে একটি ঔষধ শিল্প কারখানায় মাননিয়ন্ত্রন কর্মকর্তা হিসেবে নতুন চাকরিতে প্রবেশ করলাম। প্রতিষ্ঠানটির নাম-ম্যাকস ড্রাগ লিঃ। এটি তখন ১৯৯ শান্তিবাগে ছিলো। এখন এটি গাজীপুরের কোনাবাড়িতে।

সাহিত্য চর্চার জন্য কবি হওয়ার জন্য আমি ঢাকা শহরকে বেছে নিলাম আর যেহেতু রসায়নে এম.এস.সি নিয়েছি তাই রসায়ন বিজ্ঞানী হিসেবে নিজেকে ধরে রাখতে চাই। একজন লোক অনেক কাজই করে-আমি বিজ্ঞানী হয়ে কেন কবি হতে পারবোনা? এটা ছিলো আমার চ্যালেঞ্জ। আজ আমার পরিচয় কবি ও বিজ্ঞানী। জানিনা কতটুকু সাফল্য লাভ করেছি। সময়ই বলে দেবে আমার বক্তব্যের যথার্থতা। সাহিত্যচর্চার অনুষঙ্গ হিসেবে আমার চাকরির প্রয়োজন ছিলো এবং তা আমার শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত হওয়ারও প্রয়োজন ছিলো। বড়ো কোন ঔষধ শিল্প কারখানায় প্রবেশ করলে বড়ো চাকুরে হওয়া যাবে কিন্তু কবি ও সাহিত্য গবেষক হওয়া যাবেনা-এটা আমার প্রতীতি ছিলো।

ঔষধ শিল্প কারখানায় চাকরির সুবাদে আমি মানুষের দেহ ও শরীরবৃত্তীয় চিকিৎসায় মানসম্মত ঔষধ উতপাদন ও গবেষণায় যুক্ত হতে পেরেছি-অপরদিকে মানুষের মনো-দৈহিক চিকিৎসার জন্য সুসাহিত্য সৃষ্টির প্রচেষ্টায় নিরন্তর সংযুক্ত রাখতে পেরেছি। কবিতা লিখতে লিখতে উচ্ছন্নে গেলাম না। ভালো ছাত্র ছিলাম, তাই কবতে লিখতে যেয়ে ছাত্রত্বও বাদ গেলো না।প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল বিজ্ঞান- সত্যেন বোস, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, ড. কুদরত-ই-খোদা, ড. মোকাররম হোসেন খোন্দকার, ড. হুমায়ুন আহমেদ স্যারের প্রিয় বিষয় রসায়নে ভর্তি হলাম। এটাও হটাৎ ঘটে যাওয়া। আমার প্রিয় বিষয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েও সে সবে ভর্তি না হয়ে রসায়নের রসে রহস্যজনক ভাবে রসে টইটম্বুর হয়ে রসায়ন হল আমার। কেন কি ভাবে তা কয়েক কিস্তি আগেই বলেছি। এখন আর বহু-উক্তি করছি না।

কবিতার রসে আর রসায়নের রসে রসময় রসগোল্লা হয়ে গেলাম। ম্যাকস ড্রাগ লিঃ একটি ওষধ শিল্প প্রতিষ্ঠান। এর তখনকার চেয়ারম্যান ছিলেন এ.এস.এম.এফ করিম। তারা চার বন্ধু-মিলে এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আমি করিম সাহেবের আনুকুল্যে তত্ত্বাবধানে মাননিয়ন্ত্রক অফিসার হিসেবে চাকুরী শুরু করি। সেই থেকে একে একে এপেক্স (রিবাক ফার্মাসিউটিক্যালস) ফার্মাসিউটিক্যালস, এ্যাপোলো ফার্মাসিউটিক্যাল ল্যাবোরেটরিজ লিঃ, ইবনে সিনা ন্যাচারাল মেডিসিন লিঃ সহ বেঙ্গল গ্রুপের ফুডস এন্ড ক্যান, আম্পাং ফুডস এন্ড মিনারেল ওয়াটার প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার এবং এডভাইজার পদে চাকরি করেছি। মাঝে দু বছর সৌদি আরবের সোবাক ক্যাটারিং কোম্পানিতে ডায়টেশিয়ান পদেও চাকরি করেছি। এ সব কোম্পানিতে ঔষধ বিশ্লেষণ ও গবেষণা, তরল পানীয়, বিশুদ্ধ মিনারেল ওয়াটার তৈরি ও বিশ্লেষণ, খাদ্যদ্রব্যের খাদ্য মান ও পুষ্টি বিশ্লেষণ, যাবতীয় ভেষজ ঔষধী উদ্ভিদের ঔষধী মান বিশ্লেষণ, খনিজ উপাদান বিশ্লেষন কর্মে নিযুক্ত থেকেছি। এ সব বিষয়ে কম বেশি গবেষণা প্রবন্ধও রচনা করেছি। অনেক মেডিসিনের রিসিপি তৈরি করেছি। ঔষধ বিশ্লেষণ ও গবেষণা সংক্রান্ত শতাধিক প্রবন্ধ লিখেছি। ইংলিশ ভার্সনে রচিত এই শতাধিক প্রবন্ধের মধ্যে মাত্র কয়েকটি ছাপা হয়েছে। উল্লেখ করা যায় ঔষধ বিশ্লেষণ করতে করতে কবিতা বিশ্লেষণে, তার ছন্দ, অলঙ্কার ধ্বনিতত্ব বিষয়ে আকৃষ্ট হয়ে পড়ি এবং এ বিষয়ক গবেষণামূলক গ্রন্থও রচনা করি। এ বিষয়ক গবেষণা গ্রন্থ, “কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিতার নন্দনতত্ত্ব” এবং “ছন্দ বিজ্ঞান ও অলঙ্কার” গ্রন্থের নাম উল্লেখ করা যায়।

কবিতা লেখা, কবিতার বই বের হওয়া সন্তান জন্ম দেওয়ার আনন্দের মতো অনির্বচনীয়। নতুন ঔষধ Not new molecule তৈরির জন্য প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্টের দীর্ঘ মেয়াদি কাজ শেষে প্রয়োজনীয় তথ্য, উপাত্তের ভিত্তিতে কয়েক শত পৃষ্ঠার গবেষণা মূলক রেসিপি তৈরি করে বাংলাদেশ সরকারের ডি.জি.ডি.এ বরাবর জমা দিতে হয়।সাথে প্রয়োজনে ওই ঔষধও জমা দিতে হয়। এরপর তাদের বিশ্লেষণ, তদন্ত ও মূল্যায়ন শেষে ঔষধ তৈরির অনুমোদন প্রদান করে। এ ক্ষেত্রে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার কোন বিকল্প নেই। এত সব জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ কাজের মধ্যে আমাকে জীবনের অন্য একটি উজ্জ্বল অধ্যায়ের সাথে বিপুল ভাবে সম্পৃক্ত থাকতে হচ্ছে।