এক-এ চন্দ্র, দুই-এ পক্ষ, তিন-এ নেত্র…

আমি প্রাইমারি স্কুলে সরাসরি দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হই। এর আগে বাড়িতে প্রথম শ্রেণির, দ্বিতীয় শ্রেণির বইসহ অন্যান্য বই-পুস্তক পড়ে শেষ করে ফেলি। আমাদের বাড়ির কাচারি ঘরে সকালে অঘোষিত মক্তব চালু ছিলো। সেখানে মহল্লার ছেলে মেয়েরা পড়াশোনা করতে আসত। আমাদের বাড়ির লজিং মাস্টার ও মহল্লার মৌলবী সাহেব তাদের পড়াতেন। সন্ধায় বয়স্করা পড়তে বসত। যারা পড়তে আসত না তাদের জরিমানা গুনতে হত। আব্বার ভয়ে অনেকে পড়তে আসত কাচারি ঘরের মক্তবে। তারা বয়সে বড়ো হওয়ায় আমাদের প্রাইমারি স্কুলে তারা বাসার বেঞ্চ পেত না। আমাকে প্রথমে মহল্লার অন্য ছেলেদের সাথে একই বেঞ্চে বসতে হবে বিধায় আব্বা এমনটা করেছিলেন। প্রখ্যাত জমিদার না হলেও আমাদের পরিবারে একটি জমিদারী ভাব ছিলো। কারণ আমার দাদার আমল থেকেই আমাদের বিশাল জমিদারীর জমাজমি কমে মাত্র কয়েক শত বিঘায় বিঘায় দাড়ায়। কিন্তু জমিদারীর শান-শওকত ঠাট-বাট ঠিকই বহাল তবিয়তে বলবত্ ছিলো। বাড়িতে আমাকে এবং আমার ছোট ভাই-বোনদের আলাদা মাস্টারের নিকট পড়তে হত। আব্বা মহল্লার সাধারণ লোকজনকে ঘৃনা করতেন না কিন্তু তাদের ছেলে-মেয়েদের সাথে লেখা-পড়া করার সময় হয়ত তাদের মুখের অশুদ্ধ ভাষা এবং বকাবকি এস্তেমাল করে ফেলবে। তাই শিশু বয়স থেকে আবর্জনা প্রতিরোধের এমন জমিদারী কৌশল।

আমার আব্বা হাট-বাজারে খুব কম জেতেন। গেলেও সকাল সকাল জেতেন যাতে মানুষের ছোঁয়া ঘেষা কম লাগে। বাজার বহন করার জন্য খলই, ধামা, চটের ব্যাগ নিয়ে সাথে যেত মহল্লার কোন সহকারী। কখনো বাড়ির কাজের সহকারী। শুধু বাবাই নয় আমাদের কেউ হাট-বাজার করতে গেলে সওদাপাতি বহন করার আলাদা লোক সাথে যেত। মিয়াবাড়ির কোন মিয়াসাহেবের উপায় ছিলো না নিজ হাতে বাজারের ব্যাগ বহন করার। আমরা এখনো বাড়িতে গেলে এই নিয়মেই চলি। অথচ এই নবাবজাদারা ঢাকা শহরে নিজের বাজার সওদা ঠিকই বহন করেন। শহরের এই নবাবদের চেয়ে আরও বড়ো হোমড়াচোমরা আছে তথচ আমার বাবা অনেক আগেই ইন্তেকাল ফরমাইয়াছেন নইলে তার রাজপুত্রদের জন্য বাজার সহকারীর সরবরাহ করতেন। ফরিদপুর শহরে বাসায় থেকে যখন লেখা পড়া করতাম তখনও আমার স্নেহময়ি পিতা বাজার সওদা করার জন্য অনেক সহকারী গ্রাম থেকে প্রেরণ করেছেন। মিয়ার পুতেরা হাতে ব্যাগ নিলে কি ইজ্জত থাকে!

আমিও শহরে অন্যান্য ভাইদের মত বাজারে যেতাম তখন আমাদের সহকারী ছিলো সত্তার ও হাকিমুদ্দি। সত্তার ছিলো আমাদের প্রায় সমবয়সী। সে ছিলো একটু দুষ্ট প্রকৃতির ও রসিক জন। তার দুষ্টমির ফিরিস্তি বেশ বড়ো। অন্য প্রসঙ্গে তার কথা পরে বলা যাবে। যা হোক আমাকে একটু বড়ো ক্লাসে অর্থাৎ দ্বিতীয় শ্রেণিতে বাবার প্রতিষ্ঠিত স্কুলে ভর্তি করা হল। এখন আর আমাকে কেউ ফাজিল করতে পারবে না। বকাবকিও মুখে নেব না। খোদার মেহেরে এবং বাবার নূরের তাজাল্লী এখনও আমার ভেতরে আছে, ফলে এই জীবনে কাউকে কখনও অশ্লীল কথা বলিনি এবং বাজে বকাবকি করিনি।

ছায়া ঘেরা মায়াময় পরিবেশে সতীর্থদের সাথে মনোযোগ দিয়ে লেখা পড়া করেছি। আমার ক্লাসমেট ছিলো বাকি মিয়া, মধ্যমহল্লার ইউনুস, চরপাড়ার হারুন, ইউনুস, বিশ্বাস বাড়ির নৃপেন বিশ্বাস প্রমুখ। এরা সকলেই প্রায় আমার চেয়ে বয়সে বড়ো ছিলো। আমি ক্লাসে যথারীতি ফার্স্ট হতাম। আমাদের স্যারদের মধ্যে ছিলেন হারুনের বাবা নজিম মুনশি, বাকির বাবা মৌলবী সুলতান আহমদ, ধীরেন গুহ মহাশয়। ক্লাসে কেউ পড়া না পারলে তাকে এক ঠ্যাং উচু করে দীপ্তিমান সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে হত। আমাকে এ সব সাস্তি পেতে হয়নি। আমি বাল্যকাল থেকে মেধাবী ছাত্র হলেও একটু ভাবুক প্রকৃতির ছিলাম। হোম ওয়ার্কের খাতা ভুলে স্কুলে না নেওয়ার কারনে অথবা অন্য কোন কারনে আমাকে জীবনে একটি প্রথম শাস্তি পেতে হয়েছিল। আমাকে বা হাত পেতে দাড়াতে বলা হল। আমি ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে লজ্জায় হাত পেতে দিলাম। অমনি শপাং শপাং দুটো বেতের বাড়ি দিলেন সম্মানিত স্যার মৌলবি সুলতান আহমদ। শিক্ষকদের যে কোন শাসন ছাত্রদের চলার পাথেয়।

মহল্লার অনেক গার্ডিয়ান তাদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে ভর্তি করার সময় শিক্ষকদের বলতেন শাসন করবেন, হাড্ডি কয়খান আমার। অর্থাৎ তাদের মানুষ হওয়ার জন্য হাড্ডি ভাঙলেও দোষ নেই। যা হোক আমার হাড্ডি আল্লার ফজলে রক্ষা পেয়েছে। স্কুলে ছুটির আগ মুহুর্তে বারান্দায় সারিবদ্ধ হয়ে সমস্বর কন্ঠে শতকিয়া নামতা পড়তে হত। মৌলবি সুলতান আহমদ এই নামতার ক্লাস পরিচালনা করতেন। তার উচ্চস্বর মাইল খানেক দূর থেকে শোনা যেত। আমার কর্ণকুহরে এখনও মৌলবি সাহেবের নামতার সুরধ্বনি মৌমাছির গুঞ্জন তুলছে। এক-এ চন্দ্র, দুই-এ পক্ষ, তিন-এ নেত্র, চার-এ বেদ, পন্ঞচ-বাণ, ছয়-এ ঋতু, সাত সমুদ্র, অষ্ট বসু, নয় নবগ্রহ, দশের দিক। আমি বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করতাম। পুরস্কার পেতাম বেশ। মুখে মুখে ছড়া বানিয়ে বলতে হবে। আমি ছোটবেলা থেকে মানুষের মুখে অনেক হেয়ালি শুনেছি, যেমন: আলিফ, বে, তে, ছে মুনশি গেছে তাল গাছে। আমিও অনুষ্ঠানে ছড়া বানালাম:
ক-তে কর কর
খ-তে খর খর
গ-তে গড় গড়
ঘ-তে ঘড় ঘড়
ঙ-তে ব্যাঙ
তারে মারো ল্যাং।
চ-তে চোট্টা
ছ-তে ছোট্টা
জ-তে জড়
ঝ-তে ঝড়
ঞ-তে মিঞা
যাও খাজনা দিয়া।