শ্রীনগরে শ্রি চন্দ

শ্রীনগর বাবুবাড়ির প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমি তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হলাম। আব্বা আমাকে এই স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। নিজের গড়া স্কুল নতুন। ভালো শিক্ষক ও ভালো ছাত্রের মেলা এখনো জমে উঠেনি। তাই আমকে অত্র এলাকার নাম করা এই বিদ্যালয়ের ছাত্র বানিয়ে দিলেন। আমাকে ভালো ছাত্রদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় ফেলে দিলেন। মনে মনে ভাবলেন নিজেদের স্কুলে ফার্স্ট হওয়া, যাও বাছাধন এবার দেখবে কেমন মজা।কতো ধানে কত চাল এবার তা গুনে কড়ায় গন্ডায় হিসেব মিলাতে হতে। কিন্তু তার বাছাধনের জন্য এ সব প্রতিযোগিতা এক্কেবারে নস্যি।

এই স্কুলের ৯৫% ছাত্র হিন্দু সম্প্রদায়ের । এরা শিক্ষিত পরিবারের সংস্কৃতিবান সন্তান। শ্রীনগর গ্রামের প্রায় ৯০% হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন। এই গ্রামে একটি বড়ো বাজার আছে কুমার নদীর পাড়ে। এটি একটি ছোট নদী বন্দরের মত সমৃদ্ধ। আমরা বাজারের ওপর দিয়ে হেঁটে স্কুলে যেতাম।আমাদের মহল্লা থেকে আমি আর বাকি একসাথে স্কুলে যেতাম প্রতি দিন। গৃষ্মের দিনে মর্নিং ক্লাস চালু হত।তখন আমরা সকাল সকাল স্কুলের পথে রওয়ানা দিতাম। বাকি তাদের বাড়ি থেকে নাস্তা করে এলেও আমার মায়ের আপ্যায়ন ছাড়তে পারতো না।বাকি আমার একান্ত সহপাঠী ছিল।

মা আমাদের দু জনকে খুব যত্ন আদর করে সকাল সকলে আম-দুধ দিয়ে কখনো দুধ কাঠালের রসালো কোয়া দিয়ে পেট পুরে খাইয়ে দিতেন। আমাদের আনারসে -আম, মধুচারা আম দিয়ে ঘন দুধ দিয়ে মাখিয়ে খাইয়ে দিতেন। এইসব দুধ আমের সাথে কখনো মুড়ি আবার কখনো বা ভাত মিশিয়ে দিতেন। সেই সব রসালো মিঠে সুঘ্রাণ ময় খাবার আমরা মনের মাধুরি মিশিয়ে আসুদা পুরন করে খেতাম। এই সুস্বাদু খাবারের কথা সেই বাল্যস্মৃতির কথা বাকি আমাকে প্রায়ই বলে থাকে। যখনি গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যাই, বাকি আমাকে এ সব বলে এক প্রকার তৃপ্তি পেয়ে থাকে। আমিও সেই সোনালী কৈশোরের জল জোছনায় ভিজে যাই।হারিয়ে যাই না বলা আনন্দলোকের পরাজগতে।

আমরা সকালের নাস্তা খেয়ে দেয়ে বাড়ির কাছের বাশের সাঁকো পার হয়ে বলতলা বটতলা পারহয়ে সেখপুরার ওপর দিয়ে ময়েনদিয়ার চকে পৌঁছে যেতাম। তারপর চকের মধ্যে আকাবাকা সনের ক্ষেত মাড়িয়ে মাঋ পথের চকের মধ্যখানের আশ-স্যাওড়া তলায় বসে খানিকটা জিড়িয়ে নিতাম। তারপর আবার দ্রুত পদক্ষেপ সামনেই বাশ বাগানের ঘন জঙ্গল গা ছমছম করা নিরবতার চাদর ফুঁড়ে ক্যাচ-ক্যাচ-কট-কট-কু কু-ক্যাক-ক্যাক, খ্যাচ জাতীয় রক্তহিম করা ভুতুড়ে শব্দ আমাদের দুজনের চলার গতি বাড়িয়ে দিত। আমরা বাঁশ বাগান পার হয়ে বড়ো রাস্তায় উঠে হাফ ছাড়তাম। ভয়-কালীন দোয়া ইউনুস পড়া স্থগিত করতাম। তারপর আবার খালের ওপর সুপারি গাছের দন্ডমত সাঁকো পেরিয়ে বাজারে উঠে যেতাম। তারপর প্রিয় বিদ্যানিকেতন, বাবুবাড়ির রাজ তোরণ পাকা রাস্তা পেরিয়ে কুমার নদীর উপকন্ঠের পাকামেঝের দুটো টিনের বড়ো সোড় ঘর। এই টিন চালা ঘরের মধ্যে আমাদের বিদ্যার্জনের কসরত চলত। আমি তখনও হাফপ্যান্ট পরি। স্কুলে যাওয়ার সময় খাকি হাফপ্যান্ট ও গায়ে দামি কেরোলিনের শার্ট চড়িয়ে নিতাম। আমার মত আর কেউ এমন দামি পোশাক পরে স্কুলে যেতনা।আমাদের স্কুলে তখনো কোন নির্দিষ্ট ইউনিফরম ছিলো না। অন্যান্য ছাত্ররা যার যার তৌফিক মত পোশাক পরে যেত।হিন্দু সম্প্রদায়ের ছেলেরা কেউ কেউ হাফপ্যান্ট, কেউ বা পায়জামা পরে যেত। দু চার জন মুসলিম ছাত্র পাজামা,তহবন্দ পরে যেত।

হারুনার রশিদ আমার ক্লাস ফ্রেন্ড ছিল। সেও আমাদের গ্রামের চরপাড়া থেকে এসে আমাদের দলে যোগ দিত। সে আমার সাথে খুব ঘনিষ্ঠ ছিল। সে পাজামা পরে স্কুলে আসত। কারণ সে লম্বাটে ধরনের বয়সে একটু বড়ো ছিলো। সে আমাকে দারোগা বলত। আমি এতে ঈশত্ রেগে যেতাম কারন তখন কার দিনে ফুলপ্যান্ট পরা পুলিশ প্রোমোশন পেলে হাফ প্যান্ট পরতে বাধ্য থাকত। আমি হারুনকে হেসে বলতাম তাহলে এ এস পি এস পিরা কি লেংটি পরে? হারুন ফিক করে হেসে বলত ধুর বোকা এস পিরা লেংটি পরলে তো ডি আইজি আইজিরা লেংটা থাকবে। আমি তখন হারুন কে বলতাম তুমি একটা ফুলিশ পুলিশ। ও বলত আমি তো ক্লাসের সেকেন্ড বয় তাই আমার পায়জামা আর তুমি হলে ফার্স্ট বয় তোমার ড্রেসতো খাকি হাফপ্যান্টই হবে। এখন মুশকিল হচ্ছে আমার এক ভায়রা ভাই এসপি সে এসব সুনলে শ্যালিকাকে কথা শুনিয়ে দেবে।

আমি শ্রীনগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সব পরীক্ষায় সব ক্লাসেই ফার্স্ট হয়েছি। আমি রেকর্ড নাম্বার পেতাম। পন্ঞ্চম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় আমি অংকে একশ, বাংলায় ৯৬ নম্বর সহ অন্যান্য বিষয়ে ৯৫ থেকে শতের কাছাকাছি পেয়েছিলাম। আমার এই রেজাল্টে হেডস্যার অনাথ বন্ধু কর্মকার খুব খুশি হয়ে আমাকে একটি গোল্ডপেন উপহার দিয়েছিলেন। তিনি বাংলায় বি.এ অনার্স পাশ ছিলেন। ক্লাসে প্রয়োজন ছাড়া অতিরিক্ত কথা বলতেন না। তিনি রাশভারি রাগী মেজাজের মানুষ ছিলেন। আমাকে পুরস্কার দেয়ার সময় সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন আমার শিক্ষাকতা জীবনে আমি কাউকে লেটার মার্ক এ পর্যন্ত দেইনি। তোমরাও কেউ ষাটের ওপরে নম্বর পাওনি। সেখানে ও পেয়েছে ছিয়ানব্বই মার্ক। আমি ওকে খুশি হয়ে এই স্বর্ণকলম উপহার দিলাম। সে অনুষ্ঠানে আমাদের অংকের শিক্ষক অতুল খাঁ, সমাজপাঠের শিক্ষক হরিপদ ভট্টাচার্য ছিলেন। এরা আমাকে খুব যত্ন করে পড়িয়েছেন। হেডস্যারের সেই সোনার কলম আমাকে সোনার মুকুটের স্বর্নস্বপ্নে এখনো উতলা করছে।

আজ মনে পড়ছে বালক বেলার স্বর্নসতীর্থদের। আমার সহপাঠীঘনিশ্ঠ আমৃত্যু বন্ধু ছিল সুশীল কুমার কর্মকার। সে ছিল ক্লাসের তৃতীয় স্হান অধিকারী মেধাবী ছাত্র। সে আজ কবছর হল মৃত্যু বরন করেছে। আমি তার শ্মশানে শেষকৃত্ত অনুষ্ঠানে যেতে পারিনি। আমার তৃতীয় ভাই হাফেজ মাওলানা শাহ হাবিবুল্লাহ তার পবিত্র দেহ শ্মশানে দাহ করার সময় উপস্হিত ছিল। সে আমার মাকে মাতৃজ্ঞানে মা বলত। আমদের পরিনারের সদস্যের মত সে ছিল। ঈদ, পূজা পার্বন, বিয়ে-শাদী অনুষ্ঠানে আমাদের পরস্পরের যাওয়া আসা খাওয়া দাওয়া প্রচলন ছিল। এখনো সে ধারা বলবত আছে।