ছি কুত্ কুত্ ছিঃ

সুশীলের ডাক নাম ছিলো পোকো। অন্য বন্ধুরা তাকে পোকা বলত। এতে সে রেগে ফুলে উঠত কিন্তু তাদের কিছুই বলতোনা কেবল কথা বন্ধ করে দিত। থুতনিতে বুড়ো আঙুল লাগিয়ে তিন বার আড়ি, আড়ি, আড়ি বলে কথা না বলার দিব্যি দিত। এই বন্ধু তাদের নিজেদের ছোট্ট কারখানা থেকে আমার জন্য রুপার মেডেল গড়ে দিত। ময়েনদিয়া বাজারের এই ছোট্ট কামার শালায় সে স্কুল শেষে বিকেলে সোনা রুপার গহনা গড়তে, বড়দা অখিলকে সহায়তা করত। মাঝেমধ্যে তার বাবা পঞ্চানন কর্মকারও কাজ করতেন। তাদের দোকানে মেয়েদের গহনা গড়ার ভিড় লেগে থাকত। অখিল দা সিংগাপুর থেকে কাজ শিখে দোকানে বসেছে। তার হাতের নৈপুণ্য ছিল আকর্ষণীয়। তিনি দিলখোলা অসাম্প্রদায়িক সাধু মননের অধিকারী
ছিলেন। তিনিও আমাকে আদর করতেন। দোকানে গেলে সহকারী দিয়ে চেয়ার টানিয়ে বসতে দিত।

আমি তার ছোট ভাইয়ের বন্ধুই কেবল নয়, শাহ ইসরাইল মিয়ার পুত মিয়ার বেটা মিয়া ছাপ। বাজারে যে বড় বড় ঘরে যেতাম সকলেই এই মিয়ার বেটা মিয়াছাপকে পুচকে পোলাকে সম্মান দেখিয়ে চেয়ার টেনে বসতে দিত। যা অন্য পোলাপানের ভাগ্যে জুটতো না। আমি সুশীলের দেয়া উপহার সামগ্রী না নিয়ে পারতাম না। ওর উপঢৌকন না নিলে ও মাথা গরম করে রাগে গড়গড়ড় করত। তাই ওকে আর কখনো এ বিষয়েই শুধু নয় ওর যেকোন আদেশ আমি শিরোধার্য করে নিতাম। আমার আরও ক্লাসমেটদের মধ্যে উল্লেখ যোগ্য ছিলো নিমাই দত্ত, ধলা দত্ত, বিনয় পোদ্দার, ওর বোন বুড়ী, মজিবর সরদার, প্রমীলা, করুনা, মিলন নামের এক মেয়ে, যমুনা, হারুন, শুকুর, সৈয়দ কামরুল হক মনিরুজ্জামান প্রমুখ।

আমার উপরের ক্লাসের মধ্যে সামাদ মোল্লা, ডাক্তার মোকন্দ লাল সাহা যাকে আমি মামা ডাকতাম তার মেয়ে চায়না রাণী সাহা, বিধান দার বোন আরতিদি আমাকে খুব ভালো জানতো।আমি ভালো ছাত্র বিধায় আমার প্রতি তাদের একটি সুনজর ও কৌতুহল কাজ করত। পড়াশোনার অনেক বিষয় তারা আমার সাথে আলাপ আলোচনা করত। টিফিন প্রিয়ডে স্কুল প্রাঙ্গণে ছেলে মেয়েদের আলাদা আলাদা দিনে খেলাধুলা চলত। আমরাও মেয়েদের মত বৌ-ছি বা ছি বুড়ী খেলতাম। আমাদের মধ্যে হারুনর রশীদ ওরফে হারু দারুণ তেজে ছি বুড়ী খেলত। ও ভিষণ ভাবে দৌড়াতে পারত। ছি বুড়ী খেলায় দম বেধে ছড়া কাটতে কাটতে বিপক্ষের খেলোয়াড়দের তাড়া করে বৌ বা বুড়ীর নাগাল থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হত। দম বাধা অবস্থায় কোনো খেলোয়াড়কে ছুতে পারলে সে মারা যেত অর্থাৎ আউট হয়ে যেত খেলা থেকে। বুড়ী বাধা মুক্ত হয়ে দৌড়ে ঘরে গেলে এক গেম হয়ে যেত। ছি বুড়ী খেলায় যে ছড়া বলা হত তা খানিকটা এমন:

ছি কুত কুত ছি
মৌমাছিদের ঝি।
কামড় দিয়ে হুল ফুটাবো
মধু চুরির ঝাল উঠাবো।
ছি কুত কুত ছি
কানা বুড়ীর ঝি।
কানা বুড়ী আসবে তেড়ে
ঘর সামলা আগ বেড়ে।

এ ছড়াটিতে আমার লেখার মিশ্রণ রয়েছে, কারণ অনেক আগের লৌকিক ছড়া যার সবটি আমার স্মরণে নেই।