ও গঙ্গা ও যমুনা

আমি আর নিমাই স্কুলের পাড়ে বাবু বাড়ির ঘাটলার শান বাধানো বেঞ্চিতে বসে বসে গল্প করতাম। এব্যপারে নিমে দত্তের ভুমিকা বেশি থাকত। টিফিন পিরিয়ডে যে দিন ছেলেদের খেলা থাকতোনা সেদিন অবসরে ঘাটলায় যেতাম। ঘাটলার পাড়ে সাদ দেওয়া অঙ্গনে বড়ো থামের আড়ালে নিমাই আমাকে নিয়ে গল্পচ্ছলে নদীতে গোছলরত নারী পুরুষের উচ্ছ্বাস অবলোকন করত। অনেক গৃহবধু পিতল কাশার কলসিতে জল ভরে নিতে আসতো।ঘাটে কম লোক বিশেষত পুরুষের উপস্তিতি না থাকলে কিছু রমনী উরত পর্যন্ত শাড়ি গুছিয়ে দু পা ঈশত ফাক করে জল ত্যাগ করত। মুহূর্তে জলে কলসির ধাক্কায় ফ্রেস গঙ্গাজল কলসিতে ভরে ত্রস্ত পায়ে ডাঙায় উঠে পাকা ঘাটলার সাদওয়ালা আঙিনা মাড়িয়ে যেতে যেই উপক্রম হত নিমাই থামের আড়াল থেকে হাত তালি সোল্লাসে বলত দিদি স সি, স সি, ই রে জল নষ্ট হইয়া গেছে। ঘাটলায় একটা নাইড়া আছে। নিমাই এর সাথে আমাকে ঘাটলায় হাজির দেখে দিদি কাখের কলশির পুরো জল ফেলে দিয়ে আবার গাঙে গাঙুড়ের জল ভরত। নিমাই এর এই আচরন ও দিদির জল ফেলে দেওয়ার লজ্জায় সেদিন বড়ো আঘাত পেয়েছিলাম। নিমাইকে বলেছিলাম আমি নেড়ে ঠিক আছে। আমি দিদির জল নষ্ট করলাম কি ভাবে? আমি তো দিদির কাখের জলের কলস ছুঁই নি। বাবুদের বাঘা কুকুরটাও তো ওখানে শুয়ে আছে। তাতে জল স সি হয় না অপবিত্র হয় না। আমার বন্ধুটি সরল মনে বলেছিল কুহুর (কুকুর) তো ম্যালোচ না, নাইড়া না। তুই জলের কলস না ধরলে কি অবে। তোর একটা বাও বাতাস আছেনা? আমি ওকে বলেছিলাম তা হলে আমাকে এখানে কেন নিয়ে আসলি? আমিতো তগো বাড়িতে যাই। সুশীলের বাড়িতে ভাত তরকারি খাই।মোকন্দ মামার বাড়িতে চা নাস্তা খাই তাতে তাদের জাত যায় না? তারাতো সাহা হিন্দু। নিমে দত্ত হাসতে হাসতে বলেছিল আরে ধুর ওসব বাদ দে। দিদির সাথে একটু মস্করা করলাম। দোস্ত তুই কিছু মনে করিস না হেডস্যারের কাছে নালিস দিস না। তোরে কামরাঙা খাওয়াবানে। কমল পোদ্দার বাবুর গাছ পাকা কামরাঙা চুরি করে খাওবানে তোরে। আমি মনে মনে বল্লাম দিদি গঙ্গার জলে জল ছেড়ে যে কামে রাঙা করেছে, ডাঙায় কাখের জল ঢেলে যে কামে লাল করেছে সেখানে গাছপাকা কামরাঙা কত আর রাঙা করবে টকে জিহ্বা মুষড়ে যাবে হে।

ঘাটলার পাশে একটি নিমগাছকে ঘেরাও করে রাম কানাই সাউ একটি মন্দির গড়েছেন। সেখানে ভুমি থেকে উত্থিত আবক্ষ একটি পিতলের নারী মূর্তি আছে। কথিত আছে এক রাতেই হঠাৎ এই মূর্তির আবির্ভাব হয়েছে,ইনি শীতলা দেবী। আদ্যাশক্তি দেবী দূর্গার অবতার হিসেবে তিনি বসন্ত রোগ, ঘা, ব্রণ, প্রভৃতি রোগ নিরাময় করেন। মাঘ মাসের ৬ঠ দিনে দেবী শীতলার পূজা করা হয়। আমরা গায়েবে ওঠা এই দেবীকে দেখার জন্য কৌতুহল ভরে মন্দিরে যেতাম। রাম কানাই বাবু জমিদার পুত জমিদার হলেও কৌপীন পরে অর্ধনগ্ন আদূড় দেহেই সাধুর বেশে জীবন চালনা করতেন। আমাকে অর্থাৎ এই দামি নামি বাড়ির পুচকে নেড়েকে দেখে কদাচিৎ ভ্রু কোঁচকালেও এক্কেবারে বারন করেন নি দেবী শীতলাকে স সি বলে উপড়ে ফেলেন নি।

আর একটি ঘটনা যা সেই বালক বয়সে শুনলেও তার মর্ম এখন বুঝে কিছুটা রক্তিমাভায় বিচলিত হই। টিফিন পিরিয়ডে কোন কোন মেয়ে সতীর্থ স্কুলের পিছনে ঝোপের ভেতর জল ত্যাগ করতে বস্ত্রন্মোচন করে জরদ স্বর্নের আচমকা বেশরম করত। দুষ্ট প্রকৃতির বন্ধুদের কেউ কেউ আমাকে গোপনে ফিসফাস করে ফাস করে দিত। এ গুলো শুনে আমার ছেলে সুলভ কৌতুহল বাড়লেও দুষ্টদের কাজে সায় দিতাম না।