সোনার চান

মা আমাকে শিশুকাল থেকে চান বলে আদর করে ডাকতেন। আমিই তাঁর প্রথম সন্তান। বড় সন্তানের প্রতি মা’দের এমন দরদই থাকে। বাংলার মায়েরা তাদের প্রথম ছেলে সন্তানকে, চান, সোনা, যাদু আরও কত কি জোছনা মাখা শিশিরে ভিজিয়ে দেয়! আমার মা ও তাই এ নামে ডাকেন আমাকে। বড় আদুরে ডাক পরাণ টা ভরে যায়। ছোট কালে একবার মাকে হেসে হেসে বল্লাম, মা আমাকে চান কও ক্যান? মা আমার কথা শুনে একটু মৃদু হেসে বলতেন, কেন কি হয়েছে? তুমিতো আমার চানই। তুমি কত্ত সুন্দর। অথচ আমি দেখতে চাঁদের মত সুন্দর নই। মাকে অনেক দিন পর আবার বলেছিলাম, মা আমাকে আমার নাম ধরে ডাক না কেন? তখন মা হেসে আবার উত্তর দিলেন, তোর বাপ তোর নাম রাখছে আলীম। আর আমার বাপে তোর নাম রাখছে হাসান। এহন তুই ক, তোরে আমি কোন নামে ডাকি। তুই আমার চান। তুই আমার জান। মা’র এ কথা শুনে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি একশো কোটি চাঁদ মার মায়াবী মুখে হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে। মা একটু দম নিয়ে একটু গভীর ভাবালু গলায় বল্লেন,
তুই যেদিন জন্ম নিলি সেদিন ছিল পবিত্র জুম্মাবার সুবহে সাদিক এর সময়। জানিস তোর জন্মের আগের রাত্রে আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম- একটি ঝলমলে চাঁদ আকাশ থেকে নেমে আমার কোলের ওপর বসে পড়েছে। কী আলো চারদিকে গলিত সোনা রুপার স্রোত বয়ে চলছে। আমার আব্বাজানকে এই স্বপ্নের কথা বল্লাম। আব্বাজীর মুখে কী আনন্দ। সে কি বলেছিল, জানিস?
আমি বল্লাম নানাজী কি বলেছিলেন, বলো।
আমাকে তিনি বলেছিলেন, তোমার কোল জুড়ে এক পুত্র সন্তান আসছে। সে দুনিয়ায় খুব বিখ্যাত নামকরা গুণি লোক হবেরে মা। তুই সৌভাগ্যবতী হবি রত্ন গর্ভা হবি।
আমার আব্বাজীর কথায় বুকটা খুশিতে ভরে গেলো। তাই তোরে আমি চান কইয়া ডাকি।
আমি মাতুলালয়ে জন্ম শুক্রবার ভোরে জন্ম নিয়েছিলাম। আমার নানাজী দরবেশ প্রকৃতির পরহেজগার ছিলেন। নিজের বাড়ির আঙিনায় অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেখানে সকালে ধর্মীয় শিক্ষা দিতেন। আমার ছোট, ফরিদ উদ্দিন কিশোর কালে এই স্কুলে পড়েছেন। ছাত্রদের পি টি হতো। ছোট মামা লেফট্ রাইট করতে বলতেন।
চল চল ছাত্র দল
চলরে চল এগিয়ে চল।
দিল্লী চল্, কাশ্মীর চল
চলরে চল চল চল।
কেন এটা পিটির সময় তারা সমস্বরে বলতেন, তা কখনো মামাকে জিজ্ঞেস করিনি। কে লিখেছে ছড়াটি তাও কখনো ভাবিনি। মামা আজ নেই। নানজীও নেই।

নানাজী কেবল নিজের প্রতিষ্ঠিত স্কুলে শিক্ষাকতা করেননি বরং এলাকার লোকদের দ্বীনি শিক্ষা দিয়েছেন। জিকির আজকার মুরিদী তালিমও দিয়েছেন। নানার অই স্কুলটি খারদিয়া হাতখোলাতে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। মদন মিয়া সাহেব নানাজীকে রাজি করে গ্রামের মাঝখানে হাটখোলাতে নিয়ে যান। নানাজীর পূর্বপুরুষ ছিলেন ফরিদ উদ্দিন আরবি সাহেব। তিনি আরব থেকে ইসলাম প্রচারের জন্য ভারতে আসেন। এরপর তিনি ফতেহাবাদে আসেন এবং খানকা বানিয়ে ধর্মীয় কাজ করতে থাকেন। তার নাম অনুযায়ী এলাকার নাম হয় ফরিদপুর। ইনিই শাহ ফরিদ নামে পরিচিত। শহরে কোর্টের কাছে ফরিদ শাহ দরগাহ ও মসজিদ রয়েছে। মোগল শাসকরা তাকে বেশ জমিজমা জায়গির হিসেবে দেন। শহরের উপকন্ঠে বাখুন্ডার সন্নিকটে জয়আড় বা জয়াড় গ্রামে এদের পরিত্যাক্ত দালান কোঠা রয়েছে।

এ এলাকায় পুষ্কাকারা বা মহামারি হলে তারা জেলার বিভিন্ন এলাকায় চলে যায়। শহরের উপকন্ঠে মুসির বাজার এরাই প্রতিষ্ঠা করে। এদের বংশে ডিপুটি ওসু মিয়া সে সময়ের আলোচিত লোক ছিলেন। আমার নানাজীর পূর্ব পুরুষ জয়াড় থেকে খারদিয়া এসে বসবাস করেন। আমার নানাজী দরবেশ প্রকৃতির লোক ছিলেন। তার বেটার বউয়েরা অর্থাৎ আমার মামিমারা নানাজীকে সম্মান করে হযরত বলতেন। নানাজী রাত জেগে নামাজ পড়তেন, তছবি তাহলিল করতেন। সুর করে জিকির করতেন। বিভিন্ন কবির কবিতা পাঠ করতেন। ফারসি কবিতা সুর করে পড়তেন আমার কানে এখনো তার দু’ এক পঙক্তি বাজে।
যেমন: দরিয়া এ অত্তাই কিশতি পুলসুর হাজার।
এর অর্থ খুব ভালো না জানলেও আমার রক্তে এই অসাধারণ শের কবিতার বীজ বুনেছে সেই বালক বেলায়। নানাজী আমাকে আদর করে নানো বলতেন। কোলের ওপর বসিয়ে অনেক কবিতার সোনালি ধান রোপন করেছেন। বালক নূর, বাল্যবোধ নামে দুটি বই আমাকে পড়ার জন্য দিয়েছেন। সে সব বই এখন কোথাও পাওয়া যায় না কিন্তু ওই বইয়ের ঘ্রাণ এখনো আমার নাকে লেগে আছে।