একলা আকাশ

এখানে বড়ো একলা আকাশ
এখানে আর চাঁদ উঠে না
নাকি পারফিউম ঢেলে
মেথর বাড়িটা ডিঙিয়ে যায় সময়
পিঠ বোঝাই নীরবতা নিয়ে
একটু একটু করে এগিয়ে যায়
রায় বাড়ির বুড়ো কচ্ছপ
গত কার্তিকে ভেজা কুকুরটা
লোম ঝাঁকা দিয়ে ঝেরে ফেলে দেয়
আজকের মৃত বেদনা
এখানে বড়ো একলা আকাশ
এখানে আর চাঁদ উঠে না।
…………………………………………..

বেদনার গান

যখন চোখ দুটো ঘুমিয়ে যায়
অন্তর আলো পড়ে হৃদয় ভাঁজে
তখনও আমি একলা একা
নিস্তব্ধ পৃথিবীর দেয়ালে মন পেতে শুনি
দূর দ্বীপে কারও বেদনা বাজে।
…………………………………………..

শিরোনামহীন

অনুভূতির সর্বস্ব দিয়ে
তোমাকে অনুভব করি
নিঃশ্বাসের চেয়ে বেশি বার তোমায়
ভেতরে নেই আর বের করি
তুমি এমনই এক ক্যাপসুল আমার
তোমাকে না পাওয়ার দ্বিধায়
এখনো আমি বাঁচি মরি।
…………………………………………..

অনুভব

স্বপ্নের ভেতরে নৃত্য করে যে
তাকে কখনো দেখিনি
কিন্তু অনুভব করি সর্বাঙ্গে সবসময়।

ভোর ও রাত্রির সঙ্গম স্থলে
সে জন্ম দেয় সবচেয়ে বড়ো শক্তির
তারপর কান থেকে শিরায় শিরায়
পৌঁছে যায় তার ঘনত্ব।

হৃদয়ের চূড়ায় বসে সে
সমগ্র সুন্দরের ঘোষণাকারী
ভালো ও মন্দের পার্থক্যকারী
একই সাথে সে নিষ্ঠুর এবং
ফুলের মতো প্রেম দাতা।
…………………………………………..

অ্যালকোহল চুল

সাবধান সন্ধ্যায় বসে সুতো কাটছেন
নিশাদেবী নিক্সের মেয়ে
প্রকৃতির বাধ্যগত সন্তান হয়ে
ঘন কালো আলোতে ঢুকে যাচ্ছে
বৃক্ষজাত নারী ও পুরুষ।

ছুঁড়ে ফেলে ব্যস্ততার ভাঙা ডিম
আবার সংসারে উড়ছে
উর্বশী রমণীর অ্যালকোহল চুল।

মাটি ও মানুষের ভরে
আহা কি সুন্দর ভরে উঠেছে
দুঃখনদীর আকেরন দেয়াল।
…………………………………………..

ঈশ্বরের মৃত্যু ঘোড়া

সাধু সন্ধ্যায় জমায়িত শব্দদূষণ
লোমকূপে ঢুকিয়ে সমুদ্র হাওয়া
কানাবগি দাঁড়িয়ে থাকে
হৃদয় গভীরে নিমজ্জিত সকালের উপর।

রাত ও প্রভাতের মাঝ-বরাবর
আকাশ ছুঁয়ে যায় তীরের মতো সুক্ষ্ম নারী
রক্ত মাখা ঘাসের মাথায়
এখনো পড়ে আছে যার ধনুক শাড়ি।

পাপে পূর্ণ পৃথিবীর পথ
কোথাও কেউ নেই! কোথাও কেউ নেই
কালের বাল কাঁধে নিয়ে যায়
মৃত্যুর মতো আনন্দ-বুড়া
জগতের সব আত্মায় ঢেলে কালিদহের জল
ফাঁকা রাস্তায় টগবগ ছুটছে ঈশ্বরের মৃত্যু -ঘোড়া।
…………………………………………..

আযানের ধ্বনি

চারদিকে শুনি আযানের ধ্বনি
এইযে মরণ বিস্ময়-বিশ্ব
বাতাসে ভেসে যায় মৃত্যুর পানি
যেদিকে তাকাই বুঝি শুধু এক
একক বিধাতার অমিয় বাণী
যম-জাঙ্গালে দাখিল দণ্ড-তুফান
নির্যাতিত ধরনীর পেটে
অশ্রু অক্ষরে ফুটে দাম্ভিক মানুষের গ্লানি
বাঁচাও আল্লাহ্ বাঁচাও ভগবান করো মেহেরবানি
চারদিকে শুনি আযানের ধ্বনি।
…………………………………………..

মতি মিয়ার হাসি কান্না

বাবার মৃত্যুর একুশ বছর পর
মতি মিয়ার জন্ম হয়
এক ঝলমলে জোছনা রাতে
আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী নদী থেকে
সবুজ রঙের কুয়াশায় উঠে আসে সে।

অনন্তকাল যায়
মতি মিয়া এখনও হাসে না
সে হাসলেই পৃথিবী কাঁদে
সে কাঁদলে পোড়ে ছারখার হয়ে যায়
মানুষ ও মানুষের বংশধর।
…………………………………………..

নত মস্তক

মৃত্যু-মহামারীতে সবুজ হয়
তামাটে রঙের চোখগুলো
সিনাই মরুভূমির মতো পাষাণ নাস্তিকও
দু-একবার আল্লাহ আল্লাহ করে।

কিন্তু আমার গ্রামের মহব্বতেরা
ফুটপাতের আমির আলীরা
প্যাডেল ঘুরানো রিক্সওয়ালা
রোজকার ডাল-ভাতে সন্তুষ্ট শ্রমিক দিন- মুজুুরেরা
দুঃখে অথবা সুখে বিশ্বাসের পরিবর্তন নেই
দরিদ্রতার আকাশ ছুঁয়েও
তারা সিজদায় থাকে কাবা-শরীফে।

তারা মহামারী অথবা দুর্যোগ বুঝে-না
সোয়াইন-ফ্লু অথবা করোনা বুঝে-না।
তারা শুধু পূর্ব-পশ্চিম বোঝে
উত্তর-দক্ষিণ বোঝে
তাদের হৃদয় চিরতরে নত, নত-মস্তকে।
…………………………………………..

ভালোবাসার অর্থ

যদি ভালোবাসো প্রশ্ন করো না
দুঃখে অথবা সুখে
যদি ভালোবাসো জল ফেলো না
জন্ম অথবা মৃত্যুতে
ভালোবাসার দুঃখ অথবা সুখ
আলাদা হয় না
ভালোবাসার আনন্দ অথবা মৃত্যু
আলাদা হয় না।

মূলত ভালোবাসার অর্থ হলো
এক ও অভিন্ন আত্মার ওজন।
…………………………………………..

অনন্ত অন্ধকার

আগমনে যে নাম লেখা আছে
প্রস্থানেও সে নাম
সে প্রত্যহ ঝরে পড়ে মাটিতে।

হলুদ বাবলা বনের পরে
চোখের আলোয় নেমে আসে অন্ধকার
ধুলোয় মলিন কাকতাড়ুয়ার ছেঁড়া শার্ট।

প্রিয়তমার চোখ সম্পদের সুখ
অথবা আদরের সন্তানের মুখ
যৌবনহারা বেশ্যার মতো খদ্দেরহীন জীবন।

আনন্দ বলতে সেই চিন্তা বলতেও সেই
সে ছাড়া আমি ডোবে যাবো
অনন্ত অন্ধকারে।
…………………………………………..

জীবন এক যুদ্ধ পাখি

বনের পাখিটি জানে
নির্মম অন্ধকারে কিভাবে তাকিয়ে থাকে বন
একান্ত নদীটির কান্না কিভাবে ছুটে যায় মহাদেশ ছেড়ে মহাদেশ
জীবন এক যুদ্ধ পাখি
তার যুদ্ধের যেন হয় না কভু শেষ।।

চান্দের আলোয় ঝলসে উঠে
ফসলের বোবা চিৎকার
মানুষের মতো বোঝা নিয়ে
কি রকমভাবে বেঁচে থাকে মাটি
সময়ের স্রোতে একদিন
কমলা রঙের বিকেল ধরে
ভায়োলিনের বেশ
জীবন এক যুদ্ধ পাখি
তার যুদ্ধের যেন হয় না কভু শেষ।
…………………………………………..

নদীর মায়া

অন্ধকার পৃষ্ঠা উল্টাতে উল্টাতে
নদী নামের এক কিশোরী মেয়ে
মরে যায় আহা মরে যায় তৃষ্ণাতে।

দোলাক দোলাক ঢোলক বাজে
শালের জাহাজে চড়ে নদী
শহরের আলোতে যায় কাজে।

অদূরে কি নড়ে মানুষ ওড়ে বাঁধে
নদী তো বয়েই যায় চিরকাল
ওপারে বসে কেন ছেলেটি কাঁদে।
…………………………………………..

না লেখা চিঠি

প্রিয়তমা চলে যাচ্ছি আজ
শেষবারের মতো চলে যাচ্ছি
দুরন্ত শীৎকার ভেঙে
আগুন আগুন আকুলতা ভুলে
শব্দের মতো হারিয়ে যাচ্ছি
এই আকাশ এই আনন্দ কারুকার্য জল
এইসব সবকিছু তোমার।
তবুও তোমার জন্য রেখে যাচ্ছি
বুকের অতলে লুকানো কয়েকটি অশ্রু অক্ষর।

যদি এ পাড়ায় কখনো বাদক দল আসে
যদি কখনো ভিখিরির মুখ থেকে
বেরিয়ে আসে স্ফটিক পাথরের প্রাসাদ
যদি তুমি আত্মস্থ করতে পারো সে সুর
যে সুর বয়ে গেছে পৃথিবীর তলদেশে
যদি তুমি বুঝতে পারো মৃত নদীর কান্নাই
একদিন মানুষের কান্না হয়ে ওঠে
তবেই তুমি পড়তে পারো এই না লেখা চিঠি।
…………………………………………..

অমানুষ

দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে আছেন
মোহাম্মদী বেগ
বিষাক্ত ষড়যন্ত্রের বিষ নিয়ে
হাসতে হাসতে এগিয়ে আসছেন ঘসেটি বেগম
ভেতরে এক পা দিয়ে আকাশ চাটছেন
অতি কাছের বন্ধু ও শ্রেষ্ঠ ঘাতক মীরজাফর।

স্বপ্ন ভাঙার একশো বছর পরেও
এখনও কোথাও মানুষ দেখি না
পায়ের কাছে যে কুকুরটি বসে থাকে
জোছনা আলো পড়লেই
তাকে কেমন মোশতাক! মোশতাক! লাগে।