সম্প্রতি প্রয়াত বাংলা ভাষার বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক দেবেশ রায় (জন্ম ১৯৩৬ সালের ১৭ ডিসেম্বর-মৃত্যু ২০২০ সালের ১৪ মে) বাংলা উপন্যাসের জগতে যেমন ব্যতিক্রমী পথযাত্রী, তেমনি বাংলা ছোটগল্পের ক্ষেত্রেও তাঁর স্বতন্ত্র পদচারণা! বাংলা ছোটগল্পের বিষয়ে ও আঙ্গিক নিয়ে তাঁর নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা সাহিত্য সমালোচক ও মেধাবী পাঠককে বিস্মিত করে! একজন ব্যতিক্রমী গল্পকার হিসেবে তাঁর অবস্থান আন্তর্জাতিক স্তরের! দীক্ষিত পাঠকের লেখক দেবেশ রায় সস্তার পাঠকপ্রিয়তা কোনদিনই চাননি! তাঁর গল্পের ভাষা একেবারেই তাঁর নিজস্ব!দেবেশ রায় সাহিত্যজগতে পা রাখেন ১৯৫৩ সালে। তাঁর প্রথম গল্প ‘নিশিগন্ধা’ প্রকাশিত হয় জলপাইগুড়ি থেকে প্রকাশিত জলার্ক পত্রিকায়। ১৯৫৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হলো ‘হাড়কাটা’ নামে একটি গল্প। তখন তিনি উনিশ। তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। তারপর একটার পর একটা গল্প – ‘নাগিনীর উপমেয়’, ‘আহ্নিক গতি ও মাঝখানের দরজা’, ‘অপরাহ্নের কান্না’, ‘সাত-হাটের হাটুরে’, ‘দুপুর’, ‘বত্রিশ আঙুলে’, ‘পা’, ‘কলকাতা ও গোপাল’, ‘অসুখ’, ‘পশ্চাৎভূমি’, ‘পায়ে পায়ে’, ‘অপেক্ষায়’, ‘দাহনবেলা’, ‘নিরস্ত্রীকরণ কেন’, ‘উদ্বাস্তু’-চমকে দেওয়ার মতো সব গল্প।তাঁর প্রথম গল্পের বই দেবেশ রায়ের গল্প প্রকাশিত হয় ১৯৬৯-এ। তাতে ‘আহ্নিক গতি ও মাঝখানের দরজা’, ‘দুপুর’, ‘পা’, ‘কলকাতা ও গোপাল’, ‘পশ্চাৎভূমি’, ‘ইচ্ছামতী’, ‘নিরস্ত্রীকরণ কেন’ ও ‘উদ্বাস্তু’ – এই আটটি গল্প ছিল।তাঁর প্রথম দিকের গল্পে ফর্মের মধ্যে একটা স্বাতন্ত্র্য থাকলেও তা খুব বেশি অপরিচিত ছিল না বাংলা গল্পের পাঠকের কাছে। কিন্তু সত্তর আশির দশকের লেখা গল্পে ফর্ম আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে! ফর্ম ও গল্পের বিষয় একাকার হয়ে যায়। ফলত উপন্যাসের মত তাঁর গল্প সেভাবে সমাদর পায়নি সাধারণ পাঠকের কাছে।ঝরঝরে গদ্যে তিনি কখনোই লেখেননি। বরং ক্রমশ তিনি গল্পবিষয় ও ভাষায় অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছেন। সমসাময়িক সমাজ ও রাজনীতির প্রসঙ্গ তাঁর গল্পে যেভাবে এসেছে সমকালীন আর কারো গল্পে তেমনটা দেখা যায় না। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন এই জটিলতা তাঁকে সাধারণ পাঠকের থেকে দূরে সরিয়ে দেবে। সাধারণ পাঠক গল্পে আখ্যান চায়। চায় বিনোদন। কিন্তু তথাকথিত চিত্ত বিনোদনের জন্য লেখক হিসেবে তিনি দায়বদ্ধ নন। তাঁর দায়বদ্ধতা বৃহত্তর সময় ও সমাজের কাছে।তিনি গল্পের দুরূহ পথটিকেই বেছে নিয়েছিলেন। এবং সাফল্যের সঙ্গে আজীবন সে পথেই হেঁটেছেন।
দেবেশ রায়ের ‘আহ্নিকগতি ও মাঝখানের দরজা’ অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি গল্প। এ গল্পে লেখক তিনটি চরিত্রের পারস্পারিক সম্পর্ক ও তাকে ঘিরে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ও জটিলতার এক আশ্চর্য আবহ নির্মাণ করেছেন। গল্পের আখ্যানভাগটি পাঠকের খুব চেনা। কিন্তু অচেনা বিষয়টি হল লেখকের অনবদ্য উপস্থাপন কৌশল, বর্ণনা ও ভাষাভঙ্গি।শিশিরের দাদা প্যারালিসিস আক্রান্ত। দীর্ঘদিন সে ঘরবন্দি। স্ত্রী তটিনী তার সন্তানদেরকে যেমন স্নান করিয়ে দেয়, তেমনিভাবে নিজের স্বামীকেও। শিশিরের দাদার কোনও নাম দেননি লেখক। সে যেন একটা শিশুর মতই তটিনীর সংসারে প্রতিপালিত। দাদা উপার্জনহীন। সংসারের অভাব পূরণ করতে অফিসের পর বাড়তি ট্যুইশন করে অনেক রাতে বাড়ি ফিরতে হয় শিশিরকে। তটিনী শিশিরের জন্য সিগারেট আর সুপারি তৈরি রাখে। বৌদি শিশিরকে সিগারেটের রুটিন তৈরি করে দেয়। দিনে পাঁচটা। কিন্তু রাতে খাওয়ার পর সে কথা রাখতে পারে না শিশির। প্যাকেট থেকে বাড়তি সিগারেট টেনে নিতে গেলে “খপ করে হাত থেকে সেটা কেড়ে নেয় তটিনী।’”
আসলে গল্পকার শিশির আর তটিনীর পারস্পারিক সম্পর্কের পালাবদলকেই বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে চিহ্নিত করে তুলতে চান। অনিবার্যভাবে শিশির আর তটিনী পরস্পরের নিবিড় সান্নিধ্যে আসে, কিন্তু আশ্চর্য দক্ষতায় লেখক বারবার তাদের আসন্ন অনিবার্য জৈবনিক সম্পর্কের ইঙ্গিতকে আড়াল করেন। দীর্ঘদিন স্বামী সোহাগ বঞ্চিত তটিনী ‘ঠাকুরপো’ শিশিরের কাছে তার অক্ষম দাদার গল্প শোনায়। সারাদিন জড়ভরত হয়ে বসে থাকলেও রাত্রে তার দাদা তটিনীকে কাছে পেতে চায়। পঙ্গু মানুষটা তার অক্ষম যৌবনের তীব্র আক্রোশ নিয়ে যেন তটিনীকে গ্রাস করতে চায়। কিন্তু সে কদর্য বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করে তটিনী সমবয়সী দেওর শিশিরের কাছে ছুটে আসে। কিন্তু আগুনটা জ্বলতে জ্বলতেও জলে না।দাদার ঘর আর শিশিরের ঘরের মাঝখানে একটা দরজা। সেটা সারাদিন খোলাই থাকে। কেবল রাত হলে বন্ধ হয়ে যায়। এই মাঝখানের দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে তটিনী প্রতিদিন একটা পেন্ডুলামের মত দোল খায়।
এই গল্পের তটিনী রাতে সব কাজ শেষ করে যায় তার শোবার ঘরে। অনেকদিন ধরে সেখানে শয্যাশায়ী অসুস্থ পঙ্গু স্বামী। প্রতিদিন নিয়ম করে দুই ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে তার দেওর শিশিরকে জিজ্ঞেস করে – ‘ঠাকুরপো তোমার কিছু লাগবে?’ শিশির প্রতিদিন বলে – ‘না।’ বড় বেদনাময় এবং ব্যঞ্জনাময় এই সংলাপ। মুখ ফুটে বলতে না-পারা আশ্লেষ বাসনার প্রতিধ্বনি এই সংলাপ।তবু লণ্ঠন হাতে আরো কিছুটা সময় দাঁড়িয়ে থাকে তটিনী। একসময় আলো সরে গেলেও আলোর রেখা পড়ে থাকে দরজার বাইরে। তারপর বিকট শব্দে দরজা বন্ধ হয়। একইভাবে চলে বছরের পর বছর। তারপর একদিন পাশের বাড়িতে নতুন ভাড়াটে আসে। তারা আলাপ করতে আসে। তটিনী আর শিশিরকে স্বামী-স্ত্রী ভাবে। কেউই ভুলটা ভাঙিয়ে দেয় না। সেদিন রাতেও তটিনী বলে – ‘ঠাকুরপো, তোমার কিছু চাই?’ শিশির একইভাবে বলে, ‘না।’ শিশির মশারির মধ্যে থেকে অপেক্ষা করে কখন বিকট শব্দে দরজাটা বন্ধ হবে। কিন্তু আজ আর দরজা বন্ধ হয় না। শিশির অপেক্ষা করে। তটিনীও কান পেতে অপেক্ষা করে আহ্বানের। ‘সারারাত ভরে দুজন দুঃসাহসী পদধ্বনির কাল গুনবে, সারাটা রাত ধরে দুজন দুঃসাহসী পদক্ষেপের শক্তি সঞ্চয় করবে। সেই প্রতীক্ষা আর শক্তি সঞ্চয়ের সঙ্গে মিশে অস্তিত্বভরা অন্ধকার নিয়ে পৃথিবীটা নিজের মেরুদণ্ডের চারপাশে ঘুরবে। প্রভাত হবে।’মনের কথাটা কেউই মুখ ফুটে বলতে পারবে না। এভাবে দুজনের দেহ শীতল হবে, হিম হবে, পঞ্চভূতে মিশে যাবে। ‘আর পৃথিবীটা নিজের মেরুদণ্ডের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে, দিনরাত-রাতদিন লিখে-লিখে, মুছে-মুছে, সূর্যের চারদিকে ঘুরে-ঘুরে শীতল হবে। আরো, আরো শীতল।’
দেবেশ রায়ের প্রায় মিথ হয়ে যাওয়া গল্পগুলির মধ্যে অন্যতম ‘দুপুর’। জ্যৈষ্ঠ মাসের এক দুপুরবেলার গল্প। একটি পরিবারের পাঁচটি মানুষের দুপুরযাপনের গল্প। দুপুর-অনুভবের গল্প।‘দুপুর’ গল্পটি একটি নিখুঁত মনস্তাত্ত্বিক গল্প!যেখানে একটি দুপুরের চিত্রকল্পকে আশ্রয় করে লেখক পৌঁছে যান পাঁচটি অসমবয়সী চরিত্রের মনোজগতের গহনে। অসাধারণ কাব্যিক ও ব্যঞ্জনাময় ভাষায় গল্পকার জ্যৈষ্ঠ মাসের এক রোদজ্বলা দুপুরকে পাঁচটি চরিত্রের পার্সপেক্টিভ থেকে আলাদা আলাদাভাবে চিত্রিত করেছেন।
নিম্ন মধ্যবিত্ত চল্লিশ পেরনো যতীনবাবুর পরিবারে তিন সন্তান- চোদ্দ বছরের ছোট মেয়ে সতী, বছর আঠেরোর ছেলে মুকুল, বড় মেয়ে বছর কুড়ির মায়া ও পঁয়ত্রিশ পেরনো স্ত্রী রেণুবালা। সপ্তার অন্যদিনগুলো কাজের মধ্যে কেটে গেলেও একমাত্র রবিবার যতীনবাবুর পরিবারে একটুখানি অবসর বিনোদনের দিন। এদিনই পরিবারের কর্তার জন্য বরাদ্দ থাকে একটি ডাব ও দুটো পান। এই ডাব ও পানের অত্যল্প বিলাসিতাটুকু ছাড়া এই পরিবারে আর সামান্য কোনও বিলাসিতার অবকাশ নেই। প্রাত্যহিকতার পীড়নে ধ্বস্ত অকাল-পড়ন্ত যৌবনা রেণুবালার কাছে দুপুরটা তাই “ছোট্টখাটো ভুঁড়িঅলা মাঝবয়সী এক ভদ্রলোকের মত”। সে অনুভব করে : “দুপুরের শরীরের শক্তিটা চর্বি হয়ে যাচ্ছে, চর্বিটা হাড়টাকে ঢেকে দিচ্ছে, হাড়ের স্পর্শ আর পাওয়া যায় না, মোটা থলথলে ভুঁড়ি যেন গায়ের সঙ্গে লাগে আর পিছলোয়।”
দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর সকলেই শুয়েছে। কিন্তু কেউই ঘুমায়নি। সকলেই ভাবছে সে ছাড়া অন্যরা ঘুমাচ্ছে। রেণুবালার সাধ হয় আবার মাতৃত্বের স্বাদ পেতে। দুপুরের পেটের ভিতর সে একটা বাচ্চার নড়াচড়া অনুভব করে। যতীনবাবুর মনে হয়, “অনেক ছেলের মা, শিথিল দেহ, শ্লথযৌবন নারীর মত দুপুরটা হাঁপসাচ্ছে।” এমনই রঙহীন দুপুরের অনেক উপমা তার ভাবনায় আসে। সকলেই দুপুরের মধ্যে এক বেহালার অস্ফুট সুর শুনতে পায়। কিন্তু কেউই সুরটাকে শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি শুনে উঠতে পারে না। মায়া তার সদ্য যৌবনের অস্ফুট বাসনা নিয়ে দুপুরটাকে “ফটোয় দেখা পুরুষকে কল্পনা করার মতই বাস্তব অথচ অলীক” দ্যাখে। কিশোরী সতীর কাছে দুপুরটা ভীষণই রঙিন। তার কাছে : “টইটম্বুর, টসটস করছে দুপুরটা। মধ্য সমুদ্রের মত নিস্তরঙ্গ, বিরাট,ব্যাপক; চুম্বক পাহাড়ের মত আকর্ষক; ফুলশয্যার পুরুষের মত স্থির, সবল, জ্বলন্ত।”
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সকলেই অতৃপ্ত রয়ে যায়। কারো কাছেই দুপুরটা পুরোপুরিভাবে ধরা দেয় না। যে অলীক বেহালাটার সুর এক রহস্যলোকের সৃষ্টি করেছিল, এক মায়াবী স্বপ্নঘোর তৈরি করেছিল অচিরেই তা “একটা ট্রাকের জান্তব আওয়াজে” ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। দুপুরটা গড়িয়ে যায় বিকেলের দিকে। পরিবারের পাঁচজন সদস্যই পরস্পরের মুখের দিকে অনন্তকাল ধরে যেন কিছুর প্রত্যাশায় চেয়ে থাকে। এ গল্পের শেষে পাঠক অদ্ভুত এক অনুভূতির মুখোমুখি হন। এক অস্ফুট বিষণ্ণতা তাকে গ্রাস করে। দুপুরের চিত্রকল্পগুলির সঙ্গে চরিত্রের মনোলোকের তীব্র অন্বয় এক অনাঘ্রাত বোধের জন্ম দেয়।
মহানগর – কলকাতা বারবার বিষয় হয়ে এসেছে তাঁর গল্পে। তাঁর একটি গল্পেরই নাম ‘কলকাতা ও গোপাল’ (১৯৫৯)। হেরো পরাজিত একটি যুবকের গল্প। বিশাল যৌথ পরিবারের ছেলে গোপালের চাকরি চলে যায় হঠাৎ। তারপর চাকরির সন্ধানে ঘুরে বেড়ায় শুধু। সারা কলকাতা ঢুঁড়ে ফেলেও কোনো চাকরির ব্যবস্থা করতে পারে না। একদিন গভীর রাতে রাসবিহারী অ্যাভেন্যুর প্রস্রাবখানায় গোপালের চোখে পড়ে ভ্রূণ হত্যার বিজ্ঞাপন। আর সঙ্গে সঙ্গে সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে আত্মহত্যা করার। গলায় দেবার দড়ি, ইঁদুর-মারা বিষের জন্য ঘুরে বেড়ায়। তারপর সন্ধ্যাবেলা ক্লান্ত-শ্রান্ত-হতাশ-পরাজিত গোপাল কসবার লেভেল ক্রসিংয়ের ওভারব্রিজে উঠে পড়ে।এত ওপর থেকে লোক আর গাড়িঘোড়ার মাঝখান দিয়ে কালকের রাতের সেই পেচ্ছাবখানাটা হঠাৎ নজরে পড়ে। ‘কলকাতা, কলকাতা। হঠাৎ ঘুমটা যেন আরও পাকিয়ে ধরল সারা শরীরটাকে, মনটাকে। কলকাতা। আমি একা নই। আমি কলকাতার নই। প্রায় নিদ্রিত গোপাল রেলিঙ ধরে দাঁড়াতেই ট্রেনটা এসে গেল। ওভার ব্রিজের রেলিঙ ধরে গোপাল ঝুঁকে যায়, যেন ঘুমোতে গড়িয়ে পড়ে। ওভারব্রিজ আর মাটির মাঝখানের শূন্যতার মধ্যে পড়ে যাবার ঠিক পূর্বের হ্রস্বতম মুহূর্তে সে ভাবতে চেয়েছিল – ‘আমার মরার কোনো মানেই হয় না।’ আর, এই বাক্যটা পুরোপুরি উচ্চারণে ভাবতে পারার আগেই ইঞ্জিনের ধাক্কায় সে চাকার তলায় চলে গিয়েছিল।’ গোপাল পঞ্চাশের দশকের কলকাতার বেকার যুবকদের প্রতিনিধি। কলকাতা গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে এখানে তার সকল নাগরিক চরিত্র নিয়ে। পরে ‘কলকাতা’ নামে একটি গল্প লিখেছিলেন তিনি।
আশি-নব্বইয়ের দশকে লেখা দেবেশ রায়ের গল্পগুলিতে প্রবলভাবে রাজনীতি সচেতনতার ছাপ পাওয়া যায়। এ সময় গল্পের ফর্মকে ভেঙেচুরে এক ভিন্নধর্মী গল্প আঙ্গিক নির্মাণ করতে চাইলেন তিনি। গল্পের ভিতর আসলে কোনও গল্প থাকে না, থাকে কিছু বিচ্ছিন্ন দৃশ্যকল্প; যেগুলিকে লেখক একটি অদৃশ্য সুতোয় এক বিশেষ ক্রমানুযায়ী গেঁথে দেন। পাঠকের চিন্তাজালকে বারবার ছিন্ন করে দেন লেখক; আবার নতুন করে বুনে তোলেন গল্পের এক অচেনা অবয়ব।
২০০১ সালে প্রকাশিত ‘স্বনির্বাচিত বারো’ গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত ‘বুদ্ধ আর বুদ্ধ’ গল্পটিতে সমকালীন অটলবিহারী বাজপেয়ী সরকারের ‘পোখরান পরমাণু বিস্ফোরণ’ এর ঘটনার প্রভাব পড়েছে। পৃথিবীতে বহুবার মানব সভ্যতার উপর নেমে এসেছে হিংসা আর ধ্বংসের করাল ছায়া। হিরোসিমা-নাগাসাকিতে পরমাণু বিস্ফোরণের পর রাতারাতি পৃথিবীর মানচিত্র থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল দুটি শহর। পরবর্তী কয়েক দশক ধরেও জাপানিরা সেই পারমাণবিক শক্তির ভয়ংকর অভিশাপের নিদারুণ আঘাত সহ্য করেছে; তবু পৃথিবীর দেশগুলো নিজেদেরকে আরও শক্তিধর করে তোলার উদ্দেশে নানা রকম হন্তারক অস্ত্রশস্ত্রের উদ্ভব করে চলেছে। চলছে পারস্পারিক ক্ষমতা প্রদর্শন। আলোচ্য গল্পে খুব স্বল্প পরিসরের মধ্যে লেখক গৌতম বুদ্ধের অহিংসতার আদর্শের বিপ্রতীপে মানব সভ্যতার এইসব ভয়ংকর হিংসাত্মক কার্যকলাপকে তীব্র ব্যঙ্গাত্মক ও তির্যক ভাষায় আক্রমণ করেছেন। গল্পের শুরুতে কথক জানিয়েছে প্রসিদ্ধ কিছু বৌদ্ধমূর্তি দর্শন, কিছু বৌদ্ধ গ্রন্থ পাঠ ইত্যাদির বাইরে গৌতম বুদ্ধের সঙ্গে তার সম্পর্ক বা জ্ঞান বেশি নয়। বুদ্ধদেবের অহিংসার আদর্শের সঙ্গে সমকালীন পৃথিবীর অনিবার্য সংঘাত চলছে। খবরের কাগজে ফলাও করে বেরুচ্ছে রোজ এইসব খবর। মানুষ যেন বুদ্ধের সঙ্গে তীব্র রসিকতায় করছে :“ভারত সরকার পোখরানে যে দু-দফা আণবিক বোমা ফাটালেন সেই কর্মসূচীর নাম নাকী ছিল ‘বুদ্ধের হাসি’,…এত কিছু থাকতে বোমার সঙ্গে বুদ্ধকে জড়িয়ে দেবার মধ্যে গোপন কোনও চিন্তা ধরা পড়ে যায়।…ইতিহাস তো এমন সব কাণ্ডতে ঠাঁসা। হিরোসিমার উপর পৃথিবীর প্রথম ও এখনো পর্যন্ত শেষ, আণবিক বোমাটির নাম দেয়া হয়েছিল ‘লিটল বয়, বাচ্চা ছেলে।”
বস্তুত সাধারণ মানুষের পক্ষে এই চরম বিপ্রতীপতাকে মেলানো অসম্ভব। কথকের স্ত্রী গান গেয়ে যে বুদ্ধমূর্তি উপহার পায় তার স্থান হয় ফ্ল্যাটের সবচেয়ে অন্ধকার কোনটিতে। কিন্তু কথক অনুভব করে শেষ রাত্রে সেই অন্ধকার জায়গা থেকে উজ্জ্বল বিভা ছড়িয়ে “বুদ্ধ তার ত্রিঠামে দাঁড়িয়ে আছেন।’” কিন্তু গল্পের শেষে যে আলোর উৎসারের দিকে লেখক ইঙ্গিত করেছেন তাও মুহূর্তে ধ্বংস হয়ে যায়। এক আশাহীন উত্তরণহীন পৃথিবী নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে :“বড় জোড় পাঁচ পা হেঁটে বুদ্ধের সামনে পৌঁছবার আগেই, ঐ পাঁচ পা ব্যবধানের মাঝখানেই সহস্র সূর্যের আলোতে অন্ধ করে এই ফ্ল্যাটে একটা বোমা ফাটল।”
মেধাবী মননের লেখক দেবেশ রায় কাহিনী লেখেন না, গল্প লেখেন। তাঁর একটি অচেনা গল্প ‘মানচিত্রের বাইরে’ । এই গল্প কোনো এক খবরের কাগজের কলম লিখিয়ে পরমহংস ও ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার বিনয়ের। আবার এই গল্পে জড়িয়ে আছে পরমহংসের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে যাওয়া তার স্ত্রী অনু আর কন্যা বাবিও। কোনো এক দোসরা শ্রাবণের জন্য অপেক্ষা করছিল পরমহংস। সেদিন সে অনুর কাছে যাবে। অনুর জন্মদিনের উইশ করতে। এই গল্প সেই দোসরা শ্রাবণের। সেই দিনের বিকেলটিকে পরমহংস খোলা রাখতে চায়। তার কাগজের নিউজ এডিটর পরদিন থেকে একটি লেখা ছাপতে যাচ্ছেন, ক্যালকাটাজ ইজি ডেথ, ‘কলকাতার সহজ মৃত্যু’ এই শিরোনামে। লেখা দেওয়া হয়ে গেছে পরমহংসের। বিনয় দেবে ছবি। বিনয় যদি বিকেলের মধ্যে না আসে, আর ছবি যদি সন্ধের ভেতরে ঠিক না করে নিতে পারে পরমহংসের যাওয়া হবে না গলফ লিংক। বিচ্ছেদের পর অনুর সঙ্গে বা মেয়ে বাবির সঙ্গে তার দেখা হয়নি। বাবি একটি চিঠি তাকে দিয়েছিল, কিন্তু সেই চিঠির ভেতরে বাবির সম্বোধনে ছিল আড়ষ্টতা।পরমহংস টের পাচ্ছে এক নিষ্পত্তিহীন যৌনতা তাকে প্রবল টানছে। তার কোনো তৃপ্তি অন্যত্র নেই। এমনকি অনুতেও নেই। কিন্তু যৌন টান রয়েছে প্রবল। সকাল ১০টায় জানালা দিয়ে দেখা পাশের বাড়ির দেয়াল, জানলায় নিমের ছায়ার দোলায় সেই যৌনতা মিশে যায়। মানিকতলা মোড়ে হঠাৎ বৃষ্টি ঝেঁপে আসার ভেতরে, রাস্তার আকস্মিক জনহীনতার ভেতরে… পরমহংসের দিন যাপনের ভেতরে, দোতলা বাসের ওপর থেকে দেখা শহর, এয়ারপোর্টের ভিআইপি লাউঞ্জে, দুর্গাপুর ব্রিজের মাঝখান থেকে দেখা পশ্চিমমুখো রেললাইনগুলোর ধাবমান প্রান্তরে বয়ে যায় অনুর শরীরের শাণিত ইস্পাত। দেবেশ রায় লিখছেন, ‘এই শহর কলকাতার অনুপ্রাসহীন সীমান্তহীন কলকাতার নাগরিক বিস্তার জুড়ে অনুর শরীর নিয়ত অন্বিত হয়ে থাকে পরমহংসের কাছে যৌনের আসঙ্গে।’ ওই যৌনই তাকে টানছে অনুর কাছে। টানছে অনেক দিন, কিন্তু সে এড়িয়ে থাকতে পেরেছে দোসরা শ্রাবণকে সামনে রেখে। যে স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ হয়ে গেছে, সেই স্ত্রীর প্রতি এই টান বোধ করার কোনো আইনি অধিকার, সামাজিক অধিকার তার নেই। গল্পের চালচিত্র এই। আর গল্প হয় বিনয়ের ছবি আর তার নিবার্চন নিয়ে।
পরমহংসের দ্বিধা আছে গলফ লিংক যাওয়ায়। তাই সে অনুর জন্মদিন এই দোসরা শ্রাবণ পর্যন্ত তা পিছিয়ে রেখেছিল। আজ বিনয় কখন ছবি দেবে, তার ওপর নির্ভর করছে তার যাওয়া। বিনয় কত ছবি নিয়ে বসে আছে তার নিজের ঘরে। পরমহংস যায় দুপুরে সেখানে। ফিরেও আসে। হাওড়া ব্রিজের একটা গর্ত থেকে আচমকা গলে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে এক পথচারীর। তা নিয়ে খুব হৈচৈ হয়েছিল। তারপর এই শহরে যে যে সহজ মৃত্যুর বিষয় আছে, উপায় আছে সেই কাহিনী বেরোবে পরমহংসের পত্রিকায়। বিনয়ের সঙ্গে পরমহংস ছবির কথা বলতে থাকে। ঘেঁস চুরি করতে গিয়ে ঘেঁসের গুহার ভেতরে শিশুর মৃত্যু, রাস্তায় ঘুমন্ত পথচারীর ওপর মাতাল লরি, গঙ্গার তীরে শত বছরের পুরোনো বাড়ির ছাদ ভেঙে মৃত্যু সেখানে আশ্রয় নেওয়া মানুষের। সেই ছবি নেওয়া হয়েছিল গঙ্গার ভেতর থেকে। মৃত্যুর খবরও সাজিয়ে পরিবেশন করতে হয়। তারা মৃত্যু নিয়েই কথা বলে যায়।
গল্পের ভেতরে চলে আসে ঘেঁসের গুহার ভেতরে ঢুকে শিশু মৃত্যু। খোলা হাইড্রান্টে পড়ে শিশু মৃত্যু কমন, কিন্তু ক্রমাগত গর্ত খুঁড়ে ঘেঁসের গুহার ভেতরে ঢুকে গিয়ে ১৫-২০টি বাচ্চার মৃত্যু স্টোরি হিসেবে অভিনব নিশ্চয়। আসলে এই গল্প মৃত্যুর গল্প। সহজ মৃত্যু সব সময় রহস্যময়। ঘেঁস দিয়েই এই মৃত্যুর কাহিনী খবরের কাগজে শুরু হবে। কলকাতার সব হাউজিং প্রজেক্টই ঘেঁস দিয়ে ভরাট করা জমিতে মাথা তোলা। ঘেঁস আসলে কবরখানা।আসলে মৃত্যুর কথাই বলতে বসেছেন দেবেশ রায়। সহজ মৃত্যু। এই যে সময় যায়, বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হয়ে যায়, গলফ লিংক যাওয়ার সময় পেরিয়ে যায়। পেরিয়ে যাওয়া মানে আবার কোনো এক চৈত্র বা ফাল্গুনের জন্য অপেক্ষা করা। পরমহংসের কাছে বিনয় শুনতে চায় মৃত্যুর এক ধারাবিবরণ। পরমহংস তা শোনাতে আপত্তি করেনি। শোনাতে শোনাতে সে বোঝে অনু দূরে সরে যাচ্ছে। বিনয় তার কোলে ফেলে দিয়েছে অনেক মরা মানুষের ছবি। পরমহংস ঘাড় নামিয়ে দ্যাখে, থালাভরা জলে যেম গ্রহণের সূয দ্যাখে—মৃতদেহ ভাসা স্রোতে আরো যুগ-যুগান্তরের পারে চলে চলে যাচ্ছে দোসরা শ্রাবণ।
‘দরজা’ গল্পটি দেবেশ রায়ের জীবন সায়াহ্নের একটি উল্লেখযোগ্য গল্প। জীবনের অন্তিম পর্বে এসেও লেখকের সমাজবীক্ষা যে কতটা গভীর ও তীব্র এ গল্পে তার পরিচয় আছে। সমকালীন সময়ের হৃৎস্পন্দনকে তিনি আজীবন একজন প্রাজ্ঞ দার্শনিকের মত মাপতে সক্ষম ছিলেন। ‘দরজা’ গল্পে উঠে এসেছে। অনতি অতীতে রাজ্যে যে ভুয়ো ডাক্তার আটক অভিযান চলেছে ও তার ফলে হাজার হাজার ভেকধারী, মিথ্যে ডিগ্রীধারী ডাক্তারের সন্ধান মিলেছে। মুমূর্ষু মানুষের জীবন নিয়ে এই ভঙ্ককর ব্যবসা যারা করছেন তারা হয়তো আয়নার সামনে কোনোদিন দাঁড়াবার অবসর পান না। কিন্তু সময় তাদেরকে ঠিকই চিহ্নিত করে দেয়। এ গল্পের নায়িকা অম্বিতা তার ডাক্তার স্বামীর ক্লিনিক থেকে একটা ফোন পায়। তার স্বামীকে কারা যেন ধরে নিয়ে যাচ্ছে। অম্বিতা প্রথমে ব্যাপারটাকে ততটা সিরিয়াসলি না নিলেও ক্রমশ আতঙ্কিত হয়ে ওঠে :
“বিপন্নতা বোধ, আক্রান্ত হওয়ার আতঙ্ক, বাড়ির লোকের বাড়ি না ফেরার ভয়, মেয়ের ধর্ষিত হওয়ার ঘটনা- এমনই ছড়িয়ে পড়েছে হাওয়ায়, মাটিতে, ঘুমে…।”
গল্পকার অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও ব্যঞ্জনাধর্মী ভাষায় অম্বিতার মনের সেই অসহার আর উদ্বেগপূর্ণ অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন। তার ডাক্তার স্বামীকে কারা ধরে নিয়ে যেতে পারে। গাড়ি বের করে বাইরে বেরোনোর আগে সে টিভিতে দেখতে পায় তার স্বামী ডক্টর অনুপম গুহনিয়োগীকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। এই প্রথম অম্বিতা জানতে পারে তার স্বামী আসলে কোনও ডাক্তারই নয়। তার সব ডাক্তারি সার্টিফিকেট মিথ্যে। এতো ধন-ঐশ্বর্য, সম্মান আর প্রতিপত্তির নেপথ্যে আছে তার স্বামীর ঘৃণ্য প্রতারক রূপ। কেবল অম্বিতাকেই সে ঠকায়নি, সমগ্র সমাজের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। যে ডাক্তার স্বামীকে নিয়ে তার গর্ব ছিল, অহংকার ছিল তা নিমেষে লুপ্ত হয়ে যায়। লালবাজার থানায় গিয়ে অম্বিতা যে দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢোকে তাকে লেখক সাংকেতিকভাবে উপস্থাপিত করেছেন। যেন একটা অন্ধকার সুড়ঙ্গ পেরিয়ে অম্বিতা গিয়ে পৌঁছয় স্বামীর মুখোমুখি। দুজনের কথোপকথনের মধ্যে ডাক্তারের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুর শোনা যায় :“ছ-বছর বিলেতে থাকা পাত্রকে তোমাদের বাড়ির লোকেরা যদি এম-আর-সি-পি ধরে নেয়, তার জন্য আমি কী দায়ী?”
গল্পের শেষে উকিল অম্বিকার কাছে জানতে চেয়েছে তার সঙ্গে তার স্বামীর কতদিন বিয়ে হয়েছে। এর উত্তরে অম্বিতা জানায় সে মামলার সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই। অম্বিতা ঘুরে দাঁড়িয়ে সবাইকে পিছনে ফেলে বন্ধ দরজার দিকে এগিয়ে যায়। আসলে দরজাটা অম্বিকার জন্য আদৌ খুলবে কি না তারও কোনও নিশ্চয়তা নেই। এতো দিন যে সে আসলে একটা ভুয়ো ডাক্তারের সংসারে থেকে যাবতীয় সুখ-ঐশ্বর্য ভোগ করছে তার দায়কে সে অস্বীকার করবে কেমন করে? রত্নাকরের পাপের ভাগ তাকেও তো নিতে হবে।

গল্পের বিষয়কে তিনি প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন সমাজভিত্তিতে। তিনি মনে করতেন এটা একজন লেখকের দায়। ১৯৭৬ সালে লেখা ‘বাংলা ছোটগল্পের আধুনিকতা’ প্রবন্ধে তিনি লিখছেন –
‘গল্প-উপন্যাসের, কথাসাহিত্যের, প্রকরণগত শুদ্ধতা প্রতিষ্ঠার দায় আজকের আধুনিক লেখক হিসেবে আমাদের ওপর বর্তায়। গল্প-উপন্যাস খবরের কাগজের গ্রন্থরূপ নয়, গল্প-উপন্যাস শব্দাশ্রিত শিল্প। আর-সব শিল্পের মতই তাই এই শিল্পের ক্ষেত্রেও এই প্রাথমিক উপকরণের ওপর শিল্পীর ক্ষমতার প্রতিষ্ঠার দ্বারাই আধুনিক কথাসাহিত্যিকের প্রাথমিক বিচার হবে। আধুনিক ভাষা ছাড়া আধুনিক গল্প-উপন্যাস রচনা সম্ভব নয়। যে-লেখক ভাষাসচেতন নন, তিনি ভাল গল্পকার হলেও আধুনিক গল্পকার নন। কিন্তু সচেতনভাবেই ত তৈরি করে তোলা যায় ভাষার এমন এক ছদ্ম-আধুনিকতা, যাতে গুরুবাদ, নিয়তিবাদ, ব্রাহ্মণ্যবাদের কথা লেখা যায়, বা আউল-বাউলদের লোকায়ত ভঙ্গিতে যৌনবিষয়কে সামাজিক সমর্থন দেওয়া যায়, বা কবিতায় ধ্যেয় সৌন্দর্যবোধ বা পাপবোধকে নতুন চেহারায় নেওয়া যায়। আধুনিক লেখকের ভাষাসচেতনতা আর আধুনিক লেখকের ভাষাকৌশলের মধ্যে দুস্তর পার্থক্য।’ সাহিত্যের সেই আধুনিকতাও তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন মার্কসবাদের মধ্যে। ওই প্রবন্ধের শেষে তিনি বলছেন – ‘এই বর্তমান যুগের মর্ম বুঝতে, মার্কসবাদের বিজ্ঞান আমাদের দৈবনেত্রের উন্মীলন ঘটায়। আমাদের এই আধুনিকতার গূঢ় তাৎপর্য ধরা পড়ে। আমার কাছে তাই মার্কসবাদ বিনা কোনো আধুনিকতা নেই।’
মার্কসবাদী দেবেশ রায় সক্রিয় রাজনীতিতেও যুক্ত ছিলেন ছাত্রাবস্থা থেকে।রাজনীতি করতে গিয়ে শিখেছিলেন রাজবংশী ভাষা, যা পরবর্তীকালে তাঁর লেখালেখিতে কাজে লেগেছে।আমৃত্যু তিনি ছিলেন প্রতিবাদী।ক্ষমতার বিরুদ্ধে, প্রশাসনের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত প্রতিবাদ করে গেছেন তিনি। এই প্রতিবাদ তাঁর রাজনৈতিক সচেতনতার সাক্ষ্য দেয়।
রাজনীতি করতে গিয়েই তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছিল ভারতবর্ষের মানবিক মানচিত্র। তথাকথিত প্রান্তিক মানুষদের জীবনযাপনকে নিবিড়ভাবে প্রত্যক্ষ করেছিলেন রাজনীতির সূত্রেই। আর সেই জীবনই বারবার উঠে এসেছে তাঁর লেখায়।