ভ্রমণ রেখা

কবির ভ্রমণ, প্রিয় বনের ভিতর
জাম জারুল কিম্বা পলাশ অশ্বত্থ বট শিমুল
তাদের সবার ছায়ার সঙ্গে কবির ছায়া মিশে
কথা বলে, অনর্গল কথা গলে বৃষ্টি হয়ে জল
ইন্দ্রধনু হাতে ওখানেই তো দেখা
কৃষ্ণ কাজল লতা শুয়েছিল ঘাসের উপর
মাটির রসে গভীর ভালোবাসা
লাবণ্য তার পাতায় বাতাসে দেয় কাঁপন
শব্দ আর আলোর বিচ্ছুরণ
কবি যা বলেন, শিকড় দিয়ে শোনে
শাখায় ফোটায় ছয় রকমের ফুল
পাঁচটি ফুলের পাপড়ি যেন পাঁচ রকমের শাড়ি
একটি ফুল পরে আছে মুথা ঘাসের পাতা
ভীষন খুশি কবি এগিয়ে যান জীবন -হাটের পথে
বর্ষা শেষ হেমন্তের পরে যখন শীত
কবি গেলেন বনের কাছে হেঁটে
দেখেন ঘন ছায়া, আরও ঘন, দাঁড়িয়ে আছে
সেই লতাটি আনন্দে আকুল
প্রতিটি ফুল জীবন সুধার ফলনে উদ্যত
কবি বলেন, এই যে কেমন আছো
শুনতে বুঝি পেল না তার ডাক
এখন শুধু বহুদিনের নিরব চেয়ে দেখা
কবি বাড়ি ফিরে আসেন,তখন বিকেলবেলা
জেনে গেলেন ভ্রমণ-রেখা প্রান্ত সীমা ছোঁবে ।
…………………………………………..

শান্ত চালাঘর

আমার সাত তলার ফ্ল্যাট
দূষণ কম বিমল বাতাস নির্মল আকাশ
এখানে নক্ষত্র আকারে কত বড়ো
পুত্র লিফটে ওঠে দরোজার কাছে
মাতাল হাত খুঁজে পায়না কলিংবেলের সুইচ
মেয়ে নামে ইউনিভার্সিটির আলো পিঠে এলোচুলে
হঠাৎ মনে হয় যেন ভাঙ্গা কাঁচে জ্যোৎস্না পড়িয়াছে
সেই মন্ময় জন্ম পার হতে যাই
যখন মা দুধের বাটিতে চারটি মুড়ি ফেলে
দিয়েছেন খাট পেতে উঠোনের কোণে
ঐ স্বাদ জন্মান্তরেও যে কোন জিভের কোরকে
রহস্যের মত থেকে যাবে
বাবা ছিলেন পাতায় ঢাকা দীর্ঘ এক বট কালবৈশাখী ঝড় দুলতে এসে
স্নিগ্ধ ছায়ার ঘনত্বের টানে
ফেলে গেল ঠাকুর পুকুরে
মা ডাকেন অব্যবহিত অতীতে
সামনে থেকে সরে যায় জল-সুখ, আলো-মায়া
মসৃণ হাই ওয়ে
নির্জন অন্দরে ধূম নাচ মেগাসিরিয়াল
অব্যর্থ আয়ুর্বেদ বিপন্ন স্বাস্থ্যের উজ্জ্বল উদ্ধারে
শরণ্য ত্র্যম্বক
প্রতিমাস অমাবস্যা একবার উঠোনে নেমে এসে
প্রদীপের আলো আর তেলের গন্ধ নিয়ে যেত
সে কি ভুলে গেছে জীবন জ্যোৎস্নার কথা
শহরের ছাদ থেকে দেখি
অজস্র জোনাকি ওড়ে হেমন্তের ফসলের ক্ষেতে
দেখি,উদ্ধত সাত তলা থেকে কত উঁচু
চাঁদের বাড়ির মত মায়ের ঐ শান্ত চালাঘর।
…………………………………………..

উনিশে মে

সুখের যত বিন্দুগুলি
তারা জ্বালায় দূর আকাশে
পাহাড়প্রমাণ দুঃখ ফেটে চৌদিকে চৌচির
অগ্রগামী সন্ধ্যা হানে অপরভৃত হাসি
পশ্চিমের গায়ে
চোখ যখন ফিরতে চায় পূবের সীমানায়
মনকে পাঠাই সামনে মাঠে ফসল ক্ষেতে
অন্ধকার আসি আসি করে, বাজায় শাঁখ
নদী এবং বনের ধারে ধারে
দেখি, মে মাসের উনিশ জেগে আছে
আমার চোখে মুখে এবং বুকে
লেপ্টে আছে আসাম বাংলাদেশ
মনে পড়ে পুলিশ নির্যাতনে
ধ্বস্ত মানুষ মানভূমের
বাংলা-ভাষার জন্য আন্দোলনে
ঠোঁটের কোণে আমার মাতৃভাষা
হৃদয় থেকে উৎসারিত অমৃতের ধারা
…………………………………………..

শিকল

পূব থেকে পশিমের দিকে যাই
বাধা পেয়ে উত্তরে, দক্ষিণে
সব দিকে দিগন্ত বেড়া দিয়ে আছে
বলে দাও কোন লাফে রেখা পার হই
বলল কেউ, উপরের দিকে রাস্তা খোলা
মাটিতে শরীর রেখে চলে যাওয়া যায়?
তাছাড়া দিগন্ত রেখার উপর
আকাশ তো উল্টোনো কড়াই
এবার চড়ায় গলা,বলে
ভেঙে ভেঙে বেড়া, নগ্ন করেছো প্রকৃতিকে
আর পথ নেই
ঘর-বন্দি স্মরণ করো পাপের সীমানা
দু’ হাত বেঁধেছি শিকলে।
শোনো, কেউ আছো
খুলে দাও বন্ধ দুয়ার …

আকাশ বাতাস জল জুড়ে কেউ আসে
মহাচেতনা মানুষের
সুন্দর সন্ধানে রত সৃষ্টির বিকীর্ণ পথে
সংকট মুক্ত জীবনের
…………………………………………..

দেখা হবে

ওপারে আমার কোন বাড়ি নেই
দেখা হবে কেউ কি বলেছে
কেন এত কোলাকুলি কথাবার্তা
এই দোলাচলে নির্জলের স্রোত
ওপারে পোঁছোবে কি কিছু
এপারেই ঝগড়াঝাঁটি মান অভিমান
পাওয়া না-পাওয়ার প্রতিদান
তবু সত্য জীবনের নিত্য কথকতা
বিচ্ছেদ আসন্ন জেনে বলে যাও
দেখা হবে দেখা হবে
ওপারে আমার বাড়ি নেই
দৃশ্যের উপর আঁকি বোধিবৃক্ষ হৃদয়ের রঙে
লূতাতন্তুর মতো মায়াজাল
মনোরম ছায়া তার তলে
বাতাসে উড়িয়ে দিলাম যেন ঠিক
অন্তরীক্ষে কণার বিশ্বাস প্রান্তরে আটকে যায়
দুঃস্থ পৃথিবী সুস্থ করে
মধুমত শতায়ু ছুঁয়ে অনেক পিছনে এসো
দেখা হবে সত্যিই দেখা হবে
ওপারের গাছের তলায়
…………………………………………..

এমন বন্ধু

এমন বন্ধু জেনো সহজে মেলে না
শান্ত ভালোবাসা তুমি কি পেলে না
বাড়ালে হাত তবু এলে না এলে না।
জলের আহ্বান নদীর কূলে কূলে
মুগ্ধ মৌমাছি রঙিন ফুলে ফুলে
তোমার গান শুনে গিয়েছি তরুমূলে
শুধুই বাঁশিটি সুর তো মেলে না
বাড়ালে হাত তবু এলে না এলে না।
আলোর দিনগুলি তুমি কি গেছ ভুলে
আমার স্মৃতি আর দেয় না ঢেউ তুলে
রেখেছো বন্ধন আড়ালে খুলে খুলে
দেখনি নিক্কণ গোপনে খেলে না
বাড়ালে হাত তবু এলে না এলে না।
…………………………………………..

আমার ছবি

বসে থাকি দোতলায় ছোট এক ঘরে
আমার ছবিটি দেখি খাতার উপরে
কথা বলে মন যদি ভালো থাকে তার
জীবন-সংসার জাগে আনন্দ অপার
শুধাই, যে এঁকেছে সে থাকে কোথায়
ইস্কুলে পড়তে গেছে হুই কলকাতায়
মাথার উপর সাদা কয়েকটি চুল
বাতাসে বেড়ায় উড়ে ক্ষণিক বেভুল
কে বোঝে লোকটা নাকি ছবিটা পাগল
নাকি যে এঁকেছে তার কণ্ঠে অবিরল
ভাবতে ভাবতে কত দিন রাত চলে যায়
সে এখন ইস্কুলে পড়ে হুই কলকাতায়
আধেক কপালজুড়ে আঁকা নাকখানি
কর্ণদু’টি বিহারের থেকে আমদানি
বাম চোখ একটু নিচে, আকারেও ছোট
ডান চোখ, ওরে বাপ, আমড়ার মত
হাত দুটো শীর্ণকায় নেমে গেছে নিচে
ছবি আঁকার সাধ হয়ে যায় মিছে
ডান পা মাপে খাটো, অন্য খুঁত নেই
চলতে গেলে উল্টে পড়ে পিছন দিকেই
কি করে সে, বালিশে হেলান দিয়ে বসে
কবিতা পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে কাশে
নীল নিরবতা হাঁটে নক্ষত্র-সড়কে
সহসা নিশীথ রাত ডাকে যে প্রৌঢ়কে
জ্যোৎস্নার ভিতর দিয়ে যাচ্ছ কোথায়
স্বপ্নের সঙ্গী হয়ে হুই কলকাতায়…
…………………………………………..

শেষের বয়স

শেষের বয়স এলে
মনে পড়ে নদী মোহনা সাগর
এতদিন কেন যে ভাবিনি
জীবনের প্রতিপক্ষ সময় -সরণি
ছিলা টান করে দেহ-ধনুকের থেকে
অজস্র তীর ছোঁড়া হয়ে গেছে কবে
শুধু জানি না যে বিঁধবে কোথায়
হয় না ফেরৎ ঢেউ কথা
সবিনয়ে সময় জানায়।
…………………………………………..

আমি হাঁটছি

তৃতীয় শ্রেণী নেই লোক্যাল এক্সপ্রেস সব ট্রেনেই
তবে বিশেষ শ্রেণী নেই কি আর ?
ট্রেন প্রাণহীন, তার কাছে সবাই প্যাসেঞ্জার
তৃতীয় শ্রেণীর নিচে কোন ধাপ নেই
তাই মধ্য ধাপের কামরায় উঠে আসি
শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের সঙ্গলোভের টানে
উপরের দিকে তাকাই স্বভাব দোষে
কিন্তু প্রতিবেশী যাত্রীদের নিয়ে সুখের ভ্রমণ
পারস্পারিক হিংসায় আর ভালোবাসায়
কেউ চা খাওয়ায়, কেউ ফেলে দেয় কাপড়ে
যদি হৃদয়গুলি ঝুলে থাকত শরীরের থেকে
সন্ত্রস্ত অফিসযাত্রীদের মত,ঠাসাঠাসি ভীড়ে
সহজসাধ্য বিনিময়ে গড়ে উঠত ট্রেনমধ্যসাগর
অথবা ভারতমহাসাগর, স্টেশনে থামলে
তৃতীয় শ্রেণীর মানুষ দ্বিতীয় শ্রেণীর কামরা থেকে
নেমে যাবে অসীম হুড়োহুড়ি কাঁধে
ডুব দিয়ে লাফ দেবো তাদের মিছিলে
হাত ও হৃদয় ধরাধরি করে মনকে বলবো ডেকে
দ্যাখ সঙ্গে কেমন হাঁটি মনোরম অজানার দিকে
…………………………………………..

চেনা

ততদিন চেনা যায় না যে
যতদিন সে
লুকিয়ে রাখতে পারে বিমূর্ততাকে
সৃষ্টির নিয়মে একদিন
স্বাভাবিক বিস্ফোরণ ঘটে
প্রকাশ আলোকের বৃত্তে ধরা পড়ে যায়
সেইদিন তার রূপ মনে হয় চেনা
দূরত্ব বাড়ে, সময় কমে না।
…………………………………………..

শব্দের আড়ালে শ্রীময়

কবির হর্ষ উঠে যেন সূর্য পূবদিক লাল
আমার চক্ষু বিঁধে আনন্দ নিশিত শরে
পোড়ায় উৎসবহীনতা
কবি শব্দ উপার্জন করে,সঞ্চিত করে
খরচ করে পাগলের মতো
অথচ যখন আমার দু’হাত পাতি
দেখি অনাসক্তির পাতালতা
একজন কবির টেলিফোনে নিঃশব্দ পাই
দেখা হলে একজন দ্যুলোকের হাসি দেন
সর্বাঙ্গে বুলিয়ে, কেউ মর্মভেদী ইস্তাহার
দু-একজন কি গম্ভীর কি সুগম্ভীর
কি আড়ম্বরে প্রতিপালন আমার প্রশ্নটির
স্বপ্নগুলি যেন পোল্ট্রি থেকে ভিজে নির্ঘুমে
সাদা জন্ম সাদা পাখা সাদা ক্ষুধা
ত্রিভুবন স্বাদের জন্য লালচে হাঁ-মুখ
আমাকে বিমূর্ত জগতের দিকে টানে
আমি কবির পায়ে প্রস্ফুটিত শব্দগুছ রাখি
এক একটি তুলে ঘ্রাণ পরীক্ষা করেন
বলেন ডেকে,ওহে বহুবর্ণ গন্ধ চোখে চাই
মনে যেন চিরন্তন চিরন্তন স্নিগ্ধ মায়া লাগে
ভাসমান অলৌকিকতা
লেখার আগে কবিতার কাছে যাও
সে অস্থির পথ চেয়ে আছে

পথে বের হই, কবিতা সমাদ্দার দেখি
সত্যি সত্যি অনাবিল অপেক্ষায় আহত
ছায়া তার কত শান্ত সুন্দর সমাহিত
শব্দের আড়ালে আড়ালে শ্রীময়…

যেমন সবুজের নিষ্ঠায় অরণ্য আর
শাখার ছন্দে ছন্দে গান…