দীপু তারিককে সব খুলে বলেছে। সব শুনে তারিক একটু ঘাবড়ে গেল। ওরা গুপ্তধন বের করে ফেলার আগেই যদি বড় বড় লোকেরা তাদের কালাচিতা নিয়ে নেয়, তা হলে তো খুব দুঃখের কথা হবে। আবার এও সত্যি কথা যে, জায়গাটা যদি সত্যিই এত গুরুত্বপূর্ণ তা হলে তো ওদের জানিয়ে দেয়াই উচিত। কী করতে হবে বুঝতে না পেরে দু’জনেই খুব ছটফট করছিল।
সারদিন ক্লাস করে বিকেলে স্কুল ছুটির পর ক্লাস থেকে বের হতেই ক্লাসের গোটা দশেক ছেলে ওকে ঘিরে দাঁড়াল। ছেলেদের ভেতর থেকে বাবু একটু গম্ভীর গলায় বলল, তোর সাথে কথা আছে।
কী নিয়ে কথা হতে পারে দীপু বুঝে গেল সাথে সাথে। তবু চোখেমুখে একটু কৌতুহল ফুটিয়ে জিজ্ঞেস করল, কী কথা?
আমরা সবাই জানতে চাই তুই প্রত্যেক দিন বিকেলে তারিকের সাথে কোথায় যাস।
দীপু বুঝতে পারল ধরা পড়ে গেছে। ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে রইল খানিকক্ষণ। তারপর বলল, এখন সেটা বলতে পারব না।
কেন পারবি না? আমরা তোর বন্ধু না!
বন্ধু হবি না কেন?
তা হলে আমাদের বিশ্বাস করিস না?
বাজে কথা বলিস না, বিশ্বাস করব না কেন?
তা হলে বল, কোথায় যাস তোরা?
মঞ্জু চোখ ছোট ছোট করে বলল, আমি তোদের পিছু পিছু গিয়েছিলাম, একদিন দেখেছিও কোনদিকে যাচ্ছিস।
দীপু মঞ্জুর চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল সত্যি কথাই বলছে।
যদি আমাদের না বলিস, তোর সাথে আর কোনো সম্পর্ক নেই। তুই থাক তারিককে নিয়ে।
দীপু বলল, ঠিক আছে তোদের আমি বলব, কিন্তু তার আগে আমাকে তারিকের সাথে কথা বলে নিতে হবে।
ঠিক আছে, বলে নে, ঐ যে তারিক আসছে।
দেখা গেল তারিক উদ্বিগ্ন মুখে ওদের দিকে এগিয়ে আসছে। বলল, কী হয়েছে রে?
দীপু তারিককে ডেকে একপাশে সরিয়ে নিয়ে গেল।
কী হয়েছে দীপু?
ক্লাসের সবাই জেনে গেছে কালাচিতার কথা।
সব্বোনাশ! তা হলে?
ওদের বলে দিতে হবে। এলে ভালই হবে, তা হলে সবাই মাটি কাটতে সাহায্য করতে পারবে, তাড়াতাড়ি শেষ করে ফেলতে পারব। আর আমাদের তো ব্যাপারটা জানাতেই হবে, আগে হোক পরে হোক ।
তারিক চিন্তিত মুখে দাড়িয়ে রইল। আস্তে আস্তে বলল, কিন্তু যদি এখনই জানাজানি হয়ে যায়, সবাই তা হলে খ্যাচখ্যাচ শুরু করবে।
জানাজানি হবে না ।
তুই কীভাবে জানিস? সবাই কি তোর মতো? কারও পেটে কথা থাকবে না।
সেটা তুই আমার উপরে ছেড়ে দে। কারো পেট থেকে যেন কথা বের না হয় সেটা আমি দেখব।
তারিক তবু উসখুস করতে থাকে। কী জন্যে সেটা দীপুর বুঝতে বাকি থাকে না। তারিককে নিশ্চিন্ত করার জন্য বলল, আর শোন, যদি কোনো গুপ্তধন পাওয়া যায়, সেটা তোরই থাকবে। আমি আগে সবাইকে বলে দেব।
তারিক একটু লজ্জা পেয়ে বলল, ধেৎ! গুপ্তধন কি আর সত্যি আছে?
যদি থাকে।
যদি থাকে তা হলে সবাই না হয় ভাগাভাগি করে নেব।
ঠিক আছে, তুই অর্ধেকটা নিবি, আমরা বাকি সবাই অর্ধেকটা ভাগ করে নেব।
তারিক খুশি হয়ে রাজি হয়ে গেল। একা এক মাটি কাটা আর ওর সহ্য হচ্ছিল না।
দীপুর জন্যে সবাই দাঁড়িয়ে ছিল মাঠের পাশে। দীপু এগিয়ে গিয়ে গম্ভীর হয়ে বলল, তোদের আমি সব বলব।
সবাই খুশি হয়ে উঠল।
বাবু বলল, বল।
কিন্তু একটা শর্ত আছে।
কী শর্ত?
আজ রাত একটার সময় এখানে আসতে হবে।
রাত একটায়? এখানে? কী জন্যে?
শোনার জন্যে। আমি রাত একটার সময় বলব। যারা যারা শুনতে চাস, রাত একটার সময় আসিস। যারা যারা রাত একটার সময় আসবে তাদের আমরা দলে নিয়ে নেব।
রাত একটার সময় কেন? এখনই বল, এখনই দলে নিয়ে নে।
উহু! ব্যাপারটা একেবারে টপ সিক্রেট, শুনলেই বুঝতে পারবি। যারা রাত একটার সময় কষ্ট করে আসবে বুঝতে পারব শুধু তাদেরই খাঁটি ইচ্ছে আছে, তাদের বললে তারাও গোপন রাখবে পুরো ব্যাপারটা। শুধু তাদেরই বলা যাবে।
কিন্তু–
কোনো কিন্তু না। দীপু মুখ গম্ভীর করে দাঁড়িয়ে রইল, এত গম্ভীর যে দেখে তারিক পর্যন্ত অবাক হয়ে গেল।
রাতে খাবার সময় দীপু তার আব্বাকে বলল, আব্বা আজ রাতে আমাকে একটু বের হতে হবে।
কত রাতে?
সাড়ে বারোটার দিকে।
আব্বা অবাক হয়ে তাকালেন, এত রাতে কী করবি!
দীপু একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, একটা কাজ ছিল।
চুরি করতে যাবি কোথাও?
যাও! দীপু একটু ইতস্তত করে বলেই ফেলল, সেই চিতাবাঘের ব্যাপারটা। এখন আমরা আরও কয়েকজনকে দলে নেব, তাই সবাইকে বলেছি রাত একটায় আসতে। যারা আসতে পারবে বোঝা যাবে তারা সত্যি সত্যি আমাদের সাথে আসতে চায়; সবাইকে দলে নেব না।
হুঁ ! আব্বা একটু হেসে বললেন, খামোকা ছেলেগুলোকে তাদের আব্বাদের দিয়ে পিটুনি খাওয়াবি?
কেন?
বাহ্। রাত একটার সময় ছেলে যদি ঘর থেকে বের হয় তা হলে আব্বারা ছেড়ে দেবে? এমনিতো হয়তো ওরা তোদের সিক্রেট বলে দিত না, কিন্তু কাল সকালে পিটুনি খেয়ে ঠিকই বলে দেবে।
দীপু চিন্তিত হয়ে উঠল, সে এদিকটা ভেবে দেখেনি। সত্যি সত্যি এটা হতে পারে। তা হলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। দুর্বল গলায় বলল, আব্বা।
কী?
কী করা যায় তা হলে?
আমি কী জানি! তোদের ঝামেলা তোরা মেটাবি৷
বলো না কী করি।
উহু। আব্বা খাওয়ায় মন দিলেন। দীপু আব্বাকে চেনে, ওর ব্যাপারে কখনও কিছু বলেন না, নিজের ঝামেলা মেটাতে হয় ওর নিজেকে।
তোরা কি কোনো সভ্যতা-টভ্যতা খুঁজে পেয়েছিস? কয়দিন থেকে যেরকম মাটি মেখে ফিরে আসিস মনে হয় খোড়াখুড়ি পর্যন্ত শুরু হয়ে গেছে।
আর কয়দিন আব্বা, তারপর বলে দেব সবাইকে। এখন জিজ্ঞেস কোরো না।
ঠিক আছে—আমি শুধু বলছিলাম যে এসব জায়গা খোঁড়া কিন্তু খুব কঠিন। যারা এক্সপার্ট তারা যদি না থাকে সব নষ্ট হয়ে যায়।
তাই নাকি?
হ্যাঁ। আর বড় কথা যে, যদি কোনোরকম মূর্তি-টুর্তি পাওয়া যায় তা হলে খুব সাবধান!
কেন?
একটু চোট লেগে ভেঙে যদি যায় খুব খারাপ হবে সেটা। আর যদি স্মাগলাররা খোঁজ পায় তা হলেই হয়েছে!
কেন, কেন?
এদেশে এসব জিনিস বেচাকেনা করা যায় না, কিন্তু কোনোভাবে যদি দেশের বাইরে নিতে পারে তা হলে হাজার হাজার টাকায় বিক্রি হয়। তাই স্মাগলাররা সবসময় ছোঁক ছোঁক করে ঘুরে বেড়ায় ; পড়িসনি খবরের কাগজে, মিউজিয়াম থেকে মূর্তি চুরি হয় রোজ?