দিনগুলো চমৎকার কাটছিল দীপুর, অনেক বন্ধু হয়ে গেছে ওর ক্লাসের সবার সাথেই ওর পরিচয়। প্রায় সবার বাসাতেই যায়, বন্ধুদের আম্মাদের এমন ঘনিষ্ঠভাবে খালাম্মা বলে ডাকে যে মনে হবে বুঝি কতদিনের পরিচয়। ওর নিজের বই পড়ার শখ। কাজেই যাদের বাসায় বই আছে, হেঁটে হেঁটে সেখান থেকে বই নিয়ে আসতে ওর কোনো ক্লান্তি নেই।
তারিক যদিও ধোলাই দেবে বলে শাসিয়েছিল, কিন্তু সেরকম কোনো চেষ্টা করল না। অবশ্যি ওর সাথে আর খাতিরও হল না। দুজন দুজনকে এড়িয়ে যায়। মাঝে মধ্যে মেজাজ খারাপ থাকলে তারিক অবশ্যি ঝগড়া খুঁচিয়ে তুলতে চেষ্টা করে। দীপু তেমন সুযোগ দেয় না।
স্কুলেও চমৎকার সময় কাটছিল, শুধু বুধবার করে ড্রিল-স্যারের ক্লাসটা আস্তে আস্তে অসহ্য হয়ে উঠল। প্রথমবারের পরে ও আর তেমন বেশি কিছু মার খায়নি, কিন্তু ভাল ভাল দুর্বল ছেলেগুলোকে মুখ বুজে মার খেতে দেখে দেখে ওর বিরক্তি ধরে গেছে। একদিন টাইফয়েড থেকে উঠে এসে কমল মার খেয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। দেখে দীপুর এমন খারাপ লাগল যে বলার নয়! এই অর্থহীন মারপিট কীভাবে বন্ধ করা যায় সেটা নিয়ে সেদিন থেকেই সে সবার সাথে কথা বলতে শুরু করল। প্রথমে ঘনিষ্ঠ কয়েকজন, তারপর ক্লাসের প্রায় সবাইকে নিয়েই সে ছোটখাট কয়েকটা মিটিং করল। তারিকের মতো দু-একজন ছাড়া সবাই দীপুর সাথে একমত হয়ে বলল সত্যি এটা বন্ধ করা দরকার। দৌড়ে যারা শেষে এসে পৌছুবে তাদের পিটিয়ে যাওয়া রীতিমত অন্যায়। দৌড়াতে না পারাটা কারো অপরাধ হতে পারে না। অনেক আলোচনা করেও ঠিক করা গেল না কীভাবে এটা বন্ধ করা যায়। বেশির ভাগ ছেলেই বলল সবাই মিলে হেডস্যারের কাছে নালিশ করা হোক। অবশ্যি কেউ নিশ্চিন্ত হয়ে বলতে পারল না হেডস্যারকে বললে প্রিল স্যারের উৎপাত বন্ধ হয়ে যাবে, না দ্বিগুণ বেড়ে যাবে।
নালিশ করার বুদ্ধিটা দীপু প্রথমেই বাতিল করে দিল। সোজা বলে দিল নালিশ করার মাঝে সে নেই। ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় একবার একটা ছেলের কাছে মার খেয়ে সে স্যারকে নালিশ করে উল্টো নিজে মার খেয়েছিল। দীপু এখনও কারণটা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। হয়তো ঐ ছেলেটা শহরে ডেপুটি কমিশনারের ছেলে বলে স্যার তাকে শাস্তি দিতে সাহস পাননি। কিন্তু উল্টো সে নিজে কেন মার খেল এখনও চিন্তা করে পায় না। বাসায় এসে সে তার আব্বাকে ঘটনাটা খুলে বলতে গিয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিল, আব্বা শুনে অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিলেন, আমার বলতে খুব খারাপ লাগছে, তবু শোন বাবা, এরকম ব্যাপার অনেকবার ঘটবে। যত বড় হবি তত বেশি দেখবি। কাজেই কখনও কাউকে কিছু নিয়ে নালিশ করবি না। যাদের নিজেদের কিছু করার ক্ষমতা নেই শুধু তারা নালিশ করে।
দীপু কথাটা মনে রেখেছে। এর পরে সে কখনও কাউকে কিছু নিয়ে নালিশ করেনি। কাজেই এবারেও হেডস্যারের কাছে নালিশ করার বুদ্ধিটা সে সোজাসুজি বাতিল করে দিল। কিন্তু তার বদলে কী করা হবে সেট বলে দেয়া এত সহজ হল না।
সবাই হাল ছেড়ে দিয়েছিল। ঠিক তক্ষুনি দীপুর মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। ক্লাসের সবাই, সম্ভব না হলে বেশির ভাগ ছেলেদের রাজি করাতে পারলেই সে তার বুদ্ধিটা কাজে লাগাতে পারে। প্রথমে একজন দুজন, আস্তে আস্তে সবাই রাজি হয়ে গেল। পরের বুধবারের জন্যে তখন দীপু অপেক্ষা করতে লাগল খুব আগ্রহ নিয়ে।
বুধবারের ড্রিল ক্লাসে ড্রিল-স্যার সেদিনও সবাইকে লাইন বেঁধে দাঁড় করিয়ে বলে দিয়েছেন, আজ শেষ পাঁচজন। স্যার যদি একটু লক্ষ্য করতেন তা হলে দেখতেন, ছেলেদের ভেতর আজ আর ভয়ের ভাবটা নেই, বরং একটু উত্তেজনা। সবার চোখ চকচক করছে।
স্যার বাঁশিতে ফুঁ দিলেন, অন্য দিনের মতো সবার প্রাণপণে ছুটে যাবার বদলে আজ একটা আশ্চর্য ব্যাপার ঘটল। সবাই মিলে এক লাইনে আস্তে আস্তে দৌড়াতে লাগল। প্রথমে একটু এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল কিন্তু কিছুক্ষণেই সবাই লাইন ঠিক করে ফেলল। তারিক এবং আরও দু-একজন শুধু প্রাণপণে ছুটে যাচ্ছিল, দীপু জানত ওরা যাবে। কিন্তু যখন দেখল অন্যরা সত্যি এক লাইনে ছুটে যাচ্ছে, তখন আর একা দৌড়াতে ভরসা পেল না, তারিক এবং আর বাকি তিনজনও ফিরে এসে লাইনে মিশে গেল। তখন দীপুর স্ফূর্তির সীমা থাকল না।
ড্রিল-স্যারের বিস্ফারিত চোখের সামনে চল্লিশজন এক লাইনে তালে তালে পা ফেলে দেয়াল ছুঁয়ে আবার তালে তালে পা ফেলে ফিরে আসতে লাগল। এমন শৃঙ্খলা কখনও দেখা যায় না, রাস্তায় লোকজন দাঁড়িয়ে গেল মজ দেখতে। দৌড় শেষ হবার সময় সবাই দু’পাশে তাকিয়ে লাইন ঠিক করে নিল, আর দীপু যেরকম চেয়েছিল ঠিক সেরকম করে একসাথে লাইনে পা দিয়ে কয়েক পা ছুটে থেমে গেল।
আজ আর কেউ এগিয়ে যায়নি, কেউ পিছিয়েও পড়েনি, এবারে দেখা যাবে শেষ পাঁচজন কীভাবে বেছে নেন।
স্যার লম্বা লাইনটির দিকে তাকালেন, রাগে তার মুখ থমথম করছে। হাতের বেতটি মুচড়িয়ে এগিয়ে এসে দাঁতে দাঁত ঘষে বললেন, এটা কার বুদ্ধি?
কেউ কোনো কথা বলল না।
কার বুদ্ধি এটা? প্রচণ্ড ধমকে অনেকে কেঁপে উঠল এবার, তবুও কেউ কোনো কথা বলল না। স্যারের মুখ অপমানে কালো হয়ে উঠল। দাঁত চিবিয়ে বললেন, যদি না বলিস তা হলে একধার থেকে মারতে শুরু করব। এমন মার মারব যা কোনদিন দেখিসনি। এ মিনিট সময় দিলাম–
ভয়ের একটা কাঁপুনি দীপুর মেরুদণ্ড দিয়ে বয়ে গেল ! ও বুঝতে পারল এক মিনিট পর সত্যি স্যার একধার থেকে মারতে শুরু করবেন। দীপু ভেবেছিল ক্লাসের সব ছেলেকে কোনোদিন মারা সম্ভব না. তাই কাউকে মারবেন না। কিন্তু এখন দেখল এই স্যারের পক্ষে সবকিছুই সম্ভব।
এক মিনিট পর আমি মারতে শুরু করব, এখনও বল কার মাথা থেকে এটি বেরিয়েছে। কে এই বুদ্ধি বের করেছিস এক পা এগিয়ে আয়। কেউ কোনো কথা বলল না। কয়েকজন আড়চোখে দীপুকে দেখার চেষ্টা করল।
দীপু ঠিক করল, ও স্বীকার করে নেবে বুদ্ধিটা ওর, ওর একার জন্যে সবাইকে মার খাওয়ানো ঠিক হবে না। খামোক পাঁচজনের মার খাওয়া বন্ধ করতে গিয়ে সবাইকে মার খাওয়ানো শুরু করিয়ে লাভ কী? দীপু শুকনো ঠোঁট জিভ দিয়ে ভিজিয়ে নিয়ে অল্প অল্প কাঁপতে লাগল।
এগিয়ে আয় এক পা, স্যার আবার চিৎকার করে উঠলেন।
দীপু এক পা এগিয়ে গেল, ওর মুখ ফ্যাকাসে, পা কাঁপছে থরথর করে। সহ্য করতে পারবে তো মার? কেঁদে ফেলবে না তো যন্ত্রণায়?
লাইনে বাকি ছেলেগুলো মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ টিপু ছটফট করে উঠল। তারপর এক পা এগিয়ে এসে দীপুর পাশে দাঁড়াল। টিপুর দেখাদেখি কমল আর সাজ্জাদও এগিয়ে আসে সামনে। আর তাদের দেখাদেখি হঠাৎ পুরো ক্লাস এক পা এগিয়ে দীপুর দু’পাশে সারি বেঁধে দাঁড়াল। তারিক একা একা শুধু আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে রলি কিছুক্ষণ, তারপর সেও সাবধানে এগিয়ে এসে লম্বা লাইনে মিশে গেল।
দীপু দু’পাশে তাকাল—তার কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে দু’পাশে চল্লিশজন ছেলের লম্বা সারি, সবাই মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে, কেউ কোনো কথা বলছে না কিন্তু দীপু বুঝতে পারছে ওরা কেউ ওকে একা মার খেতে দেবে না। ওর বুকের ভেতর জানি কেমন করে ওঠে, চোখে পানি এসে ঝাপসা হয়ে যায় সবকিছু।
সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার, স্যার কাউকেই মারলেন না। অনেকক্ষণ ওদের তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলেন, তারপর বেতটা ছুড়ে ফেলে পুরো ক্লাসটা ছুটি দিয়ে দিলেন। ওরা ফিরে যেতে যেতে দেখল, স্যার এক মাঠের মাঝে চুপচাপ বসে বসে সিগারেট খাচ্ছেন আকাশের দিকে তাকিয়ে। মনে হচ্ছে অনেক বুড়ো হয়ে গেছেন হঠাৎ করে।
এর পরেও স্যার মাস তিনেক ছিলেন স্কুলে, তারপর রিটায়ার্ড করে চলে গেলেন। এর মাঝে একবারও নাকি একটি ছেলেকেও মারেননি।