ক্লাস নাইনের সাথে ফুটবল খেলায় কে ক্যাপ্টেন হবে সেটা নিয়ে ক্লাসের পর আলোচনা হচ্ছিল। তারিকের লজ্জাশরম বরাবরই কম। সে সোজাসুজি ক্যাপ্টেন হতে চাইল। দীপু আপত্তি করে বলল, যে সবচেয়ে ভাল খেলে— রফিক, সে হবে ক্যাপ্টেন। রফিক ভয়ে ভয়ে বলল, তার ক্যাপ্টেন হবার কোন ইচ্ছে নেই, তারিকই হোক।
দীপুর খুব খারাপ লাগছিল, সবগুলো ছেলে তারিককে ভয় পায়, তাই ন্যায় হোক আর অণ্যায় হোক তারিক যেটা বলে সেটাই সবার মেয়ে নিতে হয়। রফিকের ক্যাপ্টেন হবার খাঁটি অধিকার আছে। ওর মতো ভাল ফুটবল সারা স্কুলে কেউ খেলতে পারে কি না সন্দেহ আছে। শুধু যে ভাল খেলে তা-ই নয়, ওর মতো ভাল খেলা কেউ বুঝতে পারে না। খেলার মাঝখানে ঠিক কাকে কোনখানে বদলে দিয়ে কী করতে দিলে খেলা ম্যাজিকের মতে পাল্টে যায় সেটা শুধু রফিকই বলতে পারে। অথচ তারিক জোর জবরদস্তি করে ক্যাপ্টেন হতে চাইছে, যেন ক্যাপ্টেন হওয়াটাই সব।
দীপু পরিষ্কার করে বলে দিল, রফিক ক্যাপ্টেন না হলে খেলা হবে না। ড্রিলক্লাসের ঘটনার পর অনেকেই তারিকের থেকে দীপুর কথাকে বেশি গুরুত্ব দেয়, কাজেই সত্যি সত্যি রফিককে ক্যাপ্টেন করে টীম করে ফেলা হল। টীমে তারিকও থাকল—শুধু যাবার সময় দাঁতে দাঁত ঘষে দীপুকে বলে গেল, সে তাকে দেখে নেবে একহাত। এর আগেও তারিক অনেকবার দীপুকে দেখে নিতে চেয়েছে। কাজেই সে খুব-একটা গা করল না।
ক্লাস নাইনের সাথে খেলার জন্যে ওদের খুব জোর প্র্যাকটিস শুরু করতে হল। প্রতিদিন বিকেলে ওরা অনেকক্ষণ মাঠে খেলে যেত। বাসায় যেতে যেতে প্রায়ই সন্ধ্যা হয়ে যায়, অর ভাত খাবার পর কিছুতেই জেগে থাকতে পারে না। আব্বা পড়ার টেবিল থেকে মাঝে মাঝে কোলে করে ওকে বিছানায় এনে শুইয়ে দেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে ওর লজ্জা সীমা থাকে না।
সেদিন সন্ধ্যার ঠিক আগে দীপু ফুটবল খেলে ফিরে আসছিল। পুরানো জমিদার বাড়িটির কাছে ফাঁকা জায়গাটায় হঠাৎ সে তারিক আর তার দু’জন বন্ধুকে আবিষ্কার করল। প্রায় অন্ধকারে ওরকম একটা জায়গায় ওরকম তিনটা ছেলেকে দেখেই দীপুর মনে হল, ওরা তার জন্যে অপেক্ষা করছে। ভয়ে ওর বুক ধক করে উঠলেও সে গলায় জোর এনে জিজ্ঞেস করল, কিরে তারিক, কী করছিস ওখানে?
তারিক উত্তর না দিয়ে বলল, এদিকে শোন।
দীপু এগিয়ে গেল। কাছাকাছি এগিয়ে যেতেই তারিক হঠাৎ করে তার মুখে এক ঘুষি মেরে বলল। কিছু বলার আগে পাশের দু’জন তাকে জাপটে ধরে ফেলল।
দীপু নোনতা রক্তের স্বাদ পেল, ঠোঁট কেটে গেছে বোধ হয়। আবছা অন্ধকারে তারিকের মুখ ঠিক দেখা যাচ্ছিল না, আবার মারবে কি না তাও বুঝতে পারছিল না ! মার খেলেই পাল্টা মার দিয়ে এসেছে দীপু, কিন্তু এখন ওকে দু’জন যেভাবে ধরে রেখেছে যে, ওর নড়ার শক্তি নেই। ঝটকা মেরে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। নিজেকে বাঁচাতে হলে এখন ওর উল্টো দিকে দৌড়ানো উচিত। কিন্তু ওর দৌড়াতে লজ্জা হল। তারিকের দিকে তাকিয়ে বলল, লজ্জা করে না তিনজন মিলে একজনকে মারছিস?
ধর হারামজাদাকে!
আবার তিনজন মিলে ওকে জাপটে ধরল। কয়টা ঘুষি যে সে খেল তার আর কোনো হিসেব নেই। প্রাণপণে সে মারামারি করে গেল কিন্তু তিনজন শক্ত ছেলের সাথে তার একার পেরে ওঠা অসম্ভব। অল্পক্ষণের মাঝে দু’জন তাকে ধরে মাটিতে ফেলে দিল। দুই হাত পেছন দিকে নিয়ে তাকে এমনভাবে ধরেছিল যে, সে নড়তে পারছিল না ।
তুলে দাঁড় করা শুয়োরকে।
তারিকের কথামতো অন্য দু’জন অনুগত ভৃত্যের মতো তাকে তুলে দাঁড় করাল। দীপুর চোখ ফেটে পানি বেরিয়ে আসতে চাইছিল, কিন্তু অনেক কেষ্ট সে পানি আটকে রাখল।
আমার সাথে আর লাগতে আসবি?
আমি কারো সাথে লাগতে যাই না।
আবার মুখে-মুখে কথা! তারিক এগিয়ে এসে পেটে প্রচণ্ড এক ঘুষি মারল। মুহুর্তের জন্যে দীপু চোখে অন্ধকার দেখে, ওর দম বন্ধ হয়ে আসে যন্ত্রণায । মিনিটখানেক সময় লাগল ওর ঠিক হতে মুখ হ্যাঁ করে ও বড় বড় করে নিঃশ্বাস নিচ্ছিল।
বল, আমার সাথে লাগতে আসবি?
আমি কারে সাথে লাগতে যাই না। তুই আমার সাথে লাগতে আসিস।
আবার একটা ঘুষি, এবার চোয়ালে! কট্ করে কোথায় যেন একটা শব্দ হল, মিনিট দুয়েক সে কিছু শুনতে পায় না। বল হারামজাদা, আমার সাথে লাগতে আসবি কি না।
দীপুর কেমন যেন একটা রোখ চেপে গেল! ও খ্যাপার মতো বলল, আমি লাগতে আসি না, তুই লাগতে আসিস-তুই—তুই—
আবার ঘুষি খেল একটা। তারিক ওর বুকের কলার চেপে ধরে বলল, বল—না। নইলে মেরে তক্তা বানিয়ে দেব।
বলব না ।
বল, আর কখনও করব না, ছেড়ে দেব তা হলে।
দীপু চিৎকার করে বলল, বলব না।
তারিক পকেট থেকে একটা পেন্সিল বের করে নিয়ে দীপুর ডান হাতের দুই আঙ্গুলের মাঝখানে রেখে দু’পাশ থেকে চাপ দিতে থাকে। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় দীপু চিৎকার করে উঠল, মনে হল ওর আঙ্গুল দুটি বুঝি ভেঙে যাবে।
বল হারামজাদা, আর কখনও করবি কি না, বল। দীপু তবু বলল না, প্রাণপণে ছাড়া পাবার চেষ্টা করতে লাগল। ঝটকা মেরে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করে হুটোপুটি করতে করতে একসময়ে তিনজনই মাটিতে পড়ে গেল। জাপটা-জাপটি করতে লাগল মাটিতে পড়ে, তার মাঝে তারিক দুই আঙ্গুলের মাঝখানে পেন্সিল রেখে চাপ দিতে লাগল আর বলতে লাগল, বল আর করব না, বল, তা হলে ছেড়ে দেব।
মরে গেলেও বলব না—মরে গেলেও বলব না—দীপু ঠোঁট কামড়ে যন্ত্রণা সহ্য করতে চেষ্টা করে, মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে ওঠে ওর, বুঝতে পারে আর একটু জোরে হলেই ওর আঙুল ভেঙে যাবে মট করে। দম বন্ধ হয়ে আসতে চায় ওর। মুখ শুকিয়ে যায় কাগজের মতো, তবুও পাগলের মতো নিজেকে বলতে থাকে, বলব না, বলব না, বলব না।
হঠাৎ করে তারিক ওর হাত ছেড়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, কে জানি আসছে।
সত্যি?
হুঁ। ওকে ঠেলে দাঁড় করায় ওরা, তাকিয়ে দেখতে চেষ্টা করে সত্যি কেউ আসছে কি না। দেখা গেল সত্যিই কে—একজন হেঁটে হেঁটে আসছে এদিকে।
পালা—