দীপুকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে ওরা দেয়াল টপকে পালিয়ে যায়। দুর্বল দীপু ধাক্কা সামলাতে পারে না, হুমড়ি খেয়ে গিয়ে দেয়ালের ওপর পড়ে। হাত দিয়ে দুর্বলভাবে আটকাতে চেষ্টা করে কিন্তু পারে না, প্রচণ্ডভাবে ওর মাথা ঠুকে যায় দেয়ালের সাথে। মনে হল ওর, ও মরে যাবে এখনই৷ হঠাৎ করে ওর ভীষণ কান্না পেল, চোখ ফেটে পানি বেরিয়ে আসে ঝরঝর করে। লোকটি এগিয়ে এসে দীপুকে দেখে থেমে যায়, কে? কে ওখানে?
গলার স্বরে চিনতে পারে দীপু, ওদের স্যার, ক্লাস-টীচার।
দীপু ওঠার চেষ্টা করছিল, স্যার টেনে তুললেন ওকে। কে? দীপু? তুই!
দীপু মাথা নাড়ল ।
কী হয়েছে? কী করছিস?
অন্ধকারে ভাল দেখা যায় না, তবু বোঝা যায় মারামারি না করলে এরকম অবস্থা হয় না ।
কার সাথে মারামারি করছিলি?
হঠাৎ স্যারের মনে হল দীপুর কানটা ভেজা, চিটচিটে। ম্যাচ জ্বেলে দেখলেন–রক্ত।
ওকী ! মাথা ফেটে গেছে নাকি?
দীপু মাথা নাড়ল। ওরও তাই মনে হচ্ছিল। মাথার পেছন দিকটা দেয়ালে ঠুকে ফেটে গেছে। স্যার ওর হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন রাস্তায়, তারপর রিকশা করে তার পরিচিত এক ডাক্তারের কাছে। মাথা ব্যান্ডেজ করে বাসায় পৌছে দিয়ে গেলেন নিজে ; কিন্তু হাজার ধমক দিয়েও বের করতে পারলেন না কে তার এই অবস্থা করেছে। কখনও কিছু নিয়ে নালিশ করবে না প্রতিজ্ঞাটা ভেঙে ফেলতে চাইছিল না, যদিও ভীষণ ইচ্ছে হচ্ছিল পুরো ঘটনাটা স্যারকে বলে তারিকের ওপর মনের ঝালটা মেটাতে।
বাসায় খেতে বসে আব্বা হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করলেন, কী, তারিক তা হলে ধোলাই দিল শেষ পর্যন্ত !
দীপু কাঁদবে না ভেবেও হঠাৎ ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। আব্বা এগিয়ে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ওকী কাঁদছিস কেন? ছি, পুরুষ মানুষের কাঁদতে নেই। মার খেয়ে কেউ কাঁদে নাকি বোকা ছেলে!
পরদিন দীপু স্কুলে যেতে পারল না। রাতে প্রচণ্ড জ্বর এসেছিল। বিকেলে ওর বন্ধুরা দেখা করতে আসে। যদিও দীপু কাউকে বলেনি, তবুও ওরা ধরে নিয়েছিল তারিকই দীপুর এ অবস্থা করেছে। দীপুর বিছানা ঘিরে সবাই বসে রইল, আর বালিশে হেলান দিয়ে বসে দীপু পুরো ঘটনাটা শোনাল। সব শুনে নান্টু জিজ্ঞেস করল, স্কুলে যাবি কবে?
কাল যেতে পারি। তারিক এসেছিল আজ স্কুলে? না, আমি দেখেছি বিকেলে রামের ক্যান্টিনে বসে চা খাচ্ছে।
আমাকে জিজ্ঞেস করল, স্যার ওর খোঁজ করেছেন কি না।
তুই কী বললি?
আমি বললাম, না। শুনে খুব অবাক হল। তুই স্যারকে কিছু বলিসনি?
উহু।
কেন, বললি না কেন? সামাদ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
এমনি।
বাবু বলল, স্যার এমনিতে কাউকে মারেন না, কিন্তু যদি কখনও সত্যিকারের খেপে যান, হুঁ হুঁ বাবা, ছাল তুলে দেন মেরে। মনে আছে একবার কিবরিয়াকে কী মারটা দিলেন!
ওহ! নান্টু মাথা নাড়ল, তুই যদি কালকে স্যারকে বলে দিতি তা হলে দেখতি মজা। দীপু কথা বলল না। আহাদ জিজ্ঞেস করল, স্কুলে যাবি তো কাল? গিয়েই স্যারকে বলিস!
উঁহু।
কেন? আমি কাউকে নালিশ করব না। কখনও করি না। যদি পারি নিজে পেটাব তারিককে, এমন টাইট করে দেব—
তুই পেটাবি তারিককে? সবাই অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকাল দীপুর দিকে, দীপু মুখ শক্ত করে বসে রইল! ওরা বিশ্বাস না করতে চায় তো না করুক, কিন্তু সে এর শোধ নেবে না?
ক্লাস নাইনের সাথে ফুটবল খেলায় দীপু খেলতে পারল না। খেলার দিনে মাঠের পাশে বসে সে গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে গেল অন্যদের সাথে। যদিও তাতে কোনো লাভ হল না, ওরা হেরে গেল। তারিক খুব খেটে খেলছিল, দু বার সে গোল বাঁচাবার জন্যে এমন ঝুঁকি নিয়েছিল যে আরেকটু হলে পা ভেঙে যেতে পারত। দীপু খেলতে পারলে হয়তে খেলা আরেকটু ভাল হতো, কিন্তু ওরা হেরে যেত ঠিকই, ক্লাস নাইনের সবাই খুব ভাল খেলে।
খেলা দেখে বাসায় ফিরে আসার সময় রাস্তার মোড়ে তারিককে দেখতে পেল দীপু। কাদামাখা কাপড়জামা পরে বাসায় যাচ্ছিল। দীপুকে দেখে একটু অপরাধীর মতো হাসল তারিক, দীপু না-দেখার ভান করে এগিয়ে যেতে লাগল। খেলার পর তারিকের ওপর থেকে রাগ অনেকটা কমে গেছে, কিন্তু মার খাওয়ার ঘটনাটা এখনও ভোলেনি, মাথায় তখনো তার ব্যান্ডেজ !
তারিক একটু এগিয়ে এসে দীপুর পাশাপাশি হাটতে লাগল। আস্তে আস্তে বলল, এই দীপু।
উঁ।
ইয়ে, মানে, শোন—
কী?
আমি কিন্তু তোর মাথা ফাটাতে চাইনি। কীভাবে যে—
ভ্যাদর ভ্যাদর করিস না। বাড়ি যা তুই।
খেপেছিস আমার ওপর, না? অবশ্যি খ্যাপারই কথা । একটু বেশি হয়ে গিয়েছিল, মেজাজটা কেন যে এত খারাপ হল সেদিন। আর তুইও এরকম—হঠাৎ সুর পাল্টে তারিক জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, তুই স্যারকে আমার নাম বললি না কেন? আমি যা ভয় পেয়েছিলাম!
দীপু কথা না বলে হেঁটে যেতে লাগল। তারিক একটু বিব্রত হয়ে জিজ্ঞেস করল, অ্যাঁ? নালিশ করলি না কেন?
তোকে যদি কুত্তায় কামড়ায় তুই কাউকে নালিশ করিস?
অপমানে তারিকের মুখ কালো হয়ে উঠলো। আস্তে আস্তে বলল, তার মানে আমি কুত্তা?
একশোবার। মানুষ হলে কখনও তিনজন মিলে একজনকে পেটায়? শুনেছিস কখনও? ব্যাটাছেলেরা তিনজন মিলে একজনকে পিটিয়েছে? থুঃ। দীপু ঘেন্নায় থুতু ফেলল রাস্তায়।
তারিকের মুখ বিবর্ণ হয়ে উঠল লজ্জায়। দীপু খেয়াল না করে বলে যেতে লাগল, নালিশ করিনি দেখে ভাবিস না আমি ভয় পেয়েছি বা ভুলে গেছি। একটু ভাল হয়ে নিই তারপর তোকে আমি পেটাব, খোদার কসম।
আমাকে পেটাবি?
হ্যাঁ, খোদার কসম। ব্যাটাছেলে হলে একলা আসিস, আমি বন্ধুদের নিয়ে আসব না।
দীপু গটগট করে বাসায় হেঁটে গেল, আর তারিক একা একা রাস্তায় হেঁটে বেড়াতে লাগল। ওর এমন মন-খারাপ হল যে তা আর বলার নয়। দীপু ওকে পেটাবে এটা সে বিশ্বাস করে না, কিন্তু তিনজন মিলে একা দীপুকে পিটিয়েছে বলে দীপু ওকে ঘেন্না করে সেটা তো অবিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। ও বুঝতে পারে অনেকেই তাকে ঘেন্না করে, কিন্তু দীপু প্রথম তার মুখের উপর বলে দিয়ে গেল। আর সত্যিই তো, দীপু তো ওকে ঘেন্না করতেই পারে।
খানিকক্ষণ পর তারিকের নিজের উপর নিজের ঘেন্না হতে লাগল।