বেশ কয়েকদিন পার হয়ে গেছে। দীপু এখনও তারিককে পেটায়নি, পেটাবে সেরকম সম্ভাবনা কম। রাগটা প্রথম দিকে যেরকম বেশি ছিল, এখন আর সেরকম নেই। তা ছাড়া কোনোরকম ঝগড়া-বিবাদ ছাড়া আগে মার খেয়েছিল বলে একদিন পাল্টা মার দেয়া বেশ কঠিন। মানুষ খেপে না উঠলে মারামারি করবে কেমন করে? তা ছাড়া তারিক আজকাল অনেক ভাল হয়ে গেছে— অন্তত দীপুর সাথে আগে সবসময় যেরকম একটা ঝগড়া খুঁচিয়ে তুলতে চাইত এখন আর তা করে না, কাজেই দীপু আর মারামারি করার উৎসাহ পায় না।
এমনিতে সময় মোটামুটি খারাপ কাটছিল না। বিকেলে ফুটবল খেলে সন্ধ্যার আগে আগে বাসায় ফিরে আসে। সামনে হাফ-ইয়ারলি পরীক্ষা, তাই আজকাল একটু পড়াশোনার চাপ। পরীক্ষাটা শেষ হয়ে গেলে সবাই বাঁচে।
সেদিন খেলা শেষ করে সবাই দল বেঁধে ফিরে আসছিল। পানির ট্যাংকটার কাছে এসে কে যেন বলল, তার বড় ভাই স্কুলে পড়ার সময় একবার ওটার উপরে উঠেছিল।
তারিক ফ্যাকফ্যাক করে হেসে বলল, কী আমার বীর! আমি এইটার ওপর কতবার উঠেছি!
গুল মারিস না। তারিক খেপে উঠল, সত্যি সত্যি সে কয়েকবার এটার ওপরে উঠেছে। চেঁচিয়ে বলল, যদি এখন উঠে তোদের দেখাই?
দেখা না!
যদি উঠি, কী দিবি?
দরকার নেই বাবা, আছাড় খেয়ে পড়বি, পরে আমার দোষ হবে।
তারিক খেপে উঠল, কী বললি? আছাড় খাব? তা হলে দেখ আমি উঠছি।
দীপু বাধা দিয়ে বলল, সন্ধ্যার সময়ে ওঠার দরকারটা কী? বিশ্বাস করলাম তুই পারিস।
উঁহু, তোরা বিশ্বাস করিস না, আমি এখন উঠব।
দীপু একটু বিরক্ত হয়ে বলল, এটা এমন কী ব্যাপার যে বিশ্বাস করব না? তার মানে এটা খুব সোজা, তুইও পারবি?
একশো’বার পারব।
ওঠ দেখি!
দীপু খেপে উঠে বলল, ভাবছিস উঠতে পারব না?
ওঠ না দেখি ।
তারিকের উপর নান্টুর অনেকদিনের রাগ, সে তারিককে খেপানোর জন্যে বলল, এটা আর কঠিন কী আমিও পারব |
নান্টু ছোটখাট হালকা-পাতলা-ভীরু বলে বন্ধুমহলে পরিচিত। যখন সেও বলে বসল যে সে পর্যন্ত উঠতে পারবে, তখন তারিক সত্যি সত্যি খেপে গেল। চোখ ছোট করে বলল, যদি সত্যি বাপের বেটা হোস, আয় আমার সাথে, ওঠ।
তারিক পানির ট্যাংকের দিকে এগিয়ে গেল, আর সত্যি সত্যি লম্বা সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল। দীপু নান্টুকে বলল, যা ওঠ!
নান্টু দুর্বল গলায় বলল, ঠাট্টা করে বলেছিলাম। দীপু বলল, যা পারিস না তা বলতে যাস কেন? গরু কোথাকার!
তারিক অনেক দূর উঠে গেছে, চেঁচিয়ে বলল, বাপের ব্যাটা হলে আয়, আর ভয় পেলে থাক—বাসায় গিয়ে বার্লি খা গিয়ে।
দীপু ট্যাংকটার দিকে এগিয়ে গেল আর হঠাৎ কী মনে করে নান্টুও পেছনে পেছনে এগিয়ে গেল—সেও উঠবে।
ওঠার আগে দীপু নান্টুকে জিজ্ঞেস করল, সত্যি উঠবি?
হুঁ।
ভয় পেলে থাক—
না আমি উঠব!
ঠিক আছে, ওঠ। দীপু নান্টুকে আগে যেতে দিল । পেছনে পেছনে সেও উঠতে লাগল। ভয়ানক উঁচু পানির ট্যাংকটা। নিচ থেকে বোঝা যায় না। প্রায় আধাআধি ওঠার পর দীপু নিচের দিকে তাকিয়ে দেখে, নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সবাইকে ছোট ছোট পুতুলের মতো দেখাচ্ছে। দেখে মাথা ঘুরে উঠতে চায়। তারিক তরতর করে উঠে যাচ্ছে, নান্টু তরতর করে না উঠলেও বেশ চমৎকার উঠে যাচ্ছে। ঠান্ডা লোহার সিঁড়িটা শক্ত করে ধরে রাখতে হচ্ছিল। শুধু ভয় হচ্ছিল এই বুঝি ফসকে যায় হাত, আর ছিটকে পড়ে নিচে।
শেষ অংশটুকু সবচেয়ে ভয়ানক। একেবারে খাড়া উঠে গেছে। তারিক পর্যন্ত একটু দ্বিধা করল ওঠার আগে। মাঝামাঝি উঠে আবার একটা হাঁক ঠিকই দিল ওদের দেখানোর জন্যে।
নান্টু শেষ অংশটায় এসে একটু ভয় পেয়ে গেল মনে হয়। সিঁড়ি ধরে ভয়ে ভয়ে উপর দিকে তাকাল, দীপু এসে জিজ্ঞেস করল, ভয় লাগছে?
নান্টু দুর্বলভাবে মাথা নাড়ল। নেমে যা তা হলে, তোর আর উঠে কাজ নেই।
নান্টুও নেমে যেতে চাইছিল, কিন্তু ঠিক সেই সময়ে উপর থেকে তারিকের গলার স্বর শুনতে পেল, মুরগির বাচ্চারা দাঁড়িয়ে আছিস কেন?
দীপু ধমকে উত্তর দিল, ফ্যাচফাচ করবি না বলে রাখলাম!
ও মাগো, ভয় করে গো, বালি খাব গো, দুধ খাব গো…..
দীপু তারিকের ঠাট্টায় কান না দিয়ে বলল, নান্টু ভয় পেলে নেমে যা।
নান্টু কী মনে করে ঠান্ডা গলায় বলল, না উঠব।
সত্যি?
হুঁ।
দেখিস–
কিছু হবে না।
দীপুকে অবাক করে দিয়ে নান্টু সত্যি সত্যি উঠতে শুরু করল। এক পা এক পা করে নান্টু উঠতে থাকে। প্রত্যেকবার পা তোলার আগে লোহার সিঁড়িটা শক্ত করে ধরে রাখে। একেবারে খাঁড়া সিঁড়ি, পেছন দিকে তাকাবে না তাকাবে না করেও শেষ তিনটা ধাপের আগে হঠাৎ নিচের দিকে তাকাল নান্টু, আর তাকানোর সাথে সাথেই তার যেন কী হয়ে গেল! কত উপরে সে ঝুলে আছে, আর কত নিচে মাটি, ছোট ছোট গাছপালা বাড়িঘর ছোট ছোট পুতুলের মতো লোকজন। মাথা ঘুরে গেল, নান্টুর হাত ফসকে যাচ্ছিল, একটা চিৎকার করে প্রাণপণে সিঁড়িটা ধরে চোখ বন্ধ করে ফেলল ।
দীপু ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করল, নান্টু কী হয়েছে?
নান্টু কোনো উত্তর দিল না।
নান্টু, নান্টু, এই নান্টু। কোনো উত্তর নেই নান্টুর। দীপু ভয় পেয়ে তাড়াতাড়ি উঠে আসে অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না, কাছে এসে হাত দিয়ে ওর পা ধরে নাড়া দিল দীপু!
একটা অদ্ভুত শব্দ করল নান্টু। দীপু অবাক হয়ে দেখল নান্টু থরথর করে কাঁপছে। ভয়ে দীপুর শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল মুহুর্তে।
উপর থেকে তারিকের হাসি ভেসে আসে, কী রে মুরগির বাচ্চারা, উঠিস না কেন? বার্লি খাবি?
দীপু আবার নান্টুকে ডাকল, নান্টু দাঁড়িয়ে থাকিস না, ওপরে ওঠ।
নান্টু কোনো উত্তর দিল না, গোঁ-গোঁ করে একটা শব্দ করল।
ওঠ। ওঠ বলছি!
ভাঙা গলায় নান্টু বলল, পারব না।
পারবি না মানে?
নান্টু গোঙাতে গোঙাতে বলল, পারব না, পারব না ।
পারব না, পারব না, পারব না—
নেমে আয় তা হলে।
পারব না, আমি পারব না ।
পারবি না মানে?
উঁহু, আমি কিছু পারব না।
উপর থেকে তারিক একটু অবাক হয়ে বলল, কী হয়েছে, তোরা ওখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?
দীপু বলল, নান্টু বলছে উপরে উঠতে পারবে না।
তা হলে নেমে যায় না কেন?
নামতেও পারছে না।
মানে?
ঠিক তক্ষুণি নান্টু হঠাৎ কাঁদতে শুরু করল।
অন্ধকারে, প্রায় দুশো ফিট উপরে সরু লোহার খাঁড়া সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে কেউ যদি কাঁদতে শুরু করে, তখন অবস্থাটা কল্পনা করা যায় না। তারিক ভয় পেয়ে বলল, এই দীপু, কাঁদছে কেন নান্টু?
জানি না !
উপরে তুলে আন ওটাকে।
আমি কীভাবে তুলব?
দাঁড়া, আমি টেনে তুলছি?
উপর থেকে তারিক নান্টুর শার্টের কলার ধরে টানতে লাগল আর নিচে থেকে দীপু লোহার মতো হয়ে আঁকড়ে থাকা নান্টুর হাত খুলে উপরে ধরিয়ে দিতে লাগল, তারপর সাবাধানে পা ঠেলে ঠেলে উপরের সিঁড়িতে তুলে দিল। মুখে ক্রমাগত ধমক আর অনুরোধ করে যেতে লাগল। তিনটি ধাপ ওকে তুলে আনতে অন্তত দশ মিনিট সময় লেগে গেল।
উপরে উঠে নান্টু মুখ চেপে শুয়ে পড়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে কাঁদতে লাগল। দীপুর মনে হল বুঝি মরেই যাবে।
তারিক ভারি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ওরকম করছে কেন?
বোধ হয় ভয় পেয়েছে ।
ভয় পেয়েছে তো উঠেছে কেন?
আমি কী জানি ।
যত্তসব ফাজলেমি মুরগির বাচ্চার মতো ভয়, তা হলে উঠতে যায় কেন?
আমাকে জিজ্ঞেস করছিস কেন? ওকেই জিজ্ঞেস কর ।
দীপু খুব ঘাবড়ে গেল। নিচে থেকে অন্যরা বুঝতে পেরেছিল একটা কিছু গোলমাল হয়েছে। বাবু চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে দীপু?
দীপু কী উত্তর দেবে বুঝতে পারল না। সন্ধ্যার সময় কয়টি ছেলে পানির ট্যাংকের নিচে দাঁড়িয়ে আছে আবার কয়টি ছেলে এত উঁচু ট্যাংকের উপরে উঠে গেছে, আশেপাশে এমনিতেই লোকজনের ভিড় জমে যাবার কথা। দীপুর সব মিলিয়ে খুব অস্বস্তি লাগতে থাকে। তাকিয়ে দেখল, সত্যি সত্যি নিচে লোকজনের ভিড় জমে গেছে। কেউ যে ব্যাপারটি ভাল চোখে দেখছে না তা আর বলতে হল না। আরও বেশি লোক জমে যাবার আগেই একটা-কিছু করা দরকার। সে চেঁচিয়ে বলল, তোরা বাসায় চলে যা।
কেন?
যা বলছি, এখানে দাঁড়িয়ে থাকিস না। খবরদার।
ব্যাপারটি কী। কিন্তু নিচে যারা আছে, তারা ব্যাপারটি আসলেই জানে না, অন্যদের কী বলবে! দীপুর কথামতো তারা সরে পড়াই বুদ্ধিমানের কাজ মনে করল। কৌতুহলী লোকজন খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ধীরে ধীরে চলে গেল।
শেষ লোকটি চলে যাবার পর তারিক বলল, আমি গেলাম।
মানে?
মানে আবার কী? সারারাত বসে থাকব নাকি?
নান্টুকে ডাকল, নান্টু কোনোমতে উঠে বসে থরথর করে কাঁপতে লাগল। ওকে নামার কথা বলার কোনো অর্থ হয় না, এখানে বসে থেকেই সে একটা অস্বাভাবিক ভয়ে কাঁপছে। কিছু-একটা হয়ে গেছে ওর।
দীপু তবু চেষ্টা করে দেখল, নান্টু, নামবি না?
নান্টু জবাব দিল না। আগের মতো কাঁদতে লাগল।
নান্টু তবু জবাব দিল না, কাঁদাটা একটু বেড়ে গেল শুধু ।
আমরা গেলাম তা হলে।
নান্টু একটু জোরে কেঁদে উঠল এবার।
তারিক বিরক্ত হয়ে বলল, আমি জানি না বাপু, তোর যা ইচ্ছে হয় কর। আমি যাচ্ছি।
এই তারিকের জন্যই যত গন্ডগোল, দীপু তারিকের উপর রেগে উঠল। কিন্তু রেগে তো আর সমস্যার সমাধান হয় না। সত্যি সত্যি যদি নান্টু নামার সাহস না পায় তা হলে অবস্থাটা কী হবে ভাবতে পারে না।
তারিককে খুব বেশি চিন্তিত মনে হল না। সে দীপুর উপর সমস্ত দায়দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে নেমে গেল। উপর থেকে দেখল, তারিক শিস দিতে দিতে হেঁটে হেঁটে চলে যাচ্ছে রাস্তা ধরে।
দীপু একা একা বসে রইল নান্টুকে নিয়ে। অনেক বুঝিয়ে ধমক দিয়ে বা ভয় দেখিয়েও কোনো লাভ হল না। নান্টু ঐভাবে বসে কেঁদে যেতে লাগল। দীপু বুঝতে পারছিল, ও ঠিক স্বাভাবিক নেই, হঠাৎ খুব বেশি ভয় পেয়ে একটা কিছু ঘটে গেছে ওর ভেতর। কিন্তু বুঝেই-বা লাভ কী। আরও কিছুক্ষণের ভেতর নিশ্চয়ই খোজাখুঁজি শুরু হবে। তখন কী হবে সে ভেবে পায় না। এক হতে পারে সে নিজে নেমে গিয়ে নান্টুর বাসায় খবর দিয়ে পালিয়ে যায়, তারপর নান্টুর বাসার লোজকন যা ইচ্ছে হয় করুক। কিন্তু পর মুহুর্তে সে এটা উড়িয়ে দেয়। পুরো ঘটনার দায়িত্ব ওকেও নিতে হবে। আব্বাকে জানালে আব্বা নিশ্চয়ই একটা ব্যবস্থা করবেন, কিন্তু তার আগে তার গলায় দড়ি দিয়ে মরতে হবে। ওর আব্বা ওকে যত স্বাধীনতা দিয়েছেন তত স্বাধীনতা আর কাউকে কারো আব্বা দেননি। স্বাধীনতা পেয়ে যা ইচ্ছে করে ঝামেলা বাঁধিয়ে আব্বার কাছে হাজির হওয়ার থেকে লজ্জার কী আছে? আব্বা হয়তো কিছু বলবেন না—হয়তো ভুরু কুঁচকে ওর দিকে তাকবেন, দীপু বুঝতে পারে ও তার আব্বার সামনে লজ্জায় মরে যাবে তা হলে। তার ইচ্ছে হল বসে বসে খানিকক্ষণ কেঁদে নেয় ।
প্রায় আধ ঘণ্টা পরে হঠাৎ দীপু নিচে থেকে তারিকের গলার স্বর শুনতে পেল, হেই—হেই দীপু।
কী?
এখনও আছিস তোরা?
নান্টু এখনও কাঁদছে?
হ্যাঁ ।
লাথি মেরে ফেলে দে নিচে ।
দীপুরও তাই ইচ্ছে করছিল, কিন্তু সত্যি সত্যি তো আর ফেলে দেয়া যায় না।
কী করবি এখন?
জানি না। দীপু চিন্তিত মুখে বলল, আমার আব্বাকে খবর দিতে পারবি একটু?
মাথা খারাপ ! আমি ওসবের মাঝে নাই।
তারিক চলে গেল না, নিচে ঘুরে বেড়াতে লাগল। খানিকক্ষণ পর বলল, তুই দাঁড়া, আমি আসছি।
বেশ খানিকক্ষণ পর তারিক এক গাছা দড়ি নিয়ে ট্যাংকের উপরে উঠে আসে।
হারামজাদার গলায় বেঁধে লটকে দেব।
যাঃ । ফাজলেমি করিস না, কী করবি বল।
নান্টুকে ঘাড়ে করে নামাব। কিন্তু হারামজাদাকে বিশ্বাস নাই। ওটাকে পিঠে তুলে নেবার পর তুই শক্ত করে আমার শরীরে সাথে বেঁধে দিবি।
দীপুর চোখ কপালে উঠে গেল। অবাক হয়ে বলল, তুই নান্টুকে ঘাড়ে করে নামাবি? এখান থেকে?
হ্যাঁ।
মাথা খারাপ?
বকবক করিস না। এছাড়া কী করবি?
সত্যি কিছু করার নেই। কিন্তু নান্টুকে ঘাড়ে করে প্রায় দুশো ফিট খাঁড়া সিঁড়ি বেয়ে নেমে যাওয়া কি সোজা কথা! দীপু ভাবতে গিয়ে ভয় পেয়ে গেল, বলল, তারিক, বেশি বাড়াবাড়ি করতে যাসনে, একটা-কিছু হয়ে গেলে—
তুই ভ্যাদর ভ্যাদর করবি না। আমি তোদের মতো ডিম মাখন খাওয়া বড়লোকের ন্যাদন্যাদা বাচ্চা না! ছোটলোকের পোলা আমি—ওই হারামজাদার মতো দু-চারটা বোছা আমি ঘাড়ে করে মাইল মাইল যাই প্রায় রোজ।
দীপু চুপ করে রইল। সত্যি যদি সে সাহস করে, তা হলে ঠিকই নেমে যাবে।
নান্টু কিছুতেই তারিকের পিঠে উঠতে রাজি হচ্ছিল না। দীপু নিজেও ওরকম অবস্থায় কখনও রাজি হতো না। কিন্তু ওকে রাজি করানোর জন্যে তারিক যে কাজটি করল সেটির তুলনা নেই! পকেট থেকে একটা ছোট চাকু বের করে চোখ লাল করে দাঁতে দাঁত ঘসে বলল, যদি পিঠে না উঠিস, চাকু মেরে দেব শালার!
অন্ধকারে তারিকের চকচকে চোখ আর হিসহিসে গলার স্বর শুনে নান্টু সত্যি ভয় পেয়ে গেল। ডাক ছেড়ে কেঁদে উঠতে চাইছিল, তার আগেই তারিক চাকুটা গলার মাঝে ধরল। বলল, খবরদার, খুন করে ফেলব হারামির বাচ্চা।
নান্টু শুকনো মুখে খাবি খেতে খেতে ফ্যাসফ্যাস করে কাঁদতে লাগল, তারপর বাধ্য ছেলের মতো তারিকের পিঠে উঠল। দীপু খুব শক্ত করে নান্টুকে তারিকের সাথে বেঁধে দিল যেন ভয়ে ছেড়ে দিলেও পড়ে না যায়। তারিক কোথা থেকে গরুর দড়ি খুলে এনেছে, ছিড়ে যাবারও ভয় নেই ।
তারিক নামাতে শুরু করার আগে হঠাৎ দীপুর ভীষণ ভয় করতে লাগল। ওঠার সময় দেখেছে খাঁড়া সিঁড়িতে সবসময় মনে হয় পেছন দিকে কে যেন টানছে, হাত একটু আলগা করলেই বুঝি পড়ে যাবে। শক্ত করে ধরে রাখতে রাখতে হাত ব্যথা হয়ে যায়। এর মাঝে কেউ যদি কাউকে পিঠে নিয়ে নামতে চেষ্টা করে তা হলে যে কী ভয়ানক লাগবে সে চিন্তাও করতে পারে না। কিন্তু তারিক যখন সত্যি সাহস করছে, তখন ওর কিছু বলার নেই। আস্তে আস্তে বলল, তুই আগে নিচে নামবি, না আমি?
তুই আগে শুরু কর। একটু ঝামেলা-টামেলা হলে ইয়ে করিস।
আচ্ছা, ঘাবড়াস না— আমি থাকব তোর নিচে নিচে।
দীপু নামতে শুরু করে। নিচে—কত নিচে কে জানে ছোট ছোট গাছপালা, ছোট ছোট ঘর বাড়ি! কত ওপরেই না ওরা দাড়িয়ে আছে! সিঁড়ি বেয়ে দু-তিন ধাপ নেমে ও দাঁড়ায়, তারিককে ডেকে বলে, এবারে তুইও নাম।
নামছি, বলে তারিক নামার জন্যে এগিয়ে আসে। দীপু উপরে তাকাতে পারছিল না ভয়ে। কিন্তু তারিকের সাহস আছে সত্যি, ঠিকই সিঁড়িতে পা দিয়ে নামতে শুরু করে দিল। মুখে বলতে লাগল, নান্টু হারামজাদা যদি একটু নড়িস তা হলে শূয়োর হাত ফসকে যাবে, আমি তো মরবই, তুইও মরবি—
নান্টু কোনো শব্দ করছিল না, শব্দ করার মতো সাহস বা ইচ্ছে কোনোটাই নেই।
তারিক এক পা এক পা করে নামতে থাকে সাথে সাথে দীপুও, তারিক নিচে তাকাতে পারছিল না, যতটুকু সম্ভব সোজা হয়ে সিঁড়ির সাথে মিশে নামতে হচ্ছিল । দীপু সাবধানে মাঝে মাঝে তারিকের পা সিঁড়িতে লাগিয়ে দিচ্ছিল। খুঁজে সিড়ির ধাপ না পেয়ে তারিকের পা ফসকালে হাত দিয়ে ধরে তাল সামলাতে পারবে না। কত নিচে নামতে হবে কে জানে! দীপুর কাছে একেকটি মুহুর্ত মনে হচ্ছিল একেকটি বছর।
উপর থেকে আবার তারিকের গলার স্বর শোনা গেল, দেখে তো মনে হয় শুকনো, শালার ওজন তো ঠিকই আছে। কী খাস হারামজাদা? সীসা নাকি? বাবাগো! হাত না ছিড়ে যায়! খবরদার—খবরদার নান্টু—নড়বি না। তুই মরতে চাস মরিস, আমার কোনো আপত্তি নেই, আমাকে নিয়ে মরিস না।
নান্টু কোনো উত্তর দিল না, উত্তর দেয়ার মতো অবস্থাও নেই। প্রথম অংশটুকু সবচেয়ে ভয়ানক, একেবারে খাড়া আর ভয়ানক লম্বা। এক সময়ে সত্যি সেটা শেষ হয়ে গেল। পরের অংশটুকু শুরু হবার আগে খানিকটা জায়গা রেলিং দিয়ে ঘেরা, পা ছড়িয়ে বসাও যায় ইচ্ছে হলে। তারিক নেমে এসে মুখ হা করে শ্বাস নিতে থাকে-ভীষণ পরিশ্রম হয়েছে ওর পরিশ্রম থেকে বড় কথা, সারাক্ষণ পড়ে যাবার ভয়ে তারিক গলগল করে ঘামছিল।
দীপু জিজ্ঞেস করল, একটু বিশ্রাম নিবি?
বিশ্রাম? এই হারামজাদাকে ঘাড়ে নিয়ে বিশ্রাম নেব কেমন করে?
নাহ, থাক। খোলা, আবার বাঁধা অনেক ঝামেলা। নে শুরু কর।
আবার নামতে শুরু করে ওরা। প্রথম প্রথম তারিক নান্টুকে গালিগালাজ করছিল, মাঝে মাঝে দীপুর সাথে কথা বলছিল। আস্তে আস্তে তার গলার স্বর থেমে গিয়ে শুধু লম্বা লম্বা নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। নান্টুকে ঘাড়ে করে নিয়ে নামতে যে কী পরিমাণ পরিশ্রম হচ্ছে দীপু খুব ভাল করে বুঝতে পারে।
কতক্ষণ লেগেছিল কে জানে! শেষ ধাপটা নেমে দীপুর ইচ্ছে করছিল আনন্দে চিৎকার করে উঠতে। তারিক টলতে টলতে কোনোমতে দাঁড়িয়ে থাকে। মুখ হা করে শ্বাস নিতে নিতে বলে, খুলে দে তাড়াতাড়ি।
দীপু তাড়াতাড়ি খুলে দিতে চেষ্টা করে। খুব শক্ত হয়ে এঁটে গিয়েছিল, তাই তারিকের কাছ থেকে চাকু নিয়ে দড়ি কেটে নান্টুকে আলগা করল। সাথে সাথে তারিক লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে।
নান্টু অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে রইল, তখনও ফোঁস-ফোঁস করে কাঁদছিল, কী জন্যে কে জানে!
দীপু তারিককে জিজ্ঞেস করল, বাতাস করব খানিকক্ষণ?
তারিক হাত নেড়ে না করল। দীপু তবুও শার্ট খুলে বাতাস করতে থাকে। তারিকের জন্যে একটা-কিছু করতে ইচ্ছে করছিল ওর।
তারিকের উঠে দাঁড়াতে বেশ খানিকক্ষণ সময় লাগল। বারকয়েক হাত-পা ছুড়ে একটু তাজা হয়ে দীপুকে বলল, বাড়ি যা এখন, মার খাবি গিয়ে। কত রাত হয়েছে দেখেছিস? তারপর নান্টুকে ডাকল ঠান্ডা গলায়, নান্টু শোন।
কী?
শোন বলছি ।
নান্টু ভয়ে ভয়ে কাছে এগিয়ে আসে আর কিছু বোঝার আগেই পেটে প্রচন্ড ঘুষি!
বাবাগো বলে নান্টু নাক মুখ চেপে পেটে হাত দিয়ে মাটিতে বসে পড়ে। তারিক ওর দিকে না তাকিয়ে হালকা শিস দিতে দিতে হেঁটে চলে গেল।
দীপু খানিকক্ষণ তারিককে চলে যেতে দেখল। তারপর নান্টুকে ঘাড় ধরে টেনে তুলল। হাসতে হাসতে বলল, কাদিস না বেকুব কোথাকার! আমি হলে অন্তত দশটা ঘুষি মারতাম, তারিক তো মোটে একটা মারল!