দুঃখবাদী কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের (১৮৮৭-১৯৫৪) কথা আমরা কি মনে রেখেছি ? কাব্য সাহিত্যের স্বর্ণযুগে তিনি ছিলেন একক এক আত্মপথের স্রষ্টা। কবির পৈত্রিক বাড়ি ছিল নদীয়া জেলার হরিপুরে, কিন্তু জন্মগ্রহণ করেন মাতুলালয়ে বর্ধমান জেলার পাতিলপাড়া গ্রামে। পিতা দ্বারকানাথ ছিলেন খ্যাতনামা কবি। ১৯১১ সালে শিবপুর কলেজ থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে প্রথমে নদীয়া জেলা বোর্ড ও পরে কাশিমবাজার রাজ-এস্টেটে কাজ করেন। লোহা-লক্কড় ও যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ কারবার করলেও, তাঁর সত্তাটি ছিল নিখাদ কবির। আধুনিক যুগে নঞর্থক জীবন-ভাবনার যে প্রবণতা শুরু হয়, বাংলা কবিতার আত্মায় তিনিই তা সঞ্চারিত করেন। মূলত দুঃখবাদকে আশ্রয় করেই কবি দ্বান্দ্বিক সংশয়কে প্রশ্রয় দেন।

চিরায়ত সুন্দরের ধ্যান-ধারণা ও শুভচেতনার বিপরীতে মালিন্যের প্রতি আসক্তি প্রকাশই আধুনিক কবিতার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। যতীন্দ্রনাথ ফরাসি কবি বোদলেয়ারের মতোই কদর্যতার সৌন্দর্য অবলোকন করেন। বাংলা কবিতার রুচি ও মর্জি বদলের এবং জীবনানন্দ দাশের ‘বোধ’গত ব্যক্তি-হৃদয়ের রহস্যময় পদধ্বনির কথা শুনিয়ে দেন। যে ‘বোধ’ ব্যক্তিকে তাড়িত করে, দুর্জ্ঞেয় মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়, নারী-শিশু-প্রেম-বন্ধুতা-সম্পদ-স্বচ্ছলতা— কিছুই যাকে বাঁধতে পারে না, পৃথিবী প্রতীত হয় মৃতের মাথার খুলির মতো, যতীন্দ্রনাথও দুঃখবাদে মথিত হয়ে, তাকে জীবন ও জগতের প্রেম ও সৌন্দর্যের ‘মায়াবী ছলনা’ বলে ভাবতে থাকেন। তাঁর মনে হয় সবই অন্তঃসারশূন্য, সামঞ্জস্যহীন। তাই তাঁর নেতিবাচক দৃষ্টিতে শুধু উঠে আসে জীবনের দুঃখপীড়ন বিষাদ আর আলোহীন চির অন্ধকারের সাম্রাজ্য।

প্রথম তিনটি কাব্যেই মরুময় জীবনের ব্যঞ্জনাশ্রিত প্রতীকে তিনি নামকরণ করেন ‘মরীচিকা’ (১৯২২), ‘মরুশিখা’ (১৯২৭) ও ‘মরুমায়া’ (১৯৩০)। ‘মরু’ শব্দটিই এই জগৎ-জীবন-প্রেম-প্রকৃতি ও স্বপ্নের অস্বীকৃতিকে জোরালো করে তোলে। সবই মায়াজাল, মিথ্যা ফানুস। তিনি ঘোষণা করলেন ‘সুখবাদী’ কবিতায়:
‘মিথ্যা প্রকৃতি, মিছে আনন্দ, মিথ্যা রঙিন সুখ;
সত্য সত্য সহস্রগুণ সত্য জীবের দুঃখ!’

দুঃখের চশমা চোখেই তিনি দেখলেন জগৎ-জীবনকে। প্রেম বলে যাকে লোকে ভাবে তাঁর কাছে আসলে তা ভোগের নামান্তর। নারীদেহ পুরুষ ও শিশুর চাহিদা মেটায়। পুরুষ যৌনাকাঙ্ক্ষা তৃপ্ত করে, শিশু স্তন্যপান করে পরিপুষ্ট হয়। ভারবহনকারী গাড়োয়ানের দুঃখের গল্প ফুরোয় না। খেজুরের রস আসলে খেজুর বনেরই কান্না। গেনু দাসের বাঁশিতে সুর ঝরে না, অশ্রু ঝরে। যে ফুল সৌন্দর্যের প্রতীক,
সকলের ভালোবাসার বস্তু— সেই ফুলও মালায় উঠে কী দশাপ্রাপ্ত হয় কবি জানালেন, ‘ঘুমের ঘোরে’ কবিতায় :
‘কণ্ঠে দুলালে মিলন-মালিকা নব সুগন্ধ ঢালা
সদ্য ছিন্ন শিশু কুসুমের কচি মুণ্ডের মালা!’

এভাবে কে দেখেছে ফুলকে? লোকের দরজায় কত সুন্দরী পসারিণী, কবির দরজায় শীতকালে জরাজীর্ণ বৃদ্ধ এক কচি ডাবওয়ালা। নবান্ন দিনে চিরনিরন্ন চাষি, অতিথির কাছে আশীর্বাদের বদলে অভিশাপই চেয়েছে। চেরাপুঞ্জিতে কত বৃষ্টি, অথচ গোবিসাহরা হাহাকার করছে। কেন এত অসাম্য চারিদিকে? কবি এসবের উত্তর পাননি, শুধু কৌতুক অনুভব করেছেন:
‘আনন্দ নহ নহ
দিচ্ছ দুঃখ
দুঃখের ফেরি বহ।’

দুঃখের ফেরিওয়ালা সর্বত্রই দুঃখ বিলি করে চলেছেন। গোঁজামিল দিয়ে জগৎ চলছে। জননীর কোলে সন্তান দিয়েও তাকে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। নিরীহ ছাগশিশু যতই সুন্দর হোক তাকে খাদ্যের নামেই ভক্ষণ করা হচ্ছে। প্রকৃতি মায়াবিনী, ‘বিপথযাত্রী করিছে রাত্রিদিবা’। সবই খাদ্য ও খাদকের সম্পর্ক। ‘ষড়-ঋতু ছলে ষড়-রিপু কাম হ’তে মাৎসর্য’— সুতরাং নীতি-আদর্শের কোনো বালাই নেই। এই মহা অস্থির বঞ্চনায় কবি ঘুমকেই একমাত্র আশ্রয় হিসেবে গ্রহণ করলেন, আর সেই কারণেই ঘুমিওপ্যাথির আবিষ্কার করলেন :
‘সারাবিশ্বের বেদনা বহিয়া কেমনে জীবন চলে
বুঝেছি প্রাণটা ঠান্ডা রেখেছে ঘুমিওপ্যাথির বলে।’

‘ঘুম’ আছে বলেই জীবনের বিশ্রামে নিজেকে কিছুটা টিকিয়ে রাখা সম্ভব। কিন্তু হৃদয়ে যার দুঃখের অনল জ্বলছে তিনি কী করে ঘুমাবেন ? সুতরাং ঘুমিওপ্যাথির আবিষ্কর্তাই অনিদ্রায় ম্রিয়মাণ। জীবনকে বিদ্রুপ করতে করতে কবি নিজেও বিদ্রুপের শিকার হয়ে পড়েছেন। জীবনযন্ত্রণার পরিধি ধীরে ধীরে বেড়ে গেছে। এভাবেই হয়তো তৈরি হয়েছেন জীবনানন্দ দাশের ‘বোধে’র মানুষটি। পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ-বর্ণ-স্পর্শে যেন তাঁর কোনো দাবি নেই। তিনি শুধু অন্ধকারেরই যাত্রী, মরুহৃদয়ের মানুষ। দুঃখবাদী, বস্তুবাদী, ব্যঙ্গপরায়ণ বাংলা কাব্য-কবিতার পথিক।

রবীন্দ্রনাথের আনন্দময় জীবনদেবতার পরিবর্তে তিনি কৌতুক প্রিয় দুঃখবাদী ‘বন্ধু’কেই বেশি আপন ভাবেন। তাই যাবতীয় অভিযোগ করতে গিয়ে ‘বন্ধু’ সম্বোধনটি রঙ্গপ্রিয়তায় উচ্চারণ করেন। যে দুঃখ বা অতৃপ্তি কবিকে ইহবিমুখ করেছে এবং জীবন সম্পর্কে এনে দিয়েছে চরম বৈরাগ্য তিনি যে প্রতিবাদীও একথা বলতে ভোলেননি। ‘লোহার ব্যথা’ কবিতায় লিখেছেন :
‘যাহা অন্যায়, হোক না প্রবল, করিয়াছি প্রতিবাদ
আমার বুকের কোমল অংশে, কে বলিল তারে খাদ?’

লোহা এই জীবন, প্রতিমুহূর্তে তার ওপর পড়ছে হাতুড়ির ঘা, মাথা তুলবার অবকাশ নেই। একদিকে সমাজ শাসনের পীড়ন, অন্যদিকে রাষ্ট্রযন্ত্র এবং নিয়তিবাদের ষড়যন্ত্র ‘আগুনের তাপ সাঁড়াশির চাপ’ সৃষ্টি করেছে। মানুষ অসহায়। প্রতিবাদ করেও নিরুপায়ের অন্ধকারে অশ্রুময় জীবনই বহন করে চলেছে। কবি এই সত্যটিই উদঘাটিত করলেন যা বোধের জগতের সেই বিমূঢ় দিকভ্রান্ত সন্ন্যাসের মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া আত্মসমর্পণকারী কোনো বিপন্ন সত্যদ্রষ্টা যার কাছে পৃথিবী বা ব্রহ্মাণ্ডটি মস্ত একটি মাকাল ফল। কিন্তু এরপরেও একটা জিজ্ঞাসা থেকে যায়— কেন এই বীতরাগ ?

কবির প্রখর জীবনতৃষ্ণা ছিল বলেই এবং তা সমূহ অপূর্ণতায় ভরা বলেই তিনি শূন্যতা নিয়ে, দুঃখ বৈরাগ্য নিয়ে, এরকম মৃত্যুসন্ন্যসের যাত্রী হয়েছেন। যে প্রাপ্তি সম্পূর্ণ অধরা, যে সামঞ্জস্য কখনোই নেমে আসবে না, তার জন্য তো ব্যক্তিকে অবশ্যই দুঃখ পেতে হবে। আর এই দুঃখ পাওয়াও দুঃখের সঙ্গেই প্রেমে আবদ্ধ হওয়া। কবির কপালে যতই ‘তেঁতুলগোলা’ থাক, তার অন্তরালে দধি-মাখন পাওয়ারও ইচ্ছা ছিল। রামপ্রসাদ সেন গেয়েছেন :
‘মা নিম খাওয়ালে চিনি বলে কথায় করে ছলো।
ও মা মিঠার লোভে তিত মুখে সারাদিনটা গেল।

যতীন্দ্রনাথ মিঠা খাওয়ার ইচ্ছে নিয়েই নিম খেয়েছেন, তাই শেষপর্যন্ত অনুশোচনাও এসেছে। আবার ফিরে আসতে চেয়েছেন শান্তশ্রী আশ্রয়ে। তাই কাব্যের নামকরণে আবার পাল্টে গেছে জীবনের প্রত্যয়ও। পরবর্তী তিনটি কাব্য— ‘সায়ম’, (১৯৪১) ‘ত্রিযামা’ (১৯৪৮) ‘নিশান্তিকা’ (১৯৫৭)-র অর্থ করলে পাওয়া যায়—সন্ধ্যা, রাত্রির তৃতীয় প্রহর, রাত্রির অবসান—অর্থাৎ রাত্রির মহিমময় রূপ শেষপর্যন্ত স্নিগ্ধতায় পর্যবসিত হয়— যা প্রভাতের দিকেই প্রবহমান। এই প্রভাত তো রবীন্দ্র আলোকেই আলোকিত, মানবতাবাদী জীবনতৃষ্ণার স্বরূপটিই সেখানে বিরাজ করে। যে দাবদাহ জীবন দগ্ধ করেছে—তা-ই ছিল কবির প্রেম। ‘দেশোদ্ধার’ কবিতায় সেই আশাবাদই ঝংকৃত হল:
‘ফসল হবেই হবে !
আকাশ হইতে না নামে বৃষ্টি, পাতাল ফুঁড়িবি তবে।
আপনার হাতে বুনেছিস যাকে,
টেনে তুলে বলে রু’য়ে দিবি পাঁকে,
বাজিবে মাদল ঝরিবে বাদল বর্ষার উৎসবে।’

রঙ্গ-ব্যঙ্গ যা-ই থাক জীবন যে বাঁচতে চায়, আশার বীজ বুনে ফসল তুলতে চায়, সে কথা শেষপর্যন্ত কবিও স্বীকার করলেন। ‘বাদল’ ও ‘মাদল’ শব্দ দুটি জীবনের পর্যাপ্ত উল্লাসেরই ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু কবি যে সংশয় ও দ্বান্দ্বিক জীবনের প্রশ্রয়ে এই জগৎ-জীবনকে দেখার দৃষ্টি খুলে দিলেন, সেখানে সৌন্দর্যের অন্তরালে কদর্যতা, সুখের অন্তরালে দুঃখকে আবিষ্কার করলেন, পাঁজরের নিরবচ্ছিন্ন যন্ত্রণা নিয়ে সমষ্টি চৈতন্যে করাঘাত করলেন, তাতেই নতুন সাহিত্য পথের দরজা খুলে গেল। জীবনানন্দ দাশ সেই বোধের বিস্তৃতি ঘটালেন। নিঃসঙ্গ জীবনের শেকড় ছড়িয়ে গেল যুগের প্রাণসত্তায়।