কৈশোরের ছুটে চলা সময়ের স্মৃতি গুলো বাস করে করোটিতে মৌনতায়, যৌবনের বৃত্তে পা দিতেই কিছু স্মৃতি ঘোলাটে রং ধরে, স্মৃতির জাবর কাটতে গিয়ে বুকে দারুণ শূন্যতা অনুভব হয়, স্মৃতিগুলোকে রংতুলিতে আঁকতে চেয়েছি অনেক, কিন্তু যৌবনের জীবনধারায় যখন মন্থর শ্লথ গতি নিবিষ্ট হয়, তখন স্মৃতিগুলো রঙিন করার চেয়ে হৃদয় কিছু রঙ ঢেলে দিতে হয়।
আমার হয়েছে তেমন অবস্থা, বেকারত্বের বিষণ্নতা হৃদয়টাকে পুরো গ্রাস করে নিচ্ছে, নৈঃশব্দতার গহীন গহব্বরে তলিয়ে যাওয়ার আগে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াইটা করে যেতে হবে, সংকটাপন্ন জীবন স্নানতায় ভরে উঠেছে, একাকীত্ব যেন দৈত্য রূপে জীবনের সাথে মিশে গেছে।
দারুন ব্যস্ততায় দিন কাটানো বন্ধুদের দেখা পাওয়া বড় ভাগ্যের ব্যাপার, আমার নির্লিপ্ত জীবন ধ্বংসলীলার সামনে দাঁড়ানো,
মাঝে মাঝে মনে হয় যেন সবকিছুই নিষ্ফল কেটে গেল অনেকটা জীবন, রঙহীন আহ্লাদ হীন জীবনের স্বাদ মুখে নিয়ে মাঝে মাঝে থমকে যাই, তোমরা যাকে ডিপ্রেশন বল।
এমন নিকষ কালো অন্ধকারে স্মৃতির হাবি হাতড়িয়ে শরতোববো কোন আনন্দঘন স্মৃতির সন্ধান পাই না ।
জীবনের প্রতি শেষ বৃন্দু ঘৃণা ছুড়ে দেয়ার আগে সমবেত হতে পেরেছি প্রিয় বন্ধুদের সাথে, তাদের সংস্পর্শে কিছুটা ভালো লাগা অনুভব করলাম, বেকারত্বের গ্লানি যেভাবে আমার উপর আচড়ে পড়েছে, আমি সত্যি তার থেকে পরিত্রান চাই, কেন আমি বেকার? কথাটা শুনতে শুনতে আমি খুব ক্লান্ত, একঘেয়েমিতে ভরে উঠেছে জীবনের সকল আনন্দ-বেদনার পাত্র, ঠিক এমন একটা সময়ে বন্ধুদের ভ্রমণে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে আমি মনেপ্রাণে স্বাগত জানিয়েছি।
স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে মুছাপুর, নোয়াখালীর শেষ প্রান্তের একটা জায়গা, এর আগেও আমাদের একই জায়গায় ভ্রমণ হয়েছিল, যেখানে ছোট আকারে সমুদ্র এবং বন একসাথে পাওয়া যায়, অনেক আনন্দের স্মৃতি আছে আমাদের এই জায়গায়, এই জায়গার অনেক অংশজুড়ে, তাই আবারও সিলেকশন।
কোন এক ভোরে আমাদের যাত্রা শুরু হবে, ঠিক গতবারের মতো একটা মিনি বাস ভাড়া করা হলো, খাবারের মেনু আগে যা ছিল তা, তাৎক্ষণিক চা দোকানদারের রান্না করা ভাত ডাল এবং সাথে ডালের বড়া, এক অন্যরকম তৃপ্তি, কয়েকদিনের টানা বর্ষণের পর এখন পরিবেশ শান্ত, আকাশে তীক্ষ্ণ সূর্য জমিনে থৈথৈ করছে পানি রোদের সাথে পানির একটা ঝলমলে খেলা চলছে, আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলছে দ্রুতগতিতে, আমি জানলার পাশে তাকিয়ে আছি প্রকৃতির সৌন্দর্য দর্শনে গাড়িতে বিরতিহীন গান চলছে, রাসেলের প্রিয় গান, তুমি দিও নাগো বাসর ঘরের বাত্তি নিভাইয়া, একই গান বারবার চলেছে, যেহেতু মিউজিক প্লেয়ার তার হাতে নিরুপায় অন্যরা, তাদের ভেতর ১৮ প্লাস কথার যত ঝুড়ি আছে সব উগড়ে দিচ্ছে, মাঝে মাঝে আমিও, আমরা প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছি।
এই দিকে রাস্তা অনেক সংকীর্ণ দু’পাশে পানি রাস্তা ছুঁই ছুই মনে হচ্ছে এবং মনে হচ্ছে সমুদ্রের ভেতর ট্যানেল, পানি থৈ থৈ করছে বাতাসে ঢেউ খেলছে এতই সংকীর্ণ রাস্তা বাহিরে তাকালে বোধহয় গাড়িটা পানিতে পড়ে গেলো বুঝি।
শেষ পর্যন্ত সেটাই হলো আমাদের গাড়ি এক্সিডেন্ট করলো পানিতে পড়ে গেল, আর শুরু হল আমাদের আর্তনাদ এবং ডুবে যাওয়া গাড়ি থেকে কার আগে কে বের হবে, আমি পিছিয়ে পড়লাম একে একে সবাই তীরে উঠেছে আর পানির দিকে তাকিয়ে অধীর আগ্রহে গগনবিদারী চিৎকার দিচ্ছে, শেষ ব্যক্তি হিসেবে আমি গাড়ি থেকে বের হতে পারলেও পানি থেকে উঠতে পারেনি, পানির স্রোত আমাকে টেনে নিয়েছে তাদের চেয়ে অনেক দূরে, দশ বারোজন বন্ধু সবাই আমার জন্য হাত বাড়িয়ে আছে কিন্তু আমাকে দেখছে না আমি পানির নিচে উঠব কি করে, আমার মাথার উপরে জাল স্রোতে আমাকে জালে আটকে দিল, আমি সাঁতরে এ মাথা থেকে অন্য মাথায় যাই, কিন্তু জলের বাহিরে যেতে পারি না, আবার সাতরে যাই বন্ধুরা কাঁদছে, তারা ততক্ষনে ধরেই নিয়েছে আমি পানির অতলে মিলিয়ে গেছি, অথচ জীবনের উপর যতই অপ্রসন্নতা থাক না কেন, আমি অবিরাম বেঁচে থাকার জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছি, জলের বাহিরে আমাকে যেতেই হবে আমার শক্তি প্রায় শেষ আমি বুঝতে পারলাম এই জালের বাহিরে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়, কিন্তু আমাকে বাঁচাতে হবে, শেষ নিঃশ্বাস টুকু চলে যাওয়ার আগে আমি গালের দুই পাটির দাঁতের সর্বশক্তি দিয়ে জাল টা কেটে ফেললাম এবং জলের বাহিরে মাথাটা বের করার সাথে সাথেই জীবনের সেরা জিনিসটা পেলাম, হ্যাঁ আমি অক্সিজেন পেলাম, মাথার উপর আকাশ দেখলাম ঠিক তখনই স্বপ্নটা ভেঙ্গে গেলো মূলত এই আমার বাস্তব জীবনের চিত্র।