নফুদ মরুর তায়মায় তাওরাতে বলা কূয়ার ধারে

তাবুক শহর থেকে নফুদ মরুর মধ্য দিয়ে নযদের দিকে মাঝ পথে হাইল। এক্সপ্রেসওয়ে ধরে প্রথম পঞ্চাশ কিমি পর্যন্ত ডানে-বাঁয়ে ছোট-বড় বিচিত্র সবুজ উদ্যান। সে পথ বেয়ে চলি।
মনের পর্দায় দোল খায় কাছিমের পিঠের মতো তাবুকের বিস্তীর্ণ চত্বর। ঢালে ঢালে নবীজীর তিরিশ হাজার সাহাবির খিমা। মসজিদ-ই-আবু বকর। জুলবাজাদাইনের কবর। …তাবুক থেকে দু’শ কিমি দূরে আকাবা উপসাগরের তীরে মাদায়েনের প্রাচীণ পথের ধারে আল-বেদে আরবের নবী শোয়াইব আ.-এর স্মৃতি বিজড়িত পাহাড়ি ঘরবাড়ি। মাগায়েরে শোয়ায়েব। সেখানে মুসা নবির যৌবনের স্মৃতির বন্দর। সেখান থকে অল্প দূরে ঝলকায় তুর পাহাড়ের নূর।
হাজার হাজার খেজুর গাছের পাহারায় আঙ্গুরের ঝোপের কাছে ছাগল-ভেড়ার পাল। এ সবের শেষে বাস মোড় নেয় নফুদ মরুর দিকে।
প্রাচীন পাহাড়সারির মাঝে মরু বিয়াবান। ধুসর ক্যানভাসে কালো দাগের মতো সে পথ…
বালুর সাগরে হু-হু শ্বাস-প্রশ্বাসের মাঝে কাছিমের পিঠের মতো কখনো উঁকি দেয় কালচে পাথর। বালু ও পাথরের মাঝে নতুন আকাবাঁকা অমসৃণ সরু-সড়কে বাসের গতি মন্থর।
দেড়শ কিমি পর মরুপল্লী কালিবায় পরিত্যক্ত কিছু মাটির ঘর নযরে পড়ে। তার পাশে বেদুইন তাবু। সেখানে কিছু মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস টের পাই। তার পর… শত কিমি শুধু ঠাঠা ধুধু মরুভূমি!
মুহাম্মদ আসাদের কথা মনে হয়। অস্ট্রিয়ার ইহুদি সাংবাদিক লিওপোল্ড উইস। ১৯২২ থেকে ১৯২৬ সাল পর্যন্ত মিসর, ফিলিস্তিন, জর্ডান, সিরিয়া, ইরাক ও আফগানিস্তান সফর করে জেরুসালেমে আসেন। তখন তার কাছে স্পষ্ট হয়: বহিরাগত ইহুদিরা নয়, আরবরাই- আরো স্পষ্ট বললে- বেদুইনরাই হিব্রু নবীদের প্রচারিত সদগুণাবলীর প্রকৃত প্রতিনিধি…
১৯২৬ সালে ইয়োরোপে ফিরে লিওপোল্ড উইস ইসলাম কবুল করেন। এরপর ছয় বছর আরব দেশে মুহম্মদ আসাদের টানা কষ্টকর সফর। তখন ছিলো বাদশাহ আবদুল আযীযের যমানা। বাদশাহ তাকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করেন। আরব ঘুরে দেখতে গাড়ি দেন। আসাদ গাড়ি ছেড়ে উটে চরে আরবের মরু সাগরে সাঁতার কাটেন…
এক ইয়োরোপীয়, তিনি আরব-মরুর লু হাওয়ায় আবিষ্কার করেন তার হৃদয়ের নিশ্চয়তা আর আত্ম-অবিশ্বাস থেকে মুক্তি…
নফুদ আল-কবিরের মরুঝড়ে পড়েন আসাদ। উট আর সাথি জায়েদকে হারিয়ে ফেলেন। এই নফুদে আসাদ যেনো মরণ পরখ করেন।
সেই সব অবিস্মরণ কাহিনী, আর তার ভেতর দিয়ে আরব-আত্মার সৌরভ ও সম্পদকে আসাদ তুলে আনেন রুহানী সফরের বয়ানে। ‘রোড টু মক্কা’য় আসাদ আসাদ লেখেন: ‘আমার কাহিনী… একজন ইউরোপীয়র ইসলাম আবিষ্কার আর মুসলিম সমাজে মিশে যাওয়ার সাদামাটা কথা।’
আসাদ স্মরণ করেন তার নফুদ মরুপথ পাড়ি দেয়া দিনের কথা: ‘যখন আমরা দু’জন, সওয়ারী হাঁকিয়ে চলেছি আর চলেছি, দু’জন দু’টি উটের উপরে, সাঁতরে চলা আলোর ভেতর…’
আর এখন আমি গাঙ্গেয় বদ্বীপের মুসাফির… আসাদের সাত-আট দশক পরে, বাদশাহ ফাহাদের যমানায়, মরুর তাপ-ঠেকানো কাচের দেয়ালঘেরা বাসে সেই নফুদের পথ চলছি।
নফুদ পাড়ি দিতে দিতে আমি সেই উটযাত্রীকে স্পর্শ করতে চাই। তার দিকে হাত বাড়াই… তার রূহানী সফরের সংগী হয়ে আমিও পৌঁছাতে চাই সেই জীবন-দৃষ্টির মর্মকেন্দ্রে। মক্কায়… আসাদ যাকে বলেছেন ‘হোম কামিং’। ‘ঘরে’ ফেরা।
মুহম্মদ আসাদ আরব মরুতে কাটান ১৯২৬ থেকে ১৯৩২ সাল তক। সে প্রথম সফরের কুড়ি বছর পর ১৯৫২ সালে আসাদ লেখেন: সে আরব এখন নেই। এর নির্জনতা আর সংহতি আর মহৎ সরলতা হারিয়ে গেছে। তেলের ধাক্কায় যে পরিবর্তন এসেছে, তার মাঝে আরব যা হারিয়েছে, কোনো দিন তা আর ফিরে পাওয়া যাবে না…
আসাদের এ বেদনার বয়ান এখন আমার মাথায় জ্বালা ধরায়। নয়া যমানার সওয়ারিতে বসে কল্পনা করি ঊনিশশ ছাব্বিশের আরব মানচিত্র… তার পর ঊনিশশ বায়ান্ন সাল!
সে আরব তো এখন আরো বদলেছে। মরুভূমির বুকে ছুটছে তেলের নহর। কাঁচা সোনার টানে নানা দেশের মানুষ আসছে দলে দলে… তাদের মুখে কফিল-ইকামা- রিয়াল-দিরহামের গল্প । নতুন সে কারাভাঁর পেছনে আমিও ছুটছি। এখন ছুটছি হাইলের দিকে… নফুদ মরুর পথে।
কালিবা পল্লী থেকে একশ কিমি পার হয়ে পাহাড়-পর্বতের গুহা-কন্দরে পরিত্যক্ত ঘরবাড়ি। তার পর সবুজের হাতছানি। নফুদের মাটি ভিজিয়ে নানা ফসলের সাথে খেজুর-জয়তুন-ত্বিন-আপেল-আনারের বাগান আবাদ করা হচ্ছে।
সে সবুজ-কোমল আতিথেয়তার মাঝে বাসের তুর্কি চালক সহি আরবী জবানে এলান করেন: তায়মা! ইশতারাহা নুস সা’! তায়মা! বিশ্রাম আধা ঘন্টা!!
নযদ ও হেজাজের উটের কাফেলার প্রাচীন চৌরাস্তায় আধুনিক সরাইখানার ধারে বাস থামে। তায়মার মাটি ছুঁই। দাঁড়াও পথিকবর! তিষ্ঠ ক্ষণকাল!
আরব উপদ্বীপের বহু যুগের সভ্যতা-সংস্কৃতি, যুদ্ধ-শান্তির সাক্ষী তায়মার কূয়ার কথা তাওরাতে আছে। সে প্রাচীন মরুদ্বানের আঙ্গুর লতার ছায়ায় দাঁড়িয়ে চার দিক দেখি। বেবাহা-বিস্তীর্ণ নফুদ মরুভূমিতে তায়মার পুরনো শহর। পাতালপুরির মতো মনে হয়…
জীবনের জন্য পানির প্রয়োজন। মরুচারীর চেয়ে তা আর কে বেশি বোঝে? হাজার বছর ধরে নিচু জমিন খোঁজেন মরু বেদুইন। হাদাবা বা ওয়াদির খোঁজ পেলে তাদের উটের কারাভাঁর গতি সে দিকে মোড় নেয়। ওয়দির তীরে নতুন তাবু খাড়া হয়। পল্লী গড়ে ওঠে…
কতো মরু-পাথার সাঁতরে কেটে কবে থেকে মানুষের স্রোত মিশেছে তায়মার মরুদ্যানে।
তার পর এ তায়মা মুহাম্মদ সা.-এর সাহাবিদের উত্তরমুখি কতো অভিযাত্রার সাক্ষি। তায়মার ইহুদিদের সাথে স্থায়ী সন্ধিপত্রে রাসূল সা.এর পক্ষে খালেদ বিন সাঈদ লেখেন: ‘এই বার্তা রসূল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে বনু তায়মার জন্য…’
সরাইখানায় খানাপিনা চলছে। প্রায় সব যাত্রী চা কিংবা কাহাওয়ায় গলা ভিজিয়ে নিচ্ছেন। সেদিকে আমার ভ্রুক্ষেপ নেই। আমি খুঁজছি অন্য কিছু…
বাসের এক বেদুইন সহযাত্রী কী ভেবে আমার দিকে এগিয়ে আসেন। এক টুকরা রুটি এগিয়ে ধরেন। আমি দুই হাত বাড়িয়ে তা গ্রহণ করি। মরুভূমিতে এ দাওয়াত অগ্রাহ্য করা গুনাহ!
আমি অস্থীর চোখে চার দিক দেখি। তায়মার প্রাচীন নাগরিক-ঐতিহ্যের প্রতিনিধি পৌর ভবন, পুরনো দর-দালান… গোটা তায়মাই তো এক বিশাল মিউজিয়াম!
তায়মা থেকে বাঁয়ে কালো পাহাড়সারির ওপারে খায়বার। তার পর মদীনা। ডানে উঁচু ভূমির আধুনিক কৃষিখামার পেরিয়ে একশ কি.মি. গেলে প্রাচীন সামুদ সভ্যতার লীলাভূমি ওয়াদিউল কুরা। ‘মাদায়েন সালেহ’।
দু’দিন আগে শোয়ায়েব নবীর মাদায়েনে ছিলাম। সালেহ নবীর এ মাদায়েন তো সে মাদয়েনের অভিন্ন ঐতিহ্যের অংশ। মাদায়েন সালেহ থেকে বাঁয়ে মোড় নিয়েছে দুমাতুল জন্দলের পথ…
তায়মার ঐতিহাসিক চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে আমি ভেবে পাই না কোন পথে যাবো!