হাতেম তায়ীর কবরের পাশে ফররুখের কাব্যপাঠ

বাস চলে হাইলের পথে। সড়কের দুই ধারে মরুভূমির ছবি অবিরাম বদলে যায়। মরু বাতাস কেটে বাসের একটানা হুহু শব্দের মাঝে তায়ীপুত্র হাতেমের কণ্ঠধ্বনী শুনতে কান খাড়া করি!
‘ঘুরেছি অনেক আমি। মানুষের বিচিত্র মিছিল
দেখেছি দু’চোখে। শহরে, বন্দরে, মাঠে, লোকালয়ে
চিনেছি তাদের আমি, ছিল যারা অচেনা; জীবনে
সম্পূর্ণ অপরিচিত। শ্রমজীবী মেহনতি মজদুর, মাল্লা,
মাঝি, কাঠুরিয়া, – বৃদ্ধ বা তরুণ—সকলেরি
পেয়েছি প্রাণের স্পর্শ। অনুভব করেছি জীবনে
মানুষের আত্মীয়তা সুদীর্ঘ সফরে।’

তায়মা থেকে একশ কিমি পার হয়ে মুহরজাহের। এখান থেকে নতুন পার্বত্য বেষ্টনী। শামলী ও ইসরাত পার হয়ে পাহাড়ের কোলে ছবির মতো আমায়ের বিন সানা পল্লী। বাস থামে। যাত্রী ওঠেন। দু’জন বেদুইন। আটজন প্রবাসী শ্রমিক। কেউ যাবেন হাইল। কারো সফর আল-কাসিম পানে। কেউ যাবেন রিয়াদ অবধি। বিকালের নরম রোদে পাহাড়-পর্বতের ভাঁজে ভাঁজে আলো-ছায়া নামে। ছোট্ট মনোরম পল্লী ওয়ালিদ আল আতরাম। তাবুর ধারে ছাগল-দুম্বার পাল। সে ছবি ছাড়িয়ে দূরে শাম্মারের উঁচু পর্বতমালা। সে পর্বতমালার কোল জুড়ে ছোট-বড় নাঙ্গা পাহাড়-পর্বত। সাঁঝের আলো-ছায়ায় বিষন্ন একাকি। নিজেকেও হঠাত একা মনে হয়। তুর্কি ড্রাইভার একমনে গাইছেন। কী গাইছেন বুঝি না। তবে সুরের মাঝে মরুর ঠাঠা বিরহের হাহাকার। কান্নার মতো বাজে! এমন সাঝেঁর মায়াময় উপত্যকায় হঠাত সড়ক আগলে দাঁড়ায় দু’টি উট। সাথে বালবাচ্চা। চালক গান থামিয়ে হর্ন বাজান। উট সরে না। আমরা অপেক্ষা করি। তারা দয়া করে পথ ছাড়েন।

ফারহানিয়া, মুহুফা, মাওকাফ পল্লী পার হয়ে আসমান সমান উঁচুতে উঠি। নিচে ওয়াদী, খেজুর বাগান, আর তার কাছে প্রাচীন প্রাসাদ কসর আল-আশরোয়াত দেখি। শেষে হাইল সীমানায় প্রবেশ করি। বাসস্টেশনে আবদুল মোত্তালেব ও মুনিরের নেতৃত্বে একঝাঁক তরুণ ঘিরে ধরেন মুসাফিরকে। দেরী না করে তারা একটি গাড়িতে তোলেন। হাইলের প্রাচীন সড়ক আর ঘর-বাড়ির দিকে চোখ রাখি। একটি পুরনো পাথুরে ভবনে আমাদের পথ থামে। আগে এ বাড়িতে স্কুল বসতো। সময় বদলেছে। স্কুল গেছে আধুনিক ভবনে। এখন এখানে বাংলাদেশী, পাকিস্তানি, শ্রীলঙ্কী ও ভারতীয় স্বল্প আয়ের প্রবাসী শ্রমিকগণ বাসা বেঁধেছেন। কিছুক্ষণের মধ্যে সে প্রাচীন বাড়ির বড় হল ঘরটি বরফ পড়া ঠান্ডা আর বালু পোড়া রোদে কাজ করা বাংলাদেশীদের কলধ্বনীতে মুখর হয়ে ওঠে।

তাদের মেহনতের টাকায় দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরে। তাদের অকৃত্রিম চোখে দেশের মমতামাখা। আমার চোখের তারার সাথে মিলে তাদের চোখ ছলছল করে। গভীর রাতে ঘুমাতে যাই হাইলের বিছানায়। সুবহে সাদিকে উঠেছি তাবুকে। এখন তাবুক ও রিয়াদের সম-দূরত্বে সাগর থেকে তিন হাজার তিন শ ফুট উঁচুভূমিতে শুয়ে ভাবি হাইলের কথা। স্থলপথে আরব উপদ্বীপের প্রধান প্রবেশদ্বার। উত্তর ও দক্ষিণ আরবের মাঝে প্রাচীন যোগাযোগের মধ্যবিন্দু। মেসোপটেমিয় বা ব্যাবিলনীয় ও আসুরিয় সভ্যতার সংযোগ বিন্দুতে হাইল। ইরাক-সিরিয়া থেকে হেজাজ ও নযদে প্রবেশের প্রধান দরোজা। হাইলের ষাট কিমি পুবে জাবাল জানীনের গুহার দেয়ালে সাত হাজার বছর আগের আমহারিক লিপির সন্ধান মিলেছে। হাবাশী পর্বতে পাওয়া গেছে চার হাজার বছরের পুরনো বুরুজ ও কবরের চিহ্ন। পাওয়া গেছে কিছু তরবারি ও যুদ্ধ সরঞ্জাম। ইয়াতিব দূর্গে পাওয়া সামুদীয় লিপিও হাইলের সভ্যতার প্রাচীনত্বের সাক্ষ্য দেয়। হাইলের আরেক পরিচয় আল-আযীম। মুহাম্মদ সা-এর সাহাবা অভিযাত্রী দলের সদর দরোজা ছিল হাইল।

এ শহরের সত্তুর কিমি দূরে শাম্মার পর্বতমালার তায়ী উপত্যকায় ছিল হাতেম তায়ীর বসতি। আজা ও সালাম পার্বত্য এলাকা নিয়ে শাম্মার। শাম্মারীদের কারণে এলাকার নাম নাকি এলাকার নামে কবিলার পরিচয়? আট শতকে ইরাক ও সিরিয়ার মুসাফিরগণ মক্কা ও মদীনায় যাতায়াত করতেন এই পথে। হাইল তার মেহমানদারির পুরনো ঐতিহ্যবাহী দস্তরখান উন্মুক্ত করতো মুসাফিরদের জন্য।

খলিফা হারুনুর রশীদের স্ত্রী জোবায়দা এখানে তার প্রশস্ত হাত মেলে ধরেন। উত্তর ও দক্ষিণের পথে উটের কারাভাঁর বিরতির জায়গায় খনন করেন কূয়া, লেক ও সেচ খাল। প্রাচীনকালে হাইল ছিল ফায়েদ মরুদ্যান। ইসলামপূর্ব প্রাচীন খারাশ প্রাসাদের কাছে সেই মরুদ্যান এখন হাইল শহর। প্রাসাদটি এখনো আছে। তার কাছে নহরের ধারে এখন পাঁচতারা হোটেল তৈরি হচ্ছে। জোবায়দার নহরে বসছে পানির নতুন ফোয়ারা। আব্বাসীয় আমলে আরবী ভাষাকে বিদেশি প্রভাব ও ভুল প্রয়োগ থেকে বাঁচাতে হাইলের ভূমিকা ছিল। হাইল ছিল আরবী ভাষার পণ্ডিত ও ছাত্রদের কেন্দ্র। এ সব কথা ভাবতে ভাবতে পথশ্রান্তি কেটে যায়। চোখের ঘুম কোথা উধাও হয়।

সৈয়দ হামজার পুঁথির ‘হাতেম তাই’র কথা মনে পড়ে। সে পুঁথি আমি পড়িনি। তবে ‘য়েমনের শাহজাদা তায়ীপুত্র হাতেম’-এর মহত্ব-গাঁথা পাঠ করেছি ফররুখ আহমদের ‘হাতেম তা’য়ী’ মহাকাব্যে। আর তার ‘নৌফেল ও হাতেম’ কাব্যনাট্যে। কবি ও সমালোচক আবদুল কাদিরের কাছে প্রথম জেনেছি: ‘হাতেম তা’য়ী’ মহাকাব্য বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান এ কবির সবচে বড় অবদান। সেই ‘য়েমনের শাহজাদা’ শুয়ে আছেন হাইল শহরের কাছে! তবে তাকে য়েমন বা ইয়ামেনের শাহজাদা কেন বলা হয়? আমাদের প্রাচীন সাহিত্যে প্রাধান্য বিস্তার করে আছে দক্ষিণ আরবের ইয়ামেন।

সুপ্রাচীনকালে বাঙলার কাছে আরব মানেই ছিল ইয়ামেন। সেই আরবের সাথে ছিল বাঙলার প্রাচীন বানিজ্যিক সম্পর্ক। তাই বুঝি হাইলের হাতেম আমাদের দেশে ‘য়েমনের শাহজাদা’ হয়ে গেছেন! সেই ‘য়েমনের শাহজাদা’র বাড়িতে এসেছি বাংলাদেশের মুসাফির। আবেগে ভেতরটা নেচে ওঠে। হাইলের প্রবাসী বাংলাদেশীদের সাথে নানা অনুষ্ঠানের ফাঁকে দুই দিনে শহরের প্রাচীন নিদর্শনগুলি ঘুরে দেখি। হাতেম তায়ীর বাড়ির ঠিকানার কিছু ইশারা সম্বল করি। ষোল জুন দুপুরে মুনির ও আবদুল মোতালিবকে নিয়ে বারজান, লুবদা, নুযদা ঘুরে ওয়েলকাম পর্বত আর আজা পর্বতের কোলে কোলে ঘুরি। আজা প্রাসাদ দেখি। তার পর সুফেইনের পথ ধরি। পঞ্চাশ কিমি দূরে এক আজনবী দোকানদার পথ বাতলান। বাঁয়ে পর্বতঘেরা পথে কিছু দূর গেলেই পুরনো কবর। ‘লেকিন হা-জা মা-ফী মুসলিম’! তবে ওরা তো মুসলমান ছিল না। সেখানে তোমার কী ফায়দা! ‘শুকরান কাছিরান’ বলে আমরা হোফায সড়ক ধরি। তার পর তোয়ারেনের পথ।

পাকা সড়ক শেষ হয়ে পাহাড়-পর্বতের ভেতর কুচি পাথর স্তূপে হোঁচট খেতে খেতে গাড়ি চলে। পাথরকুচিতে গাড়ি আটকে গেলে তিন যাত্রী মিলে ঠেলি। এভাবে কিছু পথ গিয়ে পথ হারাই। ডান-বাম ঠাহর হারিয়ে দূরের পাহাড়ে ছাগলের পাল আন্দাজ করে চীৎকার করি, ‘কেউ কি আছেন? কেউ কি আওয়াজ শুনছেন!’ পর্বতে বাংলা শব্দের প্রতিধ্বনী হয়। পাথরের আড়াল থেকে কালোপানা কিছু একটা বের হতে দেখি। তিনি এগিয়ে আসেন। কুমিল্লার দীন ইসলাম। তিনি কথা বলেন। দেশি আগন্তুক পেয়ে ইচ্ছ্বসিত। তিনি বলেন, ‘দাদা’ হাতেমের বাড়ি অল্প ক’মাইল। দূরত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হতে সওয়াল জওয়াব করি। মনে হয়, এ মাইল সতেরো শ ষাট গজের না।

আমাদের গাড়ির চালক অনেক সহ্য করেছেন। এবার বলেন: এই সন্ধ্যায় পাহাড়-পর্বতের অনিশ্চিত পথে
নেকড়ে ও ভালুকের ভয়। আমি আর সামনে যাব না। আপনারা ফিরতে না চাইলে নামুন। ভাড়া না নিয়েই আমি চলে যাব। বিপদ বুঝে আমরা হাতেমের দরজার কাছ থেকে খালি হাতে ফিরে চলি।

পর দিন ভোরে দু’টি শক্তিমান ফোর হুইলার গাড়ি চলে জুব্বা রোড ধরে। এই সড়ক গেছে হাইল থেকে দুমাতুল জন্দলে। সেই ভিন্ন পথে শাম্মারের পর্বত বলয়ের ভিতর দিয়ে সুফেইন পার হই। পেট্রোল পাম্পের পাশ দিয়ে দশ কিমি পিচঢালা হোফায সড়কশেষে পাথর কুচির এবড়ো-থেবড়ো, উঁচু-নিচু, বিক্ষিপ্ত রাস্তা। সে পথ গেছে তোয়ারেন পর্বতমালার দিকে। মনের জোরে সামনে এগোই। পাহাড়পুরির গোলকধাঁধায় সূর্যের তাপ বাড়ে। সাথিদের হাতেম আবিষ্কারের উত্তেজনা ঠাণ্ডা হবার আগেই পর্বতের কোলে একটি মাজরা পেয়ে যাই। খামারে মানুষ নেই। মাজরার ভেতর ঘর। চীৎকার করি। ক’মিনিট পর দু’টি চেহারা জানালায় ভেসে ওঠে। হারুন ও কবির চীতকার করেন। বহু দিন এখানে আছি। বাংলাদেশী মুসাফির আজই প্রথম পেলাম।

কাছেই হাতেমের বাড়ি! হারুন পথ দেখান। পাথরকুচির ওপর বিস্তর ধুলি উড়িয়ে আকাবাঁকা পথ বেয়ে ‘পরহান’ ও ‘হলফা’ পর্বতের মাঝে সমতল উপত্যকা। মরুদ্যানে প্রাচীন কূয়ার কাছে খেজুর-ত্বিন-আনার-নাশপাতির বাগান। শাম্মারের আজা ও সালওয়া পর্বতমালা ছাড়িয়ে শান্ত নিঝুম প্রকৃতিতে শাম্মার কবিলার পুরনো বাড়ি। এ বাড়ির বাসিন্দা হাতিম ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে সাদ আত-তায়ী। তার কাহিনী জানে জগতবাসী। বিখ্যাত কবি। দানশীলতার কিংবদন্তী। মহানুভব হাতেম। হাতেমের কথায় পথরের হৃদয় গলে। দুশমন হয় দোস্ত। পর আপন হয়। তিনি ছিলেন ঈসা নবীর উম্মত। নবী মুস্তফার জন্মের ছয়-সাত বছর পর পাঁচশো আটাত্তর সালে ওফাত হয় তার। হাতেমের ছেলে আদি ইবনে হাতিম আর কন্যা সাফানা বিনতে হাতেম ছিলেন মুহাম্মদ সা-এর বিশিষ্ট সাহাবী।

গুলিস্তাঁয় শেখ সাদী বলেছেন: হাতেম তায়ীর উজালা নাম সব ভালো কাজে পথ দেখাবে চিরকাল। সাদী তার বুস্তাঁয়ও হাতিমের চর্চা করেছেন। ইরান-তুরান নানান দেশে নানা ভাষায় লেখা হয়েছে হাতেমের যশ-গাঁথা। দক্ষিণ এশিয়ায় জনপ্রিয় হাতেম চরিত্রের সবাক সিনেমার কত নায়ক হয়েছেন বিখ্যাত। আরব্য উপন্যাসের রহস্য পুরুষ হাতেম তায়ী। বাংলাদেশের ঘরে ঘরে পরার্থপরতার প্রবাদ জমেছে তাকে নিয়ে। সেই হাতেমের দুয়ারে কড়া নাড়ছি আমি।
‘শুনেছি শৈশব থেকে মুক্ত মন, সে দারাজ-দিল
দূর হতে দূরান্তরে ঘোরে নিত্য সেবাব্রতী প্রাণ
দুর্গত অথবা দুঃস্থ মজলুমের টানে। মহাজ্ঞানী;
জ্ঞানের সন্ধানে তবু চলে নিত্য সফরের পথে;
মখলুকের খেদমতে দেয় তার সর্বস্ব বিলিয়ে।’

দুর্গের মতো বাড়ি। মাটির সাথে গম বা খেজুর পাতার গুড়া আর পাথরকুচি মিশিয়ে তৈরি পাচিল। দেড় হাজার বছরের কত মরুঝড় সয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পাচিলের দু’পাশে দু’টি পাহারা বুরুজ ছিল। কালের আঘাতে একটি বুরুজ মাটিতে নুইয়ে পড়েছে। অন্যটি এখনো মাথা উঁচু করে আছে। বাড়ির ভেতর ক’টি কক্ষ আলাদা করা যায়। একটির ছাদ খেজুর গাছের কড়ি-বর্গা আর কালি-ঝুলির প্রাচীন আস্তরণ নিয়ে টিকে আছে। একটি বড় কক্ষে বোধ করি হাতেমের দরবার বসতো। আরবি কাহওয়ার রেওয়াজ কী তখন ছিলো? দুরু দুরু চিত্তে হাতেম তায়ীর এ-ঘর ও-ঘরে পা ফেলি। অচেনা শুকনা জীর্ণ পাতার ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দেয় প্রাচীন দানশীলতার চেনা কাহিনী। মেহমানদারির সোরাহি হাতে এই বুঝি সামনে এসে দাঁড়াবেন হাতেম দারাজ দিল। হাতেমের ঘর থেকে কেউ খালি ফেরে না। বাংলাদেশি মেহমান বিমুখ হবে কেন?

হাতেমকে ডেকে কথা বলতে মন চায়। বলতে চাই দাওয়াত বন্ধু আমার কুটিরে!
“তা’য়ী পুত্র তুমি সে হাতেম,
চিনেছি তোমাকে আমি স্বভাবে তোমার।
শুনেছি যা এতদিন, ভাগ্যগুনে এল সেই কামিল ইনসান
মজুরের পোড়া জিন্দেগীতে। গরীবের বন্ধু! দোস্ত!
দুঃখীর কুটিরে চলো একবার।’

বাড়ির উত্তর ও দক্ষিণে পাথর গেঁথে তৈরি দু’টি কূয়া। দক্ষিণের কুয়ায় কিছু দিন আগেও পানি ছিলো। একশ গজ দূরে উত্তরের কূয়াটি আগে শুকিয়েছে। ক’টি কবুতর সেখানে বাকবাকুম ডাকছে। দক্ষিণ-পশ্চিমে পর্বতের কোলঘেঁষে প্রাচীর-ঘেরা জায়গায় দু’টি প্রাচীন কবর। একটি হাতেম তায়ীর। অন্যটি তার মায়ের। দেয়াল ডিঙিয়ে ভেতরে যাই। কবর দুটি পুব-পশ্চিমে। দু’টি কবরের চার পাশে ক’টি ছোট ছোট পাথর। হাতেম তায়ীর কবরের পাশে দাঁড়াই। প্রত্যয়ে, বিশ্বাসে, ত্যাগে ও সাহসে যার মাথা শাম্মারের গিরি-চূড়া ভেদ করে আসমানের নীলিমা ছুঁয়েছে।

ফররুখ আহমদ সেই হাতেমকে তুলে এনেছেন আদর্শের প্রতীকরূপে। হাতেমের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আবেগে আপ্লুত কন্ঠে আবৃত্তি করি ফররুখের মহাকাব্য থেকে:
‘যে মানুষ প্রাণ দিয়ে করে যায় বিশ্বের কল্যাণ
কুল মাখলুকের বুকে স্থান তার; দুনিয়া জাহানে
পায় সে বিপুল মান জীবনে অথবা মৃত্যু পারে।’
পরহান ও হলফা ঘেরা হাতেমপুরি থেকে বের হই।
আত্মার ভেতর অনুরণন শুনি:
‘কাব্য নয়, গান নয়, শিল্প নয়, -শুধু সে মানুষ
নিঃস্বার্থ, ত্যাগী ও কর্মী, সেবাব্রতী- পারে যে জাগাতে
সমস্ত ঘুমন্ত প্রাণ, -ঘুমঘোরে যখন বেহুঁশ
জ্বালাতে পারে যে আলো ঝড়-ক্ষুব্ধ অন্ধকার রাতে;
যার সাথে শুরু হয় পথ চলা জাগ্রত যাত্রীর
দিল সে ইশারা আজ আত্মত্যাগ হাতেম তায়ীর॥’’

*
হাতেমের ঘর থেকে ফিরে চলি। উপত্যকায় ছোট ছোট আরো দুটি মরুদ্যান। বিভিন্ন সময় এখানে বসতি হয়েছে। হাতেমের বাড়ির উত্তরে একটি মসজিদ আর দক্ষিণে কবে মাদরাসা হয়েছিলো। বাসিন্দারা চলে গেছে অন্য কোনো মরুদ্যানের কাছে! হারুনদের মাজরায় যাই। তাদের প্রথম মেহমানদারি এক বাটি পানি। একে একে পান করি। তৃষ্ণার্ত কলিজা ঠাণ্ডা হয়। এর পর মাজরার গাছ থেকে সদ্য তোলা গাছপাকা সুমিষ্ট রসালো মিশমিশ। শেষে পুদিনা চা। হারুন, কবির আর মমিন জনবিরল শাম্মারে কিছুক্ষণের জন্য স্বজন পেয়ে কেমন বিহ্বল। চোখে-মুখে সেই খুশি চিক চিক করে। তাদের জীবনের গল্প অন্য অনেক প্রবাসীর থেকে আলাদা নয়।
হারুন প্রথমে একা আসেন। এরপর খালাত ভাই কবির আর ভাগ্নে মমিনকে আনেন। তিনে মিলে এই ঘরে মাজরার সংসার। হারুন এই মাজরায় বসেই বা-মার ইনতেকালের খবর শুনেছেন। প্রতি বার সে খবর পৌঁছে ক’সপ্তাহ পর। বাড়ি থেকে চিঠি আসে হাইলে কফিলের ঠিকানায়। শহর থেকে কফিলের লোক আসে মাসে দু’এক বার। হারুনরাও চিঠি লিখে অপেক্ষায় থাকেন। কফিলের লোক সে চিঠি হাইলে নিয়ে ডাকে দেন। মাঝখানে বেজায় ফাঁক। এসব গল্পের মাঝে হারুনরা চারটা ডাল-ভাত খাওয়ার আবদার করেন। সব কিছু তৈরি আছে। দুম্বার গোশত। বাগানের তাজা সবজি। শরীর জুড়ানো বাতাস। কঠিন প্রকৃতির কোলে নরম আদর! হাইলে ফিরে বাংলাদেশীদের সাথে বসতে হবে। নইলে এমন দাওয়াত কি ফেরানো যায়?