শাহজালাল এক্সপ্রেসে

কিছুই জানিনা আমি কোনোই খবর
কার মেয়ে কার বোন কার বা প্রেমিকা ?
কোথায় চলেছো তুমি ঠিকানা কোথায়
বহুদূর চায়ের বাগান ? নগ্ন জলের হাওর ?

ট্রেনের জানালা বেয়ে ভেসে যায় বুনো মেঘ উদাস সবুজ
বিদ্যুতের ধ্যানী থাম সন্ধানী রাখাল
লঞ্চ বাস রোদ আর বৃষ্টির প্রণয়
তারাও জানে না তুমি চলেছো কোথায় ?

মুখোমুখি বসে শুধু দেখেছি তোমাকে মেয়ে
আর, গেঁথে যাচ্ছি কৃষ্ণবর্ণ শব্দের কসুম
উত্তরের উদ্বেল বাতাস সাদা ওড়নায় মুখ ঘষে ঘষে
তোমাকে অস্থির করে তোলে
ভ্রু বাঁকিয়ে তাকে যতই ধমকাও
বাতাস তো শাসন মানে না ।

তোমার আনত চোখে দুপুরের নীল ঘুম নামে
কয়েকটি স্খলিত চুল লুটেপুটে খায় দুটি ঠোঁটের সুষমা
সুদূর নীলিমা থেকে ছুটে আসে মেঘ
স্টিলের জানালা গলে ছুঁয়ে যায় চুলের বিনুনি
হাতের পাতায় বোনা লাল কারুকাজ
কাঞ্চনজঙ্ঘার ভোর ঝিলিমিলি করে ওঠে কখনো কখনো
কালো চোখে

এইভাবে একজোড়া চোখ ছুঁয়ে ছুঁয়ে
কেটে গেলো দশ জুন গোলাপি প্রহর
সিলেট স্টেশনে এই কবিতার শেষ
একজোড়া চোখ গেলো চোখের গন্তব্যে
পিছনে রইলো পড়ে হাহাকারপূর্ণ এক কবির হৃদয়।
…………………………………………..

অভিমানী দূরের স্টেশনে

পড়ে আছো দূরের স্টেশনে
ভয়ঙ্কর অভিমান বুকে
কাছেপিঠে কৃষ্ণচূড়া নেই
কত বেশি প্রিয় ছিলো তোমার দু’চোখে !

স্টেশনের পুবে নীল ডোবা
রাশি রাশি জলফল রোদ্দুরে উন্মুখ
দুলে উঠতো ফ্রকের হাওয়ায়।
ঠিক সাড়ে দশটা বেজে গেলে
হুইসেল বাজিয়ে গ্রিনএরো
ছুটে যেতো দক্ষিণ দিগন্তে।

রোদে ভিজে যেতে যেতে শৈশবের স্কুলে
বড় বড় চোখ মেলে দেখতে তুমি
ফুলেদের মাতামাতি
সে ডোবা অদৃশ্য আজ
আছে মাটি প্রস্তরের ফুল।

কিছুই তো অবশিষ্ট নেই
বড় বড় চোখ দুটি ছাড়া
পেছনে তাকালে মনে পড়ে
মানুষের নির্মমতা স্বপ্নের সমাধি।

এখনো কি হোস্টেলের উঠোনে শীতের রোদ
পিঠে নিয়ে আড্ডা দেয় পাঁচ জন তরুণী
এখনো কি মহিলা কলেজে আসে ঘুরে ঘুরে শুক্রবার
অপরাহ্ণ দুলে ওঠে ভুল প্রেমিকের স্পর্শে
সিলেটের পাহাড়ি সড়কে।

পড়ে আছো দূরেরে স্টেশনে
কখন ঘনাবে রাত চাপচাপ অন্ধকার
তার প্রতীক্ষায়।
গোধূলির বিমর্ষ আলোয়
অবাধ্য শিশুটি খুব ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে
রেশমি চুলে ঝরে পড়ে
বাতাসের হিম সম্ভাষণ ।

মনে পড়ে কত রাত জেগে থাকতে ঘুমচোখে
পিতার পায়ের প্রিয় শব্দের আশায়
মাথায় ঝুলিয়ে লাল আলো
মেলট্রেন থামতো এসে পাহাড়ি স্টেশনে
একটি কিশোরীর খুব প্রিয় স্বপ্ন সুটকেসে ঢুকিয়ে
জোসনাময় পথ তিনি পেরুতেন
বুকে নিয়ে অপার বাৎসল্য ।

উঠোনে পৌষের চাঁদ
বারান্দায় বাগানবিলাস
আশ্চর্য গহিন কণ্ঠ ডেকে উঠতো
তাহেরা তাহেরা
তার বড় আদরের কনিষ্ঠ মেয়েটি
জেগে উঠে খুলে দিতো রাত্রির দরোজা
আজ সেই পিতা নেই
মমতামাখানো বুকে নিবিড় আশ্রয় চলে গেছে
কোন দূরলোকে

আজ তুমি দাঁড়াবে কোথায় ?
…………………………………………..

তরুণী

কবিতা যেমন গোপন থাকে না
তুমিও থাকো না তেমনি
নিজেকে ওড়াও বাতাসে ও মেঘে
শহর কাঁপাও তোলপাড় বেগে
শত যুবকের বিস্মিত চোখে
জ্বলে না পাওয়ার বহ্নি।
…………………………………………..

দরোজা

শীতের শহর ঘুরে প্রতিটি শীতার্ত দরোজায়
কড়া নেড়ে যাই
দরোজা খোলে না।
একটি কুৎসিত হাত যদি খুলে দিতো
আবদ্ধ কপাট
একজোড়া অন্ধ চোখও নীমিলিত বিপন্ন পাতায়
সহানুভূতির নম্র কেশর ওড়াতো
একজোড়া বোবা ঠোঁটও যদি
কাঁপতো না বলা কিছু শব্দের তাড়ায়!

তবু জানি এই পোড়া গ্রহে
মোহন বন্দিত্ব নিয়ে একটি বাড়ানো হাত
হোক সে বিষণ্ণ ম্লান বিশীর্ণ পাণ্ডুর

খুব ক্লান্ত একজোড়া চোখ থাকে নিত্য পথ চেয়ে
না হোক ভ্রমরকৃষ্ণ কালো
তবু তার সজল উঠোনে জ্বলে প্রতিদিন মঙ্গল প্রদীপ

একজোড়া ঠোঁট আছে অপেক্ষায় তৃষ্ণার্ত তবুও
যেন এক শান্ত ছায়া অন্তহীন রোদের হাওরে
তালাবদ্ধ সন্ত্রস্ত এ দেশে আছে একটি দরোজা
সর্বদাই খোলা।
…………………………………………..

বিরহী শ্রাবণ

খুব বেশি দূরে নয়
বড়জোর মিনিট দশেক
দু’একটি বাঁক পেরুলেই
সাদামাটা আটপৌরে বাসা।
কোনো মোঘল স্তাপত্য নয়
নয় কোনো সামন্তের ভগ্ন প্রাসাদ
অথবা জাঁদরেল কোনো আমলার বিলিতি ভবন
তবুও রহস্যময় বুকে তার সুবিন্যস্ত নীলের দ্যোতনা।

সেখানে সে থাকে
আর কে কে থাকে ?
ফুল থাকে পাখি থাকে
রোদ মেঘ বৃক্ষছায়া থাকে
প্রেম থাকে প্রেমের ব্যর্থতা থাকে
বিরহ ও হাহাকার থাকে।

মৃন্ময় উঠোনে বাজে অবেলায় বৃষ্টির নূপুর
রোদ আসে বাতাসের নরম পালকে ভেসে ভেসে
বারান্দায় কুণ্ডলী পাকিয়ে শোয় বিরহী শ্রাবণ
জানালায় লটকে থাকে প্রণয়বিমুগ্ধ এক
অচেনা আকাশ।
…………………………………………..

বিবাগী পুরুষ

তোমার শিকড় আছে, আছে প্রিয় জোসনার বাঁধন
আমি তো বন্ধনহীন হয়তো-বা শিকড়বিহীন
আমার অস্তিত্ব জুড়ে শুন্যতার অসীম স্তব্ধতা
দূর অরন্যের দীর্ঘশ্বাস
আমি কাকে পরাব বন্ধন ?

শিকড়ের সন্ধানে যার কাটে দিন
কুড়িয়ে মাটির গন্ধ মেখে দেবো তার স্নিগ্ধ চুলে!

আমি তো সংসারছেঁড়া পথের মানুষ
জন্ম জন্ম কেটে গেল হাহাকার বুকে
যে আমাকে দিয়েছিল অন্ধকারে
আলোকিত ঘরের খবর
আমি তাকে করেছি বিবাগী।

আমাকে দিও না কেউ বন্ধনের মায়া
তার বুকে জ্বলে উঠবে চিতার আগুন।
…………………………………………..

ভালোবাসার শহর

এ শহর ছেড়ে আমি পালাবো কোথায়
যেদিকে তাকাই দেখি সারাটি ভুবনময়
আলো আর মৃত্তিকার বুকের ভিতর
তোমার দু’চোখ
সুরভিত শস্যময় সজল দু’চোখ।

কখনো বৈশাখ আসে প্রমত্ত ঝরের চিঠি নিয়ে
আবার ফাল্গুন এলে একগুচ্ছ কুমারীর কলহাস্য
ঝরে পড়ে শহরের আনাচে কানাচে
মৃত্যু- ক্ষুধা- ভালোবাসা খেলা করে উত্তর হাওয়ায়।

হাওয়ায় হাওয়ায় উড়ে রাতের আকাশ
প্লাবনের গান বাজে শিরায় স্নায়ুতে।

একজোড়া কালো চোখ বসে থাকে যে শহরে
অপেক্ষার প্রদীপ জ্বালিয়ে
সে শহর ছেড়ে আমি পালাবো কোথায়!
…………………………………………..

নিজস্বতা

তোমাকে নিয়েছি আমি
তুমিও আমাকে
অন্তহীন মধ্যরাতে নয়
নয় চন্দ্রের উদ্যানে কোনো
আমরা নিয়েছি আমাদের এক
অপরাহ্ণে ঈষৎ আলোয়।

তোমার নোনতা স্বাদ আমার জিহ্বায়
আমার তৃষ্ণা কাঁপে তোমার অধরে

আমরা দুজন এমন অচেনা
স্মৃতিভ্রষ্ট মানুষের মতো
আমাকে চেনো না তুমি
আমিও তোমাকে।
…………………………………………..

দূরের মানুষ

দূরের মানুষ দুরেই থাকা ভালো
সাইবেরিয়ান হাঁসের মতো দূরে
কাছে এলে দূরত্বটাই বাড়ে
দূরে গেলে বিরহের উত্তাপে
নির্বাপিত তৃষ্ণা আবার জাগে।

দূরের মানুষ দূরেই থাকা ভালো
কখনো যদি প্রশ্ন জাগে মনে
দূরের মানুষ কাছে কেন এলে ?

ভালোবাসা খুদ-কুঁড়ো জল চেয়ে
কাটলো অনেক বছর অনেক মাস
কালো গোলাপ আর পারি না যে
দশ বছরের তৃষ্ণা বুকের মাঝে
এবার তোমায় দিলাম বনবাস।
…………………………………………..

তুমি নেই

তোমার জন্যে ছিলো আমার যাওয়া
পৌঁছে দেখি সবাই আছে
তুমিই শুধু হাওয়া
চারিদিকে বৃষ্টিবাদল
বুকের ভিতর ঢেউ
এগিয়ে এসে ভেজা হাতে
হাত ধরেনি কেউ।

মন তো খারাপ হতেই পারে
কোথাও তুমি নেই
তুমি তখন নিজের ভিতর
আছো আনন্দেই।