জলবাষ্প ও ঘুমের জঙ্গল

তাকে তীক্ষ্ণ নজরদারীতে রাখা যায়-হরিণ শিকারীর মতো
কোথায় যায়, কি করে

কিন্তু যখন মেঘমল্লার সিথানে গিয়ে সঙ্গম শেষে
নিজেকে আবিস্কার করে বৃষ্টির শহর এবং নিজেকে ধোয়
তখন
চোখের ভেতরে শহরের বিপরীতে জন্ম নেয় ঘুমের জঙ্গল!
-শহর ও জঙ্গল বিপরীত ভাষার কবি

আমি বেছে নিলাম ঘুমের জঙ্গলের দিকে যাবো

হাঁটতে হাঁটতে দেখা হয় দূর্বাঘাসের লকলকে শরীরের সাথে
দূর্বাঘাস আর জলবাষ্পদের ভাষার ভীষণ মিল
যৌবনের হুবহু ফিসফিসানী ওদের ভেতর

আমি চোখ বুজে ঈষৎ বৃক্ষ হলাম,স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি
ওদের তখন বর্ষাযাপনের কুতকুত খেলা চলছে,
নিরামিষ ভোজের আয়োজনে একদল রংধনু এসে
খেয়ে যাচ্ছে মেঘের বাষ্প
আমি দাঁড়িয়ে দেখছি-ঘুমগুলো ফিস ফিস করে কথা বলছে
জঙ্গলের সাথে মিটিয়ে নিচ্ছে কি সব দেনা পাওনা

আমার চোখ দু তিনবার ছলাৎ ছলাৎ পিছলে পড়ে

আমি এক অবাক বৃক্ষের তালগাছ-দাঁড়িয়ে দেখছি সব
আমার আঁশযুক্ত শরীর বেয়ে তির তির করে
নেমে আসতে লাগলো কান্নাপাতির পা-
…………………………………………..

টাইটানিক ও নদী পথের যাত্রী

সরিসৃপ হাওয়ার জাহাজ-
এঁকেবেঁকে দুলে দুলে চলছে উজানে

নুইয়ে এসেছে মেঘ ওপরে-দ্বীপচূড়ায় স্থির নীল আকাশ
ন’ড়ে চ’ড়ে উঠলে কাঁপে জাহাজ, কাঁপে যাত্রীসমেত

ঢেউ আছড়ে পড়ে কিনারে
যাত্রীরা সন্দেশ ভেবে চুষে খায় মেঘের চোয়ানি-
তর্জনীর ছায়ায় ন’ড়ে খুঁত খুঁতে ঢেউয়ের স্বভাব

দিকবিদিক ঘোর-কুয়াশার হেলান দেয়া ছই
জাহাজ থেমে যায় ঝড়ে-মাঝির চোখে দ্রৌপদী ঝাপসা
বালুর স্ত’পে জাহাজ দুমড়ে যায়-নিঃশ্বাস ফসকে বেরোয় নাক থেকে
যাত্রীরা ভয়ে হই দিয়ে কাঁদে-
…………………………………………..

আমি এবং রেশমি

উঁচু করে রেখেছে দৃষ্টির ফর্দ, তথাকথিত ঠোঁটের কাঁপন বাতাসে
আমি দেখি দখিন দুয়ার খুললেই-

গ্রীল ছুঁয়ে তদন্ত দায়িত্বে মাকড়সা এবং টিকটিকি

নিজস্ব একটা গন্ডির ভেতরে আমি
গ্রীল সীমানার দূরত্বে উন্নাসিক পাঁজর খোলে রেশমির
বাহুতে ওড়ে ঔপনিবেশিক বাতাবি লেবুর ঘ্রাণ
অথচ বুকে পাথরের অলিগলি তার
ইচ্ছার পুচকে পালক চাপা পড়েছে পাথরে-বহু আগে
তাকে ছুঁতে যাই, গ্রীলের ওপারে একত্ববাদ ঠোঁটের বিস্তৃতি-ঠোঁট কাঁপে
শরীরে মনস্তাত্ত্বিক ভেড়া দৌড়োয়
ইশারার পকেটে জমে যাচ্ছি আমি-পারছিনা ছুঁতে রেশমিকে

ছিটকিনি আঁটানো ঘর-দেয়ালে মাকড়সা এবং টিকটিকির বিকৃত দৃষ্টি
আমি এবং রেশমি খেলতে শুরু করি-দাবা,কাবাডি,দহন দহন

রাতের মনে রাত,নিশ্চিন্তে অন্ধকারের ভেতর হেঁটে চলে যাচ্ছে
…………………………………………..

হরিণী ও অনাগত পর্যটক

হরিণীর চোখ দেখে বোঝা যায়-ডাকসাইটে কিছু কথা হরিণীর মতোই নীল
কথার ভেতরকার উপকথা সমূহ নীল-
আমি আমার দুঃখ মিলাই ওদের সাথে-পর্যটনে এলে

থোকা থোকা শীত- কুয়াশার চাঁই ছুঁয়েছে উর্বর ধানক্ষেত
হরিণ শিকারীরা হারিয়ে ফেলেছে পথ-গহীন অরণ্য,আলো ছায়ার দিকবিদিক
গোঁফওয়ালা শিকারীর তীর হরিণীর দিকে যায়-

আমিও এক অনাগত পর্যটক- শরতের দিন এলে বছর ছয় মাসে ঘুরতে যাই
কিছু হরিণী আছে-আমাকে চেনে,খিলি পান দেয়,আত্মীয়তা করে

হে শিকারী, হে হরিণ শুটার-কুয়াশার ভির চিরে আমাকে তীর ছোঁড়ো,হত্যা করো
রক্ত দিয়ে নেশাগ্রস্থ বন্দুকের নালা ধৌত করো-এই নকশাকাটা হরিণীকে নয়

প্রথাগত বিভাজনে তুমি শিকারী- আমি পর্যটক
তুমি প্রাণবধী মানুষ-আমি পশুপ্রেমি,কাছে টেনে এনে থুতনী ধরে চুমু খাই
…………………………………………..

রাষ্ট্র এবং কারিগর

ছোট নবাব হেঁটে চলেছে, বড় নবাব ঘুমন্ত
রাষ্ট্রের ক্রিয়াশীল যে অংশ- তার বিপরীত অংশটা মৃত
চলছেইতো সব এভাবে- আঙ্গুলে আঙ্গুল ঠেকে,পায়ে পা ঠেকে

নর্তকীরাও ইদানিং ঘুমোয়- সার্কাসবন্দী ঘোরের ভেতর
মিউজিক্যাল পিড়িয়ড চলছে,নাচে গানে ভরপুর, ঢেউ উঠছে নামছে কোমরে
কিছু দর্শক শুনছে গান ও মশাদের জিকির
কিছু দর্শক দেখছে নকল নৃত্যের তর্জমা

ঘুমন্ত বড় নবাব বুঝতেই পারলোনা
মাতাল সার্কাসবন্দীদের এলোপাথারি কথার বরখেলাপ
ছোট নবাব মিছেই হাঁটে,জনগন তার হাঁটন বোঝে অকপটে

নবাবরা মূলতঃ মাতাল-গন্তব্যাভিমুখী মানুষ
রাষ্ট্র থেকে যোজন যোজন দূরে- এমন কি প্রজাদের থেকেও
…………………………………………..

রাত ও আমি ‘গেট টুগেদার পার্সন’

ঠান্ডা স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে একটা উটকো রাত আর আমি শুয়ে আছি
রাতটা আমাকে ঝাপটে ধরে আছে
আমিও অন্ধকারাচ্ছন্নতাকে চেটে খাচ্ছি জিভ ভরে
মেঝের ভেতর ভেজা ভেজা তন্দ্রাচ্ছন্ন মাটি
আমি ক্রমাগত রাতের ভেতর ঢুকে যাই,কামড়ে ধরে থাকি মৃত্তিকার হিম

অন্ধকার নয় অথচ অন্দকার, চোখের তলানীতে রাত এসে কাতরায়,কাঁপে
মৃতদেহের মতো নরম, মহাকালের সমান দীর্ঘ লেজপুচ্ছ
আমাকে জরিয়ে ধরে বউ হতে চায়,প্রেমিক হতে চায়
কেউ কেউ ভেবেছিলো রাত ও আমি ‘গেট টুগেদার পার্সন’-

আমি আর স্যাঁতসেঁতে রাত,কতোবার একাকার হয়েছি, সঙ্গম করেছি
ন্যাকামি করেছি আঁধারের ঠোঁটে চুমু রেখে

ইদানিং রাত আর মানুষ- মানুষ হয়ে ওঠার প্রত্যয়ে
শারদীয় জোসনা পেলে- জোসনায় স্নান সারে।
…………………………………………..

হিজাবের ভেতর জেগে ওঠা চর

ধব ধবে ফর্সা মুখ। হিজাবের ভেতর জেগে ওঠা চর। পরিশ্রান্ত চোখে বেহুলা বাদলের রাত।
যেনোবা সবগুলো ঘটনা জমে আছে ওখানে!
কী দিন, কী রাত- এই তো প্রসবের সময়
ভেতরে তার আঙুরলতার মতো ফুঁপিয়ে ওঠা ছাতিমবৃক্ষ

আমি জানতাম, এমন সব ঘটনা ঘটবে
হিজাবটা মরু প্রান্তর ছুঁ’লে- শালবনের আত্মীয় হয় ‘মেঘনার জল’

পৃথিবীর স্বাদভুলো পাখিরা কি এমনি ছিলো? আর ফেরেনি পৃথিবীতে?

কোন কোন রাত পালাক্রমে ধর্ষিত হয় , মদ্যপ ঘোরঘুম-
গেরস্থালীভুলো কৃষকমেয়ে ঘুম পা’ড়ে- মুখাবয়বে আকরিক চাঁদের ফালি
চাঁদটা সেদিন এক টুইট বার্তায় লিখেছিলো
‘ও কৃষকমেয়ে, খড়ম পায়ে হাঁটলে বুঝি বুকের ভেতর বেড়ে যায় খোঁজাখুঁজি’

সরোবর চুইয়ে আজগুবি ধাতু- যেখানে প্রজন্মের রাত বলে কিছু জন্মে
চাঁদ যেনো কেবলি কচি বালক ‘হিজাবের ভেতর জেগে ওঠা চর’
মাটির মতোই নিষ্পাপ এবং সরল পায়ে দাঁড়িয়ে আছে মহাশূন্যে
…………………………………………..

নতুন আবৃত্তিকার ও শহুরে চড়ূই

কবতিার আয়োজনে-পুষিয়ে রাখা দৃঢ়তা নিয়ে স্টেজে দাঁড়াই, সমুখে জনতার সারি-
স্টেজে উঠে বর্ণের সমান আকাশ দেখি, ঠোঁটে গুঁজিয়ে রাখি উৎকণ্ঠিত মেঘ
মেঘ যেনো দৃষ্টির ভেতর খাঁচাবন্দী আকাশ- আমি কাঁপি এবং পড়ে যাই

আবৃত্তি করতে করতে ঢলিয়ে পড়ি
চড়ূই আসে উড়াল শিখাতে-‘এসব ছেড়ে পাখি হও’

ডায়রির পৃষ্ঠাজুড়ে দাড়কাক- টাওয়ারে ঝুলছে
বাতাসে ফিরিঙি মেঘের কোলাহল -শাদা বলাকাদের ধিরস্থীর চিন্তা
গ্রামের ভেতর দিয়ে প্রাক্তণ সবুজের ভির- কতো যে কবিতা
তবু,মুখ থেকে নেমে আসেনা-
আমি নতুন আবৃত্তিকার

একদল শহুরে চড়ূই আসে-গলা চিপিয়ে গান শুনোয় ভাঙ্গা গলায়
টাউনহলে থেকে পোক্ত মুরদগণ মাজা বাঁকা করে বেরেিয় পড়ে দ্রুত
সুুনসান হল,দেখি কোণায় কোণায় পড়ে আছে জনতার ঢিল
…………………………………………..

একটা নীলাঞ্জনা ঢেউ

বহমান নদীতে নীলাঞ্জনা ঢেউ- মানে নীলাঞ্জনা আমার!
জাহাজ ভাঙ্গা তরঙ্গ- আকাশে উড়ন্ত বলাকাদের খেউড়
পুরষবাদী মেঘ এসে থেকে থেকে ছায় দ্যায়

কি যে অপরুপ মেঘ, বাতাসে চুলের উপদ্রপ-দাপাচ্ছে,
জাহাজের পাটাতনজুরে দৈব্যরেখার রোদ
জাহাজ থেমে আনতে গিয়েছিলাম দুরে ‘শরতের হাওয়া’
আমি ছুঁতে যাই তাকে,শরতের হাওয়া হয়ে
অথচ অস্পৃশ্য সুখগুলো কেবলি কায়া
আমার মধ্যে কে যেনো আসে যায়- যায় আসে
হাতের কব্জিজুরে শুধু নীল দূরত্বের ন্যাকামি

নীলাঞ্জনা,আমার টিশার্টের ভাঁজে খুঁজে পেয়েছিলো বায়বীয় সুখ
প্রকারান্তরে, কামিজের সান্নিধ্য পেয়েছিলো আমারও বেহায়া আঙ্গুল

আহা! আস্তাকুঁড়ে যাওয়া পাটাতন-দোলে আর দোলে
আমিও দুলছি.নীলাঞ্জনা দুলছে.

সারা পৃথিবী দুলে উঠেছিলো সেদিন-নীলাঞ্জনাও এ কথা বলেছিলো বিশ বছর পর
…………………………………………..

ইশারাগুলো মুভমেন্ট শিখুক

চেনা জানা বিষয়ক অনেক কথা আছে পৃথিবীতে
কে কাকে চিনি, কিম্বা চিনিওনা
ওটা থাক,ওটা খুব কমন এবং সার্বজনীন

তারচে একটু ব্যক্তিগত হই আমরা-আপন আপন খেলি
নিকটতম হই, ঠোঁট শিখি-ঠোঁটে ঠোট রেখে
খেলতে থাকি-ভলিবল যেমন
‘ছোঁয়াছুঁয়ি’
‘ছোঁড়াছুঁড়ি’
এপাশ থেকে একটা মন ছুঁড়ে মারি- তুমি তা ধরো
তুমিও ছুঁড়ে মারো ওপাশ থেকে-আমি ধরি
এ পাশে আমি হাত ভরিয়ে চোখের ইশারা নিক্ষেপ করি
তুমিও ছুঁড়ে মারো দৃষ্টির ভলিবল
ইশারাগুলো মুভমেন্ট শিখুক এভাবে

এভাবে খেলতে খেলতে-চলতে চলতে
‘বিরান হই’
‘নষ্ট হই’
নিঃশ্বাস ভরিয়ে বেদনাকে নিক্ষেপ করি ওপরের দিকে
বেদনারা বায়ুবদ্ধ বল হলে তুমি ধরে ফ্যালো
স্পর্শের নিকটে যেতেই পুড়ে যাই আমারা-ক্ষত বিক্ষত হই

কে কাকে খুব চিনি-আমাদের গভীরতা নিয়ে সমুদ্রের সন্দেহ বেশ
আমিও দেখিয়ে দিযেছি-আকাশের সীমানা পড়েছে আমাদের এখানে-প্রেমটা আকাশের মতোন
উঠোনে রোদ আসলে রোদকে বলি ‘আমরা আদিম দিনের সূর্য ’
প্রত্যেহ ভলিবল হই,আলো নিক্ষেপ করি- পৃথিবীটা আলোকিত হয় আমাদের আলোয়