এক ভাষা থেকে আরেক ভাষার রূপবদল, চিন্তাবদল, ভাববদল, অনুভূতিবদল, চেতনাবদল কে বলে অনুবাদ। অনুবাদ একটি শিল্প, ঠিক কবিতা ও গদ্যের মতোই। ভালো কবিতার পেছনে, সুন্দর গদ্যশৈলীর পেছনে যেমন লুকিয়ে থাকে নির্জন প্রহরের কষ্টঘেরা অনেক নীরব-সরব সাধনা, তেমনি সফল ও সুন্দর এবং চিত্তস্পর্শী ও আবেদনমাখা অনুবাদেও লুকিয়ে থাকে অপরিসীম সাধনা। এই চর্চা ও সাধনা যতো গভীর ও শেকড়-ছড়ানো হবে অনুবাদও ততো সুন্দর ও বরণীয় হবে।
‘দ্যা ফোর এগ্রিমেন্টস’ মেক্সিক্যান লেখক ‘ ডন মিগুয়াল রুইজ’ এর অসাধারণ সৃষ্টি যা তাকে এনে দিয়েছিলো বিশ্বজোড়া ক্ষ্যাতি।
‘ দ্যা ফোর এগ্রিমেন্টস’ বইটির বাংলা অনুবাদ করেছেন ‘আসাদ জোবায়ের’। অসম্ভব সুন্দর এই অনুবাদ গ্রন্থটি আমাদের জানিয়ে দিয়েছে কিভাবে সুখে থাকা যায়।

প্রকৃত অর্থে অনুবাদ অনস্বীকার্য এক মহাশিল্প। অনুবাদ বিস্তৃত দুনিয়ার এক মহাদিগন্ত। এক মহাপ্রয়োজন। অনুবাদকে অস্বীকার করলে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবো অসংখ্য জ্ঞানভাণ্ডার থেকে। বিচ্ছিন্ন হবো খ্যাতিমান সাহিত্যিকদের সমৃদ্ধ চিন্তা-দর্শন ও সাহিত্য-শিল্প থেকে। তাদের সুন্দর, কালজয়ী ও চিরায়ত গদ্যশৈলীর ঝলক থেকে।
চেতনার পরতে পরতে প্রেমের স্নিগ্ধ বাতাস বইয়ে-দেওয়া তাদের কালজয়ী কাব্যগাঁথা থেকে।
‘আসাদ জোবায়ের’ এই বইটি অনুবাদের মাধ্যমে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন ‘টলটেকদের’ কথা। টলটেকরা ছিল একটি জাতি বা সম্প্রদায় যারা আধ্যাত্নিক তথ্য অন্বেষণ ও সংরক্ষণের জন্য মেক্সিকো সিটির বাইরে প্রাচীন পিরামিডের শহর টেয়োটিওয়াকানে একটি সমাজ নির্মাণ করেছিলেন।

অনুবাদ এক মহাপ্রয়োজন।
অনুবাদ থাকলে আমাদের পৃথিবী হবে সীমানাহীন―বিশাল-বিস্তৃত। অনুবাদ আমাদের চিন্তা-চেতনা-অনুভবে তৈরি করবে― বৈশ্বিক। সমৃদ্ধ হবে আমাদের ভাবনা। আমাদের সাহিত্য। উন্নত হবে আমাদের শিক্ষা-দীক্ষা।
‘ দ্যা ফোর এগ্রিমেন্টস’ আমাদের সামনে তুলে এনেছে তেমনি এক সমৃদ্ধ ভান্ডার। এই বইয়ের মাধ্যমে অনুবাদক আমাদের জানিয়েছেন- ‘ মানুষ সব সময় স্বপ্ন দেখে। আমাদের জন্মের আগেই আমাদের পূর্বপুরুষরা একটি বড় স্বপ্ন তৈরি করেছেন।
সমাজের স্বপ্নের পথ ধরে কীভাবে নিজের স্বপ্ন দেখতে হয় তা পূর্বপুরুষরা আমাদের শিক্ষা দিয়ে থাকে। শিশু হিসাবে আমাদের সুযোগ ছিল না নিজের পছন্দমতো বিশ্বাস করার। এই বিশ্বাসের শৃঙ্খল আমাদের পুরো জীবনের স্বপ্নকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এই প্রক্রিয়ার নাম- মানুষের পোষ মানা।’

আমরা বাংলায় কথা বলি। এ ভাষাতেই লিখি। ভাব প্রকাশ করি। সাহিত্য পাঠ করি। সাহিত্য সৃষ্টি করি। গদ্য লিখি। কবিতা লিখি। প্রবন্ধ লিখি। গবেষণাপত্র লিখি।
কিন্তু একটু দুঃখ নিয়েই বলতে হয়― আমাদের অনুবাদ সাহিত্য সমৃদ্ধ না। আমাদের কলমে নেই সেই প্রাণ ও গতি এবং সেই ছন্দ ও অলঙ্কার।
অথচ সমৃদ্ধ অনুবাদের জন্ম না হলে আমরা পিছিয়ে পড়বো। আমার মতে এ বিপদে আমাদেরকে পথ দেখাতে পারে― মৌলিক সুসাহিত্যের পাশাপাশি সৃষ্টিশীল সমৃদ্ধ ও সফল অনুবাদ। অর্থাৎ শূন্যতা চি‎হ্নিত করে অনুবাদ করলেই সফলতা আসবে।

‘ দ্যা ফোর এগ্রিমেন্টস’ সেই শূন্যতা পূরণের লক্ষ্যই অসাধারণ এক সৃষ্টি।
বইটির পরতে পরতে রয়েছে চমৎকার বাক্য, যা বদলে দিতে পারে জীবন।
প্রিয় কিছু উক্তি তুলে ধরতে চেষ্টা করছি।
১. ‘ মানুষের মন হচ্ছে উর্বর ভূমি, সারাক্ষণ সেখানে বীজ বপন হচ্ছে। আর সেই বীজ হচ্ছে কথা।’
২. ভুক্তভোগীরা আবেগ দমিয়ে রাখে আর যোদ্ধারা আবেগ প্রকাশ থেকে নিজেদের বিরত রাখে, সময় হলে প্রকাশ করে।’
৩. নিজের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া সবচেয়ে বড় পাপ। নিজের কাজের দায় নিবেন কিন্তু নিজের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন না।’

অনুবাদ হচ্ছে এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায় রূপান্তরকরণ। এখানে লেখকের চিন্তা-চেতনা, ভাব-অনুভূতির পরিমার্জিত সংস্করণের অবকাশ নেই। দোভাষী যেমন বক্তার বক্তব্য অপরিবর্তিতভাবে হুবহু শ্রোতার নিকট পৌঁছে দেয়, অনুবাদকের ভূমিকাও অনেকটা সেরকম। একজন সফল অনুবাদকের মাপকাঠি হলো সে কতোটা দক্ষতার সাথে লেখকের বক্তব্য ও বর্ণনাভঙ্গী পাঠকের কাছে তুলে ধরতে পারে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন বিদগ্ধ পাঠক কখনোই অনুবাদকের চিন্তা-ভাবনা জানবার আগ্রহে অনুবাদকৃত বইটি পাঠ করেন না। বরং অনুবাদকের লেন্স দিয়ে মূল লেখকের বক্তব্য পাঠোদ্ধার করতে চান। অনুবাদকের আয়নায় লেখকের বর্ণনাশৈলীর প্রতিবিম্ব প্রত্যক্ষ করতে চান।
তাই অনুবাদকর্মে একজন অনুবাদকের নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা যোগ করা ও প্রকাশের কোন সুযোগ নেই।
‘দ্যা ফোর এগ্রিমেন্টস’ বইটি অনুবাদের ক্ষেত্রে অনুবাদ উক্ত রীতি যথাযথভাবে পালন করেছেন। মূল বইয়ের হুবহু তথ্য পাঠকদের সামনে হাজির করেছেন।
এই অনুবাদের মাধ্যমে অনুবাদক জানিয়েছেন চারটি চুক্তির কথা, যা জীবনে এনে দেবে অপরিমেয় সুখ।

  • প্রথম চুক্তিটি হলো- ‘ আপনার কথায় আপনাকে নিষ্পাপ হতে হবে।’
  • দ্বিতীয় চুক্তিটি হলো- ‘ কোন কিছু ব্যক্তিগতভাবে নেবেন না।’
  • তৃতীয় চুক্তিটি হলো- ‘ অনুমান করবেন না।’
  • চতুর্থ চুক্তিটি হলো- ‘ সবসময় সেরাটা করুন।’
    আপনি যখন এই চারটি চুক্তিকে একসাথে সম্মান করবেন, নরকে বসবাসের কোন সুযোগই আর থাকবে না। নিজেকে রূপান্তর আয়ত্ত করার সারাংশ হলো এই চারটি চুক্তি।

বইটি আমাদের বোঝায় কিভাবে প্রতিদিন গুরুত্বপূর্ণ করা যায়। ‘ আমরা একেকটি দিন শুরু করতে পারি এটা বলে, ‘ আমি জেগে উঠেছি, আমি সূর্য দেখেছি, আমি কৃতজ্ঞতা জানাতে চাচ্ছি স্রষ্টাকে কারণ আমি এখনও বেঁচে আছি। আরও একটি দিন পেলাম নিজের মতো হওয়ার জন্য। ‘

ভাল অনুবাদ করতে পারা খানিকটা ভাল অঙ্ক জানার মতো ব্যাপার। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় চর্চার।অনুবাদকের কাজ, অন্য একটা ভাষায় লেখকের কথাগুলো গুছিয়ে লেখা।
যে কোন উন্নত দেশে অনুবাদকে অনেক গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। সেসব দেশে নিজেদের সাহিত্য যেমন উন্নত, তেমনি বিদেশি সাহিত্যের অনুবাদও অনেক। পৃথিবীর কোন প্রান্তে কোন ভালো বই প্রকাশের অল্পদিন পরই তা ঐসব দেশে তাদের ভাষায় অনুবাদ হয়ে যায়। ফলে মানুষের জীবনে কখনও চিন্তার দৈন্য হয় না। আর পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের জ্ঞান ও জীবনবোধকে নিজ ভাষায় আহরণ ও ক্ষমতাই তাদের উন্নত জাতিতে পরিণত করছে। যুদ্ধ-বিগ্রহ না বাধিয়ে এক দেশের সম্পদ আরেক দেশের মানুষ বিনামূল্যে কিছুতেই নিতে পারে না। অথচ জ্ঞানের মতো অমূল্য সম্পদ প্রায় বিনা খরচায় কোন জাতি সারা পৃথিবী থেকে সংগ্রহ করতে পারে অনুবাদ সাহিত্যের মাধ্যমে। এদিক থেকে আমরা অনেক পিছিয়ে।
দ্যা ফোর এগ্রিমেন্টস ‘ বইটির সফল অনুবাদ বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য সংযোজন। এই অনুবাদ আমাদের সামনে খুলে দিয়েছে বিপুল জ্ঞানের ভান্ডার।
জীবনকে সমৃদ্ধ করার মতো অসংখ্য বাক্যে বইটিতে রয়েছে। যেমন-
১। ‘ আপনার কাছে যেমন নরক সৃষ্টি করার ক্ষমতা আছে, তেমনি স্বর্গ তৈরি করার ক্ষমতাও রয়েছে। ‘
২। ‘ আপনি নিজেকে এবং অন্যদের শ্রদ্ধা করুন, অন্যরাও আপনাকে শ্রদ্ধা করবে।’
৩। ‘ প্রকৃত স্বাধীনতা আসে মানব আত্মার মধ্য দিয়ে। আমরা আসলে যা, তাই হওয়ার মানেই স্বাধীনতা। ‘

‘দ্যা ফোর এগ্রিমেন্টস’ পাঠককে শেখাবে বর্তমানের গুরুত্ব। ‘ বর্তমানকে উপভোগ করতে না পারাই হচ্ছে অতীতে ডুবে থাকা, যা আপনাকে অর্ধমৃত করে ফেলবে। যা আপনাকে আত্ন- করুণা, দুর্ভোগ ও চোখের জল এনে দেবে।’
‘দ্যা ফোর এগ্রিমেন্টস’ থেকে আমরা জানতে পারি ‘ মিতোতে’ র কথা, যার অর্থ ‘ মায়া’।
আপনার নিজের ও বিশ্বের যা কিছুই আপনি বিশ্বাস করেন, আপনার মনে যে ধারণা ও প্রোগ্রাম সেট করা আছে- সবকিছু মিলেই ‘ মিতোতে’।

জাতীয় উন্নয়নে অনুবাদ সাহিত্যের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ অনুবাদ সাহিত্য ছাড়া বাইরের নতুন জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে মানুষের পরিচয় হবে না। আর তা না হলে মানুষকে কূপমন্ডূক হয়ে বাঁচতে হবে। তবে নিশ্চয়ই অনেকে কোন বিদেশি সাহিত্য মূল ভাষাতেই পাঠ করতে পারেন, তার বাড়তি সুবিধাও আছে। তাই বলে সবার পক্ষে তা সম্ভব না, প্রয়োজনও নেই। বেশিরভাগ মানুষের পাঠের জন্য তাই ভিন্ন ভাষায় বইয়ের অনুবাদ প্রয়োজন। তাছাড়া বাইরের জ্ঞান ও বোধ নিজ ভাষায় প্রকাশের মাধ্যমে মাতৃভাষাও সমৃদ্ধ হয়। এর ফলে যে কোন চিন্তা প্রকাশের ক্ষেত্রে মাতৃভাষার ক্ষমতা বাড়ে।
‘দ্যা ফোর এগ্রিমেন্টস’ আমাদের শেখায় -যে কোন পরিস্থিতিতে নিজের সেরাটি করুন, বেশিও নয়, কমও নয়।
একজন মানুষ অন্য মানুষদের জন্য আয়না, এই আয়নায় তিনি নিজেকেও দেখতে পারেন।
‘দ্যা ফোর এগ্রিমেন্টস’ আমাদের জানায় কখনো অনুমান করবেন না। আমরা যখন কাউকে ভালোবাসি তখন ভাবি -আমার ভালোবাসা এই ব্যক্তিকে পরিবর্তন করবে, কিন্তু এটা সত্য নয়। আপনার ভালোবাসা কাউকে পরিবর্তন করবে না।
সে মানুষটি যেমনি আছে তেমনি তাকে ভালোবাসা উচিত। আর সেও যেন তার ভালোবাসার শক্তি দিয়ে আপনাকে পরিবর্তন করার প্রত্যাশা না করে।
অনুমান করা থেকে নিজেকে রক্ষা করার পথ হলো প্রশ্ন করা।

‘দ্যা ফোর এগ্রিমেন্টস’ হলো সমস্যা সমাধানের একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। আগের অনেক বই পড়েছি যেখানে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কথা বলেছে কিন্তু সেগুলো বিচ্ছিন্নভাবে অথচ ‘দ্যা ফোর এগ্রিমেন্টস’ বইটির আমাদের জীবনের সমস্যাগুলো আর তার সমাধান ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করেছে।

অলংকার, উপমার কথা যদি বলি, বইটির পুরোটা জুড়েই অলংকার আর উপমা ছড়িয়ে রয়েছে, পাঠকের মনে যা মুগ্ধতা ছড়িয়ে দেয়।

জ্ঞান কোন জাতির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। কিন্তু তা আকাশে, বাতাসে বা মাটির নিচে পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় বাস্তব জীবনযাপনে আর তার বাইরে প্রধানত বইতে। প্রাথমিক স্তরের পরে জ্ঞানের বৃহদংশটা মানুষ বই থেকে সংগ্রহ করে। সেজন্য একটা দেশে অনেক বই প্রকাশ হওয়া প্রয়োজন। প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে সারা বিশ্বের জ্ঞানভান্ডার থেকে অনুবাদও থাকতে হবে অনেক। কোন দেশে ভাষান্তরসহ প্রতি বছর কত বই প্রকাশিত হয় তা থেকে সেখানকার মানুষের মানসিক উচ্চতা ও উন্নয়নের সিঁড়িতে তাদের অবস্থান বোঝা যায়।

‘দ্যা ফোর এগ্রিমেন্টস’ আমার পড়া অনুবাদ গ্রন্থের ভেতর অন্যতম। এই বইটি যেমনি আমাদের জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করে তেমনি বিভিন্ন সমস্যার যৌক্তিক সমাধান দেয়।

সর্বপরি অনুবাদক ‘ আসাদ জোবায়ের’কে ধন্যবাদ জানাতে চাই এমন একটি সমৃদ্ধ বই অনুবাদ করে সর্বসাধারণের হাতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য।
‘দ্যা ফোর এগ্রিমেন্টস’ বইটির ব্যাপক প্রচার ও সফলতা কামনা করছি।

*বই: দ্য ফোর এগ্রিমেন্টস
*লেখক: ডন মিগুয়েল রুইজ
*অনুবাদক : আসাদ জোবায়ের
*প্রকাশক: জলকথা প্রকাশ
*প্রচ্ছদ: ফারাহ নাজ মুন
*পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১১২
*মুদ্রিত মূল্য: ২২০