[২০২১-এর ঈদে ইসরাইলী হামলায় শহিদ হওয়া ফিলিস্তানিদেরকে উৎর্গীত]

রাতে ঘুম আসে নি একটুও।

একাকী ঘুমাবে কেমনে? দুদিন আগেও মা ছিল, বাবা ছিল। ছিল ছোট একটা ভাইও। এখন একাকী। এই রাত কি দিন কোনো বোধই নেই ফাতেমা নওমীর।

ভাঙ্গা বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। বছর দুয়েক আগে বোমায় বারান্দার একটা অংশ ভেঙ্গে গিয়েছিল। আর ঠিক করা হয় নি। ঠিক না করাতে একদিকে ভালোই হয়েছে। বাসা থেকে সরাসরি সামনের উঠোনটায় আসা যায়।

এখন এসে দাঁড়ায় সেই ভাঙা বারান্দায়।

মা, বাবা, ভাইকে হারানোর বেদনা চোখে মুখে। তবে এ বেদনাকে ছাড়িয়ে মনটা আরো দৃঢ় হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার প্রতিজ্ঞাতে। তাকে বাঁচতে হবে। সন্তানের মা হতে হবে। সন্তানকে মাতৃভূমি ফিলিস্তান উদ্ধারের জন্য লড়াই শেখাতে হবে। এতদিন ভাইকে শিখাচ্ছিল। আজ আর সে স্বপ্নটা নেই।

তারপরও নির্বিচার হামলায় মা, বাবা, ভাইকে হারানোর বেদনায় কান্না এসে ভর করে। নিজ দেশেও মুক্ত শ্বাস নিতে পারছে না। হিংস্র হায়েনা হানা দিচ্ছে যখন তখন, ঈগল ছোঁ মারছে। ফিলিস্তানীরা স্বজন হারাচ্ছে তাই প্রতিনিয়ত। এ তো সভ্যতায় হিংস্রতার আনন্দ খেলা।

বারান্দা থেকে উঠোনে নেমে আসে নওমী। উপরের চারদিকে তাকায়। ভয়, কোনদিক থেকে আবার রকেট লাঞ্চার এসে পড়ে। সপ্তাহখানেক ধরেই দখলদার ইসরাইলের নির্বিচারে বোমাবর্ষণ সকল মানবিকতাকে হার মানিয়েছে। বিশ্বের তাবৎ রাষ্ট্রনায়করা দেশে দেশে মানবাধিকারের ছবক দিচ্ছে। কিন্তু ফিলিস্তানে এসে সে মানবাধিকার লেজ গুটিয়ে শীতাতপে ঘুমোয়।

হঠাৎ ডাক শুনে, নওমী… মামণি…

চমকে তাকায় ডান দিকে। পড়শি চাচা আবদাল হাদিদ। নওমীর খোঁজ নিতে ভাঙা দেওয়াল ডিঙ্গিয়ে উঠোনে এসেছেন। নওমী তার কাছে গিয়ে বলে, চাচা…!

ডুকরে কেঁদে ওঠে।

-মা…

অশ্রুসিক্ত চোখে আবেগে নওমীর মাথায় হাত রাখে আবদাল। কোনো কথা বলতে পারছে না।

পড়শু ছিল ঈদুল ফিতরের দিন। আল আকসায় ঈদের নামায পড়তে যাবে বাবা আর ভাই। এ পড়শির আরো অনেকেও। বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তায় উঠেছে, অমনি বোমা এসে পড়ে। সাথে সাথে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায় ওরা দুজনসহ আরো অনেকে। আরেকটি বোমা পড়ে এই উঠোনে। মা ছিলেন ওখানে। তিনিও রক্তসাগরে হারিয়ে গেলেন। ঘরে একাকী নওমী। সদ্য স্বজনহারা হিংস্রতার হাসি নিয়ে ঈদটা এসেছে নওমীর কাছে। পড়শিরা দাফন করেছে। বাবা মা ভাইকে দাফন করাটাই এবারের নওমীর ঈদ। দুনিয়ার মুসলমানেরা ঈদে আনন্দ করে; নওমীরা, ফিলিস্তানিরা আত্মজদের লাশ দাফন করে ঈদে।

নওমী আর পুরো পরিবারই নিজ মাতৃভূমি পুনরুদ্ধারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। বাবা ছিলের মুক্তিকামী যোদ্ধা। সেই ছোট্ট থেকেই নওমী দেখে আসছে বাবার যুদ্ধ। বাবার সাথে মা-ও যুদ্ধ করে। মা পাথরযোদ্ধা। দড়ি পেঁচিয়ে পাথর মারায় মায়ের নিশানা প্রায়ই অব্যর্থ। একসময় এই ফিলিস্তানিরা ইসরাইলের বুলেট লড়াইয়ের বিরুদ্ধে পাথরযুদ্ধই করত। এখন আর তেমনটি নেই। এখন আগ্নেয়াস্ত্র আর ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আগ্রাসী ইসরাইলের বিরুদ্ধে লড়াই করে। নওমী তার বাবার যুদ্ধকেই পছন্দ করে। তাই অস্ত্র চালনায় পারদর্শী নওমীও একজন প্রতিরোধ যোদ্ধা। ভাইকে সে-ই তৈরি করছিল। শুধু ভাইকেই নয়, পড়শির আরো ক’জন মেয়েকে তৈরি করাচ্ছিল বাবা, মা আর নওমী। ওদের ছোট্ট উঠোনটাই যুদ্ধ প্রশিক্ষণকেন্দ্র।

আজ নওমীর কাছে স্বজন হারানো বেদনার চেয়েও বড়ো বেদনা মুক্তিকামী যোদ্ধা হারানো। একাকী বাসায় নওমী আরো দৃঢ় হয়ে ওঠে প্রতিরোধে। ফিলিস্তান মাতৃভূমিকে মুক্ত করার জন্যই ওর জন্ম বলে বিশ্বাস করে।

আবদাল চাচার আদরে কিছুটা অনুভূতিশীল হয়ে পড়ে। চোখ মুছতে মুছতে বলে, আমাকে তো আরো যোদ্ধা তৈরি করতে হবে। আমার মাতৃভূমিকে এনে দিতে হবে আগামী প্রজন্মের কাছে। এ যে বাবা, মা আর ভাইয়ের রক্তের শপথ।

ফিলিস্তানীদের ঈদ নেই, আনন্দ নেই। নিজ দেশেই আজ নিজেরা পরবাসী। শুধু পরবাসীই নয়, চরম শত্রুও। তাই পিঁপড়ের মতো দলন ওদের প্রাপ্য। রূপকথার রাজাদের চেয়েও একরোখা নির্দয় ইসরাইলী মানুষগুলো। আচার, আচরণে আর মানবিকতায় সভ্যতার নূন্যতম পরিচয় মেলে না ইসরাইলীদের মাঝে। বিশ্বসভ্যতা এই সভ্যসময়েও ফিলিস্তানে কাছে এসে ইসরাইলীদের হয়ে ছাতা ধরে। তারপর রূঢ় হেসে চলে যায়। অবশেষে তাবৎ দুনিয়াকে আবার সভ্যতার পাঠ দেয়। এ যে সভ্যতার অসভ্যতা।

নওমী জানে পৃথিবীর সভ্যতা ফিলিস্তানীদের কাছে পরাভূত। তাই ফিলিস্তানে সভ্যতার নতুন সূর্য উদয় করতে লড়াই করছে, লড়াকু তৈরি করছে। ওর মতো আরো অনেক নওমী এমন লড়াকু তৈরি করছে এই ফিলিস্তানে। একসাথে পরিবারের সবাইকে হারিয়েছে নওমী। মানবিক রক্তক্ষরণের আলপনায় এ শহিদি দৃশ্য নতুন শক্তি প্রেরণা দিচ্ছে নওমীকে। প্রতিরোধ যুদ্ধ করার এবং আরো যোদ্ধা তৈরি করার প্রেরণা দিচ্ছে। প্রচণ্ড শক্ত নওমীর মনের অবয়ব। ফিলিস্তানের কিছু নাগরিক কিংবা কমান্ডার শহিদ হলেও প্রতিরোধ শক্তি দুর্লব হবে; এমন ভাবা নিতান্তই ভুল। বাবা, মা, ভাই গিয়েছে- তাতে কী! প্রতিরোধের এ ধারা অব্যাহত রাখবেই নওমী আর নওমীর মতো শত শত ফিলিস্তানি। চলমান যুদ্ধে আতঙ্ক নয় প্রেরণাই দিচ্ছে নওমীদের। চাচা আবদালকে দৃঢ়কণ্ঠে বলে, চাচা আমাকে সামান্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে দিন।

-দেব। তোমাকে আরো মেয়ে দেব। আমাদের পড়শির আরো অনেককে দেব। সবাইকে তুমি তোমার মতো যোদ্ধা বানাও। পাথর নয়, অস্ত্রের যোদ্ধা বানাও। যুদ্ধ করো।

-হে আল্লাহ আমাকে শক্তি দাও যেন আমি এই মাতৃভূমিকে পবিত্র করতে পারি।

অবেগে আপ্লুত আবদাল হাদিদ বলেন, আমীন।

তারপরই বলে, আমার মেয়েও এখন থেকে থাকবে তোমার সাথে এ বাড়িতে। ভেতরে তোমার একা হলেও বাইরে আমরা পড়শিরা সবাই আছি।

-কিন্তু…

আবার ডুকরে কেঁদে ওঠে।

-কী হলো আবার?

-আমি নিঃশ্বাস নিতে পারবো ফিলিস্তানী সভ্যতায়? নাকি কুটিল বিশ্বসভ্যতার বিজয় সবাই গাইবে চোখ বন্ধ করে?

ভাবতে ভাবতে আবদাল হাদিদ বলেন, আমি তো ভেবেছি মায়ের জন্য, বাবা-ভাইয়ের জন্য কাঁদছো।

-চাচা, বাবা-মায়ের শহিদি জীবন আমাদের প্রেরণা দেয়। আমাদের কান্না দজ্জালের মতো একচোখা সভ্যতার জন্য। তাদের চোখ উপড়ানোই আমাদের সভ্যতা, আমাদের কাজ। অসভ্য বিশ্বে আমরা সভ্যতার নতুন সংজ্ঞা রচনা করব।

-একদম ঠিক বলেছো মা। এখন চলো বাসায়। নাস্তাটা সেরে নাও। শরীরে শক্তি লাগবে তো।

নওমী আর আবদাল চাচা আবার ভাঙা দেওয়াল ডিঙিয়ে বাসার বাইরে আসে। আকাশের দিকে তাকিয়ে চারিদিক দেখে। ফিলিস্তানীদের সবসময় আকাশ পরীক্ষা করে চলতে হয়। শুধু আকাশই না, দূর কোত্থেকে আবার আগ্নেয়াস্ত্রের গুলি এসে পড়ে, সেসব সতর্কতায় দেওয়াল ঘেঁসে আগাতে থাকে।

হঠাৎ হই চই শুনতে পায়।

সচেতন হয়ে দুই জনে দাঁড়ায়। ওই তো এক তরুণ দৌড়ে আসছে। তার পেছনে আরো ক’জন তরুণ-যুবক। সামনের তরুণটি ইসরাইলী। তাড়া করা ওরা ফিলিস্তানী। কাছে এসেই আবদাল হাদিদকে জড়িয়ে বলে, আমাকে বাচাও।

ততক্ষণে ফিলিস্তানী তরুণরা এদের ঘিরে ফেলেছে। পাথর আর লাঠি হাতে। আবদাল হাদিদও উত্তেজিত হয়ে ওঠে ফিলিস্তানী তরুণদের পক্ষ নিয়ে। নওমী এগিয়ে এসে ফিলিস্তানী তরুণদের বলে, ও কি গুলি করেছে?

সমস্বরে ওরা বলে, না। কিন্তু ও ইসরাইলী।

-কখনো কি গুলি করেছে?

-তাও না। কিন্তু ও ইসরাইলী। ওকে খতম করব।

এবার অত্যন্ত দৃঢ় স্বরে নওমী বলে, না।

সবাই চমকে যায়। চমকে যায় ইসরাইলী তরুণটি, চমকে যায় আবদাল হাদিদও। দৃঢ়তা নিয়েই নওমী বলে, নিরীহ ওকে যদি হত্যাই করো তবে তো তোমরাও দুনিয়ার সবার মতোই অসভ্য হয়ে গেলে।

সবাই আরো উত্তেজিত হয় বলে, ছেড়ে দাও, আমরা ওকে খতম করব।

-বলছি তো না। ও তো নিরীহ একজন। কুকুর কামড়ালে কি তোমরা কুকুরকে কামড়াও? তা করো না নিশ্চয়। কুকুরকে লাঠিপেটা করে তাড়াও, তাই তো?

আবদাল চাচা বলেন, কথাটা ঠিক বটে।

-এখনও তাই। আমরা কুকুরকে লাঠিপেটা করে তাড়াব। তারপর অসভ্য দুনিয়াকে সভ্যতা শেখাব।