বাংলা কবিতার সকালবেলার পাখি কাজী নজরুল ইসলামের পাখির পৃথিবীতে উড়াল দেয়ার আগে কয়েকটি কথা জানিয়ে রাখতে ইচ্ছে করছে।

ক. কবি আবদুল কাদিরের সম্পাদনায় প্রথমবারের মতো নজরুল রচাবলী বের হয় ১৯৬৬ তে। বাংলা একাডেমি থেকে ৪ খন্ডে এর শেষ সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৯৩ সালে। ৪ খন্ডের মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল- ৩৪৮৭।

খ. বাংলা একাডেমি মে, ২০০৬ সালে পরিবর্ধিত কলেবরে প্রকাশ করে ১১ খন্ডের নজরুল রচনাবলী। ১১ খন্ডের মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা-৪৯১৫।

গ. ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি প্রথমবারের মতো নজরুল রচনাসমগ্র বের করে ২০০১ এ। ৬ খন্ডে এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় মার্চ ২০০৫ সালে। ৬ খন্ডের মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা-৩৫৬৫।

ঘ. তাহলে বাংলাদেশ ভারত মিলিয়ে নজরুল রচনাবলী ও রচনাসমগ্রের সর্বমোট পৃষ্ঠা সংখ্যা দাঁড়াল-১১৯৬৭।

ঙ. প্রতি পৃষ্ঠা পড়তে গড়ে ৬ মিনিট করে সময় ধরলে, আমার ব্যয় হয়েছে-৭১৮০২ মিনিট। ঘন্টার হিসাবে ব্যয় করেছি- ২৯৯১.৭৫ ঘন্টা। এই শ্রমেরই ফসল আজকের “আমি হব সকালবেলার পাখি : নজরুলের গানে ও কবিতায়
পাখি’’। তারপরও আমার ভুল হতে পারে। হয়তো দু’ একটা পাখির নাম চোখ এড়িয়ে গেছে। শংকা থেকে বললাম। তবে আমার বিশ্বাস তেমনটি হয়তো হয়নি।

চ. এখানে আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করছি, আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মরহুম কাজী জাকের হোসেনকে। আমার মতো অভাজনকে তিনিই চিনিয়েছিলেন পাখি। আমি যখন নজরুল ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক সেই সময় তাঁর শিক্ষাকে কাজে লাগানোর একটা সুযোগ পেয়ে যাই।

ছ. এগিয়ে এলেন পাখিবিশারদ, ছোটভাই, বন্ধু আলোকচিত্র সাংবাদিক মুজাহিদুল ইসলাম। জীবনের অনেকটা সময় মুজাহিদ ব্যয় করেছে পাখির তালাশে। ঘুরে বেডিয়েছে বনে জঙ্গলে। তার আছে পাখির ছবির বিস্ময়কর সংগ্রহ।
তাকে দিলাম নজরুলের গানে ও কবিতায় উল্লেখিত পাখির তালিকা। কিছু ছবি ওর সংগ্রহে ছিল। বাকি গুলোর সন্ধানে নেমে গেল পথে। রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, সুন্দরবন, মধুপুর, সিলেট, পণ্চগডের বনবাদাড় তোলপাড় করে, ১৫ দিনের মধ্যে ও নজরুল ইন্সটিটিউটে হাজির। হাতে ছবির বিশাল বান্ডিল, ওজন কম করেও ১০ কেজি হবে, “শিকদার ভাই, এই যে নিন, আপনার তালিকা অনুযায়ী নজরুল রচনায় উল্লেখিত সব পাখির ছবি।’ আমি অবাক!
তারপর বাংলাদেশ ভারত পাকিস্তানের ইতিহাসে, বোধ করি সাহিত্যের ইতিহাসেও প্রথমবারের মতো কোনো কবির কবিতা ও গানে উল্লেখিত পাখি নিয়ে, নজরুল ইন্সটিটিউটে আয়োজিত হলো সপ্তাহব্যপী আলোকচিত্র প্রদর্শনী “নজরুলের গানে ও কবিতায় পাখি’’। সাথে যুক্ত করলাম সংশ্লিষ্ট পাখি নিয়ে নজরুলের গান বা কবিতার পংক্তি।
সময়টা জুলাই ২০০৫। সেই প্রদর্শনীর জন্য, ছবি সংগ্রহের ব্যাকুল আগ্রহের জন্য মুজাহিদুল ইসলামকে হয়তো সেদিন তেমন করে ধন্যবাদ দিতে পারি নি কিংবা দিয়েছি হয়তো। তবু আজ আবার তার জন্য শত শুভ কামনা। একই সঙ্গে ভালোবাসা জানাচ্ছি চারুশিল্পী ফরিদী নুমানকে। সে তো এখন রীতিমত পাখি ও সুন্দরবন বিশেষজ্ঞ!

জ. সরকারী নিয়ম অনুযায়ী সাত দিনের এই প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন এলজিআরডি মন্ত্রী আবদুল মান্নান ভূঁইয়া। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী বেগম সেলিমা রহমান, ড. আশরাফ সিদ্দিকী, প্রফেসর কাজী জাকের হোসেন, কবি আল মাহমুদ, শিল্পী সোহরাব হোসেন, সুধীন দাশ প্রমুখ। ৭ দিনে প্রায় সহস্রাধিক মানুষ ঘুরে ঘুরে দেখেছেন প্রদর্শনী। বিশিষ্ট জনের মধ্যে শিল্পী ফেরদৌসী রহমান, ওবেইদ জাগীরদার, কবি ফজল শাহাবুদ্দীন, বেলাল চৌধুরী, খালিদ হোসেন, খিলখিল কাজী, শবনম মুশতারী, ইয়াসমিন মুশতারী, প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদ, ড. মাহবুব উল্লাহ, গবেষক শাহাবুদ্দীন আহমদ, প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবির, মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন, মোশারেফ হোসেন সাজাহান, শহীদুল ইসলাম এম.পি., কবি মুস্তাফা মজিদ, হাসান আলীম, নজরুল একাডেমির সম্পাদক মিন্টু রহমান, গবেষক আসাদুল হক, নজরুল সমাজের আলাউদ্দিন ভূঁইয়ার নাম এই মূহূর্তে মনে পড়ছে।

ঝ. সবাইকে অবাক করে, উদ্বোধনী দিনেই সন্ধ্যার পরে সদলবলে এসে হাজির আওয়ামী লীগ নেতা, সাবেক মন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক। পুরো প্রদর্শনীটা ঘুরে দেখতে দেখতে বললেন, ‘খুব সুন্দর একটা কাজ করেছেন। রাজনীতিবিদদের শক্ত চোয়াল নরম করার ভালো একটা কায়দা বের করেছেন!’ -তার কথায় সবাই হেসে উঠলাম। তিনি মুজাহিদকেও অনেক প্রশংসা করলেন।