“আমি বেদুঈন আমি চেঙ্গিস
আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ”
কবির আবেগ ও উচ্ছ্বাস কখনো ই তাকে স্থির থাকতে দেয়নি। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র হওয়া স্বত্বেও মাঝ পথে লেখা পড়া ছেড়ে দিয়ে সৈন্যবাহিনীতে লেখালেন নাম।

বিশের দশক। সারা ভারত বর্ষ তথা সারা পৃথিবী তখন উত্তাল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঘোর তখন সকলের চোখে দৃশ্যমান। একদিকে রাশিয়ার বিপ্লবের ঢেউ অন্যদিকে পরিবারের আর্থিক দুর্দশা, আবার বাংলায় কমিউনিষ্ট আন্দোলনের ভিত্ তৈরি। সবমিলিয়ে নজরুলের তখন মনে প্রাণে বইছে ঘুর্নিঝড়। সব কিছুই তাকে যেন স্থির থাকতে দিচ্ছে না।

১৯২০সাল। ভারতে কমিউনিষ্ট আন্দোলন সবে দানা বাঁধতে শুরু করে দিয়েছে। জানুয়ারি মাসে কবি করাচীর সেনা নিবাস থেকে ছুটি তে এসেছেন। হিতাকাঙ্খী বন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় ও মুজাফফর আহমদ এর বাড়িতে উঠেছেন। তখন কলকাতায় তার পরিচিত মাত্র চার জন শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় মুজাফফর আহমদ, নাসির উদ্দিন ও পবিত্র মুখোপাধ্যায়। ছুটির পর আবার ফিরে গেলেন করাচির সেনাবাহিনীর ছাউনীতে। মাথায় টগবগ করে ফুটছে যৌবন, অদম্য উৎসাহ, আর কলমের বিদ্রোহী অক্ষর মালা।

মার্চ মাসে ভেঙে দেওয়া হলো বেঙ্গলি রেজিমেন্ট। সবাই তখন হয়ে পড়লেন কর্মহীন। বাদ গেলেন না নজরুল ও। দুশ্চিন্তা তখন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে সারাক্ষণ। আবারও তিনি ফিরলেন হিতৈষী বন্ধু মুজাফফর আহমেদ এর বাসায়। ৩২নম্বর কলেজ স্ট্রিটের মুসলিম সমিতির বাড়িতে। বাংলাদেশে তখন চারজন কমিউনিষ্ট পার্টির সদস্য মুজাফফর আহমদ, আব্দুল হালিম, আব্দুর রাজ্জাক খাঁ ও শামশুল হুদা। তবে এদের সাথে আরও কিছু কমিউনিষ্ট ভাবাপন্ন মানুষ তাদের সাথে ছিলেন, বঙ্কিম মুখার্জি, মণি সিংহ, কালী সেন, আব্দুল মোমিন, ধরণী গোস্বামী গোপেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী, গোপাল বসাক, রাধারমন মিত্র, নীরদ চক্রবর্তী। পিয়ারী মোহন দাস নলীনী মোহন সেন গুপ্ত এবং ডঃ ভূপেন্দ্র নাথ দত্ত। নজরুল এই সময় পার্টির সদস্য ছিলেন না ঠিক ই কিন্তু আন্দোলন গড়ে তোলার পেছনে তার অবদান কম ছিল না। কমিউনিষ্ট আন্দোলনের আদি সংগঠকদের সাথে তার ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।

করাচি থেকে ফিরে এসে দেশপ্রেমের প্রেরণায় যুদ্ধের অভিজ্ঞতা কে স্বাধীনতা সংগ্রামের কাজে লাগানো যেতে পারে তার ভাবনা কিছু তেই তাকে স্থির হয়ে থাকতে দিচ্ছে না। মনে মনে তিনি টগবগ করে ফুটছেন। জীবিকা অর্জনের ভাবনা কে তুড়ি মেরে রাজনীতি কে তিনি বেশি প্রাধান্য দিয়েছিলেন। যুদ্ধ ফেরত সৈনিক দের তখন প্রচুর চাকরির সুযোগ। সব কিছু কে প্রত্যাখান করে মুজাফফর আহমেদ এর সঙ্গে সাংবাদিকতা ও রাজনীতি করার সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন। কল্প তরু সেনগুপ্ত মশাই নজরুল সম্মন্ধে বলেছেন নজরুল নিজে মুখে নাকি বলেছিলেন” রাজনীতি ইযদি না করবো তবে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে গিয়েছিলাম কেন?”

যুদ্ধে যাওয়ার ফলে নজরুলের একটা বড়ো প্রচার হয়েছিল। রাশিয়ার অক্টোবর বিপ্লবের ফলে পৃথিবীর ধনতান্ত্রিক দেশগুলো হতচকিত হয়ে ওঠে। তারা বুঝতে পেরেছিল বিপ্লবের এই ছোঁয়াচ বন্ধ না করতে পারলে ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা কায়েম রাখা সংকটময় হয়ে উঠবে। ১৯২০সালের ১৭ই অক্টোবর ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা হয় তাসখন্দের মাটিতে। এই রুশ বিপ্লবের নতুন পথ ও ভারতের নতুন আন্দোলন গড়ে তুলবার কাজে নিজেকে মনে মনে উৎসাহিত হয়ে পড়ছিলেন। ভারতীয় বিপ্লবীগণ বুঝতে পারছিল যে শ্রমিক কৃষকের অংশগ্রহণ ভারতীয় স্বাধীনতা অর্জনের একমাত্র পথ। ভিতরে, বাহিরে, অন্তরে তিনি কমিউনিষ্ট আন্দোলনের সাথে নিজেকে এ সংপৃক্ত করে তুলছিলেন। নজরুল ব্যারাকে বসে বসে রুশ বিপ্লবের সমস্ত নিষিদ্ধ পুস্তক হস্তগত করেছিলেন। একথা আমরা জানতে পারি নজরুলের সেনা জীবনের সঙ্গী প্রানোতোষ চট্টোপাধ্যায় এর কাছে। লালফৌজের কীর্তি কলাপে তিনি এতটাই উত্তেজিত হয়ে পড়তেন যে বন্ধুদের নিয়ে মেতে যেতেন আনন্দে।

যুদ্ধে যাওয়ার ফলে চুরুলিয়ার অখ্যাত গ্রামের আবদ্ধ যুবক আন্তর্জাতিক দৃষ্টি ভঙ্গি নিয়ে স্বদেশ কে চিনতে শিখেছিলেন। এই সময়ের দুটি গল্প “ব্যাথার দান”, “হেনা” পড়ে আমরা অনুভব করতে পারি। কমিউনিষ্ট রাজনীতি করার প্ররণা নিয়ে মুজাফফর আহমেদ এর সঙ্গে সাংবাদিকতার জগতে প্রবেশ করেন। তার সাথে মিলিত উদ্যোগে প্রকাশ করেন নবযুগ, ধূমকেতু, লাঙ্গল ও গণবাণির মতো কাগজ। সমালোচক গত যে যাই বলুন না কেন জীবনের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে কমিউনিষ্ট চিন্তা ধারার প্রতি আস্থা দিন দিন বাড়তে থাকে।

এই কাগজ গুলোতে দুধরনের রচনা আমরা দেখতে পাই। এক পর্যায়ে ছিল দেশাত্মবোধক রচনা। পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচন অভিলাষী ভারতবাসীর মনে প্রত্যক্ষ আলোড়ন সৃষ্টি করা। অন্য পর্যায়ে ছিল কমিউনিজমের আদর্শ তুলে ধরা। কবির এই সময়ের রচনা গুলো ঔপনিবেশিক স্রকারকে মতো বেশী ভাবিত করে তুলেছিল তার চেয়ে সাম্যবাদী ভাবনা অনেক বেশি বিচলিত করে তুলেছিল।

নজরুল সবসময় সাম্প্রদায়িক দৃষ্টি ভঙ্গির তীব্র বিরোধিতা করেছেন। বিরোধিতা করেছেন সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশিক বাংলাকে। নির্ভীক কন্ঠে উচ্চারণ করেছেন স্বদেশের পূর্ণ স্বাধীনতা ও নিম্ন বর্গ মানুষের মুক্তির কথা। গণবিপ্লবের কথা বলতে চেয়েছেন বারবার। তিনি বলতে চেয়েছেন স্বাধীনতা মানুষ এমনি এমনি পায়না, একে অর্জন করতে হয়।

তিনি ছিলেন একজন বিপ্লবী, বিদ্রোহী ও সাম্যবাদী ।তার সামগ্রিক চেতনার মূলে ছিল মানবপ্রেম। শুধুমাত্র নিজের দেশের কথা বলে শান্ত থাকেননি, সমগ্র বিশ্বের নিপীড়িত জনগোষ্ঠির কথা বলে ছেন। যেখানেই অন্যায় অবিচার শোষন দেখেছেন সেখানে তিনি গর্জে উঠেছেন বারবার। আন্তর্জাতিক সংকট তার মনকে পীড়া দিয়েছে বারবার। তাই তিনি হয়ে উঠেছিলেন বিদ্রোহী, বিপ্লবী ও প্রতিবাদী। সাধারণের দাবি জন্য হয়ে উঠেছিলেন সাম্যবাদী। ১৯৩২ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মাসে প্রকাশিত “বিষের বাঁশি”তে বিপ্লবী নজরুলকে খুঁজে পাই। বিপ্লবী চেতনায় সমৃদ্ধ এই কাব্যগ্রন্থের মূল সুর ছিল দেশাত্মবোধ। পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনে র আকাঙ্ক্ষায় স্বদেশ ভাবনা কে ঝড়ের তান্ডবে রূপায়িত করতে চেয়েছিলেন।

ঝড়কবিতাটি বিপ্লব চেতনার বহিঃপ্রকাশ। স্বদেশের বন্দীদশাকে আত্ম নিগ্রহ বলেছেন। পরাধীনতার নাগপাশ ছিন্ন করার জন্য নাগশিশুর মতো সহস্রাধিক তরুণ দলকে ছুটে আসতে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। সকল মায়ার বন্ধন ছিন্ন করে সাপের ন্যায় তীব্র গতিতে আক্রমণ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

সম্পূর্ণ স্বাধীন দেশে প্রেম পূর্ণ সহাবস্থানের প্রত্যাশায় মনপ্রাণ উৎসর্গ করতে চেয়েছিলেন। তার কবি প্রকৃতি রোমান্টিক হওয়া স্বত্বেও অভুক্ত কঠিন পথে চলতে চেয়েছেন। দুর্যোগের ঘনঘটা স্বত্বেও অভুক্ত পথে চলতে চেয়েছেন বারবার। তার চলার মূলে ছিল স্বদেশ প্রীতি ও স্বদেশ ভাবনা।

ভারতীয় মুক্তি সংগ্রামের শেষ দুদক ছিল নজরুলের সাহিত্য সাধনার বৎসর। তিনি দেখেছেন ১৯১৪তে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা, ১৯১৭তে দেখেছেনরুশ বিপ্লব, ১৯১৯শে জালিওয়ানা বাগের নির্মম হত্যা কান্ড। ১৯৪২ এ দেখেছেন ভারতছাড়ো আন্দোলন, দেখেছেন অসহযোগ আন্দোলন।আর দেখেছেন দেশীয় নেতাদের ইংরেজপ্রীতির পদলেহনের নির্লজ্জ বাস্তব চিত্র। বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির বাস্তবায়ন হয়েছে এ সময়ের সকল সাহিত্য কর্মে।

এই সময় ভারতে তিনটি আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় প্রবাহিত ছিল। কংগ্রেস আন্দোলন, সাম্যবাদী আন্দোলন ও কমিউনিষ্ট আন্দোলন। নজরুল তখন জ্বালাময়ী বক্তৃতায় জনগণের মন জয় করে চলেছেন। এর সুবাদে সকল নেতাকর্মীর সাথে ছিল ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ।

আমাদের গর্ব নেত জী সুভাষ চন্দ্র তো কান্ডারী হুশিয়ার কবিতা টিকে বিপ্লবী কার্যক্রমের মূল মন্ত্র হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন। স্বদেশের ভাবনা, স্বদেশপ্রেম তাকে এমনভাবে জারিত করেছিল যে ভারতের মুক্তি ছাড়া অন্য কিছু চিন্তা করতেই পারছিলেন না। তিনি উদাত্ত আহ্বান জানান
বর্তমানের কবি আমি ভাই ভবিষ্যতের নই নবী
কবি ও অকবি যাহা বলো মোরে মুখ বুজে তাই সই সবি ।
সাম্যের গান কবিতায় লিখেছেন
মানুষের চেয়ে বড়ো কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান
সর্বহারাতে লিখেছেন
আমি বিদ্রোহী ভৃগু ভগবান বুকে এঁকে দিই পদচিহ্ন
বৃটিশ পার্লামেন্টের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য লিখেছেন
আর কতকাল থাকবি বেটি মাটির ঢেলার মূর্তির আড়াল
স্বর্গ যে আজ ভয় করছে অত্যাচারীর শক্তি চালায়
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধনে বাঁধতে লিখেছেন
হিন্দু না ওরা মুসলিম জিজ্ঞাসে কোন জন?
কান্ডারী বলো ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা’র
“অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া জানেনা সন্তরণ
কান্ডারী আজ দেখিবো তোমার মাতৃমুক্তি পণ”
“ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায় ভারতের দিবাকর
উদিবে সে রবি আমাদেরী খুনে রাঙিয়া পূর্বার
বন্ধন মুক্তির প্রেরণায় তুলে ছিলেন ঝড়”
ক্ষুধাতুর শিশু চায়না স্বরাজ, চায় দুটো ভাত একটু নুন
বেলা বয়ে যায় খাইনি কোন বাছা, কচি পেটে তার জ্বলে আগুন
মাটিতে যাদের ঠেকেনা চরণ
মাটির মালিক তারাই হন
ঐদিকে দিকে বেজেছে ডঙ্কা,শঙ্কা নাহিক আর
মরিবার মুখে মারণের বাণী উঠিতেছে মার মার
তেমনি আবার কুলি মজুর কবিতায় শ্রেণী চেতনার তীব্র বহিঃপ্রকাশ ঘটে
হাতুড়ি শাবল গাঁইতি চালায়ে কাটিল যাহারা পাহাড়
পাহাড় কাটা সে পথের দুপাশে পড়িয়া যাদের হাড়
তারাই মানুষ তারাই দেবতা গাহি তাহাদের গান
তাদের ব্যাথিত বক্ষে পা ফেলে আসে নব উত্থান
কাটায়ে উঠেছি ধর্ম আফিম নেশা
ধ্বংস করেছি ধর্মযাজকী পেশা
ভাঙি মন্দির ,ভাঙি মসজিদ
ভাঙিয়া গীর্জা, গাহি সঙ্গীত
এক মানবের একই রক্ত মেশা

নজরুল সাহিত্যের অন্যতম প্রধান বিষয় মানবতার মুক্তির অদম্য আহ্বান। স্বদেশ, সমাজ, রাষ্ট্র, ধর্ম, সাম্য, সর্বোপরি মানুষ তার কবিতা গানে যথেষ্ট সক্রিয়। তিনি একাধারে কবি, সমাজ সংস্কারক, বিপ্লবী ও রাজনৈতিক নেতা। শৃঙ্খল মোচন অভিলাষী কবি সহজেই মানুষের মনে আবেদন সৃষ্টি করতে পারতো। তার দ্বিতীয় পর্যায়ের রচনা গুলো কমিউনিষ্ট তথা কমিউনিজমের আদর্শে পরিপুষ্ট।

লন্ডনে ইন্ডিয়া অফিসে স্যার সিসিল ১৯২২ সালের ২১ নভেম্বর থেকে ১৯২৩ সালের ১০ মে পর্যন্ত প্রকাশিত পত্রিকা গুলোর যে প্রতিবেদন লেখা হয় তাতে ধূমকেতু তিনবার অভিযুক্ত হয়। ১০৯/১৯২৩ নম্বর ফাইলে বলশেভিক মতাদর্শ প্রচারে অভিযুক্ত হয় এবং এক নম্বরে নাম থাকে ধূমকেতুর। The Dhumketu,It’s editor Nazrul Islam has since been convicted U/S124IPC and sentenced to one years RI Amaresh kanjilal who succeeded Nazrul as the editor has also prosecuted U/S124IPC.

বিপ্লবীদের সাথে নজরুলের কম-বেশি যোগাযোগ তো ছিলই। এদের অনেকেই কম-বেশি টেরোকমিউনিষ্ট ও টেরো সোস্যালিষ্ট। নজরুলের স্বদেশ ভাবনায় তখন দুইয়ের প্রভাব মিলে মিশে একাকার। জাতীয় বিপ্লববাদ থেকে ক্রমাগত কমিউনিজমের আদর্শে উজ্জীবিত হচ্ছিলেন। অসহযোগ আন্দোলনের যুগে তিনি লিখেছিলেন” কারার ঐ লৌহ কপাট/ভেঙে ফেল কররে লোপাট ১৯২২, গাহি সাম্যের গান, ওড়াও ওড়াও লাল নিশান (রেড ফ্ল্যাগ গান)।

দেশের অভ্যন্তরে কমিউনিষ্ট পার্টির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন উদ্যোগ শুরু হলেও নজরুল ইসলাম দেশবন্ধু ও গান্ধী ভক্ত ছিলেন। তবুও তিনি নতুন দল তৈরি করেন নাম দেন The Labour Swaraj Party of Indian National Congress। এর ইস্তেহারর প্রকাশ করেন ৩৭নম্বর হ্যারিশন রোড কলকাতা থেকে।এটি লাঙ্গল পত্রিকার প্রথম বর্ষের প্রথম সংখ্যাতে ১৬ ডিসেম্বর ১৯২৫ এ প্রকাশিত হয়। এতে চারটি ভাগ এক গঠনতন্ত্র (costitution) দুই নীতি ও কর্মসূচি (policy and program) তিন চূড়ান্ত দাবি (ultimate demand) চার আরো দাবি (immediate demand)। বাংলা ভাষায় এর নাম দেওয়া হয়েছিল (ভারতীয় জাতীয় মহাসমিতির শ্রমিক প্রজা দল)। বাংলা নামটা লোকে ভালো ভাবে নেয়নি বরং ইংরেজি নামটা নিয়ে ছিল (Labour swaraj party) নজরুল ইসলাম এই সময় কৃষ্ণনগরে ঠাসা রাজনৈতিক কার্যালয়ে ব্যাস্থ ১৯২৬-১৯২৮ সাল পর্যন্ত যে পার্টির নাম ছিলো (বঙ্গীয় শ্রমিক ও কৃষক দল) সেই নাম নিয়ে অনেক বিভ্রান্ত হচ্ছিলো। তাই নতুন নাম ( Bengal Peasant And Worker Party) দিয়ে গ্লাসগো র ৪৬/৪৮ রেন ফ্রিউ স্ট্রিটের সোস্যালিষ্ট পার্টি অফ গ্রেট ব্রিটেন সেক্রেটারি কে চিংড়ি পাঠানো হয়। চিঠিটি নিম্ন রূপ The Bengal Peasant and Workers party which was organised in October last under the name of the labour and swaraj party been changed to the Bengal Peasant and Workers party at a conference of the peasant at Krishna Nagar in Nadia. এর আরও পরে এর নাম দেওয়া হয় The workers and peasant party of Bengal যে মুদ্রিত আস্তানার টি সংরক্ষিত আছে আই, বি, ৩২০/১৯২৬ (কে ডব্লিউ) নম্বর ফাইলে। সেখানে যে পনের জন্ কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন তার একনম্বরে নাম ছিল কাজী নজরুল ইসলামের।

এই পার্টির একনম্বরে নাম থাকলেও ধীরে ধীরে রাজনীতি র আঙিনা থেকে সরে আসতে শুরু করেন। ১৯২৯ সালের ফেব্রুয়ারি মার্চ মাসে কুষ্টিয়ায় যে সম্মেলন হয়েছিল সেটা নজরুলের জীবনের শেষ উল্লেখযোগ্য সম্মেলন ও সমাবেশ। খুব উৎসাহ নিয়ে কাজ করেছিলেন। এই সভায় মুজাফফর আহমেদ, আব্দুল হালিম ছাড়াও ছিলেন গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিষ্ট পার্টির সদস্য ফিলিপ স্প্যাট। সম্মেলন শেষে স্ত্রী ও পরিবার কে কলকাতায় পাঠিয়ে দেন। আনুষ্ঠানিক কাজে কুষ্টিয়ায় ফিরে যান।

এরপর মুজাফফর আহমেদ কে মিরাট ষড়যন্ত্র মামলায় দীর্ঘ দিন কারাগারে থাকতে হয়। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। মনে হয় কবিকে উৎসাহ ও সহযোগিতা করার কেউ ছিল না।মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা কমিউনিষ্ট আন্দোলনের ভিত্ কে নাড়িয়ে দিয়েছিল।

তিনি নিম্ন বর্গের মানুষ ও সমগ্র বিশ্বমানবতার মুক্তির কথা বলেছেন যা সমকালীন হয়ে ও চিরায়ত। তার অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টি ভঙ্গি, সাম্রাজ্যবাদ, ও উপনিবেশবাদের বিরোধীতা বজ্রবাণীর মতো ফুটে উঠেছে। স্বদেশের পূর্ণ স্বাধীনতা ও বিশ্ব মানবতার মুক্তির কথা বলেছেন যা সমকালীন হয়ে ও চিরায়ত। নির্ভীক, সাহসী, মানবতাবাদী কবি স্বত্তা নজরুলের স্বদেশ ভাবনার মূল প্রেরণা। বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় তিনি এমন সময় এসেছিলেন যে সময় সারা ভারত বর্ষের লোক মুক্তি পাওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। সারা ভারত তখন আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য প্রস্তুত। দেশবাসীর স্বদেশ প্রেম ও জাতীয়তাবোধকে জাগ্রত করতে লেখনী ধারণ করে ছিলেন। তার রচিত অগ্নি বীনা, বিষের বাঁশি, সাম্যবাদী, সর্বহারা, ফনিমনসা, জিঞ্জীর, সন্ধ্যা, প্রলয় শিখা ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থ তার স্বদেশ প্রেমের উজ্জ্বল উদাহরণ।

তিনি অধীনতার নাগপাশ ছিন্ন করতে লিখলেন
“আমি উপাড়ি ফেলিবে অধীন বিশ্ব অবহেলে মহাসৃষ্টির মহানন্দে”
কৈফিয়ত কবিতায় লিখলেন “বন্ধু গো আর বলিতে পারিনা/বড় বিষয় জ্বালা এই বুকে/রক্ত ঝরাতে পারি না তো একা/তাই লিখে এ রক্ত লেখা/বড় কথা বড় ভাব আসে না কো মাথায়।”
অর্ধচেতন ভারতকে স্বচেতন করার জন্য লিখলেন
“আয় চলে আয় ধূমকেতু/আঁধারে বাঁধ অগ্নি সেতু/দুর্দিনের ঐ দূর্গ শিরে/উড়িয়ে দেয়া তোর বিজয় কেতন/অল্পক্ষণের তিলক রেখা /রাতের ভালে হোকনা লেখা/ জাগিয়ে জেরে চমক মেরে/আছে যারা অর্ধচেতন “

নজরুলের তখন আর্থিক দুর্দশা চরমে উঠছিলো। কলকাতায় একটা ভালো বাড়িতে থাকতে পারেন নি। কমিউনিষ্ট মতাদর্শে লালিত কবি ক্রমশ অনটনের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকলেন। নজরুলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত সবসময়ের সঙ্গী মুজাফফর আহমেদ কথা স্মরণ করা যেতে পারে। মিরাট ষড়যন্ত্র মামলায় আদালতে মুজাফফর আহমেদ বলেন লেবার স্বরাজ পার্টির ও কমিউনিষ্ট আন্দোলনে নজরুল ইসলাম ছিলেন আমার সক্রিয় ও একনিষ্ঠ সহযোগি। তবে নজরুল কমিউনিষ্ট পার্টির সদস্য ছিলেন না।

মূলত কাজী সাহেব ছিলেন দেশপ্রেমিক ও স্বদেশ প্রেমের মূর্ত প্রতীক। স্বদেশ নিয়ে ভাবনা তাকে স্থির থাকতে দেয়নি।স্বয়নে স্বপনে ভেবেছেন নিপীড়িত জনগণের কথা। আমরা কাজী সাহেব কে তার সুস্থ জীবদ্দশায় অস্থির হয়ে দেশের মুক্তি কামনায় ছুটে বেড়িয়েছেন।

তথ্যসূত্র
বাঙলায় কমিউনিষ্ট আন্দোলনের প্রথম যুগ চন্দ্র অমিতাভ ১৯২৮
নজরুল ইসলাম কবি ও কবিতা আব্দুল মান্নান সৈয়দ
নজরুল চরিত মানস ডঃ সুশীল কুমার গুপ্ত ১৩৮৪বঙ্গাব্দ
কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতি কথা মুজাফফর আহমেদ ১৯৬৫