কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় কবি। তাঁর লেখায় জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য, আশা-আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন-কল্পনা প্রমূর্ত হয়ে উঠেছে। তাঁর সাহিত্য জাতিকে যেমন উদ্বুদ্ধ-অনুপ্রাণিত করেছে, তেমনি তা জাতির সর্বশ্রেণির মানুষের মধ্যে আবেগ-অনুভূতি ও প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে। তাই নজরুল যথার্থই আমাদের জাতীয় কবির মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছেন।
নজরুল জাতীয় জাগরণের এক অবিস্মরণীয় প্রাণ-পুরুষ। তাঁর প্রতিভার বহুমাত্রিকতা ও বর্ণিলতা সকলকে মুগ্ধ করে। তাঁর মত অসাধারণ প্রতিভাবান কবি শুধু বাংলা সাহিত্যে নয়, বিশ্ব সাহিত্যেও নিতান্ত বিরল। তিনি প্রধানত মুসলিম নবজাগরণের তূর্যবাদক হলেও জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের বিশেষত অবহেলিত-দরিদ্র-নিপীড়িত-বঞ্চিত মানুষকে তিনি জাগরণের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করেছেন। পরাধীন ও অধঃপতিত মুসলিম জাতিকে তিনি ইসলামের গৌরবময় আদর্শ-ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন-রঙিন পথে অগ্রসর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
নজরুল স্বাধীনতার কবি। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তিনি অগ্নিঝরা বিদ্রোহের বাণী উচ্চারণ করেছেন। তাঁর কবিতা ও গানে তা নানাভাবে সোচ্চারিত। এজন্য তিনি পরাধীন আমলে দু’বার জেল খেটেছেন। তাঁর লেখা বই ইংরেজ সরকার বাজেয়াপ্ত করেছে, তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা নিষিদ্ধ করেছে। তিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল ভারতবাসীকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে পারস্পারিক ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর কাব্য-কবিতা-সাহিত্যে সে আহ্বানের অনুরণন স্বাধীনতাকামী ভারতবাসীর মনে ‘কারার ঐ লোহ কপাট’ ভাঙ্গার দুর্বার আকাক্সক্ষা সৃষ্টি করেছে।
নজরুল মানবতার কবি। তিনি জগতের সকল ভাগ্যহত, অধিকার-বঞ্চিত, নিপীড়িত মানুষের কবি। মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টিকারী সকল নিয়ম-নীতি ও প্রথা-সংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি প্রবল বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। তাই তিনি শুধু বিশেষ অঞ্চল বা জনগোষ্ঠীর নয়, সমগ্র বিশ্বের আর্ত-মানবতার মুক্তির অকুতোভয় দিশারী। তাঁর মত অসাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন মুক্ত-আত্মা ও উদার মানবিকবোধসম্পন্ন কবি বাংলা সাহিত্যে নয়, বিশ্ব সাহিত্যেও নিতান্ত বিরল। বিশিষ্ট লেখক ও সাংবাদিক আবুল কালাম শামসুদ্দিন তাই তাঁকে যথার্থই ‘বিশ্ব বিপ্লবী’ বলে সম্বোধন করেছেন।
নজরুল যৌবনের কবি, প্রেমের কবি। তারুণ্যদীপ্ত যৌবনের বাঁধভাঙা জোয়ার তাঁর কাব্য-শরীরে সর্বত্র বিরাজিত। তাঁর প্রেমানুভূতির বিচিত্র রূপ সকলকে মুগ্ধ করে। এ প্রেম যেমন নারীর প্রতি, তেমনি সাধারণ মানুষের প্রতি। তাঁর প্রেম একাধারে স্বদেশ-স্বজাতি, মানুষ-প্রকৃতি ও মহান স্রষ্টার প্রতি সমভাবে নিবেদিত। তাঁর কাব্য-কবিতায় মানব-প্রেমের পাশাপাশি অধ্যাত্ম চেতনার প্রকাশ ঘটেছে। তাঁর প্রেমের অন্তহীন গভীরতা ও আবেগ-উত্তাপ পাঠককে বিমোহিত করে।
নজরুল-প্রতিভা বহুমাত্রিকতা ও বর্ণাঢ্যতায় সমুজ্জ্বল। একাধারে কবিতা, গান-গজল, গল্প-উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, চিঠিপত্র, অভিভাষণ ইত্যাদি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তাঁর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অবদান বাংলা সাহিত্যের ভান্ডারকে সুসমৃদ্ধ করেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর প্রতিভার ঔজ্জ্বল্য দেদীপ্যমান। তাঁর বহুমাত্রিকতা ও বর্ণাঢ্যতার মধ্যে এক সচল প্রাণময়তা ও স্বাতন্ত্র্য সমুজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। শত-সহস্র কণ্ঠস্বরের মধ্যে নজরুলের সাবলীল উচ্চকণ্ঠ সকলের সপ্রশংসা দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এজন্য তিনি এক স্বতন্ত্র ধারার অসামান্য প্রতিভা হিসাবে পরিকীর্তিত।
নজরুল বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। তিনি রবীন্দ্রযুগে এক স্বতন্ত্র ধারার প্রবর্তক। তিনি এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন কাব্য-ভাষার নির্মাতা। এক্ষেত্রে তাঁর স্বাতন্ত্র্য তাঁকে স্বমহিমায় উজ্জ্বল করে রেখেছে। নজরুলের এ স্বাতন্ত্র্যের মূলে প্রেরণা যুগিয়েছে ইসলামি ভাবাদর্শ ও মুসলিম ঐতিহ্য। নজরুল সে ঐতিহ্যের অনুসরণে এক আধুনিক স্বতন্ত্র কাব্য-ভাষা নির্মাণ করে বাংলা ভাষায় ওজস্বিতা সৃষ্টি করেছেন। নজরুল-পরবর্তী প্রায় সব মুসলিম কবিই এক্ষেত্রে তাঁকে কম-বেশি অনুসরণ করেছেন। এ কারণে তিনি যুগ-প্রবর্তক ও পথিকৃৎ কবি। বাংলা সাহিত্যে রবি-করোজ্জ্বলে উদ্ভাসিত সাহিত্য ধারা থেকে এক স্বতন্ত্র প্রাণবন্ত ধারার উজ্জ্বল কবি প্রতিভা। তাঁর প্রতিভার সূর্যদীপ্ত মৌলিকত্ব এখানেই।
আমাদের ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি এমনকি, জাতিসত্ত্বা বির্নিমাণে নজরুলের ভূমিকা অনন্য সাধারণ। ব্রিটিশ-বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে, মুসলিম নবজাগরণে, নিরন্ন-বুভুক্ষ-বঞ্চিত মানুষের মুক্তির সংগ্রামে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে নজরুলের গান-কবিতা আমাদেরকে সর্বদা অনুপ্রাণিত-উদ্বুদ্ধ করেছে। তাই মাত্র ৩০ বছর বয়সেই ১৯২৯ সালে পরাধীনতার যুগে কলকাতায় এলবার্ট হলে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের এক যৌথ অনুষ্ঠানে তাঁকে ভবিষ্যৎ স্বাধীন ভারতের জাতীয় কবি এবং তাঁর রচিত গানকে জাতীয় সঙ্গীত করার ঘোষণা দেয়া হয়। কিন্তু ভারত স্বাধীন হলেও স্বাধীন ভারতে নজরুলকে বোধগম্য কারণেই জাতীয় কবির মর্যাদা দেয়া হয় নি।
তবে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাঁকে বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদা দেয়া হয়। তাঁর গানকে জাতীয় সঙ্গীত করা না হলেও ‘রণ-সঙ্গীত’ করা হয়েছে। তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব সনদ প্রদান করা হয়েছে। এর দ্বারা অধঃপতিত বাঙালি মুসলিম সমাজের প্রতি তাঁর বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি অথবা তাঁর প্রতি বাঙালি মুসলিমের কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। তাঁর মনের ঐকান্তিক আকুতি পূরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে মসজিদের পাশে তাঁকে কবরস্থ করা হয়েছে।
নজরুল প্রতিভার বৈশিষ্ট্য, স্বাতন্ত্র্য ও শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে তিনটি বিষয় চিহ্নিত করা যায়। প্রথমত, তিনি বাংলা ভাষার এক স্বতন্ত্র রূপ ও বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন। সেন-ব্রাহ্মণ্য আমলে বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ঐ আমলে বিভিন্নভাবে এ ভাষাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার ফলে বাংলা ভাষার চর্চা ও উৎকর্ষ সাধনে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। বাংলা ভাষা নিতান্ত দীনহীন অবস্থায় উপনীত হয়। মুসলিম শাসনামলে বাংলা ভাষার চর্চার উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয় এবং হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকল বাঙালি সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে রাজ-পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। ফলে মুসলিম শাসনামলের সাড়ে পাঁচশ বছরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ব্যাপক চর্চা ও উৎকর্ষ সাধিত হয়। এ সময় আরবি-ফারসি-উর্দু-তুর্কি প্রভৃতি ভাষার অসংখ্য শব্দরাজি আত্মীকৃত করে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।
পরবর্তীতে ইংরেজ আমলে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হয়। ইংরেজ পাদ্রী ও ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের যৌথ ষড়যন্ত্রে বাংলা ভাষায় আত্মীকৃত আরবি-ফারসি-উর্দু-তুর্কি শব্দরাজি বাদ দিয়ে দুর্বোধ্য সংস্কৃতবহুল শব্দরাজির দ্বারা নতুন বাংলা ভাষা চালু করে তার নাম দেয়া হয় ‘সাধু বাংলা’। এ ভাষায় পাঠ্যপুস্তক রচনা করে তা পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করে এ সাধু বাংলা চালু করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এ কৃত্রিম ভাষা জনগণ গ্রহণ করেনি। পরবর্তীতে রাজা রামমোহন রায়, পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে বাংলা ভাষা ক্রমান্বয়ে সহজবোধ্য হয়ে ওঠে। বিশেষত রবীন্দ্রনাথ কলকাতা-কেন্দ্রিক বাংলা ভাষার আদলে এক সহজ, সাবলীল, প্রসাদগুণ সম্পন্ন আধুনিক বাংলা ভাষা সৃষ্টি করেন। এটা রাবীন্দ্রিক ভাষা হিসাবে বিশেষভাবে পরিচিত। এ ভাষায় তাঁর বিশাল সাহিত্য রচিত হওয়ায় এটা সর্বজনীনভাবে গৃহীত হয়। রবীন্দ্র-সমকালে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে প্রায় সকল কবি-সাহিত্যিকই রবীন্দ্রনাথের এ ভাষা কম-বেশি অনুসরণ করেন। ভাষার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের এটা এক অসাধারণ সাফল্য। এ ভাষা যেমন অনেকেই অনুসরণ করেছেন, তেমনি এ ভাষার উৎকর্ষ সাধনেও কমবেশি অনেকেই অবদান রেখেছেন।
রবীন্দ্রনাথের প্রতি নজরুলের অপরিসীম শ্রদ্ধাবোধ সত্ত্বেও সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে নজরুল রবীন্দ্রনাথের ভাষাভঙ্গি অনুসরণ না করে এক নতুন স্বতন্ত্র ভাষাভঙ্গিতে সাহিত্য সৃষ্টি করলেন। এটা তাঁর অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় বহন করে। এটা নজরুলের নিজস্ব ভাষাভঙ্গি নয়, মুসলিম শাসনামলে প্রচলিত এবং বাঙালি মুসলিম সমাজে ব্যাপকভাবে অনুসৃত ভাষার আধুনিক রূপ এটি। তবে এটা নাজরুলিক ভাষাভঙ্গি হিসাবে অধিক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এভাবে বাংলা ভাষার দূ’টি রূপ ও ধারা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি রবীন্দ্রানুগ ভাষা, আরেকটি নাজরুলিক ভাষা। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় তৎসম, তদ্ভব শব্দের আধিক্য এবং হিন্দু ঐতিহ্যের অনুসৃতি যেমন লক্ষ্যযোগ্য, নজরুলের ভাষায় তেমনি বিদেশি তথা আরবি-ফারসি-উর্দু-তুর্কি শব্দের প্রাধান্য ও মুসলিম ঐতিহ্যের অনুসৃতি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। নজরুলের ভাষাকে নজরুল নিজেই ‘বাংলা ভাষার মুসলমানী ঢং’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এ উক্তি যেমন গভীর তাৎপর্যপূর্ণ, তেমনি এর মধ্যে ইতিহাস-ঐতিহ্যের এক বিশাল গৌরবময় স্মৃতি বিজড়িত।
দ্বিতীয়ত, নজরুলের সাহিত্যে সর্বধর্ম ও সর্বমানবিকতার প্রকাশ ঘটেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও স্বধর্ম, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও মুসলিম নবজাগরণের চিন্তা-চেতনা তাঁর সাহিত্যে বলিষ্ঠ রূপ লাভ করেছে। অধঃপতিত মুসলিম জাতি স্বধর্ম ও অতীত গৌরবময় ইতিহাস-ঐতিহ্যের আলোকে নবজাগরণের উদ্দীপনা লাভ করেছে। তাই নজরুল মুসলিম নবজাগরণের কবি। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁর সাহিত্যে অসাম্প্রদায়িক উদার মানবিকতার নিরবিচ্ছিন্ন প্রকাশ ঘটেছে। এক্ষেত্রে সম্ভবত নজরুলের মত অসাম্প্রদায়িক চেতনাসম্পন্ন বলিষ্ঠ কবিকণ্ঠ বাংলা সাহিত্যে দ্বিতীয়টি আর নেই।
সকল বড় কবি-শিল্পীরই একটি লালিত স্বপ্ন থাকে। নিজস্ব চিন্তা-বিশ্বাস ও মতবাদের ভিত্তিতে কবি-শিল্পীরা সে স্বপ্ন লালন করেন এবং তাঁদের সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে জনমন্ডলীর মধ্যে তা ছড়িয়ে দেন। মহাকবি ইকবালের লালিত স্বপ্নের বাস্তবায়ন হয় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। বাংলা সাহিত্যের বড় কবি রবীন্দ্রনাথেরও লালিত স্বপ্ন ছিল- বেদ-বেদান্তের চিন্তাধারায় মহাভারতের মহাসিন্ধুর পাড়ে এক অখন্ড হিন্দু সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার। নজরুলেরও তেমনি লালিত স্বপ্ন ছিল উপমহাদেশের অধঃপতিত মুসলিম জাতিকে ইসলামের গৌরবময় আদর্শ-ঐতিহ্যের আলোকে উদ্বোধিত করা। নজরুল তাঁর সে স্বপ্ন-কল্পনার আবেশ ছড়িয়ে দিয়েছিলেন বঞ্চিত-সর্বহারা-ভাগ্যহত-নিপীড়িত মুসলিম সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। ফলে উপমহাদেশের মুসলিম জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে নিজেদের জন্য এক স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হয়। ১৯৪৭ সালে সে স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছিল বলেই ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। তাই বলতে গেলে, নজরুল বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল সোপান রচনা করে গেছেন। এ কারণেই তিনি আমাদের জাতীয় কবি। জাতির আশা- আকাক্সক্ষা, কল্পনা-বাসনা, লালিত স্বপ্ন নজরুলের লেখায় প্রমূর্ত হয়ে উঠেছে।
তৃতীয়ত, নজরুলের স্বাতন্ত্র্য ও ঔজ্জ্বল্য প্রধানত কবি হিসাবে। কবি হিসাবে তাঁর বৈচিত্র্যময় স্বাতন্ত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন অবদান বাংলা সাহিত্যের এক গৌরবময় উজ্জ্বল অধ্যায়। বাংলা কাব্যের বিভিন্ন রূপরীতিতে নজরুল তাঁর বিশাল সাহিত্য রচনা করেছেন। এক্ষেত্রে তাঁর সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য অবদান এবং শ্রেষ্ঠত্ব নিঃসন্দেহে গানের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশ গানের দেশ, নানা রঙ ও সুরের বৈচিত্র্য বাংলার প্রকৃতিতে সর্বত্র পরিদৃশ্যমান। আবহমান কাল থেকে বাঙালি গান গেয়েছে, গান রচনা করেছে- চর্যাপদ থেকে শুরু করে আধুনিক কাল পর্যন্ত যুগ যুগ ধরে বাংলার কবি ও শিল্পীরা অসংখ্য গান রচনা করেছেন ও গেয়েছেন। বাংলা গানের ভুবনে অনেক প্রতিভাবান কবি-শিল্পী আপন বৈশিষ্ট্য ও স্বতন্ত্র মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে আছেন। বাংলা গানের এ সমৃদ্ধ ভুবনে নজরুল সর্বশ্রেষ্ঠ ও চির উন্নত শির। ভাবের ঐশ্বর্য্য, বিষয়-বৈভবে, রাগ-রাগিণী-সুরের বৈচিত্র্যে ও ঝংকারে এবং রচনার অজস্রতায় নজরুলের গানের সাথে তুলনীয় প্রতিভা কেবল বাংলা সাহিত্যে নয়, বিশ্ব-সাহিত্যেও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তাই বাংলা সাহিত্যে প্রথিতযশা প্রতিভাবান কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে নজরুলের শ্রেষ্ঠত্ব এখানেই।
নজরুলের সব গান সংগৃহীত ও সংরক্ষিত না হলেও তাঁর গানের সংখ্যা কারো মতে সাড়ে তিন হাজার, কারো মতে চার হাজার আবার কারো মতে পাঁচ হাজার। তাঁর গানের ভাব-ভাষা-আবেদন বৈচিত্রপূর্ণ। তাঁর গানে দেশি-বিদেশি অসংখ্য সুর ও রাগ-রাগিণীর ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। তিনি একদিকে যেমন ইসলামি গান লিখেছেন, অন্যদিকে তেমনি শ্যামাসঙ্গীত রচনা করেছেন। এছাড়া, নারীপ্রেম, মানবপ্রেম, অধ্যাত্মপ্রেম, দেশাত্ববোধক, নৈস্বর্গিক, হাস্য-রসাত্বক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তিনি গান রচনা করেছেন। তাঁর রচিত ইসলাম-বিষয়ক গানের সংখ্যা প্রায় ২৬৫টি। এর মধ্যে কাওয়ালী ৫৯টি, উদ্দীপনাময় ৩৪টি, নাত ৭৫টি, হামদ-নাত একত্রে ৪টি, বাকিগুলি ধর্মীয় অনুষঙ্গমূলক। এ কারণে চট্টগ্রামের বন্দর কেল্লা মসজিদে নজরুলকে ‘আলেকুশ শুয়ারা’ উপাধি দেয়া হয়।
নজরুলের গানে অসংখ্য সুর ও রাগ-রাগিণীর সমাবেশ ঘটেছে। নজরুল-গবেষক শেখ দরবার আলমের তথ্য থেকে জানা যায়, তাঁর গানে অন্তত ৭০টি সুর ও রাগ-রাগিণীর সন্ধান মেলে। এগুলো নিম্নরূপঃ ১. ধ্রুপদী, ২. খেয়াল, ৩. টপ্পা ও খেয়াল মিশ্রিত, ৪. ঠুমরী, ৫. বঙ্গ ঠুমরী, ৬. টপ্পা (সাধারণ), ৭. রাগ ভিত্তিক, ৮. মিশ্র রাগ, ৯. কর্ণাটী রাগ, ১০. লুপ্ত বা লুপ্ত প্রায় রাগ, ১১. অপ্রচলিত রাগ, ১২. নিজের সৃষ্ট রাগ, ১৩. আরবি বা বিদেশি সুর, ১৪. লোকসঙ্গীতে রাগ, ১৫. লোকসঙ্গীতে ঠুমরী, ১৬. কীর্তন, ১৭. নিজের সৃষ্ট তাল, ১৮. তথ্যভিত্তিক গান, ১৯. কাওয়ালি, ২০. ইসলাম গান (নাত), ২১. ইসলামি গান (হামদ), ২২. ইসলাম গান (জাগরণী), ২৩. শ্যামা গান, ২৪. ভজন, ২৫. প্রেম সংগীত (গজল), ২৬. প্রেম মানবিয়, ২৭. প্রকৃতি বিষয়ক, ২৮. ভাটিয়ালী, ২৯. ভাওয়াইয়া, ৩০. বাউল, ৩১. সারিগান, ৩২. জারিগান, ৩৩. মুর্শেদী, ৩৪. সাম্পানের গান, ৩৫. সাঁওতালী বা ঝুমুর, ৩৬. বারানসী (লোক), ৩৭. কাজরী, ৩৮. লাউনী, ৩৯. হোরী, ৪০. ভোজপুরী, ৪১. শিশু, ৪২. কোরাস, ৪৩. গণসংগীত, ৪৪. নৃত্য সংগীত, ৪৫. সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির গান, ৪৬. নারী জাগরণী, ৪৭. ছাত্রদের গান, ৪৮. শ্রমিকের গান, ৪৯. কৃষকের গান, ৫০. ধীবর বা জেলেদের গান, ৫১. দেশাত্ববোধক গান, ৫২. লেটোর গান, ৫৩. মঞ্চ নাটকের গান, ৫৪. বেতার নাটকের গান, ৫৫. গীতি নাট্যের গান, ৫৬. গীতি আলেখ্যের গান, ৫৭. বেতার অনুষ্ঠানের গান. ৫৮. নাটকের গান, ৫৯. চলচ্চিত্রের গান, ৬০. সময় ভিত্তিক গান, ৬১. হিন্দী গান, ৬২. উর্দু গান, ৬৩. হাসির গান, ৬৪. বিরহের গান, ৬৫. মার্চ সংগীত, ৬৬. অনুষ্ঠানের গান, ৬৭. দ্বৈত বা ডুয়েট গান, ৬৮. রণ সংগীত, ৬৯. চলচ্চিত্র (সাধারণ), ৭০. প্রচলিত গান, ৭১. প্রভৃতি। (সূত্র ঃ শেখ দরবার আলম, দৈনিক ইনকিলাব, ২০ মে ২০০২)
ভাব-বিষয়, সুর, রাগ-রাগিণীর বৈচিত্র্যে এবং সংখ্যার বিচারে নজরুল বাংলা গানের জগতে সর্বশ্রেষ্ঠ। একথা অনেক আগেই প্রমাণিত হয়েছে। ত্রিশের দশকে গ্রামোফোন কোম্পানির বদৌলতে নজরুলের গান আপামর জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে পৌঁছে গিয়েছিল এবং তিনি আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তাঁর গানের এ বিশাল ভান্ডারকে যথাযথরূপে আজও চর্চা ও মূল্যায়ন করা হয়নি। অন্ধের হাতি দেখার মত নজরুলের খন্ডিত রূপ নিয়ে ব্যস্ত। অখন্ড নজরুলকে যথাযথরূপে তুলে ধরা আজ সময়ের অপরিহার্য দাবি।
নজরুল বাংলাদেশের জাতীয় কবি। নজরুল স্বতন্ত্র মহিমায় উজ্জ্বল এক অসাধারণ প্রতিভাদীপ্ত কবি। নজরুলের ভাষিক স্বাতন্ত্র্য বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আপন সত্ত্বার সাথে অবিভাজ্য। তাঁর সাহিত্যের ভাব-বিষয়-আদর্শ ও ঐতিহ্য চেতনা বাংলাদেশের জাতীয়তার মূলভিত্তি। নজরুল বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ এবং পৃথিবীর অন্যতম প্রধান গীতিকার। নজরুলের এ স্বাতন্ত্র্য, বৈশিষ্ট্য ও শ্রেষ্ঠত্ব আমাদের জাতীয় অহংকার। এ অহংকার আমাদের জাতীয় মর্যাদাবোধের প্রতীক। তাই এ মর্যাদা সমুন্নত রাখতে জাতীয় কবি নজরুলের যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া অপরিহার্য।