বাংলা সাহিত্যের মহানায়ক কাজী নজরুল ইসলামের প্রতি আমার চূড়ান্ত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানিয়ে কিছু দৃষিকটু সত্য আলোচনার সূত্রপাত করলাম। কেন নজরুল আমাদের জাতীয় কবি? এ নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। কখন একজন কবি জাতীয় কবি হতে পারেন ?

যখন একজন কবি একটা জাতির প্রতিভূ হয়ে উঠেন তখনি তিনি ঐ জাতির জাতীয় কবি হতে পারেন। যখন কোনো কবির কাব্যে সে দেশ ও সমাজের মানুষের আবেগ অনুভূতির সামগ্রিক রূপ ফুটে উঠে, যখন কোনো কবি সে জাতির হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনাকে তার কাব্যে রূপায়িত করেন, যখন কোনো কবি তার কবিতার বিষয়বস্তু হিসেবে নিজের জাতিকে উপস্থাপন করেন, যখন কোনো কবি তার কবিতার মাধ্যমে নিজ জাতিকে জাগিয়ে তুলতে চান, যখন কোনো কবি তাঁর জাতিকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে পরিণত করার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেন, যখন কোনো কবি সমাজের সকল মতের-পথের-শ্রেণির-ধর্মের-বর্ণের মানুষকে এক কাতারে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন, যখন কোনো কবি ব্যক্তিগত মনীষায় জাতীয় মানস তৈরি করেন, যখন কোনো কবি তার সংস্কৃতিকে বিশ্ব সংস্কৃতিতে শ্রেষ্ঠ হিসেবে প্রমাণ করতে চান তখন তিনিই ঐ জাতির জাতীয় কবি হতে পারেন। এই সবগুলো শর্ত পূরণ করেই নজরুল আমাদের জাতীয় কবি। তিনি আমাদের হাসিয়েছেন-কাঁদিয়েছেন-ভাবিয়েছেন-বিপ্লবের মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছেন-মানবতার জয়গানে মুখরিত করেছেন-প্রেমের গভীর ভাব উচ্চকিত করেছেন। তার কবিতা পড়ে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা প্রাণের উচ্ছ্বাসে প্রোজ্জ্বল হয়ে উঠে। বাংলার মাটির গহীনে প্রোথিত তাঁর কাব্য শিকড়। বাঙালির যেখানে সমস্যা দেখেছেন সেখানেই তার কলম সজাগ হয়েছে। নজরুল শুধু আমাদের জাতীয় কবি নন তিনি আমাদের জাতীয় বীরও বটে। জাতির এই দুর্দিনে নজরুলকে বড়ই প্রয়োজন।

নজরুল ব্যক্তিগত মননে জাতীয় চেতনা ফুটিয়ে তুলেছেন তার কাব্যে । নিজেকে আবিষ্কার করেছেন সবার মাঝে। সকল কালের সকল কবির সকল গীতির ছন্দ সুর পেয়েছে নজরুল মননে । জীবনকে নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন তিনি এবং বুঝতে পেরেছিলেন নিজ হৃদযের চেয়ে বড় কোনো মন্দির কাবা নাই । তাই হৃদয়ের ধ্যান গুহা মাঝে বসে তিনি নিজেকে চিনেছেন ভাঙা গড়ার কারিগর হিসেবে । নজরুল পাঁকে পাঁকে ঘুরে বাঁকে বাঁকে ঠেকে নিজেকে আবিষ্কার করেছেন বিদ্রোহী ভৃগু হিসেবে। বীণা, বাঁশি, প্রেম, বিদ্রোহ, গান; নজরুল সাহিত্যের প্রাণ। এই প্রাণকে ধারণ করে তিনি যুগ মানসে যুগান্তর এনেছিলেন। নব সৃষ্টির উন্মাদনায় মুখর ছিল তার ব্যক্তি সত্তা। সত্য ও সুন্দরের সাধনায় তার অন্তরালোক উদ্ভাসিত হয়েছিল স্বর্গিয় আলোক ধারায়।

নজরুল একটা ভঙ্গুর জাতিকে প্রবল শক্তিতে রূপান্তরিত করেছিলেন। দারিদ্রকেও তিনি আপন করে নিয়েছিলেন । তাই দারিদ্র তাঁকে মহান করে তুলেছিলেন। তিনি বাঙালির ছেঁড়া পালে জোড়া-তালি দিয়ে প্রবল স্রোতস্বিনী সমুদ্র পাড়ি দিয়েছেন। নয়া জামানার দাওয়াত দিতে গিয়ে তিনি ভাঙা কেল্লায়ও নিশান উড়িয়ে দিয়েছেন। শ্রদ্ধা জানিয়েছেন মানুষকে। তিনি ধ্যান করেছেন মানুষের। সেখানে ধর্ম কিংবা মতবাদ বড় হয়ে উঠেনি। বড় হয়ে উঠেছে মানুষ ও মানবতা। তাই মানবতার বৃন্তে তিনি স্বপ্নের কুসুম ফুটিয়েছেন। বাংলার প্রকৃতি তাঁর দেহ-মন দখল করে নিয়েছিলো। তাই তিনি বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষকে নমস্কার নিবেদন করেছেন। আজকের এই দিনে হৃদয়ের সবটুকু আবেগ ঢেলে দিয়ে স্মরণ করছি বাংলার অগ্নি পুরুষ কাজী নজরুল ইসলামকে।

আমাদের সকল ত্যাগে, সংগ্রামে, দ্রোহে, ক্রোধে, বিজয়ে, আনন্দে, হতাশায় কিংবা বেদনায় সকল ক্ষেত্রেই আমরা নজরুলকে পাই একান্ত আপন করে। বাঙালি জাতির মনস্তত্ব নজরুল খুব ভালো করেই বুঝেছিলেন। তাই বাঙালিকে জাগানোর মূলমন্ত্রও তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন। বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষার স্বাপ্নিক বন্দরে নজরুল তাঁর প্রেমের বীণা বাজিয়েছেন। সকল দল-মত-পথের মানুষকে ধরে এনে এক মিলনের বাঁশি শুনিয়েছেন। সবাইকে এক কাতারে এনে মানবতার জয় ঘোষণা করেছিলেন। এই জন্যই নজরুল আমাদের জাতীয় কবি ।

স্যালুট আপনাকে প্রিয় কবি। আপনিই পেরেছিলেন এই জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে। এখনো আপনার কবিতা পারে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে। যখন আপনার কবিতা কেউ পড়ে তখন বিএনপি-আওয়ামিলীগ-প্রগতিশীল থাকে না, সবাই মানুষ হয়ে ওঠে। নাস্তিকরা যেমন আপনাকে তাদের বলে প্রচার করে, তেমনি হিন্দুরা মনে করে আপনি তাঁদের, মুসলামানরা মনে করে আপনি মুসলিম রেনেসাঁর কবি। সবাই সব অবস্থান থেকে আপনাকে নিজের মধ্যে খুঁজে পায়।
মানুষ যেসব বিষয়ে বিশ্বাস করতো কিন্তু ভাষায় প্রকাশ করতে পারতো না আপনি সেসব মানুষের মুখে ভাষা দিয়েছেন। তাদের মূক মুখকে মুখর করে দিয়েছেন। সুতরাং আপনি ছাড়া আর কেউ এ দেশের জাতীয় কবি হতে পারে না। এজন্য আপনি আমাদের জাতীয় কবি। শুভ জন্মবার্ষিক প্রিয় কবি।

বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি নজরুলকে। যিনি ঘুনেধরা সমাজকে বদলে দিয়ে যুগোপযোগী ও আধুনিক মননশীল সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। আমরা জানি নজরুল বাংলাদেশের জাতীয় কবি । এই তথ্যটি ভুল। বাংলাদেশের কোনো জাতীয় কবি নেই। বাংলাদেশের জনগণ নজরুলকে জাতীয় কবি হিসেবে মানলেও বাংলাদেশের কোনো সরকারই নজরুলকে জাতীয় কবি হিসেবে মানেননি। এমনকি তাঁরা নজরুলকে জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সাহস পর্যন্ত অর্জন করতে পারেননি। অথচ সকল দলই নজরুলকে নিয়ে রাজনীতির মাঠ গরম করেছেন। অসংখ্য মানুষ নজরুলকে নিয়ে ব্যবসা করেছে এখনও করছে।

কিছু ব্যক্তি আবার নিজের প্রচার বাড়ানোর জন্য নজরুলকে নিয়ে বড় বড় উক্তি করছে । যখন প্রচার পেয়ে যাচ্ছে তখন নজরুলকে হেয় করে কথা বলতেও তাদের কলম ও মুখ কোনোটাই আটকাচ্ছে না। এমন অসংখ্য মানুষকে আমি চিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী পর্যন্ত এই তালিকায় অাছে। আবার এমন কিছু সংগঠনের জন্ম হয়েছে যারা নজরুলকে একান্ত তাদের বলে দাবি করতে বিন্দুমাত্রও দ্বিধা করছে না। কিছু ব্যক্তিও আছে যারা মনে করে তারা নজরুলকে কিনে নিয়েছে। অথচ এসব কূপমণ্ডুক এবং কুলাঙ্গারদের বিরুদ্ধে নজরুলের মুখ ও কলম দু’টোই সোচ্চার ছিলো। নজরুল সকল কালের , সকল মানুষের। দেশ-কাল-ধর্মসীমাকে অতিক্রম করে তিনি মানবতার জয়গানে মুখরিত হয়েছিলেন।

বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর কবিতা ও গান মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। জাতীয় জাগরণের কবি হিসেবে তাঁর অবদান অনন্য। নজরুল এদেশের অধিকার হারানো মানুষদের জাতীয় কবি। লাঞ্চিত-বঞ্চিত-নিগৃহীত-নিষ্পেষিত মানুষের অন্তর্বেদনা তিনি তাঁর কাব্যে রূপায়ণ করেছেন। দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্নে তিনি সব সময় বিভোর থাকতেন। তাঁর কবিতা-গান-গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ-ভাষণ সব কিছু্ই ছিলো জাতিকে জাগানোর জয়গানে মুখরিত। নজরুল আমাদের জাতীয় জাগরণের প্রধান পুরোহিত। নজরুলকে ছাড়া বাঙ্গালি জাতি তার অস্ত্বিত্ব প্রমাণ করতে পারে না।

বাংলাদেশ সরকারের কাছে বিনীত আহবান এবং আবেদন জানাই নজরুলকে সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশের জাতীয় কবি করার জন্য।
জয়তু নজরুল ।
সবাইকে নজরুলীয় শুভেচ্ছা।