নজরুল কেন জাতীয় কবি? এরকম একটি প্রশ্ন অনেকের মনেই রয়েছে। কেউ কেউ প্রশ্নটি লিখিত এবং অলিখিতভাবে, উচ্চারণও করেন। নজরুল কেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি? এমন প্রশ্নের অস্তিত্বও রয়েছে অনেকের মনে, কেউ-কেউ লিখিত এবং অলিখিতভাবে প্রশ্নটি উচ্চারণ ও উপস্থাপন করেছেন। এসব প্রশ্ন নিয়ে অনেকে বিতর্কেও জড়িয়েছেন।
নজরুল কেন জাতীয় কবি? কিংবা, নজরুল কেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে ‘জাতীয় কবি’ কে হতে পারেন, জাতীয় কবি কাকে বলা যায়, জাতীয় কবি ও তাঁর কাব্যে চরিত্র্যধর্ম কি, সে সম্পর্কেই আলোচনা করতে হয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশের জাতীয় কবি কে হতে পারেন, কার সেই অধিকার ও দাবি রয়েছে, কার কাব্যের চারিত্র্যধর্ম সে-দাবি ও অধিকারের অনুকূলে, সে-সম্পর্কেও আলোকপাত অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়।
প্রথমেই বলে নেয়া ভালো যে, জাতীয় কবি তিনিই হতে পারেন, যাঁর কাব্যে জাতির আশা-আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন-কল্পনা, সংগ্রাম-সাধনা, ইতিহাস, ঐতিহ্য, এবং সামগ্রিক আত্মপরিচয় বিধৃত। জাতীয় কবি তিনিই হতে পারেনÑ যার কাব্য শুধু জাতীয় সাহিত্যের ভা-ারই সমৃদ্ধ এবং ঐশ্বর্যম-িত করে না, জাতীয় ভাষাই সমৃদ্ধ করে না, দেশের মাটি, মানুষ, প্রকৃতি এবং দেশবাসীর আশা-আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন-কল্পনা, সংগ্রাম-সাধনার রূপায়ণ ঘটায় ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক আত্মরিচয় ও স্বাতন্ত্র্য নির্বিশেষে সবার পরিচয় বিধৃত করে। জাতীয় কবি তিনিই হতে পারেন- যার কাব্যসমগ্র জাতির প্রতিনিধিত্বশীল। জাতীয় কবির কাব্যের প্রকৃতি ও চারিত্র্যধর্ম সম্পর্কে হয়তো আরও অনেক সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দেয়া যেতে পারে। তবে সংক্ষেপে এ কথা বলতেই হবে যে, যে-কবির রচনায় ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে দেশ ও জাতির অন্তর্গত সর্বশ্রেণির মানুষের আত্মপরিচয় ও আশা-আকাক্সক্ষার, সংগ্রাম-সাধনার প্রতিফলন এবং বলিষ্ঠ রূপায়ণ নেই, তিনি জাতীয় সাহিত্যে শ্রেষ্ঠ রূপকার হয়তো হতে পারেন, কিন্তু জাতীয় কবি হতে পারেন না।
এই প্রেক্ষিতে ‘জাতি’ এবং ‘জাতীয়-সাহিত্য’ ইত্যাদি সম্পর্কেও আলোকপাত করতে হয়, জাতি এবং জাতীয় সাহিত্য কাকে বলা যায়, জাতি ও জাতীয় সাহিত্যের সংজ্ঞা ও চারিত্র্যধর্ম কি, সে বিষয়েও আলোকপাত অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়। ‘জাতি’ কাকে বলে, কি উপাদানে জাতি গঠিত হয়, জাতির সংজ্ঞা কি- এ নিয়ে নানা মতভেদ আছে, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণেরও অন্ত নেই। তবুও সংক্ষেপে বলা যায়, ভৌগলিক এলাকা, দেশ রাষ্ট্র, ধর্ম, ভাষা সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ইত্যাদিই জাতি গঠনের উপাদান হিসেবে কাজ করে, এসবের এক বা একাধিক উপাদানকে কেন্দ্র ও অবলম্বন করেও জাতি গঠিত হতে পারে। মোটামুটিভাবে একথা বলা চলে যে সমাজবদ্ধ মানুষের এক বা একাধিক জাতিরূপে গড়ে ওঠার কিংবা কোনো বিশিষ্ট জাতিগঠনের মূলে অনেক উপাদানই কাজ করে, বহুকালের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারা, বংশ, ধর্ম, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত ঐক্য এবং একই ঐতিহাসিক বিকাশ জাতিগঠনে বিশেষরূপে সহায়তা করে। তবুও অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, জাতি গঠনের আসল উপাদান হচ্ছে একটি সেন্টিমেন্ট এবং একটি অনুপ্রেরণা। আর এই সেন্টিমেন্ট হচ্ছে সাম্যবোধের এবং অনুপ্রেরণা হচ্ছে একই জনসমষ্টির অধিকারী হওয়ার প্রবণতার। বস্তুত: মানুষের জাতীয়তাবোধের পেছনে একসঙ্গে বাস করার অনুভূতি, আবেগ ও ইচ্ছা কার্যকর, যাকে বলা যেতে পারে পারিবারিক অনুভূতিরই পরিশোধিত ব্যাপ্তি। বার্ট্রান্ড রাসেলের মতে, এই ধরনের অনুভূতি থাকলে একটি জাতিকে একটি রাষ্ট্রে সংগঠিত করা সহজ। বস্তুত: জাতীয়তাবোধ গড়ে তোলার এবং জাতি গঠনের বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে কোনটি কখন প্রাধান্য পাবে, এবং একসঙ্গে বাস করার অনুভূতি, আবেগ ও ইচ্ছা জাগিয়ে তুলবে, তা নিশ্চয় করে বলা কঠিন। প্রকৃতপক্ষে সম্পূর্ণ ব্যাপারটাই নির্ভর করে ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থার উপর।
জাতি গঠনের উপাদান, অবলম্বন ও কার্যকারণ সম্পর্কে এখানে যে বিস্তারিত আলোকপাত করা হলো, তার আলোকে এবং প্রেক্ষিতে দেখলে, ভারতীয় জাতি, বাঙালী জাতি, হিন্দু জাতি, মুসলিম জাতি ইত্যাকার জাতি এবং ভারতীয় জাতীয়তা, বাঙালী, জাতীয়তা, হিন্দু জাতীয়তা, মুসলিম জাতীয়তা ইত্যাকার জাতীয়তার উদ্ভব, বিকাশ, বিবর্তন এবং কার্যকারণের সূত্রসন্ধান মিলবে। এবং কাজী নজরুল ইসলামের কাব্য কেন বিভিন্ন সময়ে জাতীয় আত্মপরিচয়, জাতির আশা-আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন-কল্পনা, সংগ্রাম-সাধনার ধারক-বাহক হতে পেরেছে। তিনি কেন বৃটিশ যুগেই জাতীয় কবির অভিধায় চিহ্নিত হয়েছেন, কেন তিনি জাতীয় কবির দাবিদার হতে পারেন, তার যথার্থতাও উপলব্ধি করা যাবে। প্রথমে বৃটিশ যুগের অবিভক্ত ভারত উপমহাদেশের পটভূমি এবং প্রেক্ষাপটের কথাই ধরা যাক। অবিভক্ত ভারত উপমহাদেশের পটভূমিতে ভৌগোলিক ও রাষ্ট্রীয় বিচারে ভারতের অধিবাসী মাত্রই ভারতীয় এবং ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি ইত্যাদির বিস্তর পার্থক্য সত্ত্বেও, সবাই ভারতীয় জাতীয়তার অন্তর্গত- এই ছিল তখনকার সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মীয় জনসম্প্রদায় ও বুদ্ধিজীবীদের দাবি। যদিও ধর্ম, ভাষা, সমাজ-সংস্কৃতি ও ইতিহাস-ঐতিহ্যের বিচারে ভারতের অধিবাসীরা এক ও অভিন্ন জাতি নয়, ভারতে বহু জাতি-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের বাস একথাও বাস্তবতার আলোকে এবং যুক্তি-তর্কের সাথেই উচ্চারিত হয়েছে। তবুও, অবিভক্ত উপমহাদেশ তথা বৃটিশ ভারত এক দেশ ও এক জাতি- এই বক্তব্য এবং সংজ্ঞা সূত্র মেনে নিলেও দেখা যায় যে, কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যে রয়েছে ভারতীয় জাতীয়তার বলিষ্ঠ ও বিচিত্র প্রতিফলন, উপমহাদেশে তথা অবিভক্ত ভারতের সমগ্র জনম-লীর আশা-আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন-কল্পনা ও সংগ্রাম-সাধনা তাতে বাঙময়, ভারতের স্বাধীনতার সংগ্রামী প্রেরণায় তা উজ্জীবিত। অবিভক্ত ভারতে জাতীয় জাগরণ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম অগ্রনায়ক কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কাব্যে যেমন ভারতীয় পটভূমিতে স্বদেশ প্রেম, স্বজাতি-প্রীতি ও জাতীয়তাবোধ বাঙময় করে তুলেছেন, তেমনি বৃটিশ-বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রত্যক্ষভাবে যোগ দিয়ে কারাবন্দিও হয়েছেন, জেলে গিয়েও তিনি রচনা করেছেন শিকল ভাঙ্গার গান। বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়, ভাষা-সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক এলাকার অধিবাসী নিয়ে গঠিত যে ‘ভারতীয় মহাজাতি’ তাদের আশা-আকাক্সক্ষা, সংগ্রাম-সাধনার রূপকার হিসেবে দেখলেও নজরুল কেন জাতীয় কবি, এ সত্য উপলব্ধি করা যাবে।
বর্তমান আলোচনার গোড়াতেই উল্লেখিত হয়েছে যে, জাতি ও জাতীয়তা বিভিন্ন পর্যায়ে নানা উপাদানে গঠিত হয়, এবং তাতেও বিবর্তনের স্পর্শ লাগে, জাতি ও জাতীয়তা সর্বদা ও সর্বত্র এক ও অভিন্ন থাকে না। অবিভক্ত উপমহাদেশে এবং সেই বৃটিশ যুগে ভারতীয় জাতীয়তার পরিপোষক থাকলেও, কাজী নজরুল ইসলামও এ- সত্য জানতেন এবং মানতেন। সেই কারণেই অভিন্ন ভারতীয় জাতীয়তার প্রবক্তা হলেও, সে কালেই তিনি বাঙ্গালী জাতীয়তা এবং হিন্দু-মুসলিম জাতীয়তা সম্পর্কেও ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। জাতিগঠনে ধর্ম, সংস্কৃতি ও ইতিহাস ঐতিহ্যের স্বাতন্ত্র্য যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বড় ভূমিকা পালন করে, সে সম্পর্কেও নজরুলের চেতনা ছিল অত্যন্ত গভীর। এ কারণেই নজরুল ভারতীয় জাতীয়তা ও জাগরণের গান গেয়েছেন আবার তারই কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে: ‘মোরা এক বৃন্তে দুইটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান/ মুসলিম তার নয়নমণি/ হিন্দু তাহার প্রাণ।’ ধর্ম যে জাতি গঠন ও জাতীয়তাবোধ সৃষ্টির এক বড় উৎস ও প্রেরণা, এ সত্য গভীরভাবে উপলিব্ধ করতেন বলেই ভারতীয় জাতীয়তা এবং হিন্দু-মুসলিম মিলনের এক বড় প্রবক্তা হয়েও নজরুল প্যান-ইসলামিজমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বলিষ্ঠ কণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন: ‘ধর্মের পথে শহীদ যাহারা আমরা সেই সে জাতি।’
বৃটিশ যুগে ভারতীয় জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে নজরুল হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কে যে কথা বলেছেন, সে কথা অবিভক্ত বাংলায় এবং বাঙালী জাতীয়তাবোধের প্রেক্ষিতেও সত্য ছিল এবং সে কারণে বৃটিশ যুগে অবিভক্ত বাংলার পটভূমিতেও হোক, আর বাঙলার পটভূতিতে ‘এক বৃন্তে দু’টি কুসুম’ হিন্দু-মুসলমান’ সম্পর্কে এবং তাদের মিলন, ঐক্য ও সম্প্রীতি বিষয়ে অনেক অনুপ্রেরণাদায়ক কবিতা গান রচনা করেছেন। বলাবাহুল্য, ভারতীয় পটভূমিতে হোক, আর বাঙলার পটভূমিতেই হোক, নজরুল হিন্দু-মুসলিম ঐক্য, মিলন এবং সম্প্রীতি কামনা করলেও, তারা যে ভৌগোলিক ও দেশীয় পটভূমিতে ‘এক বৃন্তে দু’টি কুসুম’ এবং এক বৃন্তে একটি বা অভিন্ন কুসুম নয়, এ সত্য বিস্মৃত হননি। অর্থাৎ জাতি এবং জাতীয়তার বিচারে ফেডারেশনই (ফিউশন নয়) ছিল নজরুলের কাম্য। নজরুল ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে দেশের সব মানুষের তথা সমগ্র জনম-লীর জাগরণে ও নব-উত্থান কামনা করেছেন, তাদের আশা-আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন-কল্পনা ও সংগ্রাম-সাধনার রূপায়ণ ঘটিয়েছেন। এ কথা যেমন অবিভক্ত ভারতের, তেমনি বাংলার পটভূমিতেও সত্য। তবুও, ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষ দেশের সব মানুষের তথা সমগ্র জাতির আশা-আকাক্সক্ষার, স্বপ্ন-কল্পনা ও আবেগ-অনুভূতির, সংগ্রাম-সাধনার রূপকার হলেও হিন্দু-মুসলমান- এই দুই ধর্মীয় সম্প্রদায় ভারত ও বাংলার প্রধান দুই জনগোষ্ঠী এবং ধর্মীয় আত্মপরিচয় ও জাতীয়তাবোধের ধারকদের আকাক্সক্ষা ও অভীপ্সাই নজরুলকাব্যে স্বতন্ত্রভাবেও ভাষা পেয়েছে। এ-কারণেই, হিন্দু-মুসলিম মিলিত জাতীয়তার দিক থেকেই হোক, যে-ভাবেই দেখা হোক না কেন, জাতীয় আশা-আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন-কল্পনা, আবেগ-অনুভূতি ও সংগ্রাম-সাধনার রূপকার হিসেবে নজরুল জাতীয় কবির দাবিদার থেকেই যান।
ধর্মীয় ও সম্প্রদায়গত আত্মপরিচয়ের নিরিখে না দেখে যদি কেবল সম্প্রদায়-নিরপেক্ষ এবং আর্থ-সামাজিক ও শ্রেণিগত অবস্থান থেকেও দেখা হয় তা হলেও এ-সত্য স্বীকার করতে হবে যে, জাতীয় কবি তিনিই হতে পারেন যার কাব্যে দেশ ও জাতির জনম-লীর অন্তর্গত সাধারণ মানুষ, সব-পেশাজীবী জনগণ তথা কৃষক, শ্রমিক, জেলে, কুলি-মজুর নির্বিশেষে সবার-শোষিত, বঞ্চিত, নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের জীবন ও যন্ত্রণা এবং আশা-আকাক্সক্ষা ও সংগ্রাম-সাধনা ভাষা পায়। নজরুল-কাব্যে এ ব্যাপারটি যে অত্যন্ত ব্যাপক ও নির্যাতিত, নিপীড়িত মানুষের আবেগ-অনুভূতি, সুখ-দুঃখ, আশা-আকাক্সক্ষা এবং স্বপ্ন-কল্পনাই তাদের রচনার প্রতিফলিত হয়, সর্বজনীন আবেদনের অধিকার অর্জন করে। কিন্তু কবিও কোনো না কোনো দেশ ও সমাজ সীমার বাসিন্দা এবং ধর্মীয় সম্প্রদায় ও জাতির অন্তর্গত। সে-কারণেই তাঁর কাব্যেও স্বদেশ স্বজাতি এবং স্বদেশের মানুষের আলেখ্য বিধৃত হয়, তাদের আশা-আকাক্সক্ষা ও সুখ-দুঃখ ভাষা পায়। নজরুলের কাব্যে প্রধানত: স্বদেশ ও স্বজাতির এবং স্বদেশের নির্যাতিত, নিপীড়িত ও শোষিত-বঞ্চিত মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা, সুখ-দুঃখ, স্বপ্ন-কল্পনা ও সংগ্রাম-সাধনার কথা ভাষা পেয়েছে এবং দেশ, সম্প্রদায় ও জাতি নিরপেক্ষ বিশ্বজনীন মানুষের অভীপ্সাও রূপায়িত হয়েছে। উল্লেখ্য, জাতীয় কবি তিনিই হতে পারেন যিনি আন্তর্জাতিকতা বা বিশ্বজনীনতার ব্যাপারটাকে অবজ্ঞা কিংবা অবহেলা করেন না, কিন্তু দেশীয় ও জাতীয় ব্যাপারকে স্বদেশ ও স্বজাতির মানুষকে বড় করে দেখেন। নজরুল কেন জাতীয় কবি- বর্ণিত নিরিখে বিচার করে দেখলেও তার উত্তর মিলবে।
জাতীয় কবি শুধু দেশীয় ও জাতীয় ভাষায় তথা মাতৃভাষায় কাব্যরচনা করেই তার দায়িত্ব শেষ করেন না তিনি তার কাব্যসাধনার মাধ্যমে ভাষাকে সমৃদ্ধ ও ঐশ্বর্যম-িত করেন, দেশ ও জাতির অন্তর্গত জনম-লীর তথা সাধারণ মানুষের ভাষাও তার রচনায় স্থান দেন, জনজীবনে প্রচলিত ঘরোয়া জবান তথা শব্দাবলি, বাকভঙ্গী, ইডিয়ম ইত্যাদিও গ্রহণ করে ভাষার শক্তি ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেন, জনজীবনের সঙ্গে সেতৃবন্ধনও রচনা করেন। স্বদেশ ও স্বজাতির অন্তর্গত সব শ্রেণির মানুষের সঙ্গে, দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাস ও ঐতিহ্যধারার সঙ্গে এবং বিশেষভাবে হিন্দু-মুসলিম এই দুই প্রধান ধর্মীয় সম্প্রদায় ও জাতির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং পারিবারিক ও সামাজিক ভাষার বিশেষত: ঘরোয়া জবানের পার্থক্যের সঙ্গে সঙ্গে নজরুলের ছিল ঘনিষ্ঠ ও অন্তরঙ্গ পরিচয়। সমগ্র জাতীয় জীবন এবং জাতির আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে চেয়েছিলেন বলেই নজরুল তাঁর কাব্যে হিন্দু-মুসলিম উভয় ধর্মীয় আশা-আকাক্সক্ষা ও ইতিহাস-ঐতিহ্যের যেমন রূপায়ণ ঘটিয়েছেন, তেমনি তাঁর কাব্যের ভাষায় অবলীলায় ব্যবহার করেছেন উভয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি এবং সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের প্রচলিত ভাষার ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার। নজরুল কবিতায় শুধু সূক্ষমচেতনা এবং সৌন্দর্যের সাধনাই করেননি, সাধারণ মানুষের বিচিত্র সমস্যা, সুখ-দুঃখ-বেদনাবোধ এবং সংগ্রাম-সাধনাকেও তিনি কাব্যের উপজীব্য করে নিয়েছেন, এবং বিষয়ের তাগিদেই নজরুলকে অনেকখানি প্রচলিত ভাষা-ঘরোয়া জবান ব্যবহার করতে হয়েছে, হাত পাততে হয়েছে হিন্দু-মুসলিম উভয় ঐতিহ্যের ভা-ারে। নজরুলের আবির্ভাবে শুধু বাংলাকাব্যে উপজীব্যেরই পরিবর্তন ও সম্প্রসারণ ঘটেনি, ভাষারও পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, সংস্কৃত ও হিন্দু ঐতিহ্যম-িত শব্দাবলি ও ভাষার পাশাপাশি এবং স্বতন্ত্রভাবেও বাংলাকাব্যে মুসলিম ঐতিহ্যম-িত আরবি-ফারসি শব্দাবলি ও ভাষা ব্যাপকভাবে আত্মপ্রতিষ্ঠা অর্জন করে নিয়েছে। এই বাস্তবতার আলোকে দেখলেও নজরুল কেন জাতীয় কবি এই সত্যের সূত্র সন্ধান মিলবে।
সাহিত্যের ইতিহাসই একথা সপ্রমাণ করে যে, সমগ্র জাতির (তা সে ভৌগোলিক, ভাষাগত, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, ঐতিহ্যগত-যেদিক থেকেই হোক না কেন) উত্তরাধিকারকে প্রাণ-সম্পদরূপে গ্রহণ করতে পারলে তবেই জাতীয় সাহিত্য সৃষ্টি সম্ভব। কারণ জাতীয় সাহিত্য শুধু জাতীয় ভাষা এবং ভৌগোলিক রূপ-প্রকৃতিকেই রূপ দেয় না, তা জাতির শত শতাব্দীব্যাপী মন-মানস এবং ইতিহাস-ঐতিহ্যের পরিচয়ও রূপায়িত করে। জাতির নবজাগরণের অন্যতম বলিষ্ঠ অগ্রনায়ক এবং জাতীয় সাহিত্যের অনন্য সাধারণ রূপকার নজরুল এ-সত্য স্পষ্টত উপলব্ধি করেছিলেন যে, ভারতের এবং বাংলারও দুই স্বতন্ত্র প্রধান ধর্মীয় সম্প্রদায়- হিন্দু ও মুসলমানের এবং এই জাতির সুদীর্ঘকালীন ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং সাহিত্য-সংস্কৃতি অনেকটাই ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়েছে, অভিন্ন জাতীয় মানসচেতনাও গড়ে ওঠেনি, এবং এ উপলব্ধির পটভূমিতেই নজরুল জাতীয় ঐক্য সাধনের লক্ষ্যে হিন্দু-মুসলিম মিলনের চেষ্টা করেছেন, সাহিত্যেও উভয় ঐহিহ্যের পাশাপাশি সংস্থাপন এবং মিলনের প্রয়াস চালিয়েছেন। উল্লেখ্য, মধ্যযুগের মুসলিম কবিরা অনেক ক্ষেত্রেই ভাষা ও সাহিত্যে এই মিলনের সাধনা করেছেন, ফলে দুই সম্প্রদায়ের পরিচয় ও উত্তরাধিকার তাঁদের রচনায় বিধৃত হয়েছে। নজরুল ছিলেন ভারতের এবং বাংলারও জাতীয় জাগরণের কবি। দেশের আপামর সাধারণ এবং দুই প্রধান ধর্মীয় জনসম্প্রদায়ের জাগরণ ও মুক্তির প্রেরণারই বাণীরূপ দিয়েছেন তিনি। ফলে তাঁর রচনায় যেমন মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় চেতনা, আশা-আকাক্সক্ষা এব মানস-পরিচয় রূপ পেয়েছে, তেমনি রূপ পেয়েছে সংখ্যালঘু হিন্দু-সম্প্রদায়ের সামগ্রিক মানব-পরিচয়ও। ভাষা ও সাহিত্যে-ভাবের আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে তিনি যেমন মিলনের পথ রচনার চেষ্টা করেছেন, তেমনি এ সত্য বাস্তবে তুলে ধরেছেন যে, দুই জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্রধর্মীয় জাতিগত চৈতন্য সৃষ্টির প্রয়োজনে এবং মানসরূপে সাহিত্যিক রূপায়ণের স্বার্থে দুই স্বতন্ত্রধর্মী ও ঐতিহ্যনির্ভর সাহিত্য রচনাও অপরিহার্য। বৃটিশ যুগে ভাষা ও ভূগোলের অভিন্নতা সত্ত্বেও নজরুল বাস্তব কারণেই এসত্য উপলব্ধি না করে পারেননি। এখানেই নিহিত নজরুল সাহিত্যের জাতীয় চারিত্রের আসল পরিচয়। হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানস-পরিচয় এবং উত্তরাধিকার নজরুলের কবিতা-গানে রূপ লাভ করেছে। আর এ কারণেই, জাতীয় আশা-আকাক্সক্ষার রূপায়ণে, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারের প্রশ্নে এবং সকল জাতীয় সংকটে নজরুলের গান, কবিতা ও অন্যান্য রচনার বাণী উভয় সম্প্রদায়েরÑ সব বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মনে অনুপ্রেরণা সঞ্চার করে, উভয়ের এবং সবার মনোবিকাশের ধারায়ই নজরুলের গান-কবিতা ইত্যাদির আবেদন হয় অমোঘ। এদিক থেকে দেখলেও নজরুল কেন জাতীয় কবি- তাঁর
উত্তর মিলবে।
নজরুল যে কারণে জাতীয় কবি-ঠিক একই কারণেই বাংলাদেশের জাতীয় কবি।
আলোচনায় নজরুল কেন জাতীয় কবি- এ বিষয় সম্পর্কে আমরা আলোকপাত করেছি। সে-আলোচনার শেষে আমাদের বক্তব্য ছিল, নজরুল যে কারণে জাতীয় কবি ঠিক একই কারণেই বাংলাদেশের জাতীয় কবি। আমাদের এ বক্তব্যের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের স্বার্থেই বাংলাদেশের ভৌগোলিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্রীয় পটভূমি ও জাতিগত আত্ম-পরিচয় সংক্ষেপে বিধৃত করা দরকার, একই সঙ্গে বৃটিশ যুগে-অবিভক্ত ভারতীয় উপমহাদেশে এবং বিশেষভাবে সেকালের অবিভক্ত বাংলায় নজরুলের সাহিত্য-সাধনা ও বিচিত্র সৃষ্টিকর্মের পটভূমিতে তাঁর চিন্তাচেতনা এবং মানসধারাও সংক্ষেপে বিধৃত করা বাঞ্ছনীয়।
উল্লেখ্য, কাজী নজরুল ইসলাম সাহিত্য ক্ষেত্রে আবির্ভূত হন চলতি শতকের বিশের দশকে- বৃটিশ যুগে এবং অবিভক্ত ভারতীয় উপমহাদেশ ও বাংলার পটভূমিকায়। স্বাভাবিক কারণেই নজরুলের কবিতা-গান ও অন্যান্য রচনায় অবিভক্ত ভারত ও তৎকালীন অবিভক্ত বাংলাদেশে ভৌগোলিক রূপ-প্রকৃত নিঃস্বর্গ সৌন্দর্য-মহিমা এবং মাটি ও মানুষ বিচিত্ররূপে বিধৃত হয়েছে। তবুও, অবিভক্ত, বৃটিশ ভারতের পটভূমিকায় দেখলেও, সেকালে বাংলাদেশের ভৌগোলিক রূপ-প্রকৃতি, নৈসর্গিক সৌন্দর্য-মহিমা এবং মাটি ও মানুষই নজরুলের কবিতা, গান ও অন্যান্য রচনায় ব্যাপকভাবে এবং গভীরতররূপে প্রতিফলিত। এর বাস্তব কারণ এই যে, বৃটিশ যুগে এবং অবিভক্ত ভারতের পটভূমিকায় সাহিত্য-সাধনা করলেও নজরুল জন্মেছিলেন অবিভক্ত বাংলায় এবং পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় এবং অবিভক্ত উপমহাদেশের পটভূমিকায় সাহিত্য-সাধনা এবং জীবন-চর্চা করলেও, নজরুলের সাহিত্য-সাধনার ভাষা বাংলা- যা একাধারে কবির মাতৃভাষা এবং সামগ্রিক আত্মপ্রকাশের ভাষাও বটে। সুতরাং, নজরুলের কবিতা গান ও অন্যান্য রচনায় স্বাভাবিকভাবে এবং বাস্তবসম্মত কারণেই আপন সন্নিহিত পরিবেশের অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্ববঙ্গের অর্থাৎ তৎকালীন বাংলাদেশের ভৌগোলিক রূপ-প্রকৃতি, নৈসর্গিক সৌন্দর্য-মহিমা, মাটি ও মানুষ এবং ইতিহাস-ঐতিহ্য ব্যাপকতররূপ ও গভীরতরভাবে বিধৃত হয়েছে। নজরুল পশ্চিমবঙ্গে জন্মগ্রহণ করলেও, তাঁর বর্তমান বাংলাদেশের ভৌগোলিক রূপ প্রকৃতি, নৈসর্গিক সৌন্দর্য-মহিমা এবং মাটি ও মানুষের পরিচয় ব্যাপকতর রূপে বিধৃত হয়েছে, তার কারণ নজরুলের জীবনের ইতিহাসের মধ্যেই নিহিত, তাঁর জীবনের একটা বড় এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অর্থাৎ কৈশোর, যৌবন ও পরবর্তী কর্মজীবনেরও বিভিন্ন অধ্যায় কেটেছে পূর্ববঙ্গ অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশে, যা তাঁর সাহিত্যকর্মে ও মনোবিকাশের ধারায় ব্যাপক ও গভীর প্রভাব ফেলেছে। এ দিকটি আমরা পরবর্তীতে পর্যালোচনা করবো।
নজরুল তাঁর একটি রচনায় এই মর্মে অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, তাঁর দৃষ্টিতে দেশ শুধু দেশের নিসর্গ-সৌন্দর্য, পাহাড়-পর্বত-নদী-নালা এবং মন্দির-মসজিদ নয়, তাঁর কাছে দেশ অর্থ- দেশের মানুষ। এই ধারণা ও উপলব্ধির কারণেই, মূলত: রোমান্টিক মানস-প্রবণতা এবং স্বপ্ন ও সৌন্দর্যবোধের রূপকার হলেও, নজরুল তাঁর কবিতা-গান ও অন্যান্য রচনায় শুধু স্বদেশের ভৌগোলিক রূপ-বৈচিত্র্য, নৈসর্গিক সৌন্দর্য-মহিমা এবং ব্যক্তিমনের আর্তি-আকুলতা প্রকাশ করেই দায়িত্ব শেষ করেননি, তিনি দেশের মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, স্বপ্ন-সাধনা, আশা-আকাক্সক্ষা, সংগ্রামী প্রেরণা এবং বাস্তব জীবন-চিত্রও ফুটিয়ে তুলেছেন, শোষণ-বঞ্চনা, অত্যাচার নিপীড়ন, কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা, সংকীর্ণতা ইত্যাদি সব ধরনের মানবতা-বিরোধী কর্মকা-ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন, সাহিত্যকে ব্যবহার করেছেন, সংগ্রামের হাতিয়ার রূপে। স্বদেশের এবং ব্যাপক অর্থে বিশ্বের মানুষও নজরুলের কাছে বড় ছিল বলেই তিনি শুধু শিল্পের সাধনায় এবং কলা-কৈবল্যবাদে নিজেকে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের স্বপক্ষে এবং বিশেষভাবে স্বাধীন স্বদেশের মানুষের সপক্ষে লেখনি চালনা করেছেন, সহযাত্রী হয়েছেন তাদের সংগ্রামের। স্বদেশের মানুষ তাঁর কাছে কত বড় ছিল তা একটি মাত্র উদ্ধৃতি থেকেই স্পষ্ট হবে; ‘স্বদেশ বলিতে বুঝেছি কেবল/ দেশের পাহাড়মাটি বায়ু জল/ দেশের মানুষে ঘৃণা করি/ চাই করিতে দেশ স্বাধীন/ যত যেতে চাই তত পথে ভাই/ হই মা ধূলি-বিলীন। (গুলবাগিচা)
বস্তুত: আমার দেশের মাটি/ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি- এই ধরনের অনেক স্বদেশ-প্রেমমূলক গান ও কবিতার রচয়িতা নজরুল যে দেশের মানুষকে আপন আত্মীয়বোধে চিনে নিয়ে এবং তাদের সংগ্রামের সাথী হয়ে স্বদেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। উল্লেখ্য, স্বদেশপ্রেম, মানুষের একটি মজ্জাগত প্রবণতা। নিতান্ত উৎকেন্দ্রিক কিংবা ছিন্নমূল না হলে কেউ দেশপ্রেম বর্জিত হতে পারেন না। দেশের মাটি, মানুষ ও ভৌগোলিক রূপ-প্রকৃতির সাথে গভীর ও নিবিড় আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপনের মধ্যদিয়েই স্বদেশপ্রেম উৎসারিত হয়। বস্তুতপক্ষে স্বদেশপ্রেম শুধু ভৌগোলিক ও নৈসর্গিক সৌন্দর্য-প্রীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের জনগোষ্ঠীর সাথে আত্মীয়তার সম্বন্ধ স্থাপনের মধ্য দিয়েও স্বদেশপ্রেম উৎসারিত। স্বদেশ-প্রেমিক কবি শুধু দেশের নিঃস্বার্থ-বন্দনার মধ্যে তার আবেগ ও স্বপ্ন-কল্পনাকে সীমাবদ্ধ রাখেন না, তিনি দেশ-মাটি, আবহাওয়ার পটভূমিতে দেশবাসীর আশা-আকাক্সক্ষা ও কামনা-বাসনাকে রূপায়িত করেন। আর এ সূত্রেই তাঁর দেশপ্রেম আপন চেতনার রঙ্গে রঞ্জিত হয়। অবিভক্ত উপমহাদেশের পটভূমিকায় কিংবা স্বতন্ত্রভাবে তদানীন্তন বাংলার পটভূমিকায় অথবা পূর্ববঙ্গের পটভূমিকায় যে পটভূমিকায় স্থাপন করেই দেখা হোক না কেন, এ সত্য প্রতিভাত হবে যে, নজরুল তার গান-কবিতা ও অন্যান্য রচনায় স্বদেশের ভৌগোলিক রূপ-প্রকৃতি এবং নৈসর্গিক সৌন্দর্য-সম্ভারকে তুলে ধরলেও, বস্তুতপক্ষে তাঁর গান কবিতায় কিংবা অন্যবিধ রচনায় দেশ-বন্দনা নিছক আবেগ-অনুপ্রেরণার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, নজরুলের দেশপ্রেম স্বজাত্যপ্রীতি ও জাতীয়বোধের পটভূমিকাও খুঁজে পেয়েছে। স্বদেশ প্রেমের রূপকার হিসাবে নজরুল সমগ্র দেশবাসীর আশা-আকাক্সক্ষা, কামনা-বাসনা ও মুক্তিস্পৃহাকে তার গান ও কবিতার বাঙময় করে তুলেছেন। সমগ্র দেশের জনম-লীর আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক হিসেবে তার কাব্যে যেমন জাগরণবাণী উচ্চারিত হয়েছে তেমনি স্বতন্ত্রভাবে হিন্দু-মুসলিম উভয় জনগোষ্ঠীর নবজাগরণ ও আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামেও তা সঞ্চারিত করেছে, ঐতিহাসিক অনুপ্রেরণায় রেখেছে অবিস্মরণীয় অবদান।
এ সত্য অনস্বীকার্য যে, নজরুল এসেই বাংলা সাহিত্যে স্বদেশ ও স্বজাতি চেতনা একটি ব্যাপক পটভূমি খুঁজে পায়। নজরুল স্বধর্ম ও স্বজাতির উত্থান কামনা করেছেন, মুসলমানকে অতীতের গৌরবোজ্জ্বল স্বপ্নে উজ্জীবিত হতেও আহ্বান জানিয়েছেন, কিন্তু তাঁর কবিতা-গানে হিন্দু এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠির অস্তিত্ব ও বিচিত্ররূপে এবং রেখায় ধরা দিয়েছে। এ কারণেই চলতি শতকের বিশেষ দশকে অসহযোগ আন্দোলনের পটভূমিতে নিরুত্তাপ সমাজ-জীবনে তিনি ও নতুন অনুভূতির উত্তাপ সঞ্চারিত করেছিলেন, তাতে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায় এবং জাতিগোষ্ঠিই সমভাবে অনুপ্রাণিত হলো। নজরুলের কণ্ঠে ধ্বনিত হলো: যেথায় মিথ্যা ভ-ামি তাহা করব সেথাই বিদ্রোহ/ধামাধরা/ জামাধরা/ মরণভীতু চুপ রহো/ আমরা জানি সোজা কথা/ পূর্ণ স্বাধীন করব দেশ/ এই দুলালুম বিজয় নিশান/ মরতে আছি মরব শেষ। (বিদ্রোহীর বাণী)। অনস্বীকার্য যে, অবিভক্ত উপমহাদেশের তথা তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের স্বাধীনতাই ছিল নজরুলের লক্ষ্য এবং কাম্য, তিনিও স্বদেশ বলতে ‘ভারত’ এবং ‘বাংলা’ দুই-ই বুঝতেন। ১৯২২ সালে ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় নজরুল দেশের পূর্ণ স্বাধীনতা দাবি করেন এবং তাতে লিখেন ‘ধূমকেতু ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়। স্বরাজ-টরাজ বুঝে না। ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশী অধীনে থাকবে না। ভারতবর্ষের পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা, শাসন-ভার সমস্ত থাকবে ভারতীয়দের হাতে।’ বস্তুত: সেকালে অসহযোগ আন্দোলনের পটভূমিতে ভারতের স্বাধীনতাই ছিল ধর্ম সম্প্রদায় নির্বিশেষে উপমহাদেশের সব জনম-লীর কাম্য। কিন্তু রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং জাতিগত স্বাতন্ত্র্যবোধ, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, হিংসা, বিদ্বেষ, ইংরেজের কূটকৌশল ইত্যাদি বহুবিধ কারণে অবিভক্ত উপমহাদেশ তথা ভারত ইংরেজের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করতে পারেনি, ১৯৪৭ সালে বিভক্ত উপমহাদেশ তথা ভারত বিভক্তরূপে ‘ভারত ও পাকিস্তান’ এ দু’টি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রসত্তা নিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে। সে পটভূমিকা ও কার্যকারণ বিশ্লেষণের আগে বলা আবশ্যক যে, স্বাধীনতার চারণকবি এবং হিন্দু মুসলিম নবজাগরণের বাণীবাহক নজরুল বৃটিশ ভারতের স্বাধীনতার তূর্যবাদক হলেও বাংলার নবজাগরণ বিশেষত: পূর্ববঙ্গের নবজাগরণ এবং স্বাধীনতার স্বপ্নও তাঁর চোখে স্পন্দিত হয়েছে, সেই বৃটিশ পরাধীনতার যুগেও স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন এবং এ দেশের মানুষের মুক্তির আকাক্সক্ষা থেকেই বিদ্রোহী কবি উচ্চারণ করেছিলেন : ‘স্বাগত বঙ্গে মুক্তিকাম/সুপ্তবঙ্গে জাগুক আবার/ লুপ্ত স্বাধীন সপ্তগ্রাম’/ কবি তার স্বাপ্নিক-দৃষ্টিতে একদা দেখেছিলেন ‘পদ্মা-মেঘনা-বুড়িগঙ্গা বিধৌত পূর্ব-দিগন্তে/তরুণ-অরুণ বীণা বাজে তিমির বিভাবরী অন্তে?’/ একদা নজরুল ‘বাঙ্গালীর বাঙলা’ দীর্ঘ নিবন্ধে লিখেছিলেন, ‘এই পবিত্র বাংলাদেশ/ বাঙালাীর-আমাদের।/ ‘দিয়া প্রহারেণ ধনঞ্জয়/ তাড়াব আমরা, করি না ভয়/ যত পরদেশী দস্যু ডাকাত/ রামাদের গামাদের।’ সেই বৃটিশ-যুগেই বাংলার বিশেষত: পূর্ববাংলা বা পূর্ববঙ্গ তথা বর্তমান বাংলাদেশের ভৌগোলিক রূপপ্রকৃতি, নৈসর্গিক-সৌন্দর্য শোভা এবং সংগ্রামী চেতনাসম্পন্ন মানুষ ও তাদের জাতিগত চৈতন্যের সঙ্গে গভীরভাবে পরিচিত নজরুল উপলব্ধি করেছিলেন যে, পূর্ববঙ্গ জীবন্ত হলে, নতুন করে জেগে উঠলে, হিম জর্জর ভারতও নবীন বসন্তে জেগে উঠবে। তিনি লিখেছিলেন : ‘পদ্মা-মেঘনা-বুড়িগঙ্গা বিধৌত পূর্ব-দিগন্তে/তরুণ-অরুণ বীণা বাজে তিমির বিভাবরী অন্তে/ ব্রহ্মা মুহূর্তের সেই পূরবাণী/জাগায় সুপ্ত প্রাণ, জাগায় নবচেতনা-দানি/সেই সঞ্জীবনী বাণী শক্তি তার ছড়ায়/ পশ্চিমে সুদূর অনন্তে।/ উর্মিছন্দা শত নদী স্রোত-ধারায় নিত্য পবিত্র/সিনানশুদ্ধ-পূরববঙ্গ/ঘনবন কুন্তলা প্রকৃতির বক্ষে সরল সৌম্য/ শক্তি প্রবুদ্ধ পূরববঙ্গ/আজি শুভ লগ্নে তারি বাণীর বলাকা/অলখ বোমে মেলিল পাখা/ ঝংকার হানি তারি পূরধানী জীবন্ত হউক হিম-জর্জর ভারত/নবীন বসন্তে। (পূর্ববঙ্গ)। সন্দেহ নেই, নজরুল অবিভক্ত ভারত তথা বৃটিশ উপমহাদেশের স্বাধীনতার স্বপক্ষে ছিলেন, এবং বাংলার সংগ্রামী চেতনা ও স্বাধীন সত্তার অন্তর্নিহিত রূপও তাঁর দৃষ্টিতে এবং চৈতন্যেও ধরা পড়েছিল। চল্লিশের দশকে এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের ‘নবযুগ’ আমলে রচিত ‘জাগো সৈনিক আত্মা’ শীর্ষক কবিতায় নজরুল লিখেছেন: ‘জাগো অনিন্দ্র অভয় মুক্ত মৃত্যুঞ্জয়ী প্রাণ/ তোমাদের পদধ্বনি শুনি হোক অভিনব উত্থান/পরাধীন শৃঙ্খল কবলিত পতিত এ ভারতের।/ এসো যৌবন রণ-রস ঘন হাতে লয়ে শমসের।’ এবং ‘নবাগত’ শীর্ষক কবিতায় নজরুল লিখেছেন, মনে পড়ে আজ পলাশীর প্রান্তর/ লরিক লোভ কামানের গোলা বারুদ লইয়া যথ/ আগুন জ্বালিল স্বাধীন এ বাংলায়।’ বস্তুত: বৃটিশ যুগে পরাধীন ভারতের জন্যে সুগভীর মর্মবেদনা, স্বাধীনতা অর্জনের আকাক্সক্ষার পাশাপাশি নজরুলের রচনায় বাংলারÑ এবং বিশেষভাবে পূর্ববঙ্গে স্বাধীনতা অস্তমিত হওয়ার স্মৃতি সঞ্জাত বেদনাও মর্মরিত হয়েছে, ‘লুপ্ত স্বাধীন সপ্তগ্রাম’ এর কথা স্মরণ করেও কবি বেদনাহত হয়েছেন। চল্লিশের দশকে এবং ‘নবযুগ’ পর্যায়ে রচিত অনেক কবিতা গানে নজরুল বাংলার এবং বিশেষভাবে পূর্ববাংলার সংগ্রামী সত্তার ও প্রাণচৈতন্যের স্বরূপ ফুটিয়ে তুলেছেন, বাঙ্গময় করেছেন ‘আগ্নেয়গিরি বাংলার যৌবন’ এর বিচিত্র দিক। নজরুলের ভাষায় ‘ঘুমাইয়া ছিল আগ্নেয়গিরি বাঙলার যৌবন/বহু বৎসর মুখ চেপে ছিল পাঠানের আবরণ/… ঘুমাইয়া ছিল পাথর হইয়া তার বুকে যত প্রাণ, অগ্নিগোলক হইয়া ছুটিছে তীরবেগে সে পাষাণ/ (আগ্নেয়গিরি বাংলার যৌবন)।
আগেই বলেছি উপমহাদেশ বিভাগ এবং বাংলার বিভক্তিও নজরুলের কাম্য ছিল না, তিনি আজীবন হিন্দু-মুসলমানের মিলন ও সম্প্রীতি কামনা করেছেন, ঐক্যবদ্ধভাবে বৃটিশের বিরুদ্ধে যত বিদেশী শাসকদের, শোষকদের বিরুদ্ধেও সংগ্রাম করতে চেয়েছেন। ভারতীয় জাতীয়তাবোধে এবং স্বদেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ হলেও নজরুল বাঙ্গালী চেতনায়ও উদ্বুদ্ধ ছিলেন, যেমনি তিনি উদ্বুদ্ধ ছিলেন মুসলিম জাতীয়তাবোধে এবং ইসলামী চেতনায়। স্বদেশপ্রেমিক নজরুলের পক্ষেই তাই উচ্চারণ করা সম্ভব ছিল ‘কিছুতেই যেন ভুলিতে নারি এ মাটির মায়ের মায়া/মোর ধ্যানে হেরি আল্লার পাশে এই বাঙলার ছায়া।’ স্বদেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গÑ এ কথা মনে রাখলে স্বদেশপ্রেমিক নজরুলের বেদনাহত তাৎপর্য উপলব্ধি করা সহজ হবে। ‘বন্ধুরা এসো ফিরে’ শীর্ষক কবিতায় নজরুল বেদনাহত চিত্রে বলেছেন, ‘তোমরা বন্ধু কেহ অগ্রজ, অনুজ সোদর সম,/ প্রার্থনা করি ভাঙ্গিয়া দিও না মিলনে মম। এই সেতুঁ আমি বাঁধিব আমার সারা জীবনের সাধ/ বন্ধুরা এস, ভেঙ্গে দিব যত বিদেশীর বাধা বাঁধ।’ কিন্তু বাস্তব অবস্থা এই দাঁড়া যে, স্বতন্ত্র জাতিসত্তার অধিকারী উপমহাদেশের হিন্দু ও মুসলিম- এই দুই প্রধান ধর্মীয় সম্প্রদায় শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি, এবং অবিভক্ত বাংলার প্রেক্ষিতে একই ব্যাপার ঘটে। স্বতন্ত্র জাতিসত্তার অধিকারী এবং দাবিদার মুসলমানরা স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বৃটিশ আমলেই বহুকাল রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মিলনের এবং স্বাধীনতার জন্যে লড়াইয়ের চেষ্টা না করেছে, এমন নয়। কংগ্রেসী, স্বদেশী, অসহযোগ ইত্যাদি আন্দোলনের ইতিহাসে রয়েছে তার পরিচয়। কিন্তু সেই রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলা এবং মিলনের প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয় উভয় ধর্মীয় সম্প্রদায়ের এক শ্রেণির মানুষের সংকীর্ণচিত্ততা এবং প্রতিবেশী সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজের অনুদারতার দরুন, আন্তরিকতার আর সংখ্যালঘিষ্ঠ মুসলমানদের ন্যায়সঙ্গত দাবি মেনে নেয়ার মতো উদার মনোভাবের অভাবে। রবীন্দ্রনাথ যথার্থই বলেছেন, ‘হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সকল দিক দিয়া একটা সত্যিকার ঐক্য জন্ম নেয় নাই বলিয়াই রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তাহাদিগকে এক করিয়া তুলিবার চেষ্টায় সন্দেহ ও অবিশ্বাসের সূত্রপাত হইল’ তিনি আরও বলেন, ‘হিন্দু-মুলসমানের মধ্যে যে একটি সত্য পার্থক্য আছে তাহা ফাঁকি দিয়া উড়াইয়া দিবার জো নাই। প্রয়োজন সাধনের অগ্রহবশত: সেই পার্থক্যকে যদি আমরা না মানি তবে সেও আমাদের প্রয়োজনকে মানবে না… আজ আমাদের দেশে মুসলমান স্বতন্ত্র থাকিয়া নিজের উন্নতি সাধনের চেষ্টা করিতেছে। তাহা আমাদের পক্ষে যতই অপ্রিয় এবং তাহাতে আমাদের আপাতত: যতই অসুবিধা হউক, একদিন পরস্পরের যথার্থ মিলন সাধনের পক্ষে ইহাই প্রকৃত উপায়।’
হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকাশকাল ১৩১৮, দ্রষ্টব্য : ‘পাকিস্তান আন্দোলন ও মুসলিম সাহিত্য বাংলা একাডেমী প্রকাশিত।
উপরোক্ত বক্তব্যের পটভূমিতে পর্যালোচনা করলে, নজরুল এবং আরও অনেকের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাহিত্য-সংস্কৃতি ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলিম মিলন কেন সম্ভব হয়নি, কেন দ্বিজাতিত্ব ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের দাবির ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ বিভক্ত হয়ে দু’টি স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, কেন অবিভক্ত বাংলাও বিভক্ত হয়ে যায়। তাই অনুধাবন করা সহজ হবে। ইতিহাস ঐতিহ্য অনেক কিছু জাতি গঠনের উপাদান হিসাবে কাজ করে, তবুও জাতীয়তাবোধ গড়ে তোলার এবং জাতি গঠনের অভিন্ন উপাদানের মধ্যে কোনটি কখন প্রাধান্য পাবে, এবং একসঙ্গে বাস করার অনুভূতি, আবেগ, ইচ্ছা জাগিয়ে তুলবে তা নিশ্চয় করে বলা কঠিন। প্রকৃতপক্ষে সম্পূর্ণ ব্যাপারটাই নির্ভর করে ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থার উপর। একথা মনে রাখলে, কেন উপমহাদেশের মুসলমানরা বৃটিশ আমলে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছিল তা যেমন বোঝা যাবে, তেমনি সাবেক পাকিস্তান আমলের রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক ইতিহাস এবং পশ্চিমাদের শাসন শোষণ ও বঞ্চনা নীতির কাহিনী পাঠ করলে বোঝা যাবে কেন, সাবেক পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ আমাদের এই বাংলাদেশের মানুষ ভৌগোলিক ও ভাষাগত জাতীয়তার প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বাধিকার আন্দোলন, স্বাধীনতার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ করেছিল, কেন অগণিত শহিদদের আত্মদানের মাধ্যমে স্বতন্ত্র স্বাধীন ও স্বার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। নজরুলের কবিতা-গান ও অন্যান্য রচনা কেন বাংলাদেশ স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের অপরিসীম অনুপ্রেরণার উৎস হিসাবে কাজ করেছে, এবং কেন তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি সে সত্যও উপলব্ধি হবে।
মনে রাখতে হবে, কাজী নজরুল ইসলাম উপমহাদেশ বিভাগ এবং বাংলা বিভাগেরও পক্ষপাতী ছিলেন না। কিন্তু বাস্তব সত্য এই যে, উপমহাদেশের মুসলিম নবজাগরণ এবং জাতীয়তাবোধের প্রেক্ষিতে, মুসলমানদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের দাবির প্রেক্ষিতেও ভারত উপমহাদেশ বিভক্ত হয় এবং একইভাবে বাংলাও বিভক্ত হয়ে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নামে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়ে ছিল। এর কার্যকরণ ইতিপূর্বেই বিশ্লেষিত হয়েছে। বাংলার এবং ব্যাপক অর্থে উপমহাদেশের মুসলিম নবজাগরণে নজরুলের কবিতা, গান ও অন্যান্য রচনার যে ব্যাপক ও গভীর ভূমিকা, তার কথা স্মরণে রাখলে এ সত্য অনস্বীকার্য হয়ে ওঠে যে, নজরুল উপমহাদেশ ও বিশেষভাবে বাংলা বিভাগের পক্ষপাতী না থাকলেও তাঁর মুসলিম জাগরণমূলক কবিতা, গান ইত্যাদি পরোক্ষ হলেও মুসলিম আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের দাবি এবং স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পেছনে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। আমার লীগ কংগ্রেস শীর্ষক এক আত্মউন্মোচনমূলক নিবন্ধে নজরুল বলেছেন যে, তিনি কংগ্রেস এবং মসুলিম লীগের দুইআনার সদস্য না থাকলেও, উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং মুসলিম নবজাগরণ আন্দোলনে তার ভূমিকা ও অবদান কংগ্রেসী নেতা এবং মুসলিম লীগ নেতাদের চেয়ে কম নয়। অনুরূপভাবে বলা যায়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের বহু বহুকাল আগে বৃটিশ যুগে এবং ১৯৪২ সালেই নজরুল অসুস্থ ও বাকশক্তিহীন হয়ে গেলেও নজরুলের কবিতা, গান ও অন্যান্য রচনা এদেশের মানুষের স্বাধীকার আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে অনুপ্রেরণার উৎস হয়েছে। একদা নজরুল ‘পূর্ববঙ্গ’ শীর্ষক কবিতায় এবং ‘বাংগালীর বাংলা’ শীর্ষক নিবন্ধে যথাক্রমে ‘পূর্ববঙ্গের’ নবজাগরণ তথা সুপ্ত চেতনার উত্থান অনুধাবন ও কামনা করেছিলেন, ঘোষণা করেছিলেন, ‘যত পরদেশী’ দস্যু-ডাকাতে/‘রামাদের’ ‘গামাদের,- বাংলাদেশ থেকে তাড়াবেন। বস্তুত: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পশ্চিমা অবাঙ্গালী শাসক শোষকদের পরাজয়ে এবং ১৯৭১ সালে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে এ স্বপ্নেরই বাস্তবায়ন ঘটেছে বললে অত্যুক্তি হবে না। এ দিক থেকে দেখলেও নজরুল কেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি তা অনুধাবন করা সহজ হবে।
নজরুল শুধু বাংলাদেশের ভৌগোলিক রূপ-প্রকৃতি এবং সৈনর্গিক সৌন্দর্য-মহিমার অনন্য সাধারণ রূপকারই নন, তিনি এখানকার জনগণের, দুই প্রধান ধর্মীয় সম্প্রদায় ও জনগোষ্ঠীর মানস-চেতনা এবং জাতীয়তাবাধেরও অসামান্য রূপকার। শুধু ভৌগোলিক এবং ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার দিক থেকেই নয়, সমাজ-সংস্কৃতির সংগঠনের দিক থেকেও, নজরুলের রচনা বাংলাদেশের জনগণের মানসচেতনা এবং আশা-আকাক্সক্ষা ও সংগ্রাম সাধনার প্রতিনিধি স্থানীয়। ধর্মনিরপেক্ষতা এবং শ্রেণিগত অবস্থানের নিরিখে দেখলেও লক্ষ্য করা যাবে যে, বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগণ তথা দারিদ্র্যপীড়িত, শোষিত বঞ্চিত মানুষ নজরুলের কবিতা গান ও অন্যান্য রচনায় বিচিত্ররূপে বিধৃত হয়ে আছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক, রূপ প্রকৃতি, নৈসর্গিক সৌন্দর্য মহিমা ইত্যাদির পাশাপাশি এদেশের মানুষের জাতীয় আত্মপরিচয়, মানস-চেতনা, জনজীবন এবং জাতীয় আশা-আকাক্সক্ষা ও সংগ্রাম সাধনার কথা নজরুলের রচনায় অনবদ্যভাবে ও অনুপ্রেরণা সঞ্চারীরূপে বিধৃত হয়ে আছে বলেই তিনি জাতীয় কবিরূপে জনহৃদয়ে অভিষিক্ত। আজও সকল দুর্যোগে ও সংকটে এ দেশের মানুষের এবং সামগ্রিকভাবে জাতির হৃদয়ে অনুপ্রেরণা-সঞ্চার করে নজরুলের বাণী ‘দুর্গমগিরি, কান্তার মরু, দুস্তর পারাবার/লংঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে যাত্রীরা হুঁশিয়ার/’ কিংবা, ‘অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানে না সন্তরণ,/ কান্ডারী, আজ দেখিব তোমার মতৃমুক্তি পণ।/ হিন্দু না ওরা মুসলিম?/ ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন?/ কান্ডারী বল ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মার।’
অবিভক্ত বৃটিশ ভারতের প্রেক্ষিতে এবং সে সময় রচিত নজরুলের জাগরণমূলক ও মানবতাবাদী চিন্তাপ্রসূত রচনার আবেদন চিরন্তন ও অমোঘ। এ কারণেই পূর্ববর্তী আলোচনায় বলা হয়েছে যে, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ভাষাভিত্তিক ইত্যাদি যে-কোনো প্রেক্ষাপটেই বিচার করেই দেখা হোক না কেন, নজরুল যে কারণে জাতীয় কবি, ঠিক একই কারণে বাংলাদেশেরও জাতীয় কবি। বাংলাদেশের মাটি, মানুষ ও প্রকৃতি এবং সমাজের সঙ্গে নজরুলের ব্যাপক ও গভীর সম্পর্ক আর এদেশের শ্যামল মাটিতে তাঁর শেষ-শয্যা গ্রহণের ও অম্লান স্মৃতির দিক থেকে দেখতে গেলে তা আরও যথার্থ এবং তাৎপর্যবাহী হয়ে ওঠে।