“বল বীর –
বল উন্নত মম শির …”
বাংলা সাহিত্যের একজন বড় দিকপাল বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর জীবনবৃত্তান্ত এবং সাহিত্য সম্ভার নিয়ে আলোচনা করার মতো দুঃসাহস আমার নেই। তবে তাঁর সম্পর্কে কিছু জানা কথা ছোট্র পরিসরে লিখছি পাঠকদের উদ্দেশে। ধূমকেতুর মতোই যেন নজরুলের আবির্ভাব বাংলা সাহিত্যে। তাঁর বলয় আদিগন্ত চরাচরে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। সৈনিক জীবন থেকেই তাঁর কবি জীবন শুরু। যখন থেকে বিক্ষোভ, কোলাহল আর দ্বন্দ্ব শুরু, তখন থেকেই চারণ কবির ভূমিকা তিনি পালন করেছেন।

যুগের কবি হিসেবে তিনি পাঠকের দাবী পূরন করেছেন। সমকালীন সামাজিক বাস্তবতা তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর কবিতায় কিংবা গল্পে। একথা একবাক্যে সবাই স্বীকার করবে যে, রবীন্দ্রনাথের পরে বাংলা সাহিত্যে তিনিই প্রথম মৌলিক কবি। তবে তিনি রবীন্দ্র প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন।

নজরুলের লেখার ধরন ছিল আলাদা। কোনো একঘেয়েমি ছিল না লেখার মাঝে। পাঠককে আকর্ষণ করার মতো শক্তিশালী ক্ষমতা ছিল তাঁর। তিনি লিখেছেন সবার জন্য। ধর্মীয় প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে শুধু ইসলাম ধর্ম নিয়ে তিনি লিখেন নি। ধর্মীয় ও সামাজিক ঐতিহ্যকে তিনি নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপন করেছেন।

সাম্যবাদী চেতনায় তিনি ধর্মকে নাকচ করেননি। ঐতিহ্যের সাথে তাঁর যোগ অবিমিশ্র। তাঁর সাম্যবাদী চেতনা বাংলা কাব্যে এক নতুন ধারার সৃষ্টি করেছে। আধুনিক কবিতার তাঁরই হাত ধরে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। যেন কবিতাকে বন্ধাত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছেন। পরাধীনতার শৃঙ্খল মেনে নিতে পারেননি বলেই সৃষ্টি করেছিলেন অনবদ্য কবিতা। আর পেয়েছিলেন তখন “বিদ্রোহী “খেতাবটি।

অত্যাচারীর নিপীড়ন যন্ত্রনায় তাকে বিদ্ধ করেছিল। সামাজিক রক্ষণশীলতা সাম্প্রদায়িকতা, অসাম্যের বিরুদ্ধে আপোষহীন লেখা লিখতে একটুও ভয় পাননি তিনি। তাঁর লেখনীর মাধ্যমে উচ্চারিত হয়েছিল পরাধীনতার কথা, দারিদ্র্যের কথা, প্রেমের কথা।
“আমি সেইদিন হব শান্ত
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবেনা
বিদ্রোহী রণক্লান্ত
আমি সেইদিন হব শান্ত। “

আসলেই তিনি শান্ত ছিলেন না। অত্যচারীর বিরুদ্ধে অক্লান্ত সংগ্রামী ভৃমিকা পালন করেছিলেন। ন্যায়ের জন্য লড়েছেন, অধিকারের জন্য উচ্চকন্ঠে প্রতিবাদ করেছিলেন।
“চোখ ফেটে এলো জল
এমনি করে কি জগৎ জুড়িয়া
মার খাবে কি দুর্বল? “
আবার লিখেছেন,
“প্রার্থনা করো যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,
যেন লেখা হয় আমার রক্ত লেখায় তাদের সর্বনাশ। “

কি চমৎকার ভাবের প্রকাশ! কি অসাধারণ সৃষ্টি! বলিষ্ঠ কন্ঠে উচ্চারণ করেছেন তাঁর দ্রোহের কথা। চুরুলিয়ার সেই নজরুল আজও চিরবরণীয় ও চির স্মরনীয় হয়ে আছে বাঙ্গালী জাতির হৃদয়ে, বাঙালীর চেতনাতে। বিদ্রোহী কবি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করছেন কাজী নজরুল ইসলাম। এ অর্জন গোটা সমাজের তথা বাঙালীর। তাঁর জন্য আমাদের নিবেদন অন্তরের গভীর থেকে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা।