সাহিত্য হলো শিল্পের সবচেয়ে সরব কলা। আর সাহিত্যের মূল প্রতিপাদ্য হলো মানুষের মন ও জীবন। তাই সাহিত্যের অন্তিম বিষয়বস্তু হলো মানুষ। আগে সাহিত্য তৈরী হত ওপর তলার মানুষদের নিয়ে; রাজ রাজড়াদের Princes & Prelates নিয়ে। কিন্তু যারা এই সভ্যতার পিলসুজ, যাদের রক্তে তিল তিল করে গড়ে উঠেছে এই সভ্যতার আলীশান অধুনিকতা, সেই সব সাধারণ মেহনতী মানুষ, প্রত্যহ যাদের মুখ না দেখলে সকালের সূর্য-রশ্মি যেন সোনামাখা রূপ লাভ করে না, সভ্যতার শরীরে পালিশ লাগেনা, তারা ছিল সাহিত্য-সৃষ্টির অন্ত্যজ। অথচ সাহিত্যের পৃষ্ঠাজুড়ে ছিল শাসক ও সামন্ত শ্রেণীর আসফালন, আর খেটে খাওয়া চাষা- ভূষা মানুষেরা, যাদের উপরে উপরওয়ালারা নিষ্পেষনের ষ্টিম রোলার চালাত, যাদের রক্তে “দেব দেবীরা” পূণ্য-স্নান করত তারা ছিল বড়ই অপাঙ্ক্তেয়। এই অপাঙক্তেয়দের অনাদৃত জীবনের সুষমা গরিমার দিকে আলোকপাত করে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিমায় যিনি সর্বপ্রথম একটা পরিবর্তন এনে দিলেন তিনি আর কেউ নন, তিনি প্রগতিশীল সাহিত্যের উদ্বোধক বিপ্লবী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। আর গণজাগরণ? কাদের জাগরণ? কিসের বিরুদ্ধে জাগরণ? তাও আবার সাহিত্যে? প্রতিটি সৃষ্টিশীল কর্মেরই একটা দায়বদ্ধতা থাকে। সে দায়বদ্ধতা মানবিক হৃদয়ের দায়বদ্ধতা। তাই তো কোমল মানবিক হৃদয়ের অধিকারী কাজী নজরুল ইসলামের মনবীণায় বেজে ওঠে বেদনার সুর। তাঁর সে সুরে শামিল করতে সক্ষম হয়েছেন হাজারও নিপীড়িত মানুষকে। আর সে কারণেই শাসক এবং সামন্ত শ্রেণীর জুলুম নির্যাতনে বেদনাক্লিষ্ট হৃদয়ে তিনি বাজিয়েছেন জাগরণের বীণা। নিপীড়িত মানুষের হৃদয়াকাশে ডেকে এনেছেন সদা প্রজ্জ্বলমান অগ্নি-শিখা ধূমকেতু। অন্ধকারের বিপরীতে এ যেন আলোর জাগরণ! অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের জাগরণ। বন্দিদশা থেকে মুক্ত বিহঙ্গের জাগরণ। মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের জাগরণ! জুলুম, নির্যাতন এবং শোষণের বিরুদ্ধে মানবিকতার জাগরণ। অবিচার এবং রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের বিপরীতে সুশাসনের জাগরণ। সর্বোপরি, অমানুষের বিপরীতে মানুষের জাগরণ।

তাই তো তাঁর সাহিত্য সাধনায় জড়িয়ে আছে উৎসাহ উদ্দীপনা আর বিদ্রোহের “অনল প্রবাহ”। জীবন ও সাহিত্যে ব্যথাক্লিষ্ট জনতার কথাই গেয়েছেন কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর ব্যক্তি-স্বত্তা যুগ-স্বত্তায় বিগলিত হয়ে যুগচেতনাকেই বিশেষভাবে মুক্তিদান করেছে, তাঁর ব্যক্তি কন্ঠে আমাদের শ্বাস্বত চাওয়াই যেন বাণী লাভ করেছে। ক্ষোভ-ঘৃণা, ভর্ৎসনা-জুগুপ্সার ক্ষত সঞ্চারীতে বিদীর্ণ পুঞ্জিভূত যুগের ক্রোধ জীবন-রুদ্রের উপাসক কাজী নজরুল ইসলামের অসংখ্য সৃষ্টিতে উদ্দীপিত ও মর্মরিত হয়ে উঠেছে। মানুষের হৃদয় যেখানে স্মিমিত, জীবনের গতিবেগ যেখানে স্তব্ধ, সেখানেই কবি উচ্চারণ করেছেন উজ্জীবন-সঙ্গীত। মুক্ত প্রাণধর্মের নীতিকে জয়যুক্ত করার জন্য অমর যৌবনের আগ্নেয় দুর্দান্ততাকে চাবুক মেরে সজাগ করে তুলেছেন। তাই তো কাজী নজরুল ইসলাম শুধু বিদ্রোহী কবি নন, তিনি নিপীড়িত মানুষের কবি, তিনি মানবিক প্রেরণার কবি, তিনি মানসিক উদ্দীপনার কবি এবং সর্বোপরি তিনি জাতীয় জাগরণের কবি।

সেই ছোট্টবেলায় কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় প্রথম শুনেছিলাম মুক্ত স্বাধীন ভোরের পাখির মত জাগরণের গান। সবাই যখন ঘুমিয়ে তখন ছোট্ট খোকা জেগে উঠে কিভাবে ভোরের আলোক রশ্মিমাখা প্রভাতকে ডেকে আনতে পারে আমরা তার ছবক পাই। ‘খোকার সাধ’ নামের সেই জাগরণী কিশোর কবিতায় তিনি লিখেছেনঃ

-আমি হব সকাল বেলার পাখি
সবার আগে কুসুম-বাগে উঠব আমি ডাকি’।

সূয্যি মামা জাগার আগে উঠব আমি জেগে,
‘হয়নি সকাল, ঘুমো এখন’ মা বলবেন রেগে।
বলব আমি আলসে মেয়ে ঘুমিয়ে তুমি থাকো
হয়নি সকাল তাই বলে কি সকাল হবে না কো
আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে ?

তোমার ছেলে উঠলে গো মা রাত পোহাবে তবে!

ঝর্ণা মাসি বলবে হাসি’ খোকন এলি নাকি ?
বলব আমি, ‘নই কো খোকন, ঘুম জাগানো পাখি !

এমনি করে আঁধারের গহীন সাগর পাড়ি দিয়ে আলো ঝলোমল সূর্যোদয়ের জন্য কাজী নজরুল ইসলাম জাগাতে শিখিয়েছেন। সে জাগরণ শুধু ব্রিটিশ দুঃশাসনের অন্ধকারের বিরুদ্ধে জাগরণ নয়, সে জাগরণ যেন সর্বকালের সর্বদেশের অমানিশার বিপরীতে সকল মানব শিশুর জাগরণ।

শাসক গোষ্ঠীর অত্যাচারের ষ্টিমরোলার যখন এই ভারতীয় উপমাহাদেশকে ক্ষত বিক্ষত করেছে, মানুষের মানবিকতাকে যখন পদদলিত করেছে এবং পরাধীনতার গ্লানি যখন মানুষের জীবনকে ব্যথিত করে তুলেছে, তখন তিনি জাগরণের বাণী শুনিয়েছেন তাঁর অমর কন্ঠে। তিনি বলেছেনÑ দূর্বার আন্দোলনে যদি স্বাধীনতা নাও আসে মানবতা মুক্তি পাবে নিশ্চয়ই ঃ

জাগো দুর্মদ যৌবন! এসো তুফান যেমন আসে
সমুখে যা পাবে দলে চলে যাবে অকারণ উল্লাসে,
আনো অনন্ত বিস্তৃত প্রাণ, বিপুল প্রবাহ গতি,
কুলের আবর্জনা ভেসে গেলে হবে না কাহারও ক্ষতি
বুক ফুলাইয়া দুখেরে জড়াও হাসো প্রাণ খোলা হাসি,

স্বাধীনতা পরে হবে- আগে গাও তাজা ব-তাজার বাঁশি।

সাগরে ঝাঁপিয়ে পড় অকারণে ওঠো দূর গিরি চূড়ে
বন্ধু বলিয়া কন্ঠে জড়াও পথে পেলে মৃত্যুরে।
ভোল বাহিরের ভিতরের যত বদ্ধ সংস্কার,
মরিচা ধরিয়া পড়ে আছো সব আলীর জুলফিকার
জাগো উন্মাদ আনন্দে দুর্মদ তরুণেরা সবে,
নাই বা স্বাধীন হলো দেশ, মানবাত্মা মুক্ত হবে।
[দুর্বার যৌবনঃ নতুন চাঁদ]

ঠিক তেমনি করে আমাদের বাংলাদেশের ঝঞ্ঝা বিক্ষুদ্ধ এই বিরূপ সময়ে আমাদেরও জাগতে হবে। দিগি¦জয়ী হযরত আলীর সেই তরবারীতে মরিচা পড়ে আছে। সেই মুক্তির সংগ্রামে যেন ভাটা পড়েছে। আজকে তাই সময় এসেছে নতুন করে জাগবার। নতুন করে আন্দোলন গড়ে তুলবার। যদি আমাদের মহৎ আদর্শ পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত নাও হয় তবুও অত্যাচারীদের পতন ঘটবে। আর আন্দোলন বেগবান হলে যারা আধমরা, যারা তাপহীন তাদের ভেতরেও গতি সঞ্চারিত হবে। আন্দোলন দূর্বার থেকে দূর্বারতর হবে। আর এ ক্ষেত্রে যুবকদেরকেও পালন করতে হবে অগ্রণী ভূমিকা। তাইতো কবির আহ্বান:

আয়রে সবুজ আয়রে কাচাঁ / আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা

রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে মানুষ যখন সহায়হীন এবং সম্বলহীন হতে চলেছিল, পুরো সমাজকে যখন জড়ত্ব গ্রাস করতে এসেছিল,
তখন কাজী নজরুল ইসলাম শোনালেন বন্ধন-মুক্তির গান। নিরন্ধ্র অন্ধকারের গ্লানির মধ্যে নিঃশেষিত মানুষকে শেখালেন মুক্তির মন্ত্র। জাতীয় জীবনের ভাবনায় সঞ্চার করলেন সংগ্রামী চেতনা, শেখালেন সাহসের সমাচারঃ

নাচে ঐ কালবোশেখী
কাটাবি কাল বসে’ কি?
দেরে দেখি
ভীম কারার ঐ ভিত্তি নাড়ি
লাথি মার, ভাঙরে তালা!
যত সব বন্দিশালায়
আগুন জ্বালা
আগুন জ্বালা ফেল উপাড়ি।
[ভাঙার গানঃ ভাঙ্গার গান]

নজরুল যুগে শাসক এবং শোষক শ্রেনীর অত্যাচারে মানুষের জীবন অতীষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। তারপরেও অত্যাচারের মাত্রা যেন দিনের পর দিন বেড়েই চলছিল। একের পর এক মানুষকে বন্দী করে ব্রিটিশ আধিপত্যাদীরা নির্মম নির্যাতন করেছে। জাগরণের ভোরের পাখি কাজী নজরুলও কিন্তু সে কয়েদখানা থেকে রেহায় পাননি। নিজেও যেমন জ্বলে উঠেছেন তেমনি কয়েদীদেরকেও জাগিয়ে তুলেছেন দেশলাইয়ের কাঠির মতন:

কারার ঐ লৌহ কবাট
ভেঙে ফেল্ কররে লোপাট
রক্ত জমাট
শিকল পূজোর পাষাণ বেদী !
ও রে ও তরুণ ঈশান!
বাজা তোর প্রলয় বিষাণ!
ধ্বংস নিশান
উড়–ক প্রাচী’র প্রাচীর ভেদি।
[কারার ঐ লৌহ কপাটঃ ভাঙার গান]
জেলখানার সেই বিদ্রোহ এবং জাগরণে ছিল একটি বৈপ্লবিক আত্ম তৃপ্তি। শিকল পরালেও সে শিকল একদিন বিকল হবে, সে বন্ধন একদিন মুক্ত হবে। বন্ধন না থাকলে তো সে বন্ধনকে ছিন্ন করা যায় না। শিকল না থাকলে তো সে শিকলকে ছেঁড়া যায় না। অন্যায়ের শিকল পরতে পরতেই একদিন শিকল শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু ন্যায়ের শেষ হবে না। মিথ্যা গলে যায় কিন্তু সত্য মরে না। বেঁচে থাকে চিরদিন। পরিশেষে সত্যের জয় হয়। তাই তো শিকলকে ভয় পাননি কাজী নজরুল ইসলাম। কয়েদীদের মনোবল বৃদ্ধি করতে তিনি লিখেছেন অবিনাশী গান:
শিকল পরাই ছল মোদের এই শিকল পরাই ছল
শিকল পরেই শিকল তোদের করব রে বিকল।
[শিকল পরার গানঃ বিষের বাঁশি]

শাসনের বেড়ি পরিয়ে মানুষকে যখন নির্যাতন করা হয়েছে, ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে, তখন নজরুল শুনিয়েছেন অভয় বাণী। সাহসের জয়গান গেয়ে মানুষকে উজ্জীবিত করেছেন। শাসকের ফাঁসির মঞ্চকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়েছেন। দু’চোখে জয়ের স্বপ্ন একেঁছেন। তিনি লিখেছেন সাহসের গান, বীরত্বের গানঃ

মোরা ভাই বাউল চারণ
মানিনা শাসন বারন
জীবন মরণ মোদের অনুচর রে-
দেখে ঐ ভয়ের ফাঁসি
হাসি জোর জয়ের হাসি
অ-বিনশী নাইক’ মোদের ডর রে।
[যুগান্তরের গানঃ বিশের বাঁশী]

শাসন-ত্রাসনে যারা পর্যদূস্ত, শোষণে পেষণে যারা হৃতসর্বস্ব তাদেরকে সর্বপ্রথম বন্ধন- মুক্তির চারণ- গীতি শোনালেন জাগরণের কবি কাজী নজরুল ইসলামঃ
জাগো
জাগো অনশন বন্দী ওঠ্রে যত
জগতের লাঞ্চিত ভাগ্যহত
যত অত্যাচারে আজি বজ্র হানি
হাঁকে নিপীড়িত- জন- মন- মথিত বাণী,
নব জনম লভি অভিনব ধরণী
ওরে ঐ আগত।
[অন্তর ন্যাশনাল সঙ্গীতঃ ফনিমনসা]
সেই যে নিপীড়ন, সেই যে মানবিক অনাচার, তার অবসান হয়নি আজও। আজকের বাংলাদেশেও মানুষের দুরাবস্থার সীমা নেই। রাজকীয় অত্যাচারে মানুষের প্রাণ ওষ্ঠাগত। কিন্তু এই অত্যাচার নিপীড়ন একদিন থাকবে না। নতুন দিনের শুভ সূচনা একদিন না একদিন হবেই।

আজ কৃষকের ঘরে ভাত নেই। সারের দাম গগণচুম্বী, কৃষিপণ্যের দাম কৃষকের নাগালের বাইরে। অনেক অর্থ ব্যয়ে দাদন ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে কৃষকেরা আবাদ করে। কিন্তু ফসল যখন ঘরে আসে, ন্যায্য দাম তারা পায় না। লাভের ধন টিয়া খেয়ে যায়। মধ্যস্বত্ব ভোগীরা আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়। তাই তো কৃষকদের আর বসে থাকলে চলবে না। প্রতিবাদ করতে হবে। অধিকার আদায় করতে হবে। নজরুলের কবিতায় যেন কৃষকদের জাগানো সেই উচ্ছ্বল বন্যা। বীরের মত গর্জে ওঠার প্রেরণাঃ

আজ জাগরে কৃষাণ সব তো গেছে কিসের বা আর ভয়
এই ক্ষুধার জোরেই করব এবার সুধার জগৎ জয়
ঐ বিশ্বজয়ী, দস্যু রাজার হয়-কে করব নয়
ওরে দেখবে এবার সভ্য জগৎ চাষার কত বল
[কৃষাণের গানঃ সর্বহারা]
খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের পেটে লাথি মেরে যারা মানুষের ক্ষুধার অন্ন কেড়ে খায়, তারাই আবার বড় গলাবাজি করে। নিরাপরাধ মানুষকে চোর ডাকাত বলে বিচারের নামে প্রহসন করে।
ছোট খাট অপরাধের দায়ে বড় সাজা দেয়। নিজের স্বার্থের লেলিহান শিখায় মানবতাকে পুড়ে ছারখার করে। সেই সমস্ত তথাকথিত অপরাধীদের(!) প্রতি কাজী নজরুল ইসলামের কোমল হৃদয়ে সীমাহীন ভালবাসা, আর তাঁর কন্ঠে শান্তনার বাণী। অপর দিকে ন্যায় নীতিহীন সমাজের বড় বড় চোর-বাটপারদের প্রতি তাঁর অসীম ঘৃণা। তিনি লিখেছেনঃ
কে তোমায় বলে ডাকাত, বন্ধু, কে তোমায় চোর বলে
চারদিকে বাজে ডাকাতী ডঙ্কা চোরেরই রাজ্য চলে
চোর ডাকাতের করিছে বিচার কোন সে ধর্মরাজ?
জিজ্ঞাসা কর বিশ্ব জুড়িয়া কে নহে দস্যু আজ?
[চোর ডাকাতঃ সাম্যবাদী]
আজকের বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে আমরা কি দেখতে পাই? বর্তমানে যারা সবচে’ বড় চোর, তারাই সমাজের বড় কর্তা। তারাই ছিঁচকে চোরের বিচার করে। যারা সাধারণ মানুষের বুকে লাথি মারে, তারাই বড় নেতা। যারা সব চেয়ে বড় দূর্নীতিবাজ, তারাই দূর্নীতির বিরোধী মিছিল করে। যারা মানুষের বুকে ছুরি মারে, যারা অনবরত মানুষ খুন করে, আদম সন্তানের বুকের রক্তে রজপথ লালে লাল করে, মনুষত্য এবং মানবতাকে পায়ের তলায় পিষ্ঠ করে, প্রকাশ্য দিবালোকে রাস্তার উপরে সাপের মত লগি বৈঠা দিয়ে মানুষ পিটিয়ে হত্যা করে, তারাই আবার মানবতা বিরোধী অপরাধের নামে নিরীহ এবং নিরাপরধ মানুষকে বিচার প্রহসনের কাঠ গড়ায় দাঁড় করায়।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও আজকে অসৎ জোচ্চোর দাগাবাজদের দৌরাত্ব। যারা অনবরত সন্ত্রাস চালিয়ে সারা বিশ্বকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে, দেশের পর দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে নস্যাৎ করে চলেছে, তারাই সবচেয়ে বড় শান্তিবাদী। যাদের হাতে সারা পৃথিবীকে মাত্র ৪ মিনিটে ধ্বংস করার মত পারমাণবিক অস্ত্র আছে, তারাই বিশ্বব্যাপী পরমাণু নিরস্ত্রীকরণে সব থেকে সরব। যারা একের পর এক দুনিয়া ব্যাপী মুসলিম নিধন যজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে, তারাই মুসলমানদেরকে জঙ্গী আখ্যা দিয়ে মুসলিম রাষ্ট্রসমূহকে দখল করে নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা জাতিসংঘে তারাই সব চেয়ে বড় নেতা। তাদের অঙ্গুলী নির্দেশেই জাতি সংঘ উঠে আর বসে। নজরুলের যগেও এর ব্যতিক্রম ছিল না। তাই তো নজরুলের কবিতায় এমন অনল বর্ষণঃ
যারা যত বড় ডাকাত দস্যু জোচ্চোর দাগাবাজ
তারা তত বড় সম্মানী গুণী জাতিসঙ্ঘেতে আজ।
[চোর ডাকাতঃ সাম্যবাদী]
এই সমস্ত কুটচালের বিরুদ্ধে কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন আজীবন সোচ্চার। নিরীহ নিপীড়িত মানুষের জাগরণই ছিল যেন তার জীবনের লক্ষ্য। ঘুমন্ত জাতিকে স্বপ্ন দেখানোই যেন তার জীবনের এক মাত্র সাধনা। মুসলিম জাতি এক সময় সারা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল। অন্যায়ের প্রতিরোধে সদা সোচ্চার ছিল তারা। কারণ সমগ্র মানব জাতির কল্যাণের জন্য মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে তাদের কাছে ছিল মহাগ্রন্থ আল কোরআন। সেই মহাগ্রন্থ আজো আছে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী অন্যায় অবিচার চললেও মুসলমানেরা বড় নীরব। ইহুদী খৃষ্টানদের হাতে মুসলিম জাতি জিম্মী। অথচ তাদের হাতে আজ প্রতিরোধের শক্তি নেই। মুখে আজ প্রতিবাদের ভাষা নেই। দূর্বার গতিতে জ্বলে উঠার শক্তি বুকে নেই। তাই তো সেই ঘুমন্ত মুসলিম জাতিকে জাগরণের জন্য তিনি লিখেছেন অমর গানঃ
বাজিছে দামামা বাঁধরে আমামা
শির উচুঁ করি মুসলমান
দাওয়াত এসেছে নয়া জামানার
ভাঙ্গা কেল্লায় ওড়ে নিশান ॥
মুখেতে কালেমা হাতে তলোয়ার
বুকে ইসলামী জোশ দূর্বার
হৃদয়ে লইয়া এশ্ক আল্লাহর
চল আগে চল বাজে বিষাণ
ভয় কিরে তোর গলায় তাবিজ
বাঁধা যে ঐ পাক কোরআন ॥
অন্যায় অপকর্মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হযরত আলীর মত জেগে ওঠার জন্যও আহ্বান করেছেন কাজী নজরুল ইসলাম। যেই আলীর নেতৃত্বে মুসলিম বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে মুসলমানেরা জয়ী হয়েছিল খয়বর যুদ্ধে, সেই আলীর মত শক্তি সাহস নিয়ে জেগে ওঠার আহ্বান তাঁর মুসলিম জাতির প্রতিঃ
খয়বর জয়ী আলী হায়দার
জাগো জাগো আরবার ॥
ইসলাম মামুলী আচার অনুষ্ঠানের ধর্ম নয়। ইসলাম বিপ্লবী জীবন বিধান। সে জড়তার ধর্ম নয়, পরাজয়ের ধর্ম নয়। সে সুন্দরের ধর্ম, কল্যাণের ধর্ম, সে বিজয়ের ধর্ম । বাঙ্গালী হিসেবে নজরুল যেমন দেশের নব জাগরণকে দিয়েছেন বিশেষ রূপ এবং বিশেষ প্রেরণা, তেমনি একজন খাঁটি মুসলমান হিসেবে মুসলিম জাতিকেও শুনিয়েছেন নব জাগরণের বাণী। তাদের জীবন হতে সর্বপ্রকার জড়তা দূর করে ইসলামের সত্যিকার সৌন্দর্য ও মর্মবাণী উপলব্ধি করার আহ্বান তার অসংখ্য কবিতা ও গানে। তিনি বলেছেন মুসলমানরা বীরের জাতি, তারা কাঁধে ভিক্ষার ঝুলি রাখতে জানেনা। তারা রাখতে জানে তলোয়ার। তারা পরাজয় মানে না, পরাধীনতা মানে না। তারা স্বাধীনতার সূর্যকে উদিত করতে জানে, তারা বিজয়ের হাসি হাসতে জানে। প্রয়োজনে নিজেদের মস্তক দিতে জানে, কিন্তু কোন অন্যায়ের কাছে মাথা নত করতে জানে না। বিজয়ের উন্নত পাগড়ী ধূলায় লুটাতে দিতে পারে না। “মহররম” কবিতায় তিনি লিখেছেনঃ

দ্রিম দ্রিম বাজে ঘন দুন্দুভি দামামা
হাঁকে বীর শির দেগা নেহি দেগা আমামা

কিন্তু ইসলামের সেই সুমহান শিক্ষাকে মুসলমানেরা আজ ভুলে গেছে। তারা সঠিক ঈমানের পথে নেই। এই সমস্ত ভীরু কাপুরুষদেরকে তিনি বে-ঈমান বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাদেরকে ধিক্কার দিয়েছেন। “আনওয়ার” কবিতায় তিনি লিখেছেনঃ

আনওয়ার ! আনওয়ার!
যে বলে মুসলিম জিভ ধরে টানো তার।
বেঈমান জানে শুধু জানটা বাঁচানো সার।
আনওয়ার! ধিক্কার!
কাঁধে ঝুলি ভিক্ষার
তলওয়ারে শুরু যার স্বাধীনতা শিক্ষার।

তবে কেবল প্রেমের আদর্শ প্রচার করে এই পৃথিবী থেকে অধর্ম, অন্যায়, অবিচার, দূর্নীতি, শোষণ- নিপীড়ন দূর কর সম্ভব নয় বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। তাই তো মানব প্রেমের নবী, ভালবাসার নবী ঈসা (আঃ)কে তিনি চাননি। কিয়ামতের পূর্বে হযরত ইসা (আঃ) না কি আবার ইমাম মেহেদী নামে এই পৃথিবীতে আসবেন। কিন্তু তাঁকে স্বাগত জানাতে চাননি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি বলেছেন ঈসা (আঃ) যদি আসেনই তাহলে তিনি যেন মহান বীর খলেদ সাইফুল্লাহর মত তরবারী হাতে নিয়ে অত্যাচরীদের হন্তারক রূপে বীরের বেশে আগমন করেন। “খালেদ” কবিতায় তিনি লিখেছেনঃ

খোদার হাবিব বলিয়া গেছেন আসিবেন ঈসা ফের
চাইনা মেহেদী, তুমি এসো বীর হাতে নিয়ে শমসের।
[খালেদঃ জিঞ্জির]
তাই বলে নিরেট ঝঞ্ঝার পূজারী কাজী নজরুল ইসলাম নন। তিনি নিরর্থক হানাহানীর উর্ধে। হিংসা বিভেদের বিরুদ্ধে অবস্থান তার। শান্তির পায়রা হয়ে এক আল্লাহর জয়গান তাঁর মুখে। তিনি লিখেছেনঃ

উহারা প্রচার করুক হিংসা বিদ্বেষ আর নিন্দাবাদ
আমরা বলিব ‘সাম্য, শান্তি এক আল্লাহ জিন্দাবাদ’।
[এক আল্লাহ জিন্দাবাদ]

ভারতীয় উপমাহদেশে মুসলমানদের সংখ্যা যেমন অনেক, হিন্দুদের সংখ্যাও কম নয়। ব্রিটিশ বেনিয়ারা যেহেতু মুসলিম নবাব সিরাজ উদ্দৌলাকে প্রতারিত করে এই ভারতীয় উপমহাদেশের শাসন ক্ষমতা দখল করেছিল, সেহেতু মুসলিম জনগোষ্ঠি প্রচন্ডভাবে ব্রিটিশ বিরোধী ছিল এবং তারা ব্রিটিশদের ছায়া মাড়াতেও ঘৃণা বোধ করত। পক্ষান্তরে হিন্দু সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা মনে প্রাণে ব্রিটিশ বিরোধী হলেও অনেকেই ব্রিটিশদের ছোঁয়ায় নিজেদের ভাগ্যের উন্নয়ন করেছিল। নিজেদেরকে শিক্ষা দীক্ষায় এবং অর্থ সম্পদে সমৃদ্ধ করতে পেরেছিল। ফলে ব্রিটিশদের অন্যায় অপকর্মের প্রতিবাদ তারা করেনি। কিন্তু তাদেরকে মনে করিয়ে দিতে চেয়েছেন যে তাদের ধর্মদেবী দশভূজা মা দূর্গা অন্যায়ের বিরুদ্ধে যেন বিরাট শক্তি। তার দশটি বাহু পেশী শক্তির প্রতীক। সে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয় না। অন্যায়ের কাছে মাথা নীচু করে না। প্রতি বছর মা দূর্গা আসেন কল্যাণের বার্তা নিয়ে। আরেক দেবী মা কালীও প্রতিবছর আসেন সমস্ত অন্যায় অপকর্মের বিরুদ্ধে খড়গ হাতে নিয়ে, যিনি অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজের প্রাণপতির বুকেও পা দিয়েছিলেন, হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিলেন। তিনিও যেন নিশ্চুপ। এত অন্যায় অবিচার দেখেও যেন দেখছেন না কেউ। শক্তির প্রতীক দেবীরা যেন পাষাণী! ব্রিটিশেরাই শুধু স্বদেশীদের রক্ত শোষণ করছে না। শক্তির আধার দেবীও যেন পুত্র-হন্তারক রূপ লাভ করেছেন। প্রতিবছর মানুষের কল্যাণের বারতা নিয়ে দেবী আসেন। কিন্তু মানুষের কল্যাণ হয় না। মানুষের রক্ত ঝরে। খুন হয়। প্রতিবছর পূজাতে তার বেদীতে বলী দেয়া পাঁঠার রক্ত খেয়েও তার যেন ক্ষুধা মিটছে না। তাই তিনি আপন সন্তানের (জনগণের) রক্ত পান করতে চান। সে কারণেই তিনিও জেগে উঠছেন না। আর তার সন্তানেরাও প্রতিবাদ করছে না। তাই তো কবির বিস্ময় প্রকাশ; আর অভিমানী কন্ঠের উচ্চারণ:

বছর বছর এ অভিনয় অপমান তোর, পূজা নয়-এ
কি দিস আশিস কোটি ছেলের প্রণাম চুরির বিনিময়ে
অনেক পাঁঠা মোষ খেয়েছিস রাক্ষসী তোর যায়নি ক্ষুধা;
আয় পাষাণী এবার নিবি আপন ছেলের রক্ত সূধা!
[আনন্দময়ীর আগমনে ]

কিন্তু এভাবে তো চলতে দেয়া যায় না। মাটির মূর্তির মধ্যে দৈব শক্তি শুধু লুকিয়ে থাকলে তো জনগণের মুক্তি মেলে না। দৈবশক্তি এবার জনশক্তিতে পরিণত হওয়া দরকার। তাই তো মা দূর্গা আর মা কালীর পূজারীদের প্রতি জেগে ওঠার আহবান কবির। কেননা রাষ্ট্র ক্ষমতায় এখন আর মানুষ নেই। মহান সৃষ্টিকর্তা মানুষকে পাঠিয়ে এই পৃথিবীকে যে স্বর্গ বানিয়েছেন, সে স্বর্গ এখন অত্যাচারী চাঁড়ালেরা দখল করে নিয়েছে। আর দেবীর সন্তান মাটির মানুষকে কসাইয়ের মতন জবাই করছে। এই স্বদেশকে আজ কসাইখানায় পরিণত করেছে। যারা প্রতিবাদী, যারা ন্যায়ের কথা বলে, তাদেরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করছে। তবুও সর্বনাসী মা দেবী কি তা দেখতে পাচ্ছেন না? তার নিজের শক্তি কি তিনি ভুলে গেলেন? তাহলে তিনি আর কতকাল মাটির মূর্তির আঁড়াল হয়ে থাকবেন? তার শক্তি প্রদর্শনের প্রয়োজন এখন।
তাই তো দেবীকে স্বরূপে আবির্ভূত হবার আহবান কবির কন্ঠে:

আর কত কাল থাকবি বেটি মাটির ঢেলার মূর্তি আঁড়াল
স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল!
দেবশিশুদের মারছে চাবুক বীর যুবাদের দিচ্ছে ফাঁসি
ভূ-ভারত আজ কসাইখানা আসবি কখন সর্বনাসী?
[আনন্দময়ীর আগমনে]
কাজীর যুগে যে রাষ্ট্র ব্যবস্থা দেবশিশুদের চাবুক মেরেছে, আজকের নতুন ফর্মের অত্যাচারী শক্তি সেই আদম সন্তানকে বিনা বিচারে ডান্ডা বেড়ী পরাচ্ছে। রিমান্ডের নামে চাবুক-পেটা করে হাড়গোড় ভেঙ্গে দিচ্ছে। আর যারা প্রতিবাদী সেই সমস্ত বীর যুবকদের ধরে মুরগীর খাঁচার মতন জেলে পুড়ে বন্দী রাখছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কেউ টু শব্দ করলেই তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তারপর তার আর খোঁজ মিলছে না। কাজী নজরুল ইসলামের যুগে যে কসাইখানা ছিল তা কি আজ স্বপ্নের স্বর্গে পরিণত হয়ে গেছে? না, আজও অবস্থা সেই আগের মতনই আছে। এখনও শত শত মানুষ গুম হচ্ছে। প্রকাশ্য দিবালোকে রাস্তার উপরে লগি বৈঠা দিয়ে সাপের মত পিটিয়ে দূর্বৃত্তরা মানুষ হত্যা করছে। ছুরিকাঘাত করে রাজপথ লালে লাল করছে। এমন কি নিজের ঘরেও নিরাপদ নয় মানুষ। বেডরুমের ভেতরে ঢুকে শিশু সন্তানের সামনে চাকু দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে মা বাবাকে হত্যা করা হচ্ছে। সন্তানের আর্ত চিৎকারে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠছে। কিন্তু সে আর্ত চিৎকার বাতাসেই মিলিয়ে যাচ্ছে। শুনছেনা কেউ। রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তি যিনি তিনিও বলছেন- কারও বেডরুম পাহারা দেয়ার দায়িত্ব সরকারের নয়। তিন মাসের দুধের শিশুও ছিনতাইকারী চাঁদাবাজদের হাতে থেকে রেহাই পাচ্ছে না। শুধু তাই নয়, ক্ষুধা ক্লিষ্ট নিরীহ যুবতীকে একমুঠো ভাতের প্রলোভন দেখিয়ে তাকে নিজ বাসায় বা অফিসে ডেকে এনে ধর্ষণ করা হচ্ছে। এই সমস্ত দুস্কৃতিকারীদের লোক লজ্জা(?) এতই বেশী যে, সমাজে যাতে তারা অপমানিত না হয় তার জন্য তারা সেই উঠতি বয়সের যুবতীতে জবাই করে হত্যা করছে। সেখানেই শেষ নয়, কসাই যেমন করে ছাগলকে জবাই করার পর গায়ের চামড়া ছিলে গোস্ত কেটেকুটে পসরা সাজায়, তেমনি করে লাশ গুম করার মানসে সেই যুবতীর গায়ের চামড়া ছিলে কেটেকুটে ২৬ টুকরা করে পাশের বিল্ডিংএর ছাদে, রাস্তায়, বাথরুমের কমোডে বিভিন্ন জায়গায় ছুঁড়ে ফেলছে। বড় কষ্ট লাগে! তবুও বলতেই হয় -আজকের বাংলাদেশই বা কসাইখানার চেয়ে কম কিসে? অবাক করা বিষয়- আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাকের ডগার উপরে এসব লোমহর্ষক ঘটনা ঘটলেও তার কোন প্রতিকার হয় না। উল্টো যারা ভিক্টিম তাদেরকে ঘর ছাড়া হতে হয়। আইনের আশ্রয় চাইতে গেলে জীবন হাতে নিয়ে কোর্টের বারান্দায় যেতে হয়। অথচ পাষন্ড খুনীরা দিব্যি ঘুরে বেড়ায়। ভুক্তভোগীরা বিচার পায় না। বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে। যারা সমাজে কিলার এবং সন্ত্রাসী বলে কুখ্যাত তারাই রাষ্ট্রের কর্ণধার। আবার আইনের পোশাক পরে সন্ত্রাসের লাইসেন্স পেয়ে যায় কেউ কেউ। অবাধে সন্ত্রাস চালিয়ে তারা রাজপথ দখল করে নেয়। নিরাপরাধ, নিরীহ এবং অন্যায়ের প্রতিবাদকারী মানুষদেরকে বেকায়দায় ফেলতেই তারা ব্যতি-ব্যস্ত। এই সুযোগে দেশকে অপকর্মের অভয় অরণ্য বানিয়ে নিয়েছে দূর্বৃত্তরা। তাই তো সে পাষন্ডতার বিরুদ্ধে নজরুলের প্রতিবাদ। সেই সাথে তার অমর কন্ঠে জাগরনের বাণী। হিমালয়ের মতন মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর আহ্বান। আত্মসমর্পণ না করার আহ্বান। সবাই মিলে জাগ্রত হওয়ার প্রেরণা।

বাংলা সাহিত্যের অমর কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হতাশা থেকে উত্তরণের জন্য একলা চলার কথা বলেছেন। তিনি গেয়েছন- কাউকে সাথে না পেলেও একাই চলতে হবে। থামা যাবে না। হতাশ হলে চলবে না-

যদি তোর ডাক শুনে কেই না আসে
তবে একলা চল রে ॥

নজরুল কিন্তু একলা চলার পক্ষে নন। তার কন্ঠে বিশ্বজোড়া বিপ্লবের আহ্বানে তেজদীপ্ত ঘোষণা, সম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ আর নিপীড়নের বিরুদ্ধে আপোষহীন বাণীঃ

বল বীর বল উন্নত মম শির
শির নেহারী আমারই নত শির ওই শিখর হিমাদ্রির
বল বীর
বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাঁড়ি
চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি
ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া।
খোদার আসন আরশ ছেদিয়া
উঠিয়াছি চির বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাত্রীর
মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ রাজটিকা দীপ্ত জয়শ্রীর।
বল বীর আমি চির উন্নত শির !
[বিদ্রোহী : অগ্নি বীণা]
আর সেই উন্নত শির, সীসাঢালা প্রচীর সমান ঐক্য এবং সর্বোপরি মানব কল্যাণে প্রণান্তকর প্রচেষ্টাই কেবল খুলে দিতে পারে মুক্তির পথ। সেই সাথে ঐশী শক্তির বড় প্রয়োজন আজ। মহান সৃষ্টিকর্তার সাহায্যের মুখাপেক্ষী হওয়া ছাড়া আর কোন পথ নেই মানুষের। এই কঠিন নিদানে একমাত্র আল্লাহ্র শক্তিই বাতলে দিতে পারে মুক্তির পথ। মহান সৃষ্টিকর্তার বিধান এই পৃথিবীতে জয়ী হলে মানুষের জীবন কল্যাণময় হতে পারে। বোধ করি, সে কারণেই নজরুলের কন্ঠে আল্লাহর দ্বীনের জয় কামনাঃ
জয় হোক! জয় হোক! আল্লাহর জয় হোক!
শান্তির জয় হোক! সাম্যের জয় হোক!
সত্যের জয় হোক! জয় হোক! জয় হোক!
আল্লাহর জয় হোক!
[জয় হোক, জয় হোক]
উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে এ কথাই প্রতীয়মান হয় যে, কাজী নজরুল ইসলামের বাণী চিরন্তন। তার ভাব এবং ভাষা অমর। তিনি ছিলেন মূলতঃ সর্বকালের জাগরণের কবি। নজরুল তার যুগেও যেমন জাগ্রত বিবেকের কন্ঠস্বর ছিলেন, আজকের যুগেও তার কবিতা-গানসহ সকল সাহিত্য কর্মই বিবেকের দ্বারে কড়া নাড়ে। যত দিন অন্যায় অবিচার থাকবে, যতদিন মানুষ অত্যাচারিত হবে ততদিন তিনি বিদ্রোহ, বিপ্লব আর জাগরণের অগ্নিবীণা হাতে সম্মুখে দাঁড়িয়ে যাবেন। পৃথিবীর আদিকাল থেকেই মানুষের ভেতরে পশুত্ব বাসা বেঁধেছে। তাই তো সব যুগেই মানুষের পাশবিকতার ইতিহাস ছিল। সেই সাথে মুক্তি সংগ্রামেরও জয়গান ছিল। কোন বিশেষ যুগে কোন বিশেষ ব্যক্তি মুক্তির মূল মন্ত্র নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন। সে যুগের পরে অনেক ত্রাণকর্তার নামই মিশে গ্যাছে। কিন্তু নজরুলের জাগরনী উপস্থিতি ততদিন থাকবে যতদিন বাংলা সাহিত্য থাকবে, বাংলা ভাষা থাকবে। তিনি নিজেই বলেছেন- ‘আমি যুগে যুগে আসি/ আসিয়াছি পুনঃ বিপ্লব হেতু’। সুতরাং সব যুগেই নজরুলের সৃষ্টি মানুষের মাঝে প্রেরণার উৎস হয়ে বেঁচে থাকবে বলে আশা করা যায়।

০৩.০৬.২০১২