নববর্ষ আমার পিতা পিতার পিতা তার পিতা কিভাবে পালন করেছে তা আজ মূখ্য হয়ে ওঠছে না। গোলাকায়নের যুগে আজ সবই বাণিজ্যিক। তাই আমাদের আনন্দ উৎসব সবই বাণিজ্যের হেয়াজতে চলে গেছে। প্রতিবছর সকল প্রকার উৎসবকে সামনে রেখে পসরা সবায় বেনিয়া। আমরা আনন্দ উপভোগ করতে তাদের খরিদদার হয়ে ওঠি। নববর্ষ এর বাইরে নয়। মামুলি এক পর্বকে সামনে রেখে বেনিয়ারা করে তুলেছে বাণিজ্যের অন্যতম নেয়ামক। তাদের বাণিজ্যের পরিধি বৃদ্ধির জন্যই দরকার উৎসব। তাই তারা যেকোনো পর্বকে উৎসবে রূপ দেয়ার জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে মিডিয়ায়। আর এই মিডিয়ার সহায়তায় ছোট উৎসবকে বৃহত্তর উৎসবে রূপান্তরিত করে। কিন্তু এবার করোনার করাল গ্রাসে বেনিয়াদের পসরা না বসলেও সৃজনশীল মানুষ তাদের সৃজনক্রিয়া বন্ধ করেনি। তাদের সৃজনে উঠে এসেছে পৃথিবীর কল্যাণের কথা। উৎসবের কথা। ভালোবাসার কথা। মোলাকাতের এই সংখ্যা সবাইকে সচেতন করবে আশা করা যায়। উৎসবকে বেনিয়ার চোখে না দেখে প্রকৃতির ভালোবাসায় দেখবে বলে আমরা আশা প্রকাশ করি।
আফসার নিজাম, সম্পাদক

সূ চি প ত্র

প্রতি বৈশাখে :: রেজাউদ্দিন স্টালিন
পাপহীন নববর্ষ :: আসাদ বিন হাফিজ
স্বাগত বৈশাখ :: তৈমুর খান
পহেলা বোশেখ :: ফরিদুজ্জামান
বৈশাখ :: কাজী রহিম শাহরিয়ার
বৈশাখ :: চন্দ্রশিলা ছন্দা
বোশেখ স্মৃতি :: মহিউদ্দিন বিন্ জুবায়েদ
স্বাগত নতুন :: কিশলয় গুপ্ত
বৈশাখ এলে :: রুদ্র সাহাদাৎ
এবারের বৈশাখে যদি বেঁচে যাই :: শাহীন খান
প্রিয় নতুন বর্ষ :: শঙ্খশুভ্র পাত্র
চোখ পড়লেই হাসি দেই দূর বহুদূরে :: মোস্তফা হায়দার
কৃষকের দিনলিপি :: হাসান আবু নাঈম
বোশেখ মানে :: আশরাফ আলী চারু
আজ এ বৈশাখে :: ইসমাইল বিন আবেদীন
বৈশাখ এলো :: শেখ একেএম জাকারিয়া
রঙ্গিন বৈশাখ :: সালমা বিনতে শামছ
বৈশাখ ১৪২৭ :: অর্নিয়া অর্থি
আনন্দ আলোকে :: বিকাশ চন্দ
নববর্ষের শুভেচ্ছা :: সাকিব জামাল
স্বাগতম বৈশাখ :: প্রদীপ দত্ত
হবে জয় নিশ্চয়ই আমাদের :: উৎপলকান্তি বড়ুয়া
নববর্ষ :: শুক্লা রায়
বোশেখ মেলা :: শেলীনা আকতার খানম
মাটির থালায় ধান :: হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়
বৈশাখী রঙ :: মজনু মিয়া
মহানির্বাণের পরে :: শুভঙ্কর দাস
কালবৈশাখী :: তারিকুল ইসলাম সুমন
প্রতীক্ষা :: শুভ্রাশ্রী মাইতি
এসো হে নববর্ষ :: আবুল খায়ের নাঈমুদ্দীন
নববর্ষ :: সৈয়দ আছলাম হোসেন
বর্ষ শুরুর ছড়া :: মুজিব হক
বাংলার বৈশাখ :: শওকত আলম
বোশেখ :: মির্জা মুহাম্মদ নূরুন্নবী নূর
হালখাতা :: হুসাইন দিলাওয়ার
কুয়াশা ভেজা নববর্ষ :: বিমল মণ্ডল
নববর্ষের নব উৎসব :: কবির কাঞ্চন
বৈশাখ ও স্বপ্নের কথকতা :: কমল কুজুর

প্রতি বৈশাখে
রেজাউদ্দিন স্টালিন

হালখাতা ভিজে সাদা হয়ে আছে কান্না,
অক্ষরগুলো দেনা-পাওনার পান্না।

প্রতি বৈশাখে জীবিকার সংঘর্ষ,
ম্লান করে দেয় নির্মল নববর্ষ।

তবু বুকে হেঁটে এতোদূর এই বাঙলা,
বিদ্যুৎ দিয়ে সাজিয়েছে ঘর জাঙলা।

পাপহীন নববর্ষ
আসাদ বিন হাফিজ

পাপহীন নববর্ষ
করোনার দান
নববর্ষের পান্তাভাত
ঘরে বসে খান।

স্বাগত বৈশাখ
তৈমুর খান

নববর্ষ, লিখছি তোকে
এই আমাদের ভাঙাচোরা দেশ
সম্প্রীতির আলো জ্বেলে আয়
আঁধারে আজ হানছে বিদ্বেষ।

ঝরাপাতার বন পেরিয়ে
সবুজ পাতা হাসে
অবুঝ কেন যুগের বাতাস
আগুন দিতে আসে?

ডাইনে বাঁয়ে দুটি হাতেই
আলিঙ্গনের ডাক
কালের মানুষ নববর্ষে
নতুন বন্ধু পাক।

দুঃখবনে উড়ুক পাখি
সুখের গানে আনন্দ সব পাক
ঢেউ উঠুক মরা গাঙে
সম্পর্কের ডিঙি ভেসে যাক।

পহেলা বোশেখ
ফরিদুজ্জামান

ঢেকে রাখি দুখ পেটে লাগা ভুক
এই মহামারী কালে।
পহেলা বোশেখ আজ দিল ঠেক
গাটতি যখন চালে।
খেয়ে চমচম চড়ে টমটম
দেইনিতো চক্কর।
হাতে নাই কাজ এ বেকার আজ
ফকির ও ফক্কর।
গাঁজনের মেলা চড়কের চেলা
বসে নাই রথখোলা।
মঙল ওড়েনি মিছিল ঘোরেনি
তাই মন আলাভোলা।
কুলা ডুলা বাঁশি বড় ভালোবাসি
তার থেকে আজ দূরে।
মনজোড়া বাঁধ ওঠে অনুনাদ
মন ভাঙ্গার সুরে।
ভাঙে মনতীর তাই বিড়বিড়
করে বলি কতো কথা।
দুঃখে কাতর যে হল পাথর
ভাঙে নাই নীরবতা।
মৃত যে আপন দূরেতে দাফন
বুকেতে জগদ্দল।
এমন নিদানে মেনেছি বিধানে
ধরে রেখে মনোবল।
ক্ষুধার দুনিয়া গদ্য ধুনিয়া
পদ্য লেখার দায়।
যদি মহামারী লাশ সারি সারি
শীঘ্রই উবে যায়।
হাতে নিয়ে বাতি কেউ অমারাতি
বিদূরিত করে যদি।
ফের হবে মেলা সুজনের বেলা
ধরাধামে নিরবধি।

বৈশাখ
কাজী রহিম শাহরিয়ার

নতুন দিনের গান এলোমেলো বাতাসের বাঁকে
জীবনের, প্রকৃতির ভাঙাগড়া খেলা দেখি আমি
পুরনো দিনের স্মৃতি, দোলে মেঘে আসন্ন আগামী
জীর্ণতা ঘুচাতে জানি, আনে ঝড় আরুদ্র বৈশাখে

কালের বৈশাখী ঝড় চেতনাকে জাগাতে কি আসে?
অজস্র শক্তির দ্বার খুলে দিতে তার আগমন
অন্তরে আরেক ঝড় বয়ে যায়, দোলে এই মন
অজানা শংকায়, তবে এ ঝড়ের আড়ালে কে হাসে?

নির্দয় ঝড়ের শক্তি কার মহাশক্তির স্মারক?
মেঘপুঞ্জে লেখা তার সব কথা, সব সুর, গান
অপার্থিব দ্যুতি এক চেতনায় জ্বলে অনির্বাণ
যৌবনের দীপ্ত তেজ, যেন মহামুক্তির আরক!

জীবন-মৃত্যুর ছবি বৈশাখের উদ্যাম হাওয়ায়
যেন মহা-প্রলয়ের আগাম খবর দিয়ে যায়!

বৈশাখ
চন্দ্রশিলা ছন্দা

চোখ যায় যদ্দুর
মাঠপোড়া রোদ্দুর
চৈত্রের দুপুরে
খাঁ খাঁ শূন্যতা
হাঁটু জল পুকুরে।

এরমাঝে কড়া নাড়ে
মধুমাস বৈশাখ
উৎসব হালখাতা
পার্বণ ঢোল ঢাক

আনন্দ উল্লাস
খৈ মুড়ি মুড়কি
বৈশাখ বরণে
চাই চিড়া গুড় কি?

চাই ছড়া কবিতা
গান আর মেঠো সুর
আনন্দ হরষে
দুঃখকে করি দূর।

বোশেখ স্মৃতি
মহিউদ্দিন বিন্ জুবায়েদ

আম কুড়ানি দেখা যায় না
বোশেখ মাসে ঝড়ে,
কই হারালো এসব স্মৃতি
মন যে কেমন করে।

ছোট ছোট আমের চারা
হাতের কাছেই ধরে,
ঝড় তুফানে আম পড়ে না
কুড়াই কেমন করে?

ঘরের দোরেই আম গাছটি
আমের থোকা ঝুলে,
মনে চাইলেই হাত বাড়িয়ে
নেই যে মুঠে তুলে।

স্বাগত নতুন
কিশলয় গুপ্ত

না, আমাকে নয়- ভালো তুমি অন্য কাউকে বাসো
জানি তো, এই অনন্ত আকাশও
ধরে রাখে না শুধুই একলা চাঁদ
যেমন গৃহস্থ চাষী- চাষাবাদ
শেষে পাখীরা অবহেলিত ধান খুঁটে খায়।

মাটির গভীরে থাকা ইচ্ছাদের ডাকি- উঠে আয়
আমাদের যেতে হবে বহুদূর
আপাতত এখানে রোদ্দুর
পেতেছে শামিয়ানা। দৃষ্টি রেখেছে পথ

হে ত্রিকালদর্শী, অনন্তবর্ষীয় হজরত
নক্ষত্রের মাটির বাড়ীতে
কে রাখবে পা- কে সাজবে সনাতন শাড়ীতে
সে গল্প সাধারণ পাঠকের অজানা থাক
সূর্যের সাথে জ্যোৎস্নার অনেকটা ফারাক।

জানি, একদিন মরে যাবে শ্বাশত সর্বনাশও
না, আমাকে নয়- ভালো তুমি অন্য কাউকে বাসো

বৈশাখ এলে
রুদ্র সাহাদাৎ

বৈশাখ এলে গ্রামের কথা মনে পড়ে খুব
আমাদের মাটির টিনশেড দুতলা বাড়ি,মাটির সিঁড়ি
পিতামহের হাতে গড়া, মক্তবে হুজুরের বয়ান করা যেনো সেই স্বর্গ।

এখনো আমাদের একই ঠিকানা
গোরকঘাটা, বুধাগাজী পাড়া, আলিশান রোড়।

স্মৃতিতে চলচ্চিত্রের মতোন ভাসে শৈশব

বাবার কড়া শাসন, মায়ের ধমক যা পড়তে বস
ভাইয়ের আদর, দিদির ভালোবাসা।

বৈশাখ এলে আমি নিজেই আঁকি নিজের ছবি
ঘুমের ঘোরে হারানো দিন খুঁজি
মাঝেমাঝে আমিও হয়ে যাই কবি

এত্তোকিছু বুঝি না হারানো ভালোবাসাই খুঁজি…

এবারের বৈশাখে যদি বেঁচে যাই
শাহীন খান

এবারের বৈশাখ সাদামাটা খুব
বিরহের দরিয়া দিছে সে যে ডুব।
ঘর বন্দি মানুষের করুন দশা
আঁধার নেমে এলো যেন সহসা!

এবারের বৈশাখ “কোভিডে” ভরা
দিশেহারা হয়ে আছে বসুন্ধরা
দিনদিন বেড়ে চলে লাশের বহর
নেই নেই ভালো নেই মনের শহর!

এবারের বৈশাখ নয় ইলিশের
নয় নয় সে তো নয় পান্তাভাতের
সুনশান নিরাবতা বেদনা মাখা
কষ্টের কালিমায় রয়েছে ঢাকা।

এবারের বৈশাখে যদি বেঁচে রই
নিয়মিত নামাজেতে আমি দাঁড়াবই
দোয়া চাই দোয়া করো ওহে রহমান
চিকিৎসার পথ্য করো কিছু দান।

প্রিয় নতুন বর্ষ
শঙ্খশুভ্র পাত্র

আগুনঝরা বোশেখে
গাছের তলে বসে কে
গায়ে-পিঠে মাখছে ছায়া—
মিঠে-হাওয়ার স্পর্শ?

জল নাইকো পুকুরে
ধুঁকছে নেড়ি-কুকুরে
ঘেমে-নেয়ে কারোর দেখি
মুখখানি বিমর্ষ৷

দেখা হতেই শুরুতে
চলছে লঘু-গুরুতে—
গরম নিয়ে কতরকম
ফন্দি-পরামর্শ৷

ভরদুপুরে—বিজনে
দিব্যি আছি বীজনে
শাঁখ বাজিয়ে বরণ করি
প্রিয় নতুন বর্ষ৷

চোখ পড়লেই হাসি দেই দূর বহুদূরে
মোস্তফা হায়দার

বৈশাখের হালখাতার খেরোখাতায়
বাৎসরিক পার্বন দেয় পাঁচপোড়নের ডাক
জীবনের ধারাপাতে বসন্তের কোকিল খুঁজেছি
খুঁজতে খুঁজতে কখনো সুবর্ণা, কখনো ঈশিতা
কখনো বা সালমাকে পেয়েছি উর্মিলার মাঝে;

রোদের তপ্ততায় হাঁপাতে হাঁপাতে
কতজনের পাঁজরের দৃশ্যও করেছিল ব্যকুল
ইচ্ছের কাঠিন্যতায় সঙবরেণে লাগিয়েছি তালা
চাবিহীন এ সমাজে- রোদনে রোদন
বাড়তে
বাড়তে
ভেঙ্গে গেছে চাতাল নারীদের হালহাকিকত;

বৈশাখ এলেই চৈতালিকোকিলের সুরের রিনিঝিনি
চাতালদের নিয়ে যায় খুটেমুটে খাওয়া মঙ্গল শোভ্যাত্রায়!
তখনই মনে পড়ে
হারানো দিনের স্মৃতি
সংস্কৃতির অপছায়ায় ভাসতে থাকা বিশ্বাসহীনতার।

ডুবসাঁতারে কাবলাগোটা গিলে খাওয়া
আর পাঁচপোড়ন নামে বাঙালিপনায়
ডালকড়ি ভাজার কাছে বন্ধী ছিল বৈশাখের বিশ্বাস!
মাটির পুতুল, ঘড়িঘাট্টা, হাঁড়িপাতিলে
যে টুকু প্রেম ছিল- তা যেন হারিয়েছে চাতাল মাতালের কাছে!

আজ করোনার এই বৈশাখে
করোনার চেয়ে হিংস্রতা
আর হরিলুটের দৃশ্যে খুঁজি হারানো বিশ্বাসের প্রেম
যে প্রেম হৃদয়ে জাগে, অনুরণন যোগায়
চোখ পড়লেই হাসি দেই দূর বহুদূরের।

এই বৈশাখে বৈশ্মিক আক্রান্ততার চেয়ে
সবুজের প্রান্তর আজ রক্তসুধাপানে বড়ই ব্যস্ত!
অমঙ্গলযাত্রার কাছে ধুলোয় মিশেছে বাঙালিত্ব
ভোগের এই বৈশাখে টান না পড়ুক বিপরীত পাঁজরে
উদয়ের শোকেসে গান শুনতে ইচ্ছে করুক
‘তুমি সুন্দর, তাই চেয়ে থাকি এই কী মোর অপরাধ’

কৃষকের দিনলিপি
হাসান আবু নাঈম

আমি লাঙল ভালবাসি
ভালবাসি এই সবুজের মাঠ, খরখরে মাটির শীর্ণ কৃষক।
ভালবাসাই আমার কাছে বড়ো ভালদাম,
সব চেয়ে দামী।
বন্ধ্যা মাটির অলস তৃণ-শিশিরে করে আচ্ছন্ন,
খরতর এই বৈশাখী ফসলের মাঠ।
এ মাটির গর্ভে
সুপুষ্ট ফসলেরা উঁকি দেয়, তীব্র বেদনা বোধ কষাঘাতে,
দেখেছ কি?
এটা গোপন- একান্ত কিংবা প্রকাশ্যে জনলোক।
দুটি লাল গরু
গেরস্তালির ক্ষনেক তৃপ্তির দীর্ঘশ্বাস, মুছে আসন্ন দহনে
বেলা যায়।
আঙিনায় ঘূনপোকার বসবাস
জোয়াল, লাঙল, টুয়া অলস চিরবৈরী।
কাস্তের ঝকঝকে চকচকে বাঙালি
ডাল ভাতে হামাগুড়ি বহমান কাল
তবুও
বীজ ত্বকে ভবিষ্যৎ ঝুলে থাকে প্রাণ
খর্ব ধূলো স্হান পেলো
মুঠো মুঠো ভরে রাখা সোনা ধান।
আমি ভালোবাসি লাঙল ধরে রাখা কৃষকের মুখ
কৃষাণীর হাতে ঝরে পড়া উড়ো ধান।

বোশেখ মানে
আশরাফ আলী চারু

বোশেখ মানে গ্রীষ্ম এলো
নয়া বছর সেই সাথে
বোশেখ মানে পান্তা ইলিশ
পাটের পাতা শাক পাতে।

বোশেখ মানে চালবিলানি
আউশ ধানের বীজ বোনা
বোশেখ মানে চাঁদনী রাতে
গোনাই বিবি গান শোনা।

বোশেখ মানে ডুগডুগি আর
হরকিসিমের তাত শাড়ি
বোশেখ মানে উৎসবে আর
হালখাতাটায় জোশ ভারি।

আজ এ বৈশাখে
ইসমাইল বিন আবেদীন

চৈতালি দুপুর বিদায় নিয়েছে একদিন আগেই
কিন্তু সেই কাঠফাটা রোদে ঘোরা হয়নি সারামাঠ।
খেঁকশিয়ালের ডাক শুনতে শিমুল গাছের আড়ালে লুকোনো,
ঘুড়ি উড়োনো, নজুর সাথে ফাঁদ পেতে ধরা হয়নি যে ঘুঘুও।
হয়নি দু-একটা কচি আম কুড়োনোর
আশায় গাছের নিচে দল বেঁধে বসা।

আজ পহেলা বৈশাখ। ঘুম থেকে উঠে দেখা হয়নি বাবা-মাকে
খাওয়া হয়নি মায়ের হাতের সাদা ক্ষীর, পান্তা ও বেগুন ভাজি;
যাওয়া হয়নি বাত্তুলসী ধানের বীজ নিয়ে দূর মাঠে
শোনা হয়নি বৈশাখের গান আর রাখালের বাঁশি-
শুনছি কেবলই ঘুঘুর ডাক- বাবা ঘুট্টু ফের, ফের..

গেল বার পাহাড়ের গায়ে ঘুঘুর এ আর্তনাদ
শুনে মনে পড়েছিল মাকে!
খেলার সাথী নজরুল- মানে নজু; ও আমাকে বলতো-
ঘুঘু পাখিটার ছেলে হারিয়েছে; তাই খুঁজে ফিরছে-
আমি বলতাম থাক না! ওকে ধরে আর কাজ নেই।
ধরা হয়নি ছেলে খোঁজা সে মা পাখিটাকে
তবু আজ বৈশাখের এ প্রভাতে আমি সেই একই ডাক যেন শুনতে পাচ্ছি!
বাবা ঘুট্টু ফের, ফের…
এখনো কি মা পাখিটা সেই ছেলেটাকে খুঁজে পায়নি?
ছেলেটি এখনো ফেরেনি বাসায়?
নাকি মায়ের ডাক সে আজও শুনতে পায়নি!
কিন্তু এই নির্জন পাহাড়ে
আমি আমার মায়ের ডাক শুনতে পাই
আমি যে মাকেই খুঁজে ফিরি।
মাগো, কোথায়- কেমন আছ!
আজ এ বৈশাখে, প্রভাত বেলায়?

বৈশাখ এলো
শেখ একেএম জাকারিয়া

বৈশাখ এলো, দুয়ার খোলো
বরণ করো তারে,
নতুন ভাবে, নতুন সাজে
গড়ো জীবনটারে।

পুরনো গ্লানি,চোখের পানি
ধুয়ে মুছে হোক সাফ,
ভুলে যাও সব, ডাকো যে রব
হাত তুলে চাও মাফ।

হাত ধরে হাত,গাও দিবা রাত
নতুন দিনের গান,
এসো বৈশাখ, পাপ দূরে যাক
উঠুক হেসে প্রাণ।

রঙ্গিন বৈশাখ
সালমা বিনতে শামছ

বার্ধক্য চৈত্রের ঝিমিয়ে হেঁটে চলা,
নিরিবিলি প্রস্থান,
কচি পাতাদের অজস্র কথা বলা।
বাতাসের কানে কানে শিশ দিয়ে বলে যায়;
এলো যে বৈশাখ।
সূর্যের তেজ ভীষন,
ক্লান্ত হয় দেহ-মন।
হঠাৎ ই দমকা ঝড়ো হাওয়া
প্রকৃতির বিধ্বংসী খেলা,
প্রখন তাপ, এই বৃষ্টি
বৈশাখীর এই বেলা।
বার্ষিক গতিতে আসা
চক্রাকার বৈশাখী দিন,
বাঙ্গালির প্রাণের মাস
খুশিতে বাজায় বীণ।
রং মাখা দিবস গুলো
হয়ে উঠুক রঙ্গিন।

বৈশাখ ১৪২৭
অর্নিয়া অর্থি

যেতে পারিনি রমনার বট মূলে,
ছিল না তো পয়লা বৈশাখ আটকে।
হইনি হৈচৈ বৈশাখের মেলা,
শান্ত হয়ে কাটে সারা বেলা।

বৈশাখ উৎসব নিরুৎসব হলেও দেশে,
উৎসব হয়েছে প্রতিটি বন্ধ ঘরে ঘরে।
শোনা যায়নি কোনো বৈশাখের গান,
হয়েছে চারদিকে শুধু করোনা ভাইরাসের গান।

হয়নি প্রতি বছরের মতো বৈশাখ পালন,
তবুও পান্তা-ইলিশ,শাড়ি-ফুল পড়ে বৈশাখ করেছি গ্রহণ।

আনন্দ আলোকে
বিকাশ চন্দ

শেষ বছরের সকালে মাস পয়লায় তখন কৃষ্ণচূড়া বরণ
টলটলে জলের নাচন এদিক ওদিক অবসাদের ঢেউ
বন পাখিদের গানে ব্যাস্ত দোয়েল শালিক পায়রা টিয়া
রঙ বাহারি সময় কথা জানে কিছু শুদ্ধ সোপান
তবুও সামাজিক দূরত্বে ধীরে ধীরে নতুন বছর পালা
অস্পষ্ট মুখেরাও জানে একটু খুশির ধমনী স্পন্দন।

টুকরো টুকরো ছড়িয়ে পড়েছে কথা হাসি গান
বিনীত বসন্ত বৌরি আলগোছে ডেকে ওঠে একা
এ কেমন সময় যেন উৎসবের আড়ালে আত্ম পরিহাস
তবুওতো হার্দিক আবেদন আগামী বছরের নির্মিতি কাল
এই সবে বরণ বার্তা নদী জল মাটি ও আকাশে
আপন মাধুর্যে ঢেউ দোলে নদীর মোহনায়।

গাছেদের নতুন পাতায় সবুজ চিকণ রোদের মায়া হাসি
লুকোনো মরণ অদৃশ্য বিস্তারে থমকে দাঁড়িয়ে
এ বছর আনন্দ সকাল প্রথম পল্লবিত সূর্য আলোয়
বেদনা বোঝে মায়েরা আমার আঁচলে ভরেছে স্নেহ
সমস্ত পরজীবী নশ্বরতা থমকে দাঁড়িয়ে অবাক বিষ্ময়ে
চিরকালই প্রথম বর্ষ ভোর ভেসে আসে আনন্দ আলোকে।

নববর্ষের শুভেচ্ছা
সাকিব জামাল

গেলো কেটে দুঃখের চৈতালি রাত,
এলো নববর্ষ, সুখের সোনালী প্রভাত।
চলুক বয়ে আগামী সময় আনন্দ প্রাণে,
মঙ্গল ধ্বনি বাজুক সব অন্তর ধ্যানে।
আসুক সফলতা জীবনে সবার কাঙ্খিতমত,
আজই বিদায় হোক আছে যার অশুভ যত।
সতত শুভেচ্ছা আজ- অজস্র শুভ কামনায়,
সুসময়ে ভরে উঠুক জীবন- প্রতিদিন পথচলায়।

স্বাগতম বৈশাখ
প্রদীপ দত্ত

এই তো সামনে বৈশাখ
খরতাপ নিয়ে চৈত্র ছুটে চলেছে
কদিন পরই বৈশাখ।

লাল শাড়ির সাথে ম্যাচিং চুরি পরা তুমি হেটে যাবে রজনীগন্ধার খোপায়…
অথবা এলোচুলে কিছুক্ষণ না হয়
খালি পায়েই হেটো।

পৃথিবীর বর্জ নিয়ে ছুটে চলেছে
ভারাক্রান্ত মন
বিষাক্ত বাতাসে আটকে গেছে
স্বাধীন ভালবাসা।

ঠোঁট দুটো আটকে গেছে
মুখোশের আড়ালে
কতদিন তোমার মনগলা হাসি দেখিনি

লাল ঠোঁটে সাজান দাঁতের পাটি
অথচ দূয়ারে বৈশাখের হাটাহাটি।

হবে জয় নিশ্চয়ই আমাদের
উৎপলকান্তি বড়ুয়া

ও আমার প্রতিদিন প্রতি ভোর সকালবেলা
ও আমার প্রতিদিন ঘুমভাঙ্গা পাখির মেলা।
ও আমার প্রতিদিন কচি ঘাস শিশির ফোটা
ও আমার প্রতিদিন ফোটা কলি ফুলের বোঁটা।
ও আমার প্রতিদিন সোনা সোনা রোদের হাসি
ও আমার প্রতিদিন পাটি বেত পাতার বাঁশি।
ও আমার প্রতিদিন গাঁও মেঠো পথের বাঁক
ও আমার প্রতিদিন দুপুরের ঘুঘুর ডাক।
তোমরা কেমন আছো, তোমাদের বলো কি হাল?
আমি তো বন্দি ঘরে এখন যে করোনাকাল!

ও আমার ডিসি হিল সিআরবি শিরিষ তল
ও আমার খুকুটির গালে আঁকা রঙে ঝলমল!
ও আমার বাঁশি-সুর তাকডুম তাকডুম ঢোল
ও আমার নাগরদোলার কেচোর মেচোর বোল!
তোমরা কেমন আছো, আছে কি সে গান সুর তাল?
আমার তো একাকী যাপন এখন যে করোনাকাল!

ও আমার প্রতিদিন দীঘি জল পুকুর ঘাট
ও আমার প্রতিদিন ইসকুলে নামতা পাঠ।
ও আমার প্রতিদিন হালদার ভাটির টান
ও আমার প্রতিদিন একতারা বাউল গান।
ও আমার প্রতিদিন বিকেলের খেলার মাঠ
ও আমার প্রতিদিন গঞ্জের দূরের হাট।
ও আমার প্রতিদিন আকাশের সাঁঝের তারা
ও আমার প্রতিদিন জোছনার আলোর ধারা।

ও আমার সি বিচের নন্দিত উদার সে শোভা!
ও আমার রবি ঠাকুরের গান কী যে মনলোভা!
ও আমার পান্তা ইলিশের শানকি ভরা ভাত
ও আমার বটতলা গাঁও মেলা শান্ত প্রভাত!
তোমরা কেমন আছো? ও আমার বৈশাখী ঝড়-
তুমি হও আজ ‘করোনা’র প্রচণ্ড ভীতি-ডর!

ও আমার প্রতিদিন এই সবে মিলে মিশে থাকা
আজ আর আমাকে যে হলো নাতো ভালোই রাখা।
ঘরে বাধা পড়ে আছি করোনা’র ভয়াল চাপে
হয়তোবা কপালের আছে দোষ নিজের পাপে।

ও আমার প্রতিদিন ভালো থাকা সকল সাথি
মাথার উপরে ধরি বাঁচবার জীবন ছাতি।
তোমরাও ভালো নেই জানি জানি আমার মতো
একদিন ফুরোবেই দেখে নিও সকল ক্ষত।

ও আমার বোশেখের আগমনী, নতুনের সুর
মুছে দাও ‘করোনা’র কাল সে তো হয়ে যাক দূর!
হবে জয় নিশ্চয়ই পরিপাটি নয় অগোছালো
আঁধারের শেষে দেখো হাসবেই সুখের আলো!

নববর্ষ
শুক্লা রায়

কোথাও কোন বৃষ্টি লেখা নেই
অথচ গোমড়ামুখো আকাশ কেমন
মনখারাপে ভেসে থাকলো মাথার উপর!
চৈত্রের দুপুরের শেষ রঙটি বিঁধে থাকে বুকে
একটা নাছোড়বান্দা ছবির মতো!
সে ছবি ধিরে ধিরে অন্ধকারে ডুবে গেলেও
থেকে গেল অদৃশ্য বাতাসের গায়ে।
রঙ চটা হলদেটে আলমারীর পাল্লা বন্ধ করে
রাত নিভিয়ে দিই।

নতুন ভোরে জানলা খুলে দিতেই
বৈশাখ এসে বসে।
রঙিন নক্সা করা হাতপাখায়
কিছুটা বাতাস, কিছুটা স্বপ্ন!
আমরা জানলায় জানলায় ঝুলিয়ে রেখেছি
একাকীত্বের নীল মেঘ!
মানুষ-বিহীন সুনসান রাস্তায় চলাচল করে
কেবল নিঝুম বাতাস!
আমাদের এই মনখারাপের দিনে
আমাদের এই একলা থাকার দিনে
বৈশাখ এসে বসে!
আটপৌড়ে শাড়ির আঁচলে
আলতো মুছে দেয় মুখময় লেপ্টে থাকা
ভয়ের ঘাম!

বোশেখ মেলা
শেলীনা আকতার খানম

ছড়িয়ে ডানা উড়ছে নানান
প্রজাপতির দল,
কইরে তোরা সামিন তারিফ
বোশেখ মেলায় চল।

আজকে সবার মনের ঘরের
খুশির দুয়ার খোলা,
নাগরদোলায় চড়বো,সুখের-
লাগছে প্রাণে দোলা।

মেলায় আছে হরেক রকম
খেলনা পুতুল বাটি,
ঝুমঝুমি ঢোল বাঁশের বাঁশি
বেতের শীতল পাটি।

ঘুরবো মেলায় কাটাবো দিন
থাকবো খেলে হেসে,
আজকে সবাই হারিয়ে যাবো
খুশির নিরুদ্দেশে।

মাটির থালায় ধান
হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়

মাটির থালায় যারা ধান এঁকেছিল
আনন্দে মাটি মেখেছিল সারা গায়ে
ধানের বুকে দুধ আসার আনন্দে
তারাই উঠোন গোবরে নিকিয়েছিল
যতদূর গোল হয়েছিল হাতে হাতে
পুরোটাই একটা ভালোবাসার পৃথিবী
ধানের আনন্দে উঠোনে এসে বসেছিল
একটা দুটো তিনটে চারটে চড়ুই
চড়ুইয়ের ঠোঁটে ঠোঁটে যে ধান গল্প লিখেছিল
তার মালিক ছিল বেশ কয়েকটি গাছ
পুবের সূর্যঘর থেকে আলো এসে
খুব একচোট নেচেছিল ধানের উঠোনে
ভাতের গন্ধে বর্ণপরিচয়ের সামনে
কত কত মাথা দুলেছিল একদিন
সাদা ভাতের থালার সামনে
নদীর মতো এসেছিল অবাধ সকাল

তারপর দুপুরেই নেমে এলো এক করাল ছায়া
উঠে এলো এমন কিছু হাত
যাদের বাপ ঠাকুরদাকে পৃথিবীতে
কেউ কোনোদিন কোথাও হাঁটতে দেখে নি
রাতারাতি জমির ক্যানভাসে জমা হলো
অসংখ্য কালো রেখা
আর রক্তের গভীর আঁচড় মাটির গায়ে গায়ে
হাতে হাতে সব ভাত চুরি হয়ে গেল
ভাঙা ফুটো তোবড়ানো থালাগুলো
এমনভাবে ছড়িয়ে ছিল সারা মাঠ জুড়ে
মনে হবে ভারতের ম্যাপটা দিন দুপুরে
সকলের চোখের সামনে কে যেন ছিঁড়ে দিয়েছে।

বৈশাখী রঙ
মজনু মিয়া

বছর ঘুরে বছর আসে আমার বাংলাদেশে
বহুরূপে সাজে এ দেশ নানান রঙের মেশে।।

মেলা বসে মেলায় খেলা আসে
আলতা চূড়ি বেলুয়ারী
কত রঙের বাদ্য বাজে আহা
দেখে তামশা করি আড়ি
ঘুরে ঘুরে দেখি সবি খুবই ভালোবেসে।।

গায় বাউলের গান যায় জুড়িয়ে প্রাণ
নেচে নেচে ফুর্তি করি
গায়ে হলুদ লালের শাড়ি পড়ি
আহা বৈশাখী রঙ ধরি
নানান মানুষ নানান বেশে থাকি হেসে হেসে।।

মহানির্বাণের পরে
শুভঙ্কর দাস

মহানির্বাণের পরে
অপু আর আমিনা পাশাপাশি শুয়ে থাকে জ্বরে,
এই মৃত্যু-মন্বন্তরে!

এই হাতপাখার দেশে
লালন আসে বরকতের বেশে
যাদের মুখে লেগে আছে আতপ চালের সুগন্ধ, চোখে নক্ষত্র শিশির আর হাতে হাতে সূর্য-শালিক
কোনো এক দুর্যোগের শেষে উড়িয়ে দেবে হাসিমুখে

সবকিছু যদি ডুবে যায় হিম-অসুখে!
ওগো ঈশ্বরী পাটনি,অন্নপূর্ণাকে ডাকো,হাওয়া লেগেছে নৌকার পালে!

অফুরন্ত শান্ত পারাপারে বর চেয়ে নেবে আবার, এই হলুদপাতার কালে

জীবনানন্দ আর শামসুর রাহমানের কবিতা শোনানো হোক রাতদিন
হাসপাতালে হাসপাতালে!

কালবৈশাখী
তারিকুল ইসলাম সুমন

পাগলা হাওয়ায় ঘূর্ণী ওড়ে
খড় বিচালি-খড়,
চৈত্র শেষে মেঘ কড় কড়
কাল বৈশাখীর ঝড়।
আমের বনে মাতম ডাকে
করুন যেন হাল।
সবুজ গুটি আছড়ে পড়ে
ওড়ায় ঘরের চাল।
বকের সারি হাওয়ায় ঘোরে
উড়তে বাঁধে বাঁধ,
কালো মেঘে পাহাড় গড়ে
মিটায় যেন সাধ।

কাল বৈশাখীর মনটা কালো
কঠিন করে মুখ,
এক নিমেষেই ভেঙে চুড়ে
দেয় ছড়িয়ে দুখ।

প্রতীক্ষা
শুভ্রাশ্রী মাইতি

বড় বিপন্ন এ পৃথিবী।
চেনা-অচেনা প্রশ্নের জাল মুখোশ ঢাকা মুখের প্রতিটি লুকানো বলিরেখায়।
অতিমারীর অশরীরী থাবায় মৃত্যুর কালো ঢল।
অশনি সংকেতের সেই ভয়ংকর চিঠিটা খোলা খামে বার বার আসে ভুল ঠিকানায়।
তবু আশ্চর্য নির্লিপ্ততায় বাতাসে আবার বিষ ঢালে দূষণ গাড়ির লম্বা মিছিল।
আবার আকাশের নীলিমাটুকু অক্লেশে মুছে দেয় শহুরে ধোঁয়াশার ধূসর কোন ডাস্টার।
আবার সমুদ্রের বালুকাবেলা কচ্ছপের ডিমের বদলে ভরে ওঠে অজৈব আবর্জনায়।
মানুষের স্বার্থপর আমিত্বের চাপে আবার দলে,মুচড়ে নষ্ট হয়ে যায় পৃথিবীর সবটুকু কোমলতা!
বড় ভয় হয়,তাই বড় ভয় হয়…
পারবো তো… পারব তো আমরা পেরোতে এই ভীষণ মৃত্যুমিছিল?
পারব তো শিখে নিতে হাত হাত ধরে বেঁচে থাকার মন্ত্র?
পারব তো পাল্টাতে নিজেদের!
সময়ের অবিশ্রান্ত স্রোতে ভাসতে ভাসতে দরজার চৌকাঠে আজ আবার এসে দাঁড়িয়েছে নতুন বছর।
এসো বন্ধু,হাতের উপর রাখ হাত- ভালবাসার, আশ্বাসের।
দেখো, একদিন ঠিক কেটে যাবে এ অবিশ্বাসের অমানিশা।
সংশয়ের কালো পর্দা ছিঁড়ে সভ্যতার রাঙা সূর্য আবার উঠবে এই বদলে যাওয়া মানুষেরই হাত ধরে।
সেই প্রত্যাশার অমলিন প্রতীক্ষায় মাটি গন্ধমাখা উঠোনে আজও বিছানো নরম শীতলপাটি।
যেখানে তালপাতার হাওয়ায় আর বাউলের মেঠো সুরে আজও জেগে থাকে একটি পরমান্ন সকাল।

এসো হে নববর্ষ
আবুল খায়ের নাঈমুদ্দীন

ডেকে চলেছি সবাই এসো হে বৈশাখ এসো নববর্ষ,
নবান্ন উৎসব নাকি আমের মুকুলে প্রতি এ আহবান!
নাকি রমনার বটমূলের সেই গানের আসর!

নাকি বিগত বছরের হাঁড় কাঁপানো কষ্টের মুক্তি?

মানুষ আমরা-
মানবতার দেয়ালতো নেই?
তবে কোন নববর্ষের আহবান!

বাবুই পাখির মতো আপন নীড় নেই কারো,
ঈগলের মতো মুক্ত আকাশও নেই উড়বার,
আগের মতো মেঠো পথ আর প্রকৃতি নেই,
জোয়াল বাঁধা গরু মহিষের পাল নেই,
কৃষাণের নব বধূরা কলসি কাঁখে হেঁটে যায় না।

তবে কোন নববর্ষের আগমন!

বিশ্ব স্বাস্থ্য যখন ক্রন্দণরত, বিশ্ব মানবতা যখন আপনা প্রাণে বৈরী,
করোনার থাবা যখন ঘরে ঘরে,
তখনও আমাদের কর্তারা চুরির কাজে ব্যস্ত!
আপসোস হে নববর্ষ!

যদি পারো-
নতুন বিশ্ব মানের মানুষ নিয়ে
সবার কপালে দাও রাজটিকা!
সবার ভাগ্যকে করো-
সুপ্রন্ন মানবতাবোধে জাগ্রত,
তবেই এসো হে নববর্ষ।

নববর্ষ
সৈয়দ আছলাম হোসেন

চৌদ্দ শত সাতাশ সালে
বৈশাখ এলে,
বিশ্বজুড়ে মহামারি
জনগন জেলে।

দেশে দেশে মরছে মানুষ
করোনার থাবায়,
ঝুকি নিয়ে অনেকেই
অন্যকে খাবায়।

নববর্ষে দোয়া করি
ঘরে বসে সব
মহামারি করোনা
বন্ধ করো রব।

বর্ষ শুরুর ছড়া
মুজিব হক

আসলো নুতন সূর্য ওঠা ভোর,
ব্যর্থতা সব পেছন ফেলে
নুতন আশায় দু’চোখ মেলে;
জাগুক প্রানে নবান্নের হুল্লোড়।

কলকলিয়ে উঠুক হেসে নদী
নবীন আলোয় চোখ মেলেছে কুঁড়ি!
দখিন হাওয়া বহুক নিরবধি
ফুলের কন্ঠে ঝরুক না ফুলঝুড়ি।

এসো তবে প্রানের উছল মেলায়
এসো নবীন ফুল পাখিদের দল,
আঁধার যতো সরিয়ে অবহেলায়
জাগাতে প্রান মুমূর্ষে অচঞ্চল!

বাংলার বৈশাখ
শওকত আলম

বৈশাখে ঘরবাড়ি মটকায়,
কৈতালে ফুটনাড়ি চটকায়।

কৈখালে পুটখালি পটকায়,
বৈকালে সুটমারি লটকায়।

চৈতালে হুটতাড়ি ঝটকায়,
বৈফালে ঝুটঝাড়ি কটকায়।

বৈতালে ঝুকবাতি চমকায়,
টৈশালে শুটহাতি দমকায়।

ঝৈঝালে লুটপাতি ঢংকায়,
সৈকালে ঝুটকাটি শকায়।

পৈপালে বিলমাড়ি লঙকায়,
মৈমালে মালমাতি ধমকায়।

বোশেখ
মির্জা মুহাম্মদ নূরুন্নবী নূর

হে নবাগত বোশেখ! তোমাকে স্বাগতম
নিরাপদ জীবনের গতি ফিরে আসুক তোমার আগমনে
মহামারীর আতঙ্ক কেটে আলোর ভোর ফুটুক
প্রত্যাশার শুরুতেই জানিয়ে দিই আরো কিছু
তুমি সাবধান হয়ে এসো
কোমরটা শক্ত করে এসো
জেনে রেখো-
তোমার গতির নল্লি টিপে ধরার পাঁয়তারা চলছে
তুমি আরও সতর্ক হয়ে থেকো স্বাক্ষী হবার।

কিসের বারতা দেবে হে বোশেখ!
আনন্দে হিল্লোলিত নবজাগরণের!
নতুন সম্ভাবনার!
সুদিনের ক্ষণ গননার!
নাহ্! এসব কিছুই না
কেন?
সময় তো বৈরিতা দেখাচ্ছে এখন
আরে নাহ্! সময় না-
একদল সিন্ডিকেট নরপিশাচ করছে এমন।

বুভুক্ষুর মুখের আহার কেড়ে নেবার খবর পেয়েছ
না তো!
দশ টাকার চাল নিলামে দেবার সংবাদ শুনেছ
কই, শুনিনি তো
জেলেপাড়ার জাল ফুটো করার ফটো দেখেছ
অনেক দিন হয় দৈনিকের পাতায় চোখ রাখিনি।
বাহ্!
তোমাকে অভিবাদন হে বোশেখ!
তুমি এভাবেই চুপ থেকো ভাই
কিছুই দেখতে চেয়ো না আর
আর যদি দেখতে হয় তাহ‌লে মিনতি আমার রেখো
তোমার কালবৈশাখী ঝড়কে দাওআত কর
কানে কানে বলে দিও
একটা হানা দিক ওদের লৌহ কপাটে
ওদের দৃষ্টি নন্দন বহুতল প্রাসাদের বারান্দার গ্রিলে।

সতর্ক থেকো-
কোনো বুভুক্ষের ঘর ভেঙে দিও না
করোনায় আক্রান্ত কারো দুয়ারে আঘাত দিও না
হুম কোয়ারেন্টাইনে আছে যারা তাদের ঘরেও না
আইসোলেশনে আছে যারা তাদের বাড়িতেও না
যারা সামাজিক দূরত্ব রেখে চলছে তাদেরকেও না।

তোমার হিসেবের পুরাতন খাতাটা উল্টে রাখ
ধারাপাতের নতুন খাতা মেলে ধরো
আজকে না হয় হালখাতার নগদায়ন বন্ধ থাক
শুরু হোক নতুন হিসাব।

আমার একটা আকুতি আছে
ছোট্ট একটা চাওয়া আছে, একটা দাবি আছে
শুনবে?
হুম, বল শুনি
একাকীই কেটেছে নিশুতি রাত
ভোরের বৈশাখী সকাল
তাই-
আমার সখীর দুয়ারে একটু উঁকি দিও
বৈশাখী এলোকেশের সুঘ্রাণ বইয়ে দিও
কালো কেশের বেনিতে চিরুনির আঁচড় দিও
শশীর খোঁপাটিতে দোপাটির পরশ দিও
যা দেখে আনন্দ হিল্লোলে নেচে উঠবে আঁখিযুগল
আমার স্বপ্নসন্ধ্যাণী ভালোবাসা!

হালখাতা
হুসাইন দিলাওয়ার

খাতা থাকে মহাজনের
আরো থাকে মুদির
ধারে বিক্রির হিসাব রাখে
লাভ-লোকসান গদির।

চলা ফেরায় কটু কথায়
তোমার মনের বাঁকে
মনের খাতায় আমার নামে
বকেয়া যদি থাকে।

হালখাতাতে এলাম আমি
আমার সালাম নিও
জীবন হাটের বিকিকিনি’র
ছাড় বাট্টা দিও।

মনের খাতার পাতা জুড়ে
ছিল যত ঋণ
ফতুর আমি হে মহাজন
ক্ষমা করে দিন।

ফসল আমার পোকায় খেল
খাজনা নিল রাজা
তুমি যদি না ছাড় হে
বাড়বে আমার সাজা।

কুয়াশা ভেজা নববর্ষ
বিমল মণ্ডল

শীত ব্যাকরণ জলে সাঁতার কাটে
বসন্ত প্লুত পাথরের ঘেরাটোপে
গভীর মৃত্যু- বিষাদের তরজা

কে জানে এই পৃথিবীর পথ
মুছে যায় হৃদয়ের দ্রাঘিমান্তর

চারদিক আগুন রাষ্ট্রের বিষুবরেখাকে টেনে
গতকালের রাতে তাজা তাজা কফিন বন্দী
চির- নিশীথের অস্তাচল

রোজ প্রতিটি নববর্ষ
যা মানুষের হৃদয় কুয়াশায় আঁটা

এই পৃথিবীর মৃত্যু সরোবর
নববর্ষের কুয়াশা তিমির রাতে।

নববর্ষের নব উৎসব
কবির কাঞ্চন

ইলিশবিহীন পান্তা ভাতে
লালমরিচের হাসি
আপদকালীন এইসময়ে
কত্তো ভালোবাসি।

করোনার ভয় করব যে জয়
আরাধনা করে
উৎসবেরই আমেজ যেন
বাংলার ঘরে ঘরে।

ঘরের ভেতর উৎসব করি
দিনের শেষে রাতে
বন্ধন যেন সুদৃঢ় হয়
আপনজনের সাথে।

বাইরে যাওয়ায় বারণ আছে
উৎসবেতে মানা
এর বদলে করোনারা
দেয় না যেন হানা।

চলবো না আর উল্টো পথে
বিপথগামীর সনে
হে দয়াময় রহম করো
তোমার বান্দাগণে।

বৈশাখ ও স্বপ্নের কথকতা
কমল কুজুর

ইশান কোণে অবিরত কালো মেঘের
আনাগোনা ঝড় হয়ে ক্রমে জিততে চায়
ময়ূরপঙ্খী মন
নীল জলের আঁকরে অবিচল সমুদ্র
সুদূর নীলিমায় ভেসে চলে স্রোতের মায়ায়।

বসন্তের পাতা ঝরা দিন ক্রমেই জেঁকে বসে পৃথিবীর পরে
ছন্নছাড়া জীবনের অলিগলি ডুবে যেতে থাকে নিদারুণ উপহাসে
পথে পথে উচ্ছিষ্টের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে
থাকে তৃষ্ণার্ত মানুষ দিনরাত কষ্টের
ব্যাকুলতায় নিমজ্জিত, অমাবস্যার আঁধার ভরা মনে অবিরাম তারা ক্ষণ গোণে
শুধু একটা নতুন সময়ের;
এক নূতন সূর্যোদয়ের।

অসহায় আতংকিত মানব প্রাণভরে
নেবে শ্বাস হৃদয়ের ফল্গুধারায় যাবে
ধুয়ে মুছে সব সন্তাপ
কুয়াশার চাদর সরিয়ে দেবে উঁকি
নব বৈশাখ,
দেখা দেবে এক অকৃত্রিম পৃথিবী
প্রকৃতির মায়ায়
আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো ভালোবাসায়।