নতুন বছর নতুন আশা
ছড়িয়ে যাক ভালোবাসা
নতুন বছরে আমাদের আশা দেশের মানুষের মধ্যে পয়দা হোক ভালোবাসা। সারা পৃথিবীতেই আজ ভালোবাসার অভাবে ঝরে যাচ্ছে সবুজ পাতা। ভালোবাসায় পূর্ণ হলেই বেহেস্তি সৌরভ ছড়িয়ে যাবে সারা বাংলায়। নববর্ষের ১৪২৮ ভালোবাসা জানাই আমাদের পাঠক, লেখক, সুধি এবং আমাদের ওয়েবকে সহযোগিতাকারী প্রিয়জনদের। নতুন বছরের নতুন দিনের মতোই আমাদের জীবনের প্রতিটি দিন হোক সুন্দর ও ভালোবাসাপূর্ণ।
সম্পাদক-আফসার নিজাম

সূচীপত্র
বৈশাখ :: মোশাররফ হোসেন খান
বৈশাখে :: আফসার নিজাম
এলো বৈশাখ :: নীলিমা আক্তার নীলা
বাঙালী বোশেখ :: শিউলী খান
নব পল্লবে সাওমে বৈশাখ :: পারভীন আকতার
কালবৈশাখী ঝড় :: হুসাইন দিলাওয়ার
এসো নব আনন্দে :: সৈয়দা কানিজ রাসুল
বৈশাখে নেই আনন্দ :: হাসু কবির
পাতার নৌকো :: সিদ্ধার্থ সিংহ
…………………………………………..

বৈশাখ
মোশাররফ হোসেন খান

বৈশাখের সাথে ওড়ে দাবদাহ বাতাসের হাঁস,
ফলবান বৃক্ষরাজি তবু যেন কালের সম্রাট!
দিগন্তের বুক চিরে ফালা ফালা ফাটল বিরাট-
তবু আশা-নিরাশার কোল ঘেঁষে কৃষকের বাস!
বিশুষ্ক বাতাসে দোলে ধুলোবালি আশঙ্কার বুক
বিস্তৃত প্রান্তর, নদীর কিনার কেবলই ধুধু–
দিগন্তব্যাপী বৈশাখী ঝড়! কাঁপে গৃহ শুধু
উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা! বেড়ে যায় বুকের অসুখ!
ঝরে যায় জীর্ণ পাতা ছিঁড়ে যায় নাওয়ের পাল,
কেড়ে নেয় সূর্য-তৃষা, কাঙ্ক্ষিত সবুজাভ দৃষ্টি
দূরে চলে যায় বহু প্রতীক্ষার বৈশাখের বৃষ্টি-
হাতের মুঠোয় ঘোরে কামালের পরিশ্রান্ত হাল।
তবুও আসে বৈশাখ মুছে দিতে যাতনার ভার,
নওল বৃষ্টিতে খুলে দেয় বিপুল স্বপ্নের দ্বার।।
…………………………………………..

বৈশাখে
আফসার নিজাম

বৈশাখে ভেঙেছে হৃদয়ের জিঞ্জিরি
আর ভেঙেছে সিন্ধুকে রাখা
পানশালা পিঞ্জির
এক সাথে যে হাত রেখেছিলো সেই হাতে
এখন এ হাত দেখে না সে হাত
আজ তারা খিঞ্জির।
…………………………………………..

এলো বৈশাখ
নীলিমা আক্তার নীলা

কোন বালিকা যাচ্ছে ছুটে
নতুন আলোর খুঁজে
বৈশাখ ঝড় আসলো বলে
চক্ষু যে তার বুজে।
রং তুলিতে রং দিয়ে সে
আঁকছে আল্পনা
চিত্র শিল্পীর কারুকাজে
হয় যে লাল কণা।
মন আকাশে উড়ছে যে তার
মন পবনের ঘুড়ি
উড়ছে যে তার শাড়ির আঁচল
উড়ছে যে মন কুড়ি।
…………………………………………..

বাঙালী বোশেখ
শিউলী খান

আগুন ঝরা ফাগুন শেষে বোশেখ আসে রুদ্র-বেশে।
ঝোড়ো হাওয়ার রুদ্রানলে আম কুড়োনোর সুখের জলে।
আলতা রাঙা গাঁয়ের বধূ ঝুমুর পায়ে ঢালে মধু!
দোয়েল কোয়েলের মিষ্টি সুরে
প্রেম যেন ভাসেরে!
নীলাকাশের নীলাচলে নীলকান্ত-সুখ ভাসে ভালে!
কেঁদে ফেরে বিরহিনী কী যেন এক চাতকিনী !
একটু ছায়া মিষ্টি হাওয়া ক্লান্ত পথিকের হারিয়ে যাওয়া।
বটের ছায়ে শিশু দোলে
খুশির দোলায় দোলে।

অগ্নি ঝরা বোশেখ যেন বিদ্রোহের দাবানল হেন!
অভাব-অভিযোগ-সাঁতারে দিনগুলো কেটে যাচ্ছেরে।
এর ওপর আছে করোনা, তাকে কিছুতেই না বলা যাচ্ছে না।

দিন শেষে সাদা ভাত, জনগণ বাদ!
…………………………………………..

নব পল্লবে সাওমে বৈশাখ
পারভীন আকতার

নব সাজে এসেছে যেন
এবারের বৈশাখ,
পবিত্রতার সুধা নির্যাস নেয়
পাখি তরু শাখ।

সাওমে, তারবীহ পেয়েছে
কতই সৌভাগ্য নিয়ে,
বৈশাখ আজ সাক্ষী ধ্রুবতারা
বাংলায় আরবী দিয়ে।

বাংলা সনে সাওমের মিলন
এ এক আশ্চর্য ক্ষণ,
কালের কপালে তিলক পড়লো
রহমতের আপনজন।

সকল ধর্মেই বৈশাখ আজ
পালিত হবে সগৌরবে,
রাব্বুল আলামীন একজনই
নব পল্লবের সৌরভে।

যে চিনে তাঁরে সেইতো জানে
তিনি মুকুলের ঘ্রাণ,
বৈশাখ বিত্তশালীর গরীবের তরে
উছিলা ঈশারার প্রাণ।
…………………………………………..

কালবৈশাখী ঝড়
হুসাইন দিলাওয়ার

আসত যদি একটা এমন কালবৈশাখী ঝড়
উড়িয়ে নিত পুড়িয়ে দিত দুখের যত খড় ।

আসত যদি একটা এমন কালবৈশাখী ঝড়
ঝড়-ঝাপটের তুমুল বেগে পালিয়ে যেত ডর ।

আসত যদি একটা এমন কালবৈশাখী ঝড়
যায় না উড়ে চাষীর কুড়ে কাঁপত না থরথর ।

আসত যদি একটা এমন কালবৈশাখী ঝড়
টুনটুনিদের ছোট্ট বাসা হইত দালান ঘর ।

আসত যদি একটা এমন কালবৈশাখী ঝড়
সুখের পরীর টাকা কড়ির পেতাম যদি বর ।

আসত যদি একটা এমন কালবৈশাখী ঝড়
নদীর ধারে কুঁড়িয়ে পেতাম স্বর্ণ-বালির চর ৷

আসত যদি একটা এমন কালবৈশাখী ঝড়
করত আলো আঁধার কালো সকল নারী-নর ।

আসত যদি একটা এমন কালবৈশাখী ঝড়।
…………………………………………..

এসো নব আনন্দে
সৈয়দা কানিজ রাসুল

এসো নব আনন্দে হে বৈশাখ,
এসো বসো বাতায়ন পাশে সকল
বন্ধ দুয়ার খোলা আজ।
আর নয় দুঃসহ স্মৃতি, বুকের ভিতর জমাট কান্নার বরফ
গলে সিক্ত হয়ে উঠুক মনের আঙিনা।
এত যে মৃত্যু, জরা, খরা, তাপ
দূর হয়ে যাক সকল দুঃখ পাপ
এসো নব আনন্দে হে বৈশাখ।
এসো যত পুরাতন, যত মলিনতা ধুয়ে নবপল্লবে
শাখায় শাখায়
এসো অর্থনীতির হাল খাতায়
এসো নদীর ঢেউয়ে, ফুলের শাখায়, পাখির কলতানে
এসো শিশুর হাতে চরকি ফুলের ঘূর্ণিতে
এসো চপলা তরুণীর বৈশাখী শাড়িতে
এসো প্রেমিকার জন্য প্রেমিকের হৃদয়ের আকুলতা নিয়ে
এসো ঘরবন্দী মানুষের জীবনে এক ঝলক খুশির বারতা নিয়ে
স্তব্ধ ধরায় প্রাণের স্পন্দন নিয়ে ফিরে এসো স্বমহিমায়,
আবার হেসে উঠুক বাংলার প্রকৃতি তোমার আগমনে।
কেটে যাক ঘোর অমানিশা, নববর্ষের শুভবারতা নিয়ে
এসো নব আনন্দে হে বৈশাখ।
…………………………………………..

বৈশাখে নেই আনন্দ
হাসু কবির

বৈশাখ এলো বছর পরে
আনন্দ নেই মনে
মরণ ভাবনার বাসা সবার
মনের গহীন কোণে।

ক্ষণে ক্ষণে শঙ্কা জাগায়
কোভিড নাইন্টিন
হাসি গানে বৈশাখ এলেও
ভাবায় মৃত্যুবীণ।

পান্তা ইলিশ খায় নাতো কেউ
বুকে সবার করোনার ঢেউ
বন্দি আপন ঘরে
খিদের জ্বালায় কেহ জ্বলে
ভাসে কেহ শোকের জলে
বাঁচতে সংগ্রাম করে।

ঢাকের আওয়াজ নেই কারুকাজ
মাথার উপর অপেক্ষায় বাজ
যেন বিধি বাম
নেই কলরব বটমূলে
জানি না তা কোনভুলে
বিমুখ ধরাধাম।

মঙ্গলযাত্রা নেই পথ জুড়ে
বিষন্ন মন বিধুর সুরে
করোনারই ডরে
বেঁচে থাকার আশা করে
প্রার্থনায় রয় নামাজ পড়ে
মহান প্রভুর তরে।
…………………………………………..

পাতার নৌকো
সিদ্ধার্থ সিংহ

তুমি যেমনটি চাও, গাঢ়-রঙা টিপ
আলতা, কাজল আর জংলা ছাপায় নিজেকে সাজিয়ে
ছিলাম দু’চোখ বুজে গাছের তলায়
এমনই ধূসর এক বৈশাখী দুপুরে
পিছু থেকে চোখ টিপে ধরবে কখন!
হঠাৎই কানে এল, টিপে টিপে আসা পায়ের পাতায়
গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাওয়া পাতার মর্মর
এত কাছে, তবু এত ফাঁকা ফাঁকা কেন!
চেয়ে দেখি, তোমাদের রাখাল-বালক চরাতে এসেছে হরিণ-বাছুর।
সকালে তোমাকে নাকি কেউই দেখেনি বিছানায়…
দমকা বাতাসে ছোটে ঝরা পাতা-টাতা
ময়াল-আঁচল ধরে আমাকে পেচিয়ে…
তা হলে কি সত্যি কথা পরীরা আকাশে মেলে ডানা মধ্যরাতে!
ঝলসে ঝলসে যায় এ দিক-ও দিক
যত দূর চোখ যায় পথ চেয়ে থাকি—

ভাবি, জ্যৈষ্ঠ মাসে
মাহেন্দ্র যোগে কি কেউ তোমাকে করেছে বশীভূত!
নইলে এ জন্মদিনে বাল্য বিবাহিত বট-পাকুড়ের ডালে
নেই কেন মানত করে বেঁধে যাওয়া নতুন কোনও ঢেলা,
আগেকার ঢেলাগুলো বৃষ্টি-শিশিরে পচে খসে খসে পড়ে
তা হলে কি মনোবাঞ্ছা হবে না পূরণ!

আষাঢ়ের সকালে
পাঠশালা যেতে যেতে ভাসাতাম নৌকো খাতার পাতা ছিঁড়ে খালে-বিলে
তুমি তাতে লিখে দিতে আমার নাম, তোমার নাম—
কত দূর যেত সেটা দাঁড়িয়ে দেখিনি কোনও দিনও।
নজরে পড়ত শুধু ফেরার সময় ভাসছে এক কোণে কাগজের ভেলাটি।
চেয়ে চেয়ে দেখতাম, কী ভাবে মৃদু ঢেউয়ে মিশে যাচ্ছে
আমাদের নাম দুটো জলের ভিতরে

জলে জলে জলমগ্ন সারাটা শ্রাবণ
অলক্ষুনে মন বলে, যা শুনি, হয়তো তা-ই ঠিক
বিছানায় মুখ গুঁজে ঢুকরে কাটাই সারারাত
আরও যদি দেরি করো কাটাব তোমার কাছে পুরোটা শ্রাবণ।

মনে পড়ে, সেই ভাদ্রে বন্ধুরা মেতেছে যখন ঝুলন সাজাতে
ফাঁকি দিয়ে পালিয়েছি পেয়ারা বাগানে
দোলনা বেঁধে দু’জনে ভেসেছি
কখনও এনেছি তুলে কচুরিপানার রাঙা ফুল
অথবা ছুটেছি শুধু ফড়িঙের পিছু পিছু এ মাঠে সে মাঠে…
কোথায় হারিয়ে গেছে সেই ছুটোছুটি, ঝুলনে ঝুলন খেলা
কখনও হবে কি আর একসঙ্গে দোলা!

আশ্বিনের আগেই তো শুরু হত চালা বাঁধা
মুখুজ্জেবাড়িতে ঠাকুর বানানো।
কে আগে দেখতে পারে মা দুগ্গার মুখ
ছুটতাম মহালয়ার দিন ভোররাতে
সেটা কি আসল ছিল, না কি তোমার ও মুখ দেখে
মনে মনে ভাবতাম, দিন ভাল যাবে
একটি ঝলক আজ সেই মুখ যদি দেখা যেত হঠাৎ প্রত্যুষে!

সে বার কার্তিকে
সরায় দেখিয়েছিলে আতপের গোলা, বলেছিলে-
চৌকাঠে পায়ের ছাপ যদি রেখে যাও
মাকে আর কষ্ট করে আঁকতে হবে না
তুমিই তো এ ঘরের লক্ষ্মীস্বরূপিণী।
কেউ কি ফেলল শুনে এই কথা!
তাকিয়েছি আলোয়-অন্ধকারে
বলেছি, এ ভাবে নয়
শাঁখা আর সিঁদুরে আমার বড় লোভ, দেবে?
একটু সবুর করো, তুমি বলেছিলে
কিন্তু আর কত কাল! আর কত যুগ!

প্রত্যেক অঘ্রাণে
যেতাম রাসের মেলা পাশাপাশি হেঁটে আমরা দু’জনে, মনে পড়ে?
ফাঁকা পথে কৃষ্ণচূড়া গাছের তলায় দিয়েছিলে প্রথম চুম্বন
থরথর কাঁপা দুটি ঠোঁটে,
এখনও সেখানে যাই, যদি দেখা হয়!
নাগরদোলার ভেলা শুধু ঘুরে ঘুরে আসে, তোমাকে দেখি না
বড় একা লাগে, তাই এ বার সন্ধ্যায়
সেই কৃষ্ণচূড়ার পাশে লাগিয়ে এসেছি একটি রাধাচূড়া।

তখন তো আরও ছোট, শাড়িও ধরিনি
পৌষের নবান্ন রাতে চাদরে আমাকে আগলে
পৌঁছে দিয়েছিলে বাড়ি
তখনই তো ছোঁয়াছুঁয়ি, লজ্জাবতী লতা।
তার পর থেকে চোখে চোখ মিলে গেলে
শরীরেও খেলে যেত তিরতিরে ঢেউ
সকালে শিশির আর কুয়াশায় ভিজে যেতাম তোমার কাছে
ঠিক কত দিন হল, বলে দিতে পারি
দেয়ালের গায়ে কাটা দাগ না-গুণেই।

আতঙ্কে কাটাই বড় মাঘ এলে, মনে পড়ে যায়
সাঁকোটা পেরিয়ে গেলে কত অনায়াসে
কাঁপা কাঁপা পায়ে আমি
ও পারে পৌঁছে দেখি, তুমি বহু দূরে…
যত জোরেই হাঁটি, দূরত্ব ঘোচে না
ঝাঁকরা গাছের মাথা ঝুপ করে মুহূর্তে নামায় ঘন রাত
তুমি কই? চোখ মেলি ধুকপুক বুকে
কিছু কিছু মনে পড়ে কিছুটা হারাই
পুষ্করিণীর কাছে ভোর রাতে বলি
ছেঁড়া ছেঁড়া সেই স্বপ্নগুলো
তোমার হয়ে কাটি হাড়িকাঠে ফাঁড়া।

তা হলে কি তুকতাক কখনও হয় না ফাল্গুনে!
বুড়িমার মন্ত্রপূত ফুল-বেলপাতা
খাটের পায়ার নীচে এত দিনে পাক্কা আমচুর
তিন দিনের মধ্যেই অথচ আসার কথা ছিল!
তা হলে কি তাই…
তোমার বাড়ির লোক হয়তো সেটাই ভেবেছে
এক-আধটা বিষমও কি খাও না গো তুমি!

মনেও কি পড়ে না সেই চৈত্রে চুপিচুপি তুলসীতলায়
আবিরের ছলে আমার সিঁথিতে তুমি সিঁদুর দিয়েছিলে
করেছিলাম প্রণাম আমি হাঁটু গেড়ে।
তোমার পায়ের সেই চিহ্নটুকু ছেড়ে নিত্যদিন লেপি দু’চোখের
ফোঁটা ফোঁটা জলে করি শিবচতুর্দশী।
যেখানেই থাকো তুমি আমার ওড়ানো এ আবির
ঠিক ছোঁবে প্রিয় সে পায়ের পাতা দু’টি
যদি সত্যি সত্যি ছোঁয়, এ শরীরে অন্তত একবার ছড়িয়ো
তোমার ছোঁয়ার শিহরন!

এই গাজনের দিনে পূর্ণ হবে বারোটা বছর
সে দিনও না এলে আমি এ বার করব একাদশী-